করোনাকালীন শিক্ষা খাতের অনিশ্চিত দৃশ্যপট

ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর, বৃহৎ থেকে বৃহত্তর কোনো ইস্যু হলেই হলো তা সুই হয়ে ঢুকে ফাল হয়ে সহজেই বের হতে পারে আমাদের দেশে। করোনার শুরুর দিকে ভারতের অরুন্ধতী রায় কি বলিষ্ঠ কন্ঠে বলেছিলেন-” তাবলীগ নয়, মোদিই করোনা ছড়ানোর জন্য দায়ী কারণ চীনের বিপর্যয়কালে তিনি সচেতনতার কথা বাদ দিয়ে মুসলিমবিরোধী নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন পাশ নিয়ে সৃষ্ট গণঅভ্যুত্থান ঠেকাতে ব্যস্ত ছিলেন “।

মার্কিন মানবতাবাদী লেখক নোয়াম চমস্কি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ‘সোশিয়োপ্যাথিক বুফন’ আখ্যা দিয়ে বলেছেন-“ট্রাম্প আবার বিজয়ী হলে মহা বিপর্যয় নেমে আসবে”। আমাদের দেশের লেখকরাও কম লেখেননি উপরমহলের অবহেলা,অব্যবস্থাপনা নিয়ে।

করোনায় লকডাউনে পড়ে ক্ষতির মুখে পড়েছিলো দেশের প্রায় সব সেক্টর। তবে সময়ের পরিক্রমায় দেশের সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে গেলেও বন্ধ রয়েছে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

শিক্ষার্থীদের মধ্যে করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে নেওয়া হয়েছে এ উদ্যোগ। আপাতদৃষ্টিতে তা হিতকর মনে হলেও কার্যত তা শুভঙ্করের ফাঁকি। প্রথমত, ঢাকার বাইরে জেলাগুলোতে আদৌ করোনা আছে বা ছিলো কিনা, তা মানুষ ভুলেই গেছে হয়তো। এ নিয়ে দ্বিমত হওয়ার অবকাশ নেই।

দ্বিতীয়ত, করোনার প্রাদুর্ভাবের অতিরঞ্জিত বুলি যতটুকু প্রচলিত আছে তা রাজধানী ঢাকা কে ঘিরেই। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, ঢাকাতেও অধিকাংশ জনগোষ্ঠীর মাঝে করোনার ভয় কিংবা প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যবিধি কোনোটাই নেই। বিশেষ করে,নিম্নআয়ের লোকজন তো সহসাই বলে দেয়,”করোনা গরিবের হয় না,এটা বড়লোক আর মন্ত্রী মিনিস্টার এর রোগ”। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি,গণমাধ্যম বলছে-ঢাকার বস্তিগুলোতে করোনা রোগী নেই কিংবা মারাও যায়নি অথচ বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার ভাষ্যমতে,করোনা সংক্রমণ এর রুটম্যাপ অনুযায়ী বস্তিগুলোতেই সংক্রমণ এর হার হতো বিরামহীনভাবে এবং মারাও যেতো প্রতিনিয়ত। অথচ বাস্তব চিত্র তার সম্পূর্ণ উল্টো।

খুব সম্ভবত,বাংলাদেশের মানুষের এই ড্যামকেয়ার ভাবটাই তাদের মনোবলকে করেছে চাঙা, আর যেকোনো পরিস্থিতিতে মনোবল দৃঢ়তর হলে সেখানে মুক্তি অদূর পরাহুত। আর সেজন্যেই ঢাকাতেও এখন নিয়মিত যানযট দৃশ্যমান। বোঝাই যাচ্ছে, করোনা নিয়ে গ্রামের মতো শহরের মানুষের মাঝেও কমছে ভয়ের ত্রাস।

তাছাড়া দেশের অন্যান্য সকল খাত স্বাভাবিক হয়ে যাওয়ায় মানুষ যেভাবে চলাফেরা করছে তাতে সামাজিক দূরত্ব, মাস্ক ইত্যাদি বিষয়গুলো যে হাসির খোরাক হয়েছে কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ তা অস্বীকার করবে না এবং এর ফলে যতটুকু ক্ষতির আশঙ্কা করা হয়েছিলো তার ছিটেফোটাও হচ্ছে না। নিশ্চয়ই এটা উল্লাসের অনুষঙ্গ না তবে বাংলাদেশে যে করোনার লাগাতার ও ভয়াবহ প্রভাব পড়েনি তা সহজেই অনুমেয়। বৃষ্টিতে ভিজে আর রোদে পুড়ে এদেশের মানুষের এন্টিবডি যথেষ্ট বলীয়ান, আর সহজভাবে চিন্তা করলে দেখা যায়, যে মানুষগুলো প্রতিনিয়ত ভেজাল খাদ্য আর নোংরা পরিবেশে জীবনযাপন করে দিব্যি টিকে আছে, তাদের কাছে এই ক্ষুদ্র ভাইরাস পরাজিত হবারই কথা।


আরও পড়ুন>>


যে শিক্ষার্থীদেরকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের নামে আবদ্ধ রাখা হয়েছে, তারা কি আসলেই নিরাপদ?? খুব বেশি স্বাস্থ্যসচেতন পরিবার ছাড়া প্রায় সবাই কোথাও না কোথাও ঘুরে বেড়াচ্ছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গুলোই তার প্রমাণ। সবচেয়ে বড় কথা,করোনা যেহেতু এখন ঢাকাকেন্দ্রিক, তাই বলতেই হয় অধিকাংশ শিক্ষার্থীর বাবা মা-ই চাকরি কিংবা ব্যবসায় জড়িত,প্রতিদিন তারা অফিস করছে শহরের একেক প্রান্ত থেকে আসা মানুষগুলোর সাথে, ব্যবসা করছে আবালবৃদ্ধবনিতা সবার সাথে এবং সেখানে কতটুকু স্বাস্থ্যবিধি পালন করা হয় তা আমার সঠিক জানা নেই তবে অনুমান করতে পারি যানযট আর বাজারের চিত্র দেখে। দিনশেষে এই অভিভাবকরা গণপরিবহন কিংবা স্ব পরিবহনে করে এসে পরিবারের সবার সাথেই স্বাভাবিক মেলামেশা করছে এতে শিক্ষার্থীদের কতটুকু নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হলো, তার হিসেব কষতে হবে সময় করে।

আর অফিস কিংবা গার্মেন্টস এ যদি যথাযথ হাইজিন ব্যবস্থা প্রয়োগ করা যায়,তবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এ কেনো তা সম্ভব নয়?? এখানে বরং শিক্ষার একটা ধারাবাহিক ও অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে হাইজিন কে প্রতিষ্ঠিত করা উচিত। যাতে শুধু করোনাকালীন নয়,সর্বদা এই শিষ্টাচার অব্যাহত থাকে।

তবে এসব বিষয় কেনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি কিংবা উদ্যোগ নেয়া হয়নি তা উপরমহল এর একান্ত রুচি কিংবা দূরদর্শী সিদ্ধান্ত। তবে এর নেপথ্যে সম্ভাব্য যা রয়েছে তা হলো, শিক্ষা খাতে সরকার জাতীয় বাজেটের ১৫-২০% বরাদ্দ দেয়ার বৈশ্বিক অঙ্গীকার করলেও কার্যত বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ১১.৬৯%।

এর ফলে আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শুরু থেকে চলে আসছে আবাসন সংকট, রয়েছে সতেজ খাবারের অপ্রতুলতা, শিক্ষার অনুপযুক্ত পরিবেশ, দখলদারিত্ব আর অপরাজনীতির সংস্কৃতি। তাছাড়া প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও রয়েছে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, নেই যথেষ্ট ক্লাসরুম বা টয়লেট-ওয়াশরুম।

যার দরুণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা নিয়ে একটা ভয় থেকেই যাচ্ছে। এছাড়াও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার পর কোনো শিক্ষার্থী সাধারণ রোগে আক্রান্ত হলেও আবেগী ইস্যুবাজ ছাত্রনেতারা এ নিয়ে মুখে ফেনা তুলবে আর সরকারের চৌদ্দ গুষ্ঠি উদ্ধার করে ছাড়বে। সুতরাং, খাল কেটে কুমির কেউ ই আনতে চাইবে না।

ইউনেস্কো ও বিশেষজ্ঞদের দাবি, কোভিড-১৯ এর ফলে পারিবারিক অর্থ সংকট, বিদ্যালয়ে অনুপস্থিতি, শিশুশ্রম, ঝরে পড়া, অপুষ্টিজনিত প্রতিবন্ধকতা ও বাল্যবিবাহের ফলে বিশ্বব্যাপী শিক্ষা খাতে বিগত দুই দশকে যে অগ্রগতি হয়েছে, তা বিরাটভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে । আর এ থেকে উত্তরণের জন্যে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার ও চাহিদা বিবেচনা করে মানবসম্পদ উন্নয়নের উল্লেখযোগ্য হাতিয়ার শিক্ষার উপর সরকারকে অবশ্যই অধিক গুরুত্ব দিতে হবে।

জানিনা, বাংলাদেশ থেকে অবাস্তব করোনা আদৌ যাবে কিনা,তবে বিদায় পরবর্তী আমাদের অবশ্যই একটা নির্দিষ্ট বিধানপত্র থাকা দরকার যেখানে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর খাদ্য,শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সহ অন্যান্য মৌলিক খাতগুলোর প্রতি সত্যিকার অর্থেই বিশেষ মনযোগ দেওয়ার বিধান থাকবে।

লেখক-
মোঃ নবী হোসেন মাছুম
শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়,
স্টাফ রিপোর্টার, বাংলা দর্পণ।

এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

Leave a Reply

লেখক

সর্বশেষ সংবাদ

%d bloggers like this: