অপরাধী সনাক্তকরণে এবং ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায় ডিএনএ প্রযুক্তি

0
93
অপরাধী সনাক্তকরণে এবং ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায় ডিএনএ প্রযুক্তি
অপরাধী সনাক্তকরণে এবং ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায় ডিএনএ প্রযুক্তি

পৃথিবী সৃষ্টির পূর্ব হতে অপরাধ কথাটির সঙ্গে পরিচিত আমরা। এটা আমরা জানতে পেরেছি ধর্মীয় কিতাব হতে, আর এই অপরাধকে সনাক্তকরতে যুগে যুগে বিচার ব্যবস্থার প্রচলন। পরবর্তীতে এখন এটা হাজার হাজার বছর পরে আদালতে রুপান্তরিত হয়েছে।বিচার ব্যবস্থায় থাকেন বিচারক, আইনজীবী, ভুক্তভোগী, অপরাধী, স্বাক্ষী এগুলো ছাড়া আরও অনেক কিছু জড়িত আছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল বিচারক স্বাক্ষী ব্যতিত ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। বিচার ব্যবস্থায় একটা কথা প্রচলিত আছে আর তা হল অপরাধী যেই হোক না প্রকৃত সত্য উন্মোচন করাই হল বিচারক ও আইনজীবীদের কাজ সেটা হোক পক্ষে অথবা বিপক্ষের আইনজীবী। আর এই ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করতে সবচেয়ে বেশী ভূমিকা রাখে স্বাক্ষী উনার উপর নির্ভর করে আদালতের রায়। কিন্তু এখন আমরা যেটা দেখি যদি স্বাক্ষী সত্য কথা বলে তবে ভাল, অনেক সময় পেশী শক্তি , টাকার ভয়ে মিথ্যাকেও সত্য বলতে দ্বিধা করে না । একজন মিথ্যা স্বাক্ষীর কারণে একজন নিরপরাধ মানুষ ও ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত হয় এবং তাকে দিনের পর দিন জেল খাটতে হয় এমনকি মৃত্যুদন্ড পর্যন্ত হয়। এ ক্ষেত্রে বিচারকের কোন কিছু করার থাকে না উনি ইচ্ছা করলেও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারে না এমন কিছু দুশ্চরিত্র মানুষের জন্য যারা মিথ্যাকে সত্য বলতে দ্বিধা করে না।


আরও পড়ুন>>


বর্তমানে ডিএনএ প্রযুক্তি আমাদের কাছে পরিচিত একটা নাম। আমি মনে করি এই প্রযুক্তি আল্লাহ প্রদত্ত আমাদের জন্য একটা নেয়ামত যা মানবজাতীর মাধ্যমে ১৯৮৫ সালে আবিষ্কৃত হয় । যিনি এটা আবিষ্কার করেন তার নাম স্যার অ্যালেস জেফ্রে একজন ব্রিটিশ বিজ্ঞানী। পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম ডিএনএ প্রযুক্তি ব্যবহার করে আদালতে রায় প্রদান করা হয় যুক্তরাজ্যে ১৯৮৭ সালে একজন ধর্ষক সনাক্তকরণে যার নাম কলিন পিচকফ যিনি একজন মেয়েকে ধষণ তারপর তাকে খুন করে। বাংলাদেশে প্রথম ডিএনএ প্রযুক্তি এর ব্যবহার শুরু হয় ২০০৬ সালে ন্যাশনাল ফরেনসিক ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবরেটরীর মাধ্যমে । এটি প্রতিষ্ঠিত হয় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে। এরপর ২০১৪ প্রতিষ্ঠিত হয় ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাবরেটরী অব বাংলাদেশ পুলিশ। এই দুইটা ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাবরেটরী আমাদের দেশের ডিএনএ টেস্ট এর সেবা প্রদান করে আসছে।

ডিএনএ প্রযুক্তি আমাদের দেশের বিচার ব্যবস্থায় অসাধারণ ভূমিকা পালন করে আসছে। এটা কেন বিচারক বেশী পছন্দ করছে কারণ এই প্রযুক্তিতে এমন একটা বৈশিষ্ট্য আছে যা কোন মানুষকে সুনিদিষ্ট ভাবে সনাক্ত করতে সক্ষম। এই ক্ষেত্রে কোন স্বাক্ষীর প্রয়োজন পড়ে না এজন্য এটা বেশী জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। আমরা জানি বিচার ব্যবস্থায় কোন স্বাক্ষী ছাড়া বিচারক সঠিক রায় দিতে পারেন না কিন্তু যখন ডিএনএ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয় তখন সেই ক্ষেত্রে শুধুমাত্র ডিএনএ টেস্ট এর রেজাল্ট এর উপর ভিত্তি করে বিচারক বায় প্রদান করে থাকেন। এবং সেটা সফলভাবে প্রমাণিত হচ্ছে রায় দেওয়ার পর কারন সাজাপ্রাপ্ত ব্যাক্তি প্রথমে অস্বীকার করলেও পরবতীতে সেটা স্বীকার করে নেন। যদি অপরাধী অস্বীকার করে তারপরও সেটা কাযকরী হয়ে থাকে।


আরও পড়ুন>>


একটা উদাহরন দিলে সেটা স্পষ্ঠ হয়ে যাবে , যেমন ধরুন একজন মহিলা ধর্ষণের ফলে গর্ভবতী হয়, এর কিছু দিন পর সন্তান জন্ম গ্রহন করে কিন্তু তার সন্তানের পিতৃত্ব কেউ স্বীকার করছে না। এর মধ্যে মহিলাটি আদালতে মামলা করে এবং নিদিষ্ট বা কিছু ব্যক্তির বিপক্ষে অভিযোগ দায়ের করেন। এরপর আদালত ডিএনএ টেস্ট করার জন্য তদন্তকারী অফিসার এর উপর দায়িত্ব দেন। এরপর ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করার জন্য তদন্তকারী অফিসার মহিলা, শিশু ও অভিযুক্ত এক বা একাধিক ব্যক্তিকে ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাবরেটরীতে নিয়ে যান এবং তাদের ডিএনএ নমুনা দিয়ে আসেন। এই পৃথিবীতে প্রতিটি মানুষের ডিএনএ আলাদা কারও সাথে কারও মিল নেই। তবে প্রতিটি মানুষ তার ৫০% ডিএনএ বাবা ও ৫০% মার কাছ থেকে পেয়ে থাকেন। এরপর ডিএনএ টেস্ট এর ফলাফল পজিটিভ অথাৎ যদি মিলে যায় শিশুটির সঙ্গে অভিযুক্ত কোন ব্যাক্তির সঙ্গে তবে সেই ব্যক্তি সেটা অস্বীকার করতে পারবে না যে ঐ শিশুটির পিতা তিনি নন। ধরুন তিনজন অভিযুক্ত ব্যক্তি ছিল তাহলে একজন এর সঙ্গে ডিএনএ এর ফলাফল মিলে গেল কিন্তু অন্য জনের সঙ্গে কেন মিললো না এজন্য তিনি অপরাধী। আবার ধরুন কারও সঙ্গে মিলে নাই তখন বুঝতে হবে ঐ তিনজনের মধ্যে ঐ শিশুটির বাবা নেই, তাদেরকে মিথ্যা হয়রানি করার জন্য মামলা দিয়েছে। সন্তানটির পিতা হয়ত অন্য কেউ হবে। এভাবে ডিএনএ টেস্ট এর উপর ভিত্তি করে আদালত মামরার রায় প্রদান করে থাকেন।আর এভাবে কোন স্বাক্ষী ব্যতিত বিচারক রায় প্রদান করেন, এটা একটা যুগান্তকারী বিষয় এবং ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে।

সাম্প্রতিক সময়ে ডিএনএ প্রযুক্তি একটি শক্তিশালী হাতিয়ার এ পরিণত হয়েছে অপরাধ তদন্তে এবং বিচার ব্যবস্থায়।পৃথিবীতে খুব কম প্রযুক্তি আছে যা ডিএনএ প্রযুক্তির মতো পরিপূণভাবে বিশ্বব্যাপী সমন্বয় সাধন করা হয়েছে। আমাদের দেশের অপরাধ তদন্তে ও বিচার ব্যবস্থায় ডিএনএ প্রযুক্তির সংযোজন একটা মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে ।পৃথিবীব্যাপী ডিএনএ টেস্ট সমন্বয় করার জন্য যুক্তরাষ্ট একটা সফটওয়্যার আবিষ্কার করেছে যার নাম CODIS যার মানে হল Combined DNA Index System. এটা যুক্তরাষ্টের গোয়েন্দা সংস্থা FBI দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় এই সফটওয়্যার বাংলাদেশ সরকারের কাছে হস্তান্তর করা হয় ব্যবহার করার জন্য যখন ২০১৩ আমাদের দেশের রানা প্লাজা ট্র্যাজেড্রি সংগঠিত হয়। সারাবিশ্বে এখন পযন্ত ৫০ টির অধিক দেশ এই সফটওয়্যার ব্যবহার করছে এখানে ১৫টি STR marker ব্যবহার করা হয় যাতে করে আপনি পৃথিরীর যে কোন দেশে ডিএনএ টেস্ট করলে একই রেজাল্ট আসবে।পরিশেষে শুধু একটা কথাই বলতে চাই যে আমাদের দেশের বিচার ব্যবস্থায় ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ডিএনএ প্রযুক্তির কোন বিকল্প নেই , এটা মানব জাতির জন্য কল্যাণকর।

লেখক: রবিউল ইসলাম, সায়েন্টিফিক অফিসার, বিভাগীয় ফরেনসিক ডিএনএ স্ক্রিনিং ল্যাবরেটরী, ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ।

Leave a Reply