আফগানিস্তানের মালিক আফগানিস্তানের জনগণ

- Advertisement -

১৭৪৭ সালের পূর্বে আফগানিস্তান নামের কোন দেশ ছিল না। পশতুন নেতা আহমদ শাহ আবদালী উজবেকিস্তান ও তাজিকিস্তানের কিছু অঞ্চল, বেলুচিস্তানের কিছু অঞ্চল, বর্তমান পাকিস্তানের খায়বার পাখতুন খোয়া (উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ) এসমস্ত এলাকা নিয়ে একটি দেশ হিসেবে আফগানিস্তানের গোড়াপত্তন করেন। আহমদ শাহ আবদালী আফগানিস্তানের আমীর হিসেবে নিজেকে ঘোষণা করেন ১৭৪৭ সালে। ১৭৬০ এর দশকে পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধে আহমদ শাহ আবদালী মারাঠাদের পরাজিত করেন। মুনীর চৌধুরীর বিখ্যাত নাটক রক্তাক্ত প্রান্তর আফগান- মারাঠা যুদ্ধের পটভূমিতে রচিত হয়েছে। এসময় থেকে আফগানিস্তান আমীরদের দ্বারা শাসিত হয়েছে। এখানে গড়ে উঠেছে রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা। আফগানিস্তানের জনসংখ্যায় ৪০ ভাগ হলো পশতুন বা পাঠান। আর অবশিষ্ট ৬০ ভাগ হলো উজবেক, তাজিক, বেলুচ, হাজারাসহ আরও নানান জনগোষ্ঠী। এখানে প্রত্যেকটি জনগোষ্ঠির রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতি। তাছাড়া নৃতাত্ত্বিক ভাবেও এসমস্ত জনগোষ্ঠিগুলোর ভিন্নতা রয়েছে। কিন্তু আফগানিস্তানে সব সময় পশতুনদের প্রাধান্য বজায় থেকেছে।

ব্রিটিশ শাসনামলে আফগানিস্তান জয় করার জন্য ভারত থেকে অভিযান প্রেরিত হয়েছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল আফগানিস্তান জয় করে এটি ব্রিটিশ ভারতের সাথে যুক্ত করা। ১৮৪০-৪২ সালে প্রথম ইঙ্গ-আফগান যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ব্রিটিশরা এসময় আফগানিস্তানের শাসক দোস্ত মুহাম্মদকে সরিয়ে তাদের পছন্দের শাহ সুজাকে সিংহাসনে বসান। শাহ সুজা ছিলেন ব্রিটিশ নিযুক্ত পুতুল শাসক। শাহ সুজা বিরুদ্ধে আফগানরা শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তোলে। হাজার হাজার ব্রিটিশ সৈন্য তীব্র আফগান প্রতিরোধের মুখে নিহত হয়। এরপর দ্বিতীয় ইঙ্গ-আফগান যুদ্ধ সংঘটিত হয় ১৮৭৮-৮০ পর্যন্ত। এ যুদ্ধেও ব্রিটিশরা সফলতা লাভ করতে ব্যার্থ হয়। তবে এসময় আফগানিস্তান ও ব্রিটিশ ভারতের মধ্যে আন্তর্জাতিক সীমানা চিহ্নিত হয়। এটি ডুরা- লাইন নামে খ্যাত।

ডুরা- লাইন টানা হয় ১৮৯৩ সালে। এটি ছিল ১৬৬০ মাইল দীর্ঘ। কিন্তু আফগানরা মন থেকে ডুরা- লাইন মেনে নেয়নি। বর্তমান পাকিস্তানের পশতুন এলাকা যেমন পেশাওয়ার, কোহাট, মেহাওয়ালী অর্থাৎ উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ অঞ্চল আফগানরা তাদের হিসেবে দাবি করে।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টি হলে আফগানিস্তান তা স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারেনি। পাকিস্তান জাতিসংঘের সদস্যপদের জন্য আবেদন করলে আফগানিস্তান তার বিরোধীতা করেছিল। সেসময় আফগানিস্তান পাকিস্তানকে স্বীকৃতি দেয়নি। কেননা তারা দাবি করেছিল যে, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ হলো আফগানিস্তানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সুতরাং শুরু থেকেই আফগান-পাকিস্তান সম্পর্ক ভালো ছিল না। গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশক থেকেই দুপক্ষ সীমান্ত সংঘর্ষ সহ নানান ধরনের সংঘাতে লিপ্ত হয়েছে।

স্নায়ুযুদ্ধের সময়কালে পাকিস্তান সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে উষ্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল। অপর পক্ষে আফগানিস্তান সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে বন্ধুত্বমূলক সম্পর্ক গড়ে তোলে। ভারতের সাথে শুরু থেকেই আফগানিস্তানের ভালো সম্পর্ক ছিল। এসময় আফগানিস্তানের শাসক ছিলেন বাদশাহ জহীর শাহ। তিনি ১৯৩৩ সাল থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তানের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন। জহীর শাহর ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকার দীর্ঘ সময়কালে ভারতের সাথে আফগানিস্তানের সুসম্পর্ক বজায় ছিল। ভারত এসময় পেছন দিক দিয়ে অর্থাৎ আফগানিস্তানের মাধ্যমে পাকিস্তানকে চাপ সৃষ্টি করেছে। ১৯৭৩ সালে জহীর শাহের প্রধানমন্ত্রী দাউদের নেতৃত্বে একটি ক্যু সংঘটিত হয়। দাউদের সমর্থনপুষ্ট সেনরা বিদ্রোহ করে জহীর শাহকে দেশ থেকে বিতাড়িত করে। কিন্তু দাউদও বেশি দিন ক্ষমতার মসনদে বসতে পারেননি। ১৯৭৮ সালের ২৭ এপ্রিল আফগানিস্তানের সোভিয়েতপন্থী কমিউনিস্ট পার্টি পরচম পার্টি সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দাউদকে ক্ষমতাচ্যুত করে। এরপর সোভিয়েত পন্থীদের অন্তদ্বন্দ্বে পরচম পার্টির নূর মোহাম্মদ তারাকিকে সরিয়ে সোভিয়েতপন্থী খালাক পার্টি ক্ষমতা দখল করে। নূর মোহাম্মদ তারাকি নিহত হন এবং হাফিজুল্লা আমিন ক্ষমতা দখল করেন। এদের সাথে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভালো সম্পর্ক ছিল। ক্ষমতার দ্বন্দ্বে সোভিয়েতপন্থীরা গৃহযুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়লে এখানে সোভিয়েত প্রভাব টিকিয়ে রাখার স্বার্থে ১৯৭৯ সালে ২৫ ডিসেম্বর সোভিয়েত সেনা আফগানিস্তানে প্রেরিত হয়। এ ঘটনায় আমেরিকা তীব্র প্রতিবাদ জানায়। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার ঘোষণা করেন সোভিয়েত ইউনিয়নের আফগান আগ্রাসন প্রতিহত করা হবে। সোভিয়েত আগ্রাসনের বিরুদ্ধে পাকিস্তান ও আমেরিকা একযোগে কাজ করে। পাকিস্তানে সি.আই এর সহায়তায় আফগান মুজাহেদীনদের ট্রেনিং ক্যাম্প গড়ে উঠে। পাক-মার্কিন মদদপুষ্ট মুজাহিদরা সোভিয়েতপন্থী সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এসময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা পাকিস্তানে গিয়ে প্রকাশ্যেই এসব জেহাদী প্রশিক্ষণ শিবির ভ্রমণ করেছিলেন। কার্টারের পরবর্তীকালে প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের প্রশাসন একইভাবে মুজাহেদীনদের পৃষ্ঠপোষকতা অব্যাহত রাখেন। ১৯৭৯-৮৯ সাল পর্যন্ত দশ বছর আফগান ধর্মীয় সংগঠনগুলোর সোভিয়েত বিরোধী যুদ্ধ চলেছিল। লাখ লাখ শরণার্থী এসময় পাকিস্তানে আশ্রয় গ্রহণের জন্য আসতে থাকে। এই শরণার্থীদের মধ্য থেকে জেহাদীদের রিক্রুট করা হতো। তাছাড়া ওসামা বিন লাদেনের আল কায়দার মতো সংগঠনগুলো বিদেশী যোদ্ধাদেরকে উদ্বুদ্ধু করে আফগানিস্তানে নিয়ে আসে। শেষ পর্যন্ত ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটে এবং সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের পতনের মধ্য দিয়ে ১৫টি স্বাধীন রাষ্ট্র আত্মপ্রকাশ করে। সোভিয়েত সৈন্য অপসারণের অনতিকাল পরেই আফগান মুজাহিদ গ্রুপগুলো তীব্রভাবে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়ে পড়ে। ফলে আবার আফগানিস্তানে গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে।

১৯৯৪ সালে আফগান গৃহযুদ্ধের অন্যতম প্রধান দল হিসেবে তালেবান আবির্ভূত হয়। তালেবান শব্দের আভিধানিক অর্থ ছাত্র। পাকিস্তানে আফগান শরণার্থীদের মধ্যকার মাদ্রাসায় অধ্যয়নরত ছাত্রদের নিয়ে দলটি সংগঠিত হয়েছিল। তালেবানদের প্রধান নেতা ছিলেন মোল্লা ওমর। পাকিস্তানের সমর্থনপুষ্ট তালেবান দ্রুতই সফলতা লাভ করতে থাকে। ১৯৯৬-২০০১ সাল পর্যন্ত আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলসহ প্রায় তিন-চতুর্থাংশ তালেবানের নিয়ন্ত্রণে ছিল। তালেবানের চাপে কোণঠাসা হওয়া মুজাহিদ গ্রুপগুলো মিলে নর্দান এ্যালায়েন্স গঠন করে। তবে দেশের বেশিরভাগ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করলেও সৌদি আরবসহ অল্প কিছুদেশই তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি প্রদান করে।

এসময়কালে তালেবান ও আল কায়দা মিলে আফগানিস্তানে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। ১১ আগস্ট ১৯৯৮ তালেবান পুলি খুমরি পাবলিক লাইব্রেরী ধ্বংস করে। লাইব্রেরীতে ৫৫০০০ এরও বেশি বই ও পুরাতন পান্ডুলিপি ছিল। ২০০১ সালের অক্টোবরে তালেবান আফগানিস্তানের জাতীয় জাদুঘরের ২৭৫০টি শিল্পকর্ম ধ্বংস করে। সাংস্কৃতিক লোক সঙ্গীতসহ সমস্ত সঙ্গীত নিষিদ্ধ করে। ঘুড়ি ওড়ানো, দাবাসহ অনেক বিনোদনমূলক কাজকর্ম এবং খেলা নিষিদ্ধ করা হয়। টেলিভিশন, চলচ্চিত্র, গান এবং স্যাটেলাইট ডিশের মতো সাধারণ বিনোদনও নিষিদ্ধ করা হয়। বামিয়ানের বিখ্যাত বুদ্ধ মূর্তি আর্টিলারি দিয়ে ধ্বংস করে। এভাবে দেখা যাচ্ছে, কট্টর সৌদি-ওহাবী পন্থী শাসন ব্যবস্থা তালেবানের মাধ্যমে আফগানিস্তানে প্রতিস্থাপিত হয়।

২০০১ সালের ১১ সেপ্টম্বর আমেরিকার টুইন টাওয়ার জঙ্গীবাদীদের আক্রমণে ধ্বংস হয়। আমেরিকা এ ঘটনার জন্য ওসামা বিন লাদেনের আল-কায়দাকে দায়ী করে। আমেরিকা তালেবানের কাছে দাবি জানায় যে, লাদেনকে তাদের হাতে তুলে দিতে হবে। কিন্তু তালেবান আমেরিকার এই দাবি মানতে অস্বীকার করে। উল্লেখ্য যে এই লাদেন সোভিয়েত বিরোধী যুদ্ধে সময় আমেরিকার পৃষ্ঠপোষকতায় আল কায়দা প্রতিষ্ঠা করেছিল। ওসামা বিন লাদেনকে তালেবান ফেরত দিতে অস্বীকার করলে আমেরিকা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দিয়ে ২০০১ সালের অক্টোবরে আফগানিস্তান আক্রমণ করে। ২০০১ সাল থেকে তালেবান উচ্ছেদের নামে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ বছর ধরে সেখানে যুদ্ধ পরিচালনা করেছে। এতে প্রতিদিন শতশত সাধারণ নাগরিকের প্রাণহানি সহ আফগানিস্তানের পরিকাঠামো ধ্বংস হয়েছে। মার্কিন সহায়তায় কোণঠাসা হয়ে পড়া নর্দান এ্যালায়েন্স সরকার সামনে চলে আসে এবং কাবুল পুর্নদখল করে। এভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার সমর্থিত সরকারের বিরুদ্ধে তালেবান যুদ্ধে লিপ্ত হয়। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দিয়ে প্রথমে আফগানিস্তান পরে ২০০৩ সালে ইরাকে একইভাবে হামলায় চালায়। যুদ্ধের ফলশ্রুতিতে আমেরিকার মিলিটারী ইন্ডাস্ট্রি ফুলে উঠে। কেননা যুদ্ধ মানেই সামরিক খাতে ব্যাপক খরচ ও বিশ্বব্যাপী অস্ত্র বিক্রি। তালেবান বিরোধী যুদ্ধের নামে আমেরিকা আফগানিস্তানে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করেছে। কিন্তু আমেরিকার এ যুদ্ধ প্রচেষ্টা সেভাবে সফল হতে পারেনি। কেননা সংখ্যাগরিষ্ঠ পশতুনদের মধ্যে তালেবানদের শক্তিশালী ভিত্তি ছিল। মার্কিন সমর্থিত নর্দান এ্যালায়েন্স সরকারে তাজিক, উজবেক প্রাধান্য বেশি ছিল।

তাছাড়া আফগান জনগণ হলেন স্বাধীনচেতা। যে কোন বিদেশী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ লড়াই করার ইতিহাসে তাদের অনেক দীর্ঘ। ২০০১ সালের পরবর্তীকালে তালেবান মূলতঃ গ্রাম ও প্রত্যন্তর অঞ্চলে ভিত্তি করে লড়াই চালিয়েছে। পাহাড়-পর্বত বেষ্টিত আফগানিস্তানে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে চালানোর জন্য ভৌগোলিক পরিস্থিতি অনেকটা অনুকূল। আফগান জনগণের কাছে এই পর্বের লড়াই ছিল তালেবানের নেতৃত্বে মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধ। আর যুদ্ধটা ছিল আমেরিকার কাছে অনেকটাই বিশ্বব্যাপী অস্ত্র বাণিজ্যকে চলমান রাখার জন্য প্রয়োজনীয় বিষয়। আর এক্ষেত্রে যখন প্রয়োজনটা কমে আসে তখন তারা যুদ্ধ থেকে প্রত্যাহার করে। এরই ধারাবাহিকতায় আলাপ আলোচনার মধ্য দিয়ে সেপ্টম্বর ২০২১ সালের মধ্যে মার্কিন সৈন্য চূড়ান্ত ভাবে অপসারণের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের মধ্য দিয়ে তালেবানের ক্ষমতা বাড়তে থাকে একের এক শহরগুলো নিয়ন্ত্রণের ধারাবাহিকতায় ১৫ আগস্ট রাজধানী কাবুল প্রায় বিনা বাধায় দখল করে। বিশাল সৈন্য বাহিনী ও আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত মার্কিন সমর্থিত আশরাফ গনি সরকার তালেবানের বিরুদ্ধে সার্বিকভাবে তেমন একটা প্রতিরোধই গড়ে তুলতে পারেনি। প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি দেশ থেকে পলায়ন করেছে ও সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা প্রতিরোধ ছাড়াই আত্মসমর্পণ করেছে। ২০০১ সাল থেকে তালেবান মার্কিন বাহিনী ও আফগান সরকারের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে প্রতিরোধ যুদ্ধ পরিচালনা করেছে। এই দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধে তালেবান পাকিস্তানের কাছ থেকে নানা ভাবে আর্শিবাদপুষ্ট হয়েছে। কেননা মার্কিন সমর্থিত সরকারের সাথে ভারতে সু-সম্পর্ক গড়ে উঠে যা পাকিস্তানের জন্য হুকমী হিসেবে বিবেচিত হয়। ভারত আফগানিস্তানে নিজের অবস্থান সংহত করতে প্রায় তিন হাজার কোটি রুপি খরচ করেছে পরিকাঠামোসহ নানা খাতে। সাতটিরও বেশি ভারতীয় কনস্যুলেট গড়ে উঠেছে । এক্ষেত্রে ভারতের উদ্দেশ্য ছিল আফগান ভূমি ব্যবহার করে দুই দিক থেকে পাকিস্তানকে চাপে রাখা। তাছাড়া পরিবর্তিত বিশ্বে চীন-রাশিয়া লবির পরোক্ষ সাপোর্টও তালেবানের সাফল্যের পেছনে কাজ করেছে।

ধর্মীয়ভাবে তালেবান ইসলামি সুন্নী দেওবন্দী ঘরানার সাথে সম্পর্কিত। মূলতঃ পশতুনদের মধ্যে তাদের ভিত্তি থাকলেও ক্রমে তারা উজবেক ও তাজিকদের মধ্যেও তাদের সমর্থন ভিত্তি গড়ে তুলেছে। কেননা এবার তারা অপশতুন উত্তর আফগানিস্তানের এলাকাগুলোকেই প্রথমে নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কাবুলের দিকে অগ্রসর হয়েছে। তাছাড়া কাতারের অফিসের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক যোগাযোগ ও মাঠের লড়াই দ্বৈত নীতির মধ্য দিয়ে তালেবান সফলতা লাভ করেছে।

আশির দশকের শুরু থেকেই আফগানিস্তানে যুদ্ধ চলমান আছে। ভৌগোলিক অবস্থানের গুরুত্বের কারণে পরাশক্তির স্বার্থের বলি হয়েছে এদেশের জনগণ। বাংলাদেশের লিবারেল মহলের বেশিরভাগই সোভিয়েত নিয়ন্ত্রণাধীন আশির দশকের আফগানিস্তানকে প্রগতিশীল পর্ব হিসেবে চিহ্নিত করে থাকেন। কিন্তু এটি আসলে ছিল একটি দখলদারিত্ব পর্ব।

স্ট্যালিনের মৃত্যুর পর তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন সমাজতন্ত্রের মূল কাঠামো থেকে সরতে থাকে এবং ক্রমেই সামাজিক সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রে পরিণত হয়। সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব উপর থেকে জোর করে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে চাপিয়ে দেবার বিষয় না। ব্যাপক জনগণের অংশগ্রহণের মাধ্যমে সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় বিপ্লব সংঘটিত হতে হবে। সোভিয়েত আগ্রাসন নিয়ে আফগান সমাজে যে অসন্তোষ ছিল তা ভালোভাবেই কাছে লাগিয়েছিল আমেরিকা। সৌদি-পাকিস্তানকে দিয়ে গড়ে তুলেছে মুজাহিদ বাহিনী। পরবর্তীকালে মুজাহিদ গ্রুপগুলোর অর্ন্তকলহের মধ্য দিয়ে মোল্লা ওমরের তালেবান শক্তিমত্তা দেখালে তারা পাক-মার্কিন লবির প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সমর্থন পেয়েছিল।

সার্বিকভাবে আমরা বলতে পারি আফগানিস্তান বিশ্ব পরাশক্তির স্বার্থের জটিল আবর্তে কয়েক দশক ধরে ঘুরপাক খাচ্ছে। আর এতে ধূলিস্যাৎ হচ্ছে আফগান জনগণের স্বার্থ। এসময়কালের মধ্যে তালেবান সারা আফগানিস্তানেই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু গৃহযুদ্ধের ভিতর থেকে দেশটি কতখানি বের হতে পারবে তা নিয়ে নানা প্রশ্ন থেকেই যায়।

দ্বিতীয়ত তালেবানরা একটি স্বনির্ভর যুদ্ধ চালাতে ব্যর্থ হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে পাকিস্তান-মার্কিন লবি, দ্বিতীয় পর্যায়ে পাকিস্তান-চীন লবির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সাহায্য তালেবান লাভ করেছে। ফলে পাকিস্তান, চীন,রাশিয়া অক্ষের বাইরে গিয়ে তারা কতখানি কাজ করতে পারবে সেইপ্রশ্ন থেকেই যায়। তাছাড়া নৃ-তাত্ত্বিক, জাতিগত সংখ্যালঘু হাজারা, তাতার, উজবেক, তাজিকদের বড় অংশই তালেবান বিরোধী এরা ভবিষ্যতে সংগঠিত হলে আবার গৃহযুদ্ধ আকার লাভ করবে। তালেবান মূলত গৌঁড়া সুন্নীপন্থী সামন্তবাদী সংগঠন। সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার সাথে তার সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। সাম্রাজ্যবাদ কায়েমী স্বার্থে সামন্তবাদের অবশেষকে টিকিয়ে রাখে। মুজাহেদীন, তালেবান, আল কায়দা, আইএস প্রভৃতি সংগঠন সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে লক্ষ্যনীয় যে, এখানে ভালোভাবেই চীনের প্রভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে। পাকিস্তানে রয়েছে চীনের বিপুল বিনিয়োগ। ইরানসহ মধ্য এশিয়ার দেশগুলেতে চীনা প্রভাব ক্রমবর্ধমান। চীন-পাকিস্তান স্বীয় স্বার্থে স্থিতিশীল আফগানিস্তান চায়। তাছাড়া স্থিতিশীল আফগানিস্তানও হতে পারে চীনা পুঁজি বিনিয়োগের ভালো জায়গা। সুতরাং সাম্রাজ্যবাদী মদদপুষ্ট এই গৃহযুদ্ধে তালিবানের জয়লাভ আফগান জনগণকে মুক্তির দিশা দিতে ব্যর্থ হবে। তালেবানের এই সফলতা আফগান জাতীয় মুক্তির লড়ায়ে পরিণত হতে পারেনি। জনগনের সত্যিকার সংগ্রামের মধ্যদিয়ে সাম্রাজ্যবাদ-সম্প্রসারণবাদ মুক্ত নতুন আফগানিস্তান জেগে উঠুক।

লেখক।।
ড. গোলাম সারওয়ার
সহযোগী অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

Leave a Reply

প্রতিবেদক

সর্বশেষ সংবাদ