করোনা পরবর্তী বিশ্ব: বিপ্লব ছাড়া মৌলিক পরিবর্তন হবে না

আতিফ অনিক।।

করোনা শনাক্ত হবার পর থেকে গত কয়েক মাস ধরেই সারা বিশ্বেই আলোচনা চলছে কি হবে করোনা পরবর্তী বিশ্বের পরিস্থিতি?

আবার এই করোনাকে কেন্দ্র করেই সারা বিশ্বের রাষ্ট্র কাঠামো গুলোতে কি ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে সেসব নিয়েও আলোচনা চলছে।

আলোচনা চলছে অর্থনীতিতে ধেয়ে আসা মন্দা নিয়ে। করোনা কি গত কয়েক বছর ধরে শুরু হতে যাওয়া বৈশ্বিক মন্দাকে মহামন্দায় পরিণত করবে? যা বিশ্ব দেখেছিলো গত শতাব্দীর তিরিশের দশকে?

পৃথিবীর তাবৎ দেশের বড় বড় বুদ্ধিজীবিরা আলোচনা করে চলেছেন। আলোচনায় পিছিয়ে নেই আমাদের দেশের বুদ্ধিজীবিরাও। কিন্তু কেউই সেভাবে করনীয় প্রশ্ন হাজির করছেন না বা তাদের পক্ষে তা করা সম্ভবও না। করোনা পরবর্তীতে শ্রমিক এবং নিম্ন আয়ের মানুষদের যেভাবে কষ্ট ভোগ করতে হবে এবং এখন যেভাবে হচ্ছে তা নিঃসন্দেহ আমাদের সামনে অনেক চিন্তা তৈরী করে দিচ্ছে।

করোনার আগেই বিশ্বে মন্দার আভাস পাওয়া যাচ্ছিলো আমেরিকা এবং চীনের মধ্যেকার বাণিজ্য যুদ্ধের মধ্য দিয়ে।সেটা তরান্বিত করে দিলো করোনা। এই করোনা পরবর্তীতে শাসকদের মন্দা আটকানোর ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের আরো আরো দমনমূলক ভূমিকার প্রয়োজন পড়বে। সে তখন এই দমনকে জায়েজ করার হাতিয়ার করবে করোনাকে।কারণ বিশ্বে শুরু হয়ে যাওয়া মন্দা যা পুঁজিবাদের স্বাভাবিক প্রবণতা সেটাকে ঢেকে ফেলতে চাওয়া হবে করোনা দিয়ে। লাখ লাখ মানুষ চাকরী হারাবে। কারখানা গুলোতে শ্রমিক ছাটাই হবে। বুর্জোয়ারা অটোমেশন করে ফেলবে এবং বিশ্ব ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে।


আরও পড়ুন


এই পর্যন্ত সবাই ব্যাখ্যা করছেন। সবাই বলছেন এই সংকট এর কথা। কিন্তু এই যে কোটি কোটি শ্রমিক কাজ হারাবে। এরা কি করবে? খাবে কি? থাকবে কোথায়? কোটি কোটি শ্রমিক কাজ হারালে কি হবে আবার বিশ্ব ব্যবস্থা কেন ভেঙে পড়বে তার গভীর কোন ব্যাখ্যা নেই। সবার বক্তব্যই মোটামুটি এরকম। কিছুটা এদিক ওদিক।

আমরা কয়েকটা পর্যবেক্ষণ করতে পারি। যা আলাদা আবার পরস্পর সম্পর্ক যুক্ত।

যেমন বলা হচ্ছে যে করোনা পরবর্তী বিশ্ব ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে বা গ্লোবালাইজেশন থাকবে না। কিন্তু এটা আসলে ঘটতে পারে না। কোনভাবেই এটা সম্ভব হবে না। কারণ বিশ্ব পুঁজিবাজার কখনোই সীমানা মানে না। এটা করোনা ভাইরাসের মতোই সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। এটআ কিছুটা শিথিল হতে পারে মাত্র।

যেমন ধরুন, আমেরিকা কি তার অস্ত্র উৎপাদন বন্ধ করে দেবে? যদি বন্ধ করে না দেয় তাহলে তার বাজার দরকার হবে সে কখনোই আমেরিকায় বসে থাকবে না। তার দরকার হবে এশিয়া-আফ্রিকা-ল্যাটিন আমেরিকা-মধ্য প্রাচ্যের বাজার। আর আমেরিকা যদি তার অস্ত্র উৎপাদন বন্ধ করে দেয় তাহলে আমেরিকা আর আমেরিকা থাকে না। সেটা জনগনের বিদ্রোহ ছাড়া সম্ভবও নয়।

অন্যদিকে বিশ্বের আরেক পরাশক্তি চীন। যে কিনা তার পণ্য দ্বারা সারা বিশ্ব সয়লাভ করে দিয়েছে ইতিমধ্যেই। চীন রপ্তানী পণ্য যা অন্য দেশের সাথে সরাসরি সম্পর্ক তৈরী করে সেটা কি বন্ধ করে দেবে? একবার ভাবুন তো এটা কি সম্ভব চীনের বর্তমান ব্যবস্থার মধ্যে? যদি এইসব বন্ধ না হয় তাহলে বিশ্বে কি ধরনের মৌলিক পরিবর্তন হবে? মানুষে মানুষে শোষন কি বন্ধ হবে?

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন নাম করা প্রফেসর স্টিফেন এম ওয়াট বলছেন, “করোনা পরবর্তী বিশ্ব রাজনীতির মৌলিক বিরোধী চরিত্রের পরিবর্তন হবে না। “তিনি আরো বলছেন, “এর আগের কোন মহামারী মহাশক্তি গুলোর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বীতা শেষ করে নি বা সহযোগিতার নতুন সম্পর্ক তৈরী করে নি। “আপাত হিসেবে এই ব্যাখ্যাটি সঠিক।একজন বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবি হিসেবে তার এই বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণও। কিন্তু আমরা যারা মার্ক্সবাদী তাদের কাছে অন্য কিছু ব্যাখ্যাও রয়েছে।

পৃথিবী ব্যাপী অটোমেশন এর কথা বলা হচ্ছে। অটোমেশন হলে নাকি উৎপাদন অনেক অনেক গুন বেড়ে যাবে এবং পণ্য অভ্যন্তরীণ ভাবে চাহিদা মেটাবে। প্রাথমিকভাবে এটাকে অনেক চচটকদার কথা মনে হতে পারে। কিন্তু এটা যারা বলেন তারা মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্কের ব্যাপারে কোন পরিবর্তন হবে কিনা সেটা নিয়ে কথা বলছেন না। অটোমেশন হলে শ্রমিক কাজ হারাবে এটাও বলা হচ্ছে। কিন্তু এরপরে এসে বুর্জোয়া তাবৎ বুদ্ধিজীবিরা নিরব হয়ে পড়ছেন। তাদের ঝুলি থেকে আর কিছু বের হচ্ছে না। কারণ এর পরের টা বললে বলতে হয় যে পুঁজিবাদ কে উৎখাত করতে হবে।

আদতে অটোমেশন হলে প্রাথমিক অবস্থায় কিছু উৎপাদন বৃদ্ধি ঘটতে পারে। কিন্তু অটোমেশন এর ফলে যে ব্যাপক সংখ্যক শ্রমিক ছাটাই হবে এর ফলে যে শ্রমিক ছাটাই হবে তার ক্রয় ক্ষমতা কমে আসবে। সে আর বাজার থেকে কিছু কিনতে পারবে না। এতে করে উৎপাদিত পণ্যের চাহিদা হ্রাস পাবে এবং বাজার সংকুচিত হবে ফলে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাবে।

যেমন শ্রমিক ছাটাই হলে, সে বাজার থেকে একটা শ্যাম্পু কেনা থেকে যদি বিরত থাকে তবে বাজারে শ্যাম্পুর চাহিদা কমে আসবে। আর শ্যাম্পুর চাহিদা কমে আসলে তার উৎপাদনন কমে যাবে। এটা বেশি দিন চলতে থাকলে শ্যাম্পুর কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে।

অর্থাৎ অটোমেশন হলে উৎপাদিকা শক্তির যে ব্যাপক বিকাশ তা উৎপাদন কাঠামোর সাথে সামঞ্জস্য থাকবে না।এতে করে হয় উৎপাদন সম্পর্কের বাধ্যতামূলক পরিবর্তন না হলে পশ্চাৎপসরণ ঘটবে।

কিন্তু যদি এই সময়ে পুঁজিবাদ ক্ষমতায় থাকে তবে তাকে টিকে থাকতে হলে ফ্যাসিবাদ চালাতে হবে। রাষ্ট্র ক্ষমতা ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের রাষ্ট্র কর্তৃক সেবামূলক ব্যবস্থাপনা গুলোতে ব্যয় সংকোচন করা হবে। রাষ্ট্রের খবরদারি বেড়ে যাবে।

কারণ উপরে বর্ণিত পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রে তথাকথিত বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে। শ্রমিকরা না খেতে পেলে নিশ্চয় তারা ঘরে বসে থাকবে না। প্রথমদিকে তারা ভবঘুরে হতে পারে, এবং ডাকাতি ছিনতাই এসব বাড়বে। আর যদি রাজনৈতিকভাবে শ্রমিক শ্রেনীর পক্ষের সংগঠন থাকে তাহলে ভিন্ন কিছু হতে পারে।

বলা হচ্ছে, করোনা শ্রেনী ভুলিয়ে দিয়েছে। করোনা কোন শ্রেনী দেখছে না। হ্যাঁ, এটা সত্য বটে যে প্রাকৃতিকভাবে করোনা যেকোন মানুষের মধ্যেই ছড়াতে পারে। কিন্তু খেয়াল করে দেখুন গত দুই মাসে বিশ্বের দেশে দেশে রাষ্ট্র গুলো করোনা মোকাবেলায় কি ভূমিকা নিয়েছে। করোনা কি আমাদের দেশে হাসিনাকে গার্মেণ্টস শ্রমিক বান্ধব করতে পেরেছে? হাসিনা যে ঋণ প্যাকেজ ঘোষণা করেছে তাতে কি শ্রমিকদের বা কৃষকদের ব্যাপারে কোন প্যাকেজ রয়েছে? নেই। অর্থাৎ করোনাকে কৃষক কে আরো নিঃস্ব এবং শ্রমিককে মৃত্যু ও সাধারণ মানুষকে জিম্মি করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলে রাখা শাসকরা কাজে লাগাচ্ছে।

মোদ্দা কথা করোনা পরবর্তী পৃথিবীতে কি পণ্য অর্থনীতির পরিবর্তন হতে চলেছে আপনাপনিই? যদি হ্যা হয় তাহলে আপনি বোকার স্বর্গে বাস করছেন। তবে করোনা পরবর্তী পৃথিবীতে যে অর্থনৈতিক সংকট দেখা দিবে তার ফলে বিপ্লবের বস্তুগত ভিত্তি তথাকথিত উন্নত দেশে পেঁকে উঠতে পারে। সেসব দেশে যদি সঠিক বিপ্লবী রাজনীতি ধারণ করা দল থাকে তবে সেখানে বিপ্লবের সম্ভাবনা দেখা দেবে। আবার আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন আরো তীব্র হবে। কারণ উন্নত দেশে যদি অটোমেশন হয় তাহলে সেসব দেশের চাহিদা পুরনের লক্ষ্যে আমাদের মতো দেশগুলোতে আগ্রাসন ভয়াবহ রূপ নেবে। এতে করে এসমস্ত দেশে জাতীয় মুক্তি বা নয়াগনতান্ত্রিক বিপ্লবের পরিস্থিতিতে নতুন মোড় নেবে।

পরিশেষে বলা যায় করোনা পরবর্তী পৃথিবী বিপ্লব বা জনগনের বিদ্রোহ ছাড়া মৌলিক কোন পরিবর্তন করবে না। যা পরিবর্তন সেটা হতে পারে শুধুই রূপের বদল। তবে এই ক্ষেত্রে কি কি পরিবর্তন হবে তা দেখবার জন্য আমাদের আরো কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে।

লেখক-

আতিফ অনিক, সভাপতি, বিপ্লবী ছাত্র-যুব আন্দোলন।

এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

Leave a Reply

লেখক

সর্বশেষ সংবাদ

%d bloggers like this: