করোনা দেশে শ্রেনী বৈষম্য মূর্ত করে তুলছে

আতিফ অনিক।।

গত দশ বছর ধরে বাংলাদেশ সরকার ঢাক ঢোল পিটিয়ে বলে চলেছে, দেশে উন্নয়নের জোয়ার বইছে। বাংলাদেশে দারিদ্রতা কমে আসছে। পদ্মা সেতু হচ্ছে, নগর গুলোতে অপরিকল্পিত অসংখ্য ফ্লাইওভার হয়েছে, নদীর স্বাভাবিক গতি রোধ করে বসানো হয়েছে অসংখ্য ড্যাম, দেশের বাজেটের এক বড় অংশ ব্যায় করা হয়েছে অবকাটামোগত খাতে, তৈরী হয়েছে রাস্তা। সাধারণ মানুষের রক্ত চুষে নেয়া টাকায় এসব করার মধ্য দিয়ে বলা হয়েছে এতে করে নাকি সর্বসাধারণ এর উপকার হয়েছে। মন্ত্রীরা পত্র-পত্রিকা থেকে শুরু করে সভা-সমাবেশে বলে চলেছেন এদেশে দারিদ্রতার হার খুবই কম। মানুষের ঘরে ঘরে টিভি ফ্রিজ ঢুকেছে। কেউ আর না খেয়ে থাকে না। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ইকোনমিক জোন করবার জোর কদমে প্রস্তুতি চলেছে, কৃষকদের জমি থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। বার বার মুখে ফ্যানা তুলে বলা হয়েছে যে, দেশে কোন খাদ্য ঘাটতি নেই, পর্যাপ্ত পরিমান খাদ্য মজুদ আছে।

করোনা সংকটের এই কদিনের মধ্যেই দেখা যাচ্ছে, এক ব্যাপক অংশের মানুষ খাদ্য ঘাটতিতে পড়তে চলেছে। নিম্ন আয়ের মানুষ জন বিভিন্ন শহরগুলোতে আহাজারী করছে, দু বেলা খাবারের জন্য। গ্রাম গুলোতে এই প্রভাব এখনো কম হলেও, বিভিন্ন গবেষণা বলছে আর এক সপ্তাহের মধ্যেই লক ডাউনের ফলে গ্রামীন নিম্ন আয়ের মানুষদের খাদ্য ঘাটতি শুরু হবে। আস্তে আস্তে যা মধ্যবিত্ত শ্রেনীতে এসে ঠেকবে বলেই মনে হয়, যদি লক ডাউন দীর্ঘস্থায়ী হয়।

এই সময়ে এসে মন্ত্রী-আমলা-প্রধানমন্ত্রী-সরকারী-বেসরকারী বুদ্ধিজীবি থেকে শুরু করে সরকার রাষ্ট্রের দালাল সকলের মুখের কথা বন্ধ হয়ে যেতে চলেছে। যদিও প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে এখনো বলে চলেছেন তার নেতৃত্বে দেশ এগিয়ে চলেছে এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে এখনও করোনা মোকাবেলায় এগিয়ে রয়েছেন। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি আমাদের সামনে এক ভয়াবহ শ্রেনী সংকটকে মূর্ত করেছে। এতদিন যা ছিলো কিছুটা বিশৃঙ্খলভাবে, বর্তমানে তা সকলের চোখকে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে বাংলাদেশে খেটে খাওয়া মানুষ কি দুর্বিষহ পরিস্থিতি পার করছেন।

করোনা প্রতিরোধে একটি গুরুত্বপূর্ন স্বাস্থ্যগত নির্দেশনা হচ্ছে, ঘরবন্দি থাকা। কিন্তু এদেশের সাধারণ জনগনের আবাসনের যে তীব্র সংকট তাতে ঘরবন্দী থেকেও কোন লাভ হওয়া সম্ভব নয় সেভাবে। কারন আমাদের দেশে অধিকাংশ পরিবারের একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্যেও আলাদা থাকবার ঘর নেই। শ্রমিক অঞ্চল গুলোতে এক ঘরে গাঁদাগাদি করে অনেক সময় ১০/১২ জনও থাকতে দেখা যায়। অন্যদিকে বড়লোকদের মধ্যে একই পরিবারের চার জন সদস্যের জন্য কখনো কখনো আলাদা আলাদা ফ্লাট বা বাড়ির খবরও চোখে পড়ে। এদেশের মধ্যবিত্তের নিম্ন অংশও এই সংকটের মধ্যে রয়েছে। এ যেন বাড়িতে থেকেও ঘরবন্দী হওয়া সম্ভব নয়। যাদের ঘর নেই, রেলওয়ে অঞ্চলে থাকে, রাস্তায় থাকে, বড় বড় শপিং মলের সামনে ঘুমায় তাদের কথা তো বলাই বাহুল্য।

এক্ষেত্রেও শ্রেনী পার্থক্য সুস্পষ্ট হচ্ছে। করোনা আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে কি ধরনের বৈষম্য তৈরী হয়ে রয়েছে। যেখানে বিপরীত ভাবে সমাজতন্ত্র সকলের আবাসিক স্থলের স্বাস্থ্যকর ব্যবস্থাপনার নিশ্চয়তা দিতে পারে। আমরা দেখেছি চীন-রাশিয়ায় অধিক জনসংখ্যা থাকা সত্ত্বেও বিপ্লবোত্তর সময়ে তারা সকলের জন্য স্বাস্থ্যকর আবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছিল।

অপরিকল্পিত সেবা-স্বাস্থ্য-শিল্প সব খাতেই নিয়োজিত শ্রমিকদেরও ঠিকমত পরিকল্পিত উপায়ে ত্রাণ দেয়াও সম্ভব নয়। এমন কি গ্রাম পর্যায়েও সঠিক জরিপ এত দ্রুত করা সম্ভব হয়ে উঠবে না। কারণ এই দেশের উপর থেকে নিচে শাসক-আমলাদের তৃণমূল স্তরের জনগনের সাথে কোন সম্পর্ক নেই। এরা জানে না কোন পরিবারে কি ধরনের সমস্যা প্রকট এবং কার কি খাদ্যের সমস্যা রয়েছে। কোন পরিবারে কতজন মানুষ কর্মক্ষম আর কত জন মানুষ বৃদ্ধ এবং কার কত ঔষধের প্রয়োজন। এসব ক্ষেত্রেও গরীব মানুষ বৈষম্যের স্বীকার হবে।

উপরে আলোচিত সব সমস্যা গুলোই আবির্ভূত হয়েছে ব্যক্তি মালিকানা কেন্দ্রীক সমাজ ব্যবস্থার ফলে। এই ব্যবস্থায় ব্যক্তিগত মুনাফায় সব কিছু নির্ধারন করে দেয়। বাজার নিয়ন্ত্রন করে সিন্ডিকেট-অসাধু ব্যবসায়ীরা। এমনকি এখানকার রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা সমূহ গৃহীত হয় পুঁজিপতিদের সেবার উদ্দেশ্যে। সাধারণ জনগণ যারা প্রতিনিয়ত উৎপাদন করেন তাদের এখানে কোন মালিকানা নেই। যে শ্রমিক শ্রম দিয়ে দেশের উন্নয়ন ঘটায় সেই শ্রমিকের মজুরী নেই।কয়েক সপ্তাহ কাজ বন্ধ হয়ে থাকলে তাদের খাবারের জোগাড় নেই। তাই এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ এবং মোকাবেলার একটাই পথ শ্রেনী বৈষম্য সৃষ্টিকারী পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার উচ্ছেদ এবং সমাজের আমূল রূপান্তর। এর মধ্য দিয়ে গড়ে তোলা এক শোষণ হীন সমাজব্যবস্থা, সমাজতন্ত্র, যা অব্যাহত ভাবে শ্রেনীহীন সমাজ কমিউনিজমের দিকে এগিয়ে চলবে।

লেখক

আতিফ অনিক
সভাপতি
বিপ্লবী ছাত্র-যুব আন্দোলন, কেন্দ্রীয় কমিটি।

এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

Leave a Reply

লেখক

সর্বশেষ সংবাদ

%d bloggers like this: