করোনা উৎপত্তির নেপথ্যে

আতিফ অনিক।।

করোনা নিয়ে সারাবিশ্বে হৈঁচৈ চলছে। আবার আমেরিকা বলছে করোনা ছড়িয়েছে চীন। অন্যদিকে চীন বলছে আমেরিকা। এই নিয়েই পড়ে আছে সবাই।কিন্তু বাস্তবে এই ধরনের ভাইরাস কেন ছড়াচ্ছে কিভাবে ছড়াচ্ছে এইসব নিয়ে বস্তুগত ভাবে আপাত গভীর পর্যবেক্ষণ একেবারেই অনুপস্থিত। এখন মার্কিন-চীনের সরারাসরি চক্রান্তের বাইরেও কিভাবে এই ধরনের ভাইরাস এর উৎপত্তি ঘটে সেই বিষয়ে দু চার কথা বলা যাক।

করোনা ভাইরাস মূলত এমন একটি ভাইরাস যাকে বলা হচ্ছে প্রাণী দেহ থেকে এটা মানুষের শরীরে ঢুকেছে। আসলে এই ধরনের ভাইরাস গত কয়েক যুগ ধরেই মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে। আর এটা ঘটছে মূলত বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্রাণ প্রকৃতিকে অহেতুক ধবংস করবার জন্য।

জলবায়ু পরিবর্তন করোনা ভাইরাস এর জন্য বস্তুগত ভিত্তি তৈরী করেছে। প্রতিদিন উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে পুঁজিবাদী উৎপাদন কাঠামো প্রাণ প্রকৃতি কে ধবংস করছে। পুঁজিবাদী উৎপাদনের বৃদ্ধির সাথে সাথে তা ব্যাপক সংখ্যক গাছপালা ও বনভূমি উজার করা হচ্ছে। আর এই বনভূমি উজারের ফলে কার্বন শোষণ বন্ধ হচ্ছে। অন্যদিকে উৎপাদন কারখানা বাড়ার ফলে কার্বন উৎপাদন বেড়ে চলেছে। এতে করে বৈশ্বিক জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটছে।


আরও পড়ুন>>

মাও এর স্বাস্থ্য নীতিঃ বিশাল ঢেউ আর বৈরী বাতাসে চীনকে মোকাবেলা করতে হয়েছিলো যা কিছু

স্বাস্থ্যসেবা, স্বাস্থ্য-রাজনীতিঃ একটি পর্যালোচনা-১


এই একই প্রক্রিয়া কোভিড-১৯ এর ক্ষেত্রেও ঘটছে। পুঁজিবাদ উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রানীদেহকে (যেমন পোল্ট্রি) মুনাফা তৈরীর কেন্দ্র বানিয়েছে। অধিক বাণিজ্যিকভাবে প্রানী খাদ্য উৎপাদন করা হচ্ছে। এর জন্য গড়ে উঠছে বিভিন্ন বড় বড় প্রানী উৎপাদন খামার। সমাজতান্ত্রিক জীববিজ্ঞানী রব ওয়ালেস এর মতে বড় বড় খামার বড় বড় ফ্লু জন্ম দিচ্ছে।

আর এই উৎপাদন খামার গুলোর বর্জ্য আবার বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের জন্যেও দায়ী।

ইউএস সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) এর মতে যে চারটি নতুন সংক্রামক রোগ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ছড়িয়েছিলো তার মধ্যে তিনটিই মানব-প্রাণীর সম্পর্কের ফলে। উদাহরণস্বরূপ, ইবোলা, সোয়াইন ফ্লু এবং অন্যান্য ভাইরাসগুলো প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে প্রবেশ করেছে। কোভিড -১৯ এর ক্ষেত্রেও সন্দেহ করা হচ্ছে যে, ভাইরাসটি উহান শহরের একটি “প্রানীদেহ বিক্রয় বাজার” থেকে মানুষের মধ্যে সংক্রামিত হয়েছিল, যেখানে বন্যপ্রানী বিক্রি করা হচ্ছিল। চীন প্রায় ৭৪ বিলিয়ন প্রানীদেহ শিল্প উৎপাদন করে।

অর্থাৎ বিগতত বছর গুলোতে প্রানীদেহ খাদ্য হিসেবে উৎপাদন করতে যেয়ে জীবের স্বাভাবিক প্রবনতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আর এর থেকে দেখা দিচ্ছে নানান ধরনের ভাইরাস।

এর ফলে বোঝায় যাচ্ছে যে এটা নিছক প্রাকৃতিক বলে দেয়ার কোন সুযোগ নেই। এটা বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন এর ফলেই ঘটেছে যা মূলত পুঁজিবাদী উৎপাদন এর বিকৃতির ফলে ঘটছে।

বর্তমানে মানুষ বাধ্য হচ্ছে অপরিচিত/অজানা জায়গায় স্থানান্তরিত হতে। মানুষের দীর্ঘদিনের এক অঞ্চলে বসবাসের ফলে সেই অঞ্চলের সম্পর্কে তার একটা ধারনা গড়ে ওঠে। কিন্তু ক্রমবর্ধমান পুঁজিবাদী উৎপাদন এবং ইকোসিস্টেম পরিবর্তন হবার ফলে মানুষ তার খাদ্যাভাস সম্পর্কে ধারনা রাখছে না। আর নিজের অজান্তেই ভাইরাস কে বহন করে ফেলছে।

বৈশ্বিক ভাবে এখনো পর্যন্ত করোনা মোকাবেলায় যেসব উদ্যোগ চোখে পরছে তাতে জলবায়ুর এই দিকটি নিয়ে বা জীব বৈচিত্রের এঈ দিকটি তেমন ভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে না। যদি করোনা পরবর্তী তে একই ধরনের উৎপাদন বজায় থাকে তবে এই ধরনের ভাইরাস উৎপাদনের ভিত্তি থেকে যাবে এবং বিশ্বে ভাইরাস কেন্দ্রীক মহামারী থেকে কোনভাবেই বাঁচা সম্ভব নয়।

বিশ্বের দেশে দেশে করোনা মোকাবেলায় যতটা না মানুষ স্থান পাচ্ছে তার থেকে বেশি স্থান পাচ্ছে শিল্প উৎপাদনন বা মুনাফাকে ঠিকঠাক রাখাকে কেন্দ্র করে। আমাদের দেশেও প্রধানমন্ত্রী ৭২ হাজার কোটি টাকার যে ঋণ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে সেটাও মূলত মুনাফা কেন্দ্রীক শিল্প উৎপাদন ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থে। এখানে কৃষি বা জনবান্ধব উদ্যোগ নেয়া হয় নি। প্রকৃতিকে বাঁচাবার কোন উদ্যোগও নেই। যার ফলে করোনা পরবর্তী বিশ্ব যেটাকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে তা আসলে কতটুকু স্বাভাবিক সেটাও আমাদের ভাবতে হবে।

এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

Leave a Reply

লেখক

সর্বশেষ সংবাদ

%d bloggers like this: