আধুনিকতার গৌরবগাথা

বর্তমান আধুনিক বিজ্ঞানের যুগে মানব সভ্যতার চরম উৎকর্ষতা সাধন হয়েছে। একথা সত্য হলেও আমাদের জন্য তা কতটা কল্যানকর তা ধীরে ধীরে প্রতিয়মান হচ্ছে। যদিও ভাল-মন্দের পরিসংখ্যানে, মন্দই বেশি প্রতিয়মান হয়। একথায় মানব সমাজের সুযোগ্য কর্ণধাররা হয়তো আমার গলাটা টিপে ধরতে চাইবেন। আমি কোন কিছুকে ভাল বা মন্দ প্রমান করতে বা প্রতিষ্ঠা করতে চাই না। কিন্তু অবস্থা কতটা ভয়াবহ হতে চলেছে, তা আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানের অভিজ্ঞতা দিয়ে সবার দৃষ্টিয়মান করার চেষ্টা করছি মাত্র। আশা করি সদয় দৃষ্টিতে বিবেচনা করবেন। বিজ্ঞানের সুভযাত্রায় মানব সমাজ অনেক অভিশাপ থেকে মুক্তি পেয়েছে, একথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু নতুন অভিশাপ যে সৃষ্টি হবে না, সে দিকে আঙ্গুল উচিঁয়ে ইঙ্গিত করছে। এবং ভবিষৎ এ সেগুলো কতটা মানব সমাজকে প্রভাবিত করবে, সে সম্পর্কে সতর্ক করে দিচ্ছে। যাইহোক আমি কোন লেখক বা সভ্য সমাজের পরিচালকদের কেউ নয়। তবে মানব সংঘটনের ক্ষুদ্র জীব হিসাবে, সেই সব অভিশাপ দেখে অত্যন্ত ভীত।


আরও পড়ুন>>


সকাল সাতটা। শীতের দিন। সবে মাত্র প্রিয় ক্যাম্পাস থেকে বন্ধুর সাথে জীবন মাঠে চির পরিচিত পথে হাঁটা শুরু করেছি। ভাবির দোকানে পা রাখতেই অনুভূতিটাকে অন্য সাজে বেমানান মনে হতে লাগল। এখানেই দেড় বছর ধরে সকালের বর্বর পেটটাকে শান্ত করি। কেননা স্যারের বাসায় যেতে রাস্তার সাথেই হোটেলটি। তাছাড়া এই হোটেলে বসে সকালের নিরস গোমরা মনটাকে হাসির রসে ভেজাতাম বন্ধুদের সাথে ক্ষুদ্র আড্ডায়। সেখানে কাজ করতো দরিদ্রের স্রােতে ভাসা এক কিশোর, রাফি। দরিদ্রতার স্রােতে ডুবন্ত ক্লান্ত মা, তাকে মানব সভ্যতার খেয়ার কাছে রেখে গেছে তাতে চড়ে কুলে একটা আশ্রয় করে নেওয়ার জন্য। বয়সটা নয় বা দশ এর মাঝেই হবে। ছেলেটা খুব চঞ্চল, দুরন্ত, খুশমেজাজি হাসুক ও বুদ্ধিমান। তবে এতটা চঞ্চল, সেটা জানতাম না। মাঝে মাঝে দেখতাম, ছোট সূরে গান ধরতো। গানটা বিখ্যাত হওয়ার মতো উপযুক্ত না হলেও, মনের কষ্টাকে জয় করার পক্ষে যথেষ্ট সুনামের ছিল। রোজকার মতো সেই সকালে হোটেলে প্রবেশ করতেই পরিচিত মুখটাকে অন্য চরিত্রে অভিনয়ের দৃশ্য দেখলাম। ভাবিটা হাতে একখানা কাগজ নিয়ে কি যেন দেখাতে চেষ্টা করলো। কিন্তু রাফি লজ্জার ঢেউয়ে সে চেষ্টাকে ভাসানোর চেষ্টা করে। অনেক চেষ্টার পরে প্রথম চেষ্টা সফল হয়। সভ্যতা মানুষের জীবনটাকে সহজতম ও উপভোগযোগ্য করে তুললেও পারমানবিক বোমা দ্বারা খুব সহজে ধংসেরও ব্যবস্থা করেছে। সেটাই কল্পনাকে স্মরণ করে দিল। কাগজ খুলে দেখলাম। অপরিপক্ক হাতে অল্প চেনা কতগুলো পরিচিত শব্দকে এলোমেলোভাবে সাজানোর চেষ্টা করেছে। এটাকে চিঠি নাকি প্রেমপত্র না প্রযুক্তির অবদান বলব তা আমার জানা নেই। কিন্তু কাগজের ভাষায় লেখা- “লাভ লেটার । প্রিয় জেসমিন আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি। তুমি অনেক সুন্দর। তোমাকে অনেকটা পছন্দ করি ও ভালোবাসি।” হয়তো এতে ছেলেটার কোন দোষ নেই। এই শব্দগুলো প্রতিনিয়ত সে ভ্রমন করে। দেশ-বিদেশের সুনামধন্য প্রযোজকরা এসব নিয়ে মাতামাতি করে। কেননা এগুলোই তাদের বিখ্যাত করে। জগৎ বিখ্যাত পদক উপহার দেয়। যদিও তারা সমাজের অসঙ্গতি, রোগ দেখতে পারে না। যা তারা উপস্থাপন করবেন। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে অবশ্য অনেকে সমাজের অসঙ্গতিগুলোকে সিনেমার পর্দায় প্রদর্শন করতেন। কিন্তু বর্তমানে তারা নতুন প্রজন্ম দ্বারা হাসির পাত্র ছাড়া কিছুই না।


আরও পড়ুন>>


এটা শুধু একটা ঘটনা। পলক উচিঁয়ে ডানে-বামে দৃষ্টি স্থাপন করলেই এরকম অনেক ঘটনা আবিষ্কৃত হবে। যা এটাকে শুধু হার মানাবেই না, বরং কল্পনাকেও পিছনে ফেলবে। তাছাড়া প্রেম ভালবাসার নামে নিজেদের নৈতিকতাকে বির্সজন দিতে প্রতিযোগিতায় নেমেছে এ যুগের কপোত-কপোতিরা। আজকাল প্রেম ভালবাসায় শরীরটা একান্ত কাম্য। কিন্তু একজন জীর্ণা, অসহায়া দরিদ্রতার চাপে তার মৌলিক চাহিদা মেটানোর নিমিত্তে একই কাজ করলে, তাকে সমাজের বর্জ্য আখ্যায়িত করা হয় সমাজ নামক বাহনের পাইলটদের দ্বারা। তাছাড়া তাদেরকে কিছু অশ্রবণযোগ্য মূর্তি দ্বারা সমাজ থেকে অসমাজে প্রতিস্থাপন করা হয়। তাদের কাছে সুনামধন্য সমাজসেবকরাই রাত্রি যাপন করেন, তাদের সেবা নিয়ে। যদিও এই অসহায়ারা এটা শুধু নিজেদের জীবনটাকে উপভোগ করার জন্য করে না, বরং তার সাথে স্রােতে ভাসা কয়েকটা জলজীবকে সুন্দর একটা ভবিষৎ দেওয়ার জন্য করে থাকে। অথচ সবার আঙ্গুল তাদের দিকে। কিন্তু হাস্যকর হলেও সত্য যে, যারা পেট ভরাতে অনিচ্ছায় নিজেদের সতীত্বকে আত্মত্যাগ করে তারা ‘পতিতা’ পরিচয়ে সমাজের কিট। আর যারা নিজেদের উচ্চবিলাসিতাকে উপভোগ করতে সেচ্ছায় নিজেদের সতীত্বকে দাড়িপাল্লায় তুলেছে তারা প্রেমিকা পদকে ভূষিত। এমনকি সামান্য একটা দামি রেস্টুরেন্টে ট্রিপ পাওয়ার আশায় জড় বস্তুর সামনেও নিজেদের সতীত্বটাকে উন্মুক্ত করে। আজকাল তারা এতটাই স্বাধীন যে রিকশা বা পার্কে, ক্যাম্পাসে বা রাস্তায় একে অপরকে জড়িয়ে ধরে সভ্যতার গায়ে অশ্লীলতার কাঁদা ছুড়ে। যা একজন পিতার পক্ষে দৃষ্টিগত করা অসম্ভব। আর পিতাদের এ দৃষ্টিগোচরতা ওদের মৌণ সম্মতি দান করেছে। ভালবাসা যেমন লাইলি-মজনু, শিরিন-ফরহাদকে অমর করেছে, তেমন এযুগের কপোত-কপোতিকে উপহাসের বস্তু বানিয়েছে। ভালবাসার নামে একাধিক শরীরের সঙ্গ পাওয়ার লালসা দিন দিন প্রবল হচ্ছে। যদিও এতকিছুর পরেও কোন যুগলই বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হতে সক্ষম হয় না বা হওয়ার চেষ্টাও করে না। হতে পারে তা অন্য শরীরের সঙ্গ পাওয়ার লালসায়। লাইলি-মজনু, শিরিন-ফরহাদ আগে এসব আন্দাজ করতে পারলে ভালবাসাকেও তাদের সাথে উৎসর্গ করতেন।


আরও পড়ুন>>


আজকাল রাফি সভ্যতার ব্যর্থ নাবিকদের সাথে অলস আড্ডায় দিনপাত করে। ব্যর্থতার অভিমানে নিশার রাজ্যের রাণীর মিলনে নিজেকে অন্যের থেকে আড়াল রাখার চেষ্টা করে। তার মা যে মহৎ আশায় ছেলেকে সভ্যতার জাহাজের কাছে রেখেছিল সাঁতরে সভ্যতার রাজ্যে নিজ আশ্রয়টাকে খুঁজে নেওয়ার প্রতাশায়। কিন্তু সে আশা ক্লান্ত হয়ে তরীতে ওঠার পূর্বেই ডুবে যায়। কেননা সে জাহাজের সভ্যতার চাকচিক্য দেখে রাফি নিজ চোখ ঝলসে নিয়ে, অন্ধকারে আলো হাতরিয়ে চলে। রাফির মা আশা ভঙ্গের ব্যাথায়, হতাশায় আজ শয্যাশায়ী। যাইহোক এখনি উপযুক্ত সময় আমাদের ভবিষৎটাকে উপযুক্ত পথ দেখানো। প্রত্যেক পিতার উচিত তাদের ছেলে-মেয়ের সাথে যথাসম্ভব পরিচিত থাকা। যে আইন অন্যের অধিকার ক্ষুন্ন করে তা আইনের দ্বারা রক্ষা করা উচিত। আর এটাই প্রকৃত আইন। সন্তানদের যদি স্বাধীনতা ভোগের নামে পিতার অধিকার ক্ষুন্নের সাহসিকতা থাকে, তাহলে পিতার স্বাধীনতা নিশ্চিতের লক্ষে সামঞ্জস্যতা আনায়ন করা শ্রেয়। এটাই পৃথিবীর অস্তীত্ব টিকে রাখবে। কেননা আজকের শিশু আগামীর ভবিষৎ।

এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

Leave a Reply

লেখক

সর্বশেষ সংবাদ

%d bloggers like this: