করোনাকালে হিজড়াদের পাশে দাঁড়ান

- Advertisement -

আমাদের সমাজে একশ্রেণির লোকের জন্ম যেনো আজন্ম পাপ, শিশুবয়সেই যদের অধিকাংশকেই পারিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়, মূলত রাস্তা-ঘাটে, হাটে-বাজারে জনসাধারণের থেকে সাহায্য তুলে এবং বিবাহ-শিশুর জন্ম-পূজা ইত্যাদি অনুষ্ঠানে চাঁদা নিয়ে যাদের জীবিকা তাদেরকেই আমরা হিজড়া বলে চিনি। হিজড়াদের প্রতি সমাজের অনেক লোক দৃষ্টিভঙ্গি নেতিবাচক। হিজড়ারা ছোট বাচ্চা চুরি করে নিয়ে যায়, ওরা অপয়া এরকম কুসংস্কারও আমাদের সমাজে প্রচলিত। এখানেই শেষ না, হিজড়াদের মৃত্যুুর পরেও অনেক নিকট প্রতিবেশী জানাজা-দাফন বা সৎকারের কাজে অংশ নেন না।

হিজড়াদের অপর একটি অংশ “কোতি” নামে পরিচিত। তারা হিজড়াদের ঐতিহ্যগত বৃত্তিতে স্বাচ্ছন্দবোধ করেন না। তারা শত প্রতিকূলতা ও অসহযোগিতাপূর্ণ পরিবেশের মধ্যেও আত্মনির্ভরশীল হতে জীবন সংগ্রাম করে চলছেন। এদের বেশিরভাগই পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া সত্ত্বেও বিভিন্ন এনজিওতে কাজ, বিভিন্ন অনুষ্টানে নাচ-গান, যৌনব্যবসা ইত্যাদি পেশার সাথে জড়িত। সম্প্রতি তাসনুভা আনান শিশির নামের একজন বৈশাখী টেলিভিশন নামক বেসরকারি স্যাটেলাইট চ্যানেলে সংবাদপাঠক হিসেবে যোগদান করেছেন, যা ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে।

সমাজসেবা অধিদপ্তরের জরিপমতে, দেশে হিজড়ার সংখ্যা প্রায় দশ হাজার। তবে হিজড়া নেতৃবৃন্দের মতে, বাংলাদেশে মোট হিজড়া দেড় লাখেরও বেশি। এই বিপুল সংখ্যক লোককে আবহেলা ও মূলস্রোতের বাইরে রাখা সত্যিই দুঃখজনক। ২০২০ সালের নভেম্বরে মন্ত্রীপরিষদ বৈঠকে হিজড়া জনগোষ্ঠীর সম্পত্তির অধিকার নিশ্চিত করতে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। হিজড়া বা তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ যেন বাবা-মায়ের সম্পত্তির ভাগ পান, সেজন্য আইন মন্ত্রনালয় মুসলিম শরিয়া আইন এবং সংবিধানের আলোকের একটা উপার বের করার চেষ্ট চালিয়েছে যদিও এখন পর্যন্ত এর কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি নেই।

করোনা পরিস্থিতিতে বিবাহ-শিশুর জন্ম-ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্টানের চাঁদা তোলা সম্পূর্ণ বন্ধ। হিজড়াদের যে অংশটি যৌনকর্মে জড়িত করোনা পরিস্থিতিতে তাদেরও উপার্জন নেই। লকডাউনের কারণে রাস্তা-ঘাটে ভিক্ষারও সুযোগ নেই। করোনা মহামারি পরিস্থিতিতে বিভিন্ন প্রতিষ্টান ও ব্যক্তি পর্যায় থেকে প্রদত্ত ত্রান সহায়তা হিজড়া খুব একটা পান না। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের যে সামান্য সহায়তা হিজড়াদের অনেকেই তা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

মনে রাখা উচিত, আপনি হিজড়াদের অস্পৃশ্য ভেবে দূরত্ব বজায় রেখে চলেন বলে করোনাভাইরাস তাঁদের আক্রমণ করবে না, তা যেমন নয়; আবার তাঁরা আক্রান্ত হলে আপনি যে খুব নিরাপদ থাকবেন, সেটিও ভাববার কোনো সুযোগ নেই। সাধারণ হাঁচি, কাশি বা ছোঁয়ার মাধ্যমে যদি করোনাভাইরাস সংক্রমণের আশঙ্কা থাকে, তাহলে সেটি খুব স্বাভাবিকভাবেই অনুমেয় যে যৌন সম্পর্কের মাধ্যমেও ভাইরাস সংক্রমিত হতে পারে। অনেক হিজড়া যেহেতু বিভিন্ন দেশ থেকে আসা প্রবাসীদের সঙ্গে যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হয়ে থাকেন, আবার অনেকেই যেহেতু অপরাপর মানুষের সঙ্গে যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হয়ে থাকেন, তাই এই মুহূর্তে তাঁদের সচেতন করা এবং তাঁদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করা খুব বেশি জরুরি।

করোনা পরিস্থিতিতে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের অসহায়ত্ব বিশ্ববাসীর হৃদয়ে দাগ কেটেছে। অনেকেই অসহায় মানুষের প্রতি ভালোবাসার জায়গা থেকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। সারদেশের অনেক হিজড়াও এসময় অসহায় ও দুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। সমাজের দরিদ্র ও অসহায় নারী-পুরুষের পাশে হিজড়াদের দিকেও সমানভাবে দৃষ্টি দেয়া উচিত।

হিজড়াদের কেউ কেউ পরিবারে ঠাঁই না পাওয়া সত্ত্বেও পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হিসেবে পরিবারের ব্যয় নির্বাহ করেন। করোনাকালে তাদের পরিবার কিভাবে জীবনযাপন করছে, এর খোঁজ খবর নেয়া জরুরী। হিজড়া শিশুদের অনেকেই স্কুলে পড়ালেখা করে। তারা করোনা পরিস্থিতির কারণে তারা যেন স্কুল থেকে ঝড়ে না পড়ে সেদিকেও নজর দিতে হবে। হিজড়াদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে কেউ যেন তাদের অপকর্মে লিপ্ত করতে না পারে সেজন্য তাদের পাশে থাকা উচিত। সংবিধান অনুযায়ী, জনগণই রাষ্ট্রের মালিক। তৃতীয় লিঙ্গের স্বীকৃতি দেয়া হলেও হিজড়াদের ক্ষমতায়ন ও সমাজের মূল স্রোতে নিয়ে যেতে সরকারের আরো গুরুত্ব প্রত্যাশা করছি। সর্বোপরি, করোনা মহামারি পরিস্থিতিতে হিজড়া জনগোষ্ঠীর পাশে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবার জন্য আহ্বান জানাচ্ছি।

লেখক
ইনজামুল সাফিন
উন্নয়নকর্মী, বরিশাল।

এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

Leave a Reply

প্রতিবেদক

সর্বশেষ সংবাদ