অবরুদ্ধ চিন্তা বনাম পরিবর্তনশীল সমাজ

১.

মানুষের বিষয় বস্তুগত অবস্থার উন্নতির সাথে চিন্তনগত আনন্দের অবস্থান প্রায়ই বৈপরীত্যের সম্পর্কে সম্পর্কিত এবং অনেক ক্ষেত্রে তা সাংঘর্ষিক। আনন্দ কী? “আনন্দ” বলতে কেবল বস্তুগত আনন্দকে বোঝায় না, সূক্ষ্ণ চিন্তনগত আনন্দও পৃথিবীতে আছে যা উপলব্ধিগত বিষয়, যাকে চর্চার মাধ্যমে লালন করতে হয়। তার মানে আবার এও নয় যে,বস্তুগত আনন্দ সর্বদা পরিত্যাজ্য এবং চিন্তনগত আনন্দ বস্তুগত আনন্দের সাথে সর্বক্ষেত্রে বিরোধপূর্ণ অবস্থায় অবস্থান করে। বিষয়টা ভারসাম্যের, ভারসাম্য বজায় থাকলে বস্তুগত আনন্দ প্রায়ই চিন্তনগত আনন্দের পরিপূরক অবস্থানে বিরাজমান থাকে। তবে এটাও সত্য যে, সূক্ষ্ণ আনন্দকে লালন করতে গিয়ে স্থূল বস্তুগত উন্নতিকে যুগে যুগেই জ্ঞানী, চিন্তাশীল ব্যক্তিদের পরিত্যাগ করতে হয়েছে। কারণ তথাকথিত সমাজ কখনওই সূক্ষ্ণ অনুভূতিসম্পন্ন জ্ঞানী ব্যক্তিকে মূল্যায়নের জন্য প্রস্তুত থাকে না। যদিও যুগের প্রেক্ষিতে তিনি ঠিকই তাঁর চিন্তন, কিংবা তাঁর ক্রিয়াকলাপের জন্য মূল্যায়িত হয়ে থাকেন।

আবার “জ্ঞানী” মানে এও নয় যে, সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিই চরম এবং পরম হিসেবে গ্রহণীয়। কারণ পরম ও চরম সত্যের প্রতি মানুষের কামনাগত আকুতি থাকলেও প্রকৃতপক্ষে যেকোনো সার্বিক বাক্য, বাণী বা উপদেশই পরীক্ষণযোগ্য এবং যেকোনো মুহূর্তেই তা বাতিলযোগ্য হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে। যেমনটি ঘটেছিল আইনস্টাইনীয় আপেক্ষিতাবাদের আবিষ্কারের ক্ষেত্রে যা নিউটনীয় গতিবিদ্যাকে গোড়া থেকে উপড়ে ফেলেছিল। কাজেই অবস্থার প্রেক্ষিতে সবই পরিবর্তনশীল এবং পরিবর্তনকে গ্রহণ করাই যথার্থ জ্ঞানীর প্রাথমিক বৈশিষ্ট্য।

রক্ষণশীলতাকে গ্রহণ করে ব্যক্তি নিজেকে অভিজাত ভাবতে পারেন, কিন্তু ব্যক্তিগত অনুভূতিকে আঁকড়ে থাকায় প্রকৃতপক্ষে গৌরবের কিছু নেই। যিনি পরিবর্তিত হন, বুঝতে হবে তিনি সামাজিক অর্থাৎ সমাজলব্ধ নতুন নতুন জ্ঞান বিজ্ঞান অর্জনের জন্য তিনি প্রস্তুত এবং এর মাধ্যমে তিনি গ্রহণ বর্জনের ক্ষমতা অর্জন করেছেন যা তাকে পরবর্তীতে পরিবর্তিত করেছে। তবে সামাজিকতা বলতে এখানে তথাকথিত গোষ্ঠীবদ্ধ অবস্থান কিংবা অন্যের ব্যক্তিগত জীবনে হস্তক্ষেপ করাকে বোঝাচ্ছি না, বরং আমার দৃষ্টিতে তিনিই প্রকৃতপক্ষে সামাজিক যিনি পরিবর্তনশীল, যিনি প্রয়োজনে অবস্থান করতে পারেন তার অর্জিত ধ্যান ধারণার বিরুদ্ধে, তার সমাজ, সংগঠন কিংবা প্রতিষ্ঠান থেকে অর্জিত শিক্ষার বিরুদ্ধে এমনকি তার নিজস্ব ব্যক্তিগত অবস্থান ও সত্তার বিরুদ্ধেও।

যুথবদ্ধভাবে অবস্থানই ব্যক্তির সামাজিক পরিচয়ের একমাত্র প্রতীক কিংবা নির্দেশক নয়। একাকী অবস্থানেও ব্যক্তির চিন্তনগত অবস্থান সামাজিক হতে পারে, যদিও প্রথাগত মানুষের কাছে বিষয়টা সহজে বোধগম্য নাও হতে পারে।

২.

আমাদের প্রচলিত চিন্তা চেতনায়, রক্তে মাংসে এবং মূল্যবোধের মধ্যে এই শিক্ষাটুকু পাই না যে, আমার কথাটুকু, আমার বক্তব্যটুকু, আমার দেওয়া দিক নির্দেশনাটুকু যে কোন সময় বাতিল হয়ে যেতে পারে! এমনকি খারিজ হয়ে যেতে পারে আমি যে দৃষ্টিভঙ্গিতে পৃথিবীকে দেখি এবং ব্যাখ্যা করি তাও।

ব্যক্তিগত অবস্থান এবং নিছক ব্যক্তিগত অভিব্যক্তিতে সামগ্রিকতাবাদ (Totalitarianism) এবং কর্তৃত্ববাদ (Authoritarianism) চিন্তা চেতনায় ভর করে থাকে। বদ্ধমূল পরিবেশ, বিশেষ করে আমাদের সামাজিক শিক্ষায়, রাজনৈতিক শিক্ষায় আমাদের নিজস্ব ব্যক্তিগত চিন্তনে, নাড়ী- নক্ষত্র, হাড্ডি-মাংস, মজ্জায় মিলেমিশে আছে আমার অভিমতের বাইরে অন্য যেকোন মত এবং অভিমত সবই বাতিলযোগ্য।

আমার মতের চেয়ে তোমার মত অধিকতর যৌক্তিক এবং উত্তম হতে পারে না। অন্যের দেওয়া মতামতের একটা বাক্যও গ্রহণ করা যাবে না। এই হচ্ছে আমাদের সমাজের বেশীরভাগ মানুষের মানসিক অবস্থা (Stand) এবং স্তর (Stage)। সেখানে এই বাণীটি কি কখনো মনের গহীনে নতুন করে সুর (Symphony) তুলেছে যে; আমাদের ব্যক্তিগত শিক্ষা, পারিবারিক শিক্ষা, সামাজিক শিক্ষা, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, এমনকি রাজনৈতিক শিক্ষাটুকুও বাতিল হয়ে যেতে পারে নতুন একটি দার্শনিক মতাদর্শের নমুনার কারণে, নতুন একটি অবস্থিত বাস্তবতার কারণে।

আমরা সমাজের ঘটনাগুলোর (Fact) উপর সাঁতরে বেড়াই, বাছাই করে নিজের সাথে মিলিয়ে নেই, যা মিলে যায় তাই লুফে নেই। আর যা নিজের ব্যক্তিগত জীবনে মিলে যায় না তা দিয়ে সমাজে নেতিবাচক মন্তব্য (Judgement) করি, এবং এটা করতে গিয়ে সীমাহীন অসংগতি সৃষ্টি করি। সমাজের অসংগতিকে পরম (Absolute) করে ফেলি। সমাজের অসংখ্য অসংগতি চোখের সামনে ভাসলেও, সেগুলো তৈরিতে যে কারণগুলো ভূমিকা রাখছে সেই কারণগুলো অনুসন্ধান করার মনোবৃত্তি আমাদের কখনো মাথাচাড়া দিয়ে উঠে না। একটা বিষয়কে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা এবং ব্যাখ্যা করার জন্য বস্তুনিষ্ঠ পূর্ণাঙ্গ উপলব্ধি, তত্ত্বগত উপলব্ধি গঠন প্রয়োজন। দার্শনিক দারিদ্র্য দূরীকরণে পারিপার্শ্বিক প্রথা প্রতিষ্ঠান এবং মতাদর্শিক চর্চাকে সন্দেহের দৃষ্টিতে মূল্যায়ন খুব গুরুত্বপূর্ণভাবে প্রয়োজন। কেন প্রয়োজন সেটাও এখানে একটা মূখ্য আলোচনার এবং পর্যালোচনার দাবি রাখে। কারণ সমাজ আমাদের মাথায় ঢুকিয়ে দেয় এই কর্তৃত্ববাদী চিন্তা, যা দাঁড়িয়ে আছে সামগ্রিকতাবাদের উপর, তা মূলত অভিজাততন্ত্রকে প্রকাশ করে এবং সার্বজনীন হতে বাধা প্রদান করে। এক্ষেত্রে এরিস্টটলীয় এবং হেগেলীয় চিন্তাই আমাদেরকে আটকে রাখে। এরকম প্রথাসিদ্ধ চিন্তাকাঠামো আড়ষ্টভাব দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদী এমনকি সাম্যবাদী চিন্তার সাথে বিরোধ ঘটিয়ে দেয়, যার দরুণ মুক্তচিন্তার মানুষ, বিজ্ঞান মনস্ক এমনকি সমাজমনস্ক মানুষ হয়ে উঠা সম্ভব হয় না।

সমাজের এক শ্রেণীর লোক আছেন যারা ঢালাওভাবে তত্ত্ব বিরোধিতা করে থাকেন। তত্ত্ববিরোধিতা নিয়ে তাই কিছু কথা বলা দরকার। অনেকেই আছেন যারা মনে করেন যে, সৃষ্টির রহস্য কখনো উদঘাটন করা যাবে না অর্থাৎ তারা যে কেবল ‘সৃষ্টি’ ও ‘তত্ত্ব’-এর মধ্যে একটি অসম বিভক্তি সৃষ্টি করছেন শুধু তাই নয়, তারা একই সঙ্গে এক ধরনের সৃষ্টি -তত্ত্ব তৈরি করেছেন। যদিও তারা এই জ্ঞানতত্ত্ব মানতে নারাজ এবং তাদের আচার-আচরণে উচ্চারণে প্রায় অভ্যাসবশতভাবে তা জারি রেখেছেন। তারা আবার ঢালাওভাবে তত্ত্বের বিরোধিতাও করেন এই বুঝিয়ে যে, তত্ত্ব দিয়ে সৃজনশীল অবস্থা বা অবস্থিত বাস্তবতা ব্যাখ্যা করা যায় না। তত্ত্ব দিয়ে কি পেট চলে! বেশীরভাগের ধারণা তত্ত্ব দিয়ে মানুষের জীবন চলে না। লক্ষ করলেই দেখা যায়, যারা তত্ত্বের বিরোধিতা করছেন তারাও কোন না কোন তত্ত্বের প্রবাহ দ্বারা প্রভাবিত। আপনি জানুন আর নাই জানুন! মানুন আর নাই মানুন! আপনার বাইরের অবস্থিত বাস্তবতা যেহেতু আপনার চেতনা নিরপেক্ষ বস্তুজগৎ তাই বস্তুজগতের সকল রকম ঘটনাই আপনাকে আপনার চিন্তার উপলব্ধিতে সিদ্ধান্ত পৌঁছে দিচ্ছে। তাতে আপনি হয়তো নতুন পরিপ্রেক্ষিতে আসা তত্ত্বের বিরোধিতা করছেন কিন্তু ইতিমধ্যে আপনি নতুন অথবা পুরাতন কোনো না কোনো তত্ত্বকে রক্ষণ (Defence) করছেন।এটা একটা বাস্তবতা। আপনি কোনো না কোনো প্রবহমান তত্ত্ব দ্বারা পরিচালিত হচ্ছেন। তত্ত্ব থাকে মানুষের আচার-আচরণে, বিভিন্ন অভিব্যক্তিতে, মতামতে এবং আভাসে ইঙ্গিতে।

কোনো কোনো তত্ত্ব এবং চিন্তা চেতনা মানুষকে করে মুক্ত, আবার কোন কোন তত্ত্ব, বা চিন্তাকাঠামো মানুষকে করে বাকরুদ্ধ। কোনো কোনো মতামত মানুষকে মুক্ত হওয়ার চেয়ে করে বসে চিন্তার শৃঙ্খলে আবদ্ধ আবার কোনো কোনো তত্ত্ব, চিন্তা চেতনা গড়ে উঠে অংকের সমস্যা সমাধানের সূত্রের মতো।কোনো কোনো তত্ত্ব চুপ থেকে বা না থেকে শাসক শ্রেণীর দুঃশাসনকেই ছাড় দেয়, সমাজ রাষ্ট্রের দালালি করে; আবার কোনো-কোনো তত্ত্ব সর্বজনের অধিকার রক্ষায় খেটে-খাওয়া মানুষের লড়াকু হাতিয়ারেই রূপান্তরিত হয়। তাই যারা যেনতেন ভাবে জয়ী হতে চায় এবং ঢালাওভাবে তত্ত্ববিরোধিতা করে তাদের অন্তর্নিহিত জীবনবোধের অসঙ্গতিকে প্রশ্ন করা জরুরি: তত্ত্ব আসলে কি? কার তত্ত্ব? কিসের তত্ত্ব? কোথাকার তত্ত্ব? কি ধরনের তত্ত্ব? কি কাজ করে সেই তত্ত্ব? এমন সব প্রশ্নের সম্মুখীন হওয়া জরুরি।

সমাজের সকল জায়গায় ফাঁকিঝুঁকি চলে না। মানুষের প্রচলিত অবরুদ্ধ উপলব্ধিগুলোকে ভেঙ্গে গড়ে তোলার জন্য নির্মাতা প্রয়োজন সমাজের পরতে পরতে। তা নাহলে সমাজের অন্তঃস্রোত তৈরি হয় না যা বহিঃস্রোতকে প্রভাবিত করবে। যে কোনো চিন্তা গঠনের একটা পদ্ধতি (Method) প্রয়োজন। সুশৃঙ্খল চিন্তা পদ্ধতি ব্যতীত শুধু মাত্র ব্যক্তি বিশেষকে উপস্থাপন করা যায়, কোটি কোটি মানুষের চিন্তা পদ্ধতি, উপলব্ধি, ভাবমানসকে ছোঁয়া যায় না। আমাদের সামনে যাঁরা পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তান তাঁদের সাথে সাধারণদের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে আমরা বিশৃঙ্খল চিন্তা পদ্ধতির উপর দাঁড়িয়ে আছি। আর তাঁরা সুশৃঙ্খল চিন্তা পদ্ধতির উপর ভর করেই পৃথিবীর ক্ষুদ্র বালি কণা থেকে বিশ্বজগৎ পর্যন্ত ব্যাখ্যা করেন। আবার সুশৃঙ্খল চিন্তা গুলোও একটা সময় নতুন ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ বক্তব্যের আঘাতে ভাঙতে থাকে। দর্শন, ইতিহাস, অর্থনীতি, রাজনীতি সমস্ত ক্ষেত্রে আবার নতুন উপলব্ধি এসে মানুষকে শৃঙ্খলিত করে যা ঘটে সংহতি এবং সংঘর্ষের মারফতে। মতাদর্শকে ঘিরেই মানুষ মানুষের কাছে আসে, আবার দূরেও সরে যায়। এটা একটা জ্ঞানতাত্ত্বিক পর্যালোচনা, যাকে আরেক অর্থে সামাজিক পর্যালোচনাও বলা যেতে পারে।

(প্রবন্ধটির প্রথম অংশের লেখক সাজিয়া আফরিন এবং দ্বিতীয় অংশের লেখক মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন)

লেখক।।
সাজিয়া আফরিন, সহকারী অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।
মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন, কলাম লেখক।

এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

Leave a Reply

প্রতিবেদক

সর্বশেষ সংবাদ