অদ্ভুত ফেরিওয়ালা

অনেক দিন আগের কথা। সবকিছু এতটা উন্নত ছিল না। মানুষ আস্তে আস্তে সভ্য হতে শুরু করেছে। আধুনিকতার সুবাতাস তখনো মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ে নি। যোগাযোগ ব্যবস্থাটাও এতটা উন্নত ছিল না। গরুর গাড়ি নিজ পায়ে ধুলা উড়িয়ে সভ্য পথের মানচিত্র আঁকে। দক্ষিণা বাতাসও এর অনুসরন করে আপন মনে ধুলা উড়িয়ে দুর-দূরান্তে ছিটায়, সভ্যতার আভাস দিতে। এমনি একটি গ্রাম কদমতলি।

আধুনিকতা গ্রামের লোকদের কাছে মহাকাশের মতোই মহাশূণ্য। যে মহাআকাশ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনকে গ্রামবাসিরা অপ্রয়োজনীয় মনে করে। গ্রামের একটি মাত্র ছোট হাট। হাটের পাশ দিয়ে ছিল গরুর পায়ে অঙ্কিত সভ্য পৃথিবীর মানচিত্র। যা বর্তমানের বড় বড় রাস্তার পূর্বশরী ছিল মাত্র। হাটটা এতটাই ছোট ছিল যে, মাঝবয়সী একটা বট গাছের বিশাল দেহটার ছায়াটাও অতিক্রম করতে পারে নি। বট গাছটাও তার বিশাল দেহের ছায়াই হাটটাকে গ্রামের মানুষের ন্যায় করেছে শান্ত, অপরুপ সৌন্দর্যের অধিকারী। গ্রামটি যদি মেয়ে হতো তাহলে সৌন্দর্যের কোনো ঘাটতি বা ত্রুটি পরিস্ফুটিত হতো না। হাটের ঠিক মাঝখানে ছোট্ট একটা ঘর ছিল। ছোট্ট ঘর হলেও এর মর্যদাটা ছোট না। সবাই এখনো ঘরটাকে মনে রেখেছে। আসলে ঘরটাকে নয়, মনে রেখেছে ঘরের মানুষটাকে।


আরও পড়ুন>>


এই ঘরেই দিনের আলোতে বাস করতো এক বৃদ্ধ ফেরিওয়ালা। বৃদ্ধটি বিভিন্ন গাছ-গাছড়ার শিকড়, লতা-পাতা, ছাল দিয়ে ঔষধ তৈরি করে তা দিয়ে মানুষের প্রয়োজনের সেবা করতো। প্রয়োজন বলতে, গ্রামবাসির গৃহে বিভিন্ন অপরিচিত ব্যামো প্রায়শ আশ্রয় নিত। আর সেবা অর্থ তিনি গরিব লোকদের থেকে কোনো টাকা নিতেন না। নিলেও ধনীদের থেকে নামমাত্র গ্রহন করতো। যে ঘামটা পরিশ্রমের তুলনায় অনেক কম ছিল। বৃদ্ধ নিজের জীবন ধীরে ধীরে দান করে, বাঁচিয়েছেন অনেক জীবন।

এইতো সেদিন গ্রামের শেষপ্রান্তের বাসিন্দা ফটু তার ছোট পাঁচ বছরের ছেলেকে নিয়ে, রাস্তাটাকে ভেজাতে ভেজাতে আসে ফেরিওলার কাছে। ফেরিওয়লা সবেমাত্র খাবার থালায় হাত বুলানো শুরু করেছেন। ফটুর ব্যাথার ভাষায় আহত হয়ে থালার দানাগুলোকে আদর বঞ্চিত করে, খাওয়া শেষ করার আগেই হাতটা ধুয়ে দৌড়ে এসে ফটুর ছেলেটাকে ভালো করে দেখে। চোখগুলো ওল্টাচ্ছে এবং হাত-পা গুলো কাঁপছে। আজকের দিনে লক্ষণটা গুরুত্বর মনে না হলেও, আগের দিনে তা বেশ ভয়ের কারন ছিল। কেননা আগের দিনে বেশিরভাগ মৃত্যু হতো এ লক্ষণের মিলনে। বর্তমানে এটা কোন ভয় না। কারন যুগের হাওয়াই রোগের হিংস্রতা আরো হিংস্র হয়েছে। তাই লক্ষণ তার মূল্য হারিয়েছে। ফেরিওয়ালা একের পরে এক কি যেন ফটুর ছেলের মুখে দেয়। এভাবে তদবির চলে অনেক্ষণ। চিন্তা আর ভয়ের যমদূত কুড়ে ঘরের পরিবেশটাকে শোকের বাতাসকে ভারি করেছে। সবার জ্ঞান ও বোধ শক্তি সে বাতাসের দমকা হাওয়াই উপড়ে পড়েছে। চেষ্টার পরিশ্রমে ফেরিওয়লার চুপসানো দেহের রসে কাপড় ভিজে, সময়ের কিরনে তা আবার শুকানোর উপক্রম।


আরও পড়ুন>>


একটু পরে সবার মুখে হাসির রোদ আলো দেয়। ভয়ের কুয়াশা সে রোদে হারিয়ে যায়। এভাবেই ফেরিওয়ালা কাটিয়েছে তার জীবন এ হাটে, মানুষের সেবাই। বিনিময়ে কিছুরই আশা করেন নি। কেননা দুনিয়ার বড় হওয়ার নেশাটা সবাইকে আসক্ত করতে পারে না। অনেকে স্বার্থের রাজ্য সম্পর্কে একেবারেই অচেতন। তাই শরীরটা নুয়ে পড়লেও, তার ভবিষৎ দৃশ্যটা রচনার আগ্রহ এখনো তাকে জাগাতে পারে নি। তাই নিজেকে লুকোচুরির খেলায় অংশগ্রহন করায়।

আজব ব্যাপার তার নামটাও অনেকের কাছে অধরা। অল্প কিছু লোক জানলেও সে সংখ্যা হিসাবের অযোগ্য। এমনকি কোথায় থাকেন, কিভাবে থাকেন, কিভাবে এখানে আসেন, তাও সবার কাছে অজানা । বরং তার জীবনটা যেন চন্দ্রলোকের মতোই গভির। কৌতুহল তা গবেষণার চেষ্টা করলে অন্ধকারটা আরো অন্ধকার হয়।

 কিন্তু তাতে কি ? তিনি যে মানুষের প্রকৃত সঙ্গী, তা সবার জানা। অনেক দিন হয়ে গেল। গ্রামের অনেক নবীন অতিথি এসেছে, যারা ফেরিওয়ালার চিত্র দর্শন করে নি। ফেরিওয়ালার নাট্যগৃহের অনেক দর্শক অচেনায় পাড়ি জমিয়েছে। সেই ফেরিওয়ালাও আর আসে না। কেউই জানে না তার কি হয়েছে ? কিন্তু সবাই তার অনুপস্থিতি দারুনভাবে উপলব্ধি করে। হয়তো তিনি সৃষ্টিকর্তার আলিঙ্গনে অদৃশ্যের আমন্ত্রনে সাড়া দিয়েছেন।


আরও পড়ুন>>


এখনো অনেকে আসে এ হাটে, চিকিৎসার জন্য। কিন্তু সবাই তা নিতে পারে না। প্রিয়জনদের ভালোবাসার গানে প্রকৃতি স্তব্দ হয়ে যায়। প্রিয়জনকে ফিরিয়ে দেওয়ার তাদের ধমকানি যমদূতকে ভীত করলেও নতুন কুড়ে ঘর কর্তাদের মনে ভয়ের সঞ্চার করতে পারে না। নতুন কুড়ে ঘরের কর্তাদের সেবার ধরনে অনেক পরিবর্তন। তাদের কাছে চিকিৎসার মুলমন্ত্র মূল্যবান কতিপয় হীড়কদানা। আর চিকিৎসার সে হীড়কদানাগুলো সবাই যোগাড় করতে পারে না। কেবল ধনীরাই সে সৌখিন হীড়ক গ্রহন করে, তাদের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে থাকে। আর গরিবরা সেই হীড়ারদানার অভাবে সৌন্দর্যের প্রতিযোগীতা থেকে বাদ পড়ে, স্থান পায় ময়লার স্তুপে।

তাই এখন সবাই ফেরিওয়ালার কথা ভাবে। এখন বুঝতে পারে, তার সেবার মূল্য। তাই তারা ফেরিওয়ালাকে বাঁচিয়ে রাখে, নিজেদের মাঝে, নিজেদের আত্মার গৃহে, আপনজন হিসাবে। ফেরিওয়ালার কথা উঠলেই, স্মরন করে তার ফ্যাকাশে চিত্র। ভালোবাসা ধুলিকণা হয়ে জমা হয় কড়ে ঘরের গায়ে। প্রকৃতি সেই ভালোবাসার ধুলার রঙকে তার কোলে অপার  স্নেহে লালন করে। তার নাট্যগৃহে এখনো কল্পনায় অভিনয় করে অন্যরা। এভাবেই ফেরিওয়ালা আজও অমর। এটাই তো মানবের মহান পাওয়া। যা সবাই ছুঁতে পারে না।

এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

Leave a Reply

লেখক

সর্বশেষ সংবাদ

মরেও শান্তি নেই নারীর: গণসমাবেশে নারী সংগঠনের নেত্রীরা

নারীর ওপর ক্রমবর্ধমান সহিংসতা-ধর্ষণ, নির্যাতন ও বিচারহীনতার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নারী সংগঠনের নেত্রীরা। তারা বলেছেন, মরেও নারীর শান্তি নেই। হাসপাতালের মর্গে গিয়েও শান্তি...

আশুলিয়ায় ‘ছাদ থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যা’ নারী শ্রমিকের

ঢাকার আশুলিয়ায় পোশাক কারখানার ‘সাততলার ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে’ এক নারী শ্রমিক নিহত হয়েছেন। আশুলিয়া থানার এসআই আল মামুন কবির জানান, শুক্রবার বিকালে কাঠগড়ার...

লক্ষ্মীপুরে স্বেচ্ছাসেবকলীগ নেতা ইসমাইলের বিরুদ্ধে মাছ লুটের অভিযোগ

লক্ষ্মীপুরে ইসমাইল নামে এক স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতার বিরুদ্ধে একটি খামার থেকে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ টাকার মাছ লুটে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে। বৃহস্পতিবার (২৬ নভেম্বর)...

করোনা বলে আর কিছু নেই, তাই ভ্যাকসিনেরও প্রয়োজন নেই! বিজ্ঞানীর বিস্ফোরক দাবি

''ভ্যাকসিন নিয়ে এমন হাহাকার আমি আগে দেখিনি। যেন এই ভ্যাকসিন না পেলে পৃথিবী ধংস হয়ে যাবে। আদলে তো সেরকম কোনো ব্যাপার নেই। এখন করোনা...
%d bloggers like this: