কোভিড-১৯ পরবর্তি ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি কেমন হবে?

রঞ্জন কুমার দে।।

কোভিড-১৯ এখন সারা পৃথিবীতে এক সুপার সাইক্লোনের নাম। তবে সার্বিক বিবেচনায় এর যে ভয়বহতা তা এখনও শুরুই হয়নি বলে মনে হয়। কারণ এখন পর্যন্ত এর বিস্তার শুধুমাত্র অর্থনীতিতে এবং প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনায় উন্নত দেশ গুলির মধ্যেই সীমাবদ্ধ আছে। তৃতীয় বিশ্বের সল্পন্নোত বা দরিদ্র দেশগুলিতে এখনও এটি তেমন ভয়াবহ আকারে ছড়িয়ে পড়েনি। তাছাড়া এর প্রভাবে বিশ্বব্যাপী অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব এখনও দৃশ্যমান নয়। তাই আমরা এখনই যেমন সার্বিক ক্ষতির পরিমাণ নিরুপন করতে পারছি না আবার এর ফলে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কি ধরণের পরিবর্তন আসবে সেটা বলতে পারছি না। তবে

এই মহামারির কারণে বিশ্বব্যাপী অনেক বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এর মধ্যে দুটি বৈশিষ্ট্যই এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান: একদিকে বিশ্বব্যাপী এমনকি উন্নত দেশগুলিতেও স্বাস্থ্য থাতের বেহাল অবস্থা এবং অন্যদিকে চীনের দিকে বিশ্ব ভারসাম্যের কেন্দ্রবিন্দু স্থান্তরিত হওয়া। এই পরিস্থিতিতে এটা স্পষ্টতই বুঝা যাচ্ছে বিশ্বমোড়ল আমেরিকার দম্ভ মুখথুবরে পড়ার উপক্রম। এখনো তাকে অনেকটাই অগ্নিপরীক্ষার মধ্য দিয়েই যেতে হবে মনে হয়। এই পরীক্ষায় সে কত দূর যেতে পারে এটাও দেকার বিষয়।

এই সংকট এক নতুন বিশ্বের সূচনা ঘটাবে

কোভিড-১৯ সংকট মোকাবেলা করার জন্য গেটা বিশ্ব এখন এক ত্রাণকর্তার মুখাপেক্ষি হয়ে আছে। এই সক্ষমতাকে উপর ভিত্তি করেই বিশ্ব পরিচালনার কেন্দ্র স্থানান্তরিত হবে বলে ধারণা করা যায়। এটি বুঝার জন্য ২০১৫ সালে ইউটিউবে প্রচারিত বিলগেটসের বক্তব্যটি শোনা যেতে পারে। তিনি ইবোলার বিস্তার সম্পর্কে বলেছিলেন, “এবার আমরা ভগ্যবান”। কারণ তখন রোগটি শুধুমাত্র পশ্চিম আফ্রিকার অপেক্ষাকৃত কম ঘনবসতি অঞ্চলে এটি মহামারী আকারে ছড়িয়েছিল। তখন আন্তর্জাতিক মহলের দ্রুত হস্তক্ষেপে সেটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছিল। তাছাড়া ইবোলা ছিল একটি তরল বাহিত রোগ। তাই এটাকে নিয়ন্ত্রণ করাটাও সহজ ছিল। তিনি বারবার সতর্ক করেছিলেন, আমরা প্রস্তুত না হলে এই ধরণের মহমারী লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন নিতে পারে, বিশ্বব্যপী বড় ধরণের অর্থনৈতিক মন্দার কারণ হতে পারে। তিনি আরও সতর্ক করেছিলেন, এধরণের রোগ যদি বাতাসের মাধ্যমে ছড়ানো শুরু করে সেটা আর এক জায়গাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। সেটা ট্রেন বা বিমানের মাধ্যমে বিশ্বভ্রমণ করবে। আজ আমরা সেই পরিস্থিতিই মোকাবেলা করছি।

এমনকি ২০০৯ সালে আমেরিকার কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (সিআইএ) “২০২৫ সালের বিশ্ব পরিস্থিতি” নামে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছিল। সেখানে বলা হয়েছিল, “যদি কোন মহামারী ছড়িয়ে পড়ে, চীনের কোন বাজার বা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কোন অঞ্চল যেখানে মানুষ এবং পশু খুবই কাছাকাছি অবস্থান করে, এমন ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চল থেকেই তা ছড়াবে।“ সেই রিপোর্টে স্পস্ট করে বলা হয়েছিল, নতুন এই ভাইরাসটি হবে খুবই সংক্রামক এবং এর ফলে মানুষের শ্বাসকষ্ট জনিত রোগ হবে।

এর সাথে আরকেটি কথা না বললেই নয়। কয়েক বছর ধরে বিশ্বব্যংকও বিভিন্নভাবে হুশিয়ারী উচ্চারণ করে আসছে। এছাড়া বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও (ডাব্লুএইচও) ২০০৯ সালে এইচ১ এন১, ২০১৪ সালে পোলিও এবং ইবোলা, ২০১৬ সালে জিকা, ২০১৯ সালে আবার ইবোলা ইত্যাদি এসব নিয়ে বার বার সতর্কতা জারি করেছে। কিন্তু তার পরেও আন্তর্জাতিক মহল এটা নিয়ে তেমন দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেয়নাই। কিন্তু কেন? এর একটা কারণ হতে পারে বড় বড় দেশগুলো অন্তর্জাতিক সংহতির ক্ষেত্রে মহামারী মোকাবেলা করা যে কোন বিষয় হতে পারে এটা ভাবতেই পারন নাই। তাই তারা ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক মহামন্দা অতিক্রম করার জন্য বা বড়জোর বৈশ্বয়িক জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি যেভাবে গুরুত্ব সহকারে দেখেছেন ভাইরাসের কারণে মহামারী হতে পারে এমন ভাবনা তাদের কাছে উপেক্ষিতই থেকে গেছে।

এক্ষেত্রে আমেরিকা, চীন ও রাশিয়ার মধ্যকার “ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বিতা” বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। বিগত বছরগুলিতে আমেরিকা আগের তুলনায় অনেকটাই একক কর্তৃত্ব হারিয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিকভাবে বৃহৎ শক্তিগুলির মতবিরোধ আরও প্রকট হয়েছে। এর ফলে কোভিড-১৯ মোকাবেলা করার জন্য ডব্লুএইচও প্রধান ভূমিকা পালন করছে না, যদিও এটা তার দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। ফলে চীন তার পরিস্থিতি তার নিজে মতো করে সামলিয়েছে। তার দেশে কোভিড-১৯ মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ার অনেক পরে সে তথ্য প্রকাশ করেছে। ফলে অন্যান্য দেশ গুলি শুরুতেই এর ভয়াবহতা সম্পর্কে যেমন জানতেও পারে নাই বা আগে থেকে প্রস্তুতিও নিতে পারে নাই। ফলে বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাস মোকাবেলা করার জন্য ডাব্লুএইচও’র বদলে “চীনা লাইন” গ্রহণ করা ছাড়া অন্যান্যদের সামনে বিকল্প নেই। যাই হোক, সাম্প্রতিক বছরগুলিতে জাতিসংঘের ব্যবস্থাপনায় চীন যে বিনিয়োগ করেছে এখন তার সুফল তারা পাচ্ছে।

এখন আমরা অন্য একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করব, কিভাবে চীন ও এশিয়া বিশ্ববাজারে তাদের স্থান করে নিয়েছে।

বিগত কয়েক বছর ধরেই চীন এবং এশিয়ার দেশগুলি বিশ্ববাজারে মোটামুটিভাবে একটা অবস্থান করে নিয়েছে। এক্ষেত্রে কোভিড-১৯ কিছুটা হলেও নেতিবাচক অবস্থার সৃষ্টি করেছে। তবে এটা একসময় তাদের জন্য ইতিবাচক হিসেবেই আসবে বলে মনে হচ্ছে। আগেই উল্লেখ করা হয়েছ কোভিড-১৯ চীনের একক কর্তৃত্ব ও ভূমিকা এর বিস্তারের ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। তবে বিষয়টা অন্য জায়গায়। বর্তমান বিশ্ব অনেকটাই চীনের চাহিদা ভিত্তিক সরবরাহের উপর নির্ভরশীল। এর ফলে চীনা অর্থনীতির বড় ধরণের শাটডাউন বিশ্বঅর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করেছে। যেটা ২০০৮ সালের “মহামন্দার” চেয়েও ব্যপক। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সংহতি বজায় রাখার নামে চীনের সাথে বিশ্বমোড়লদের “শক্তির প্রযোগীতা” এখন “নমনীয়” প্রতিযোগীতায় পর্যবসিত হয়েছে।


আরও পড়ুন>> মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভেনিজুয়েলার মাদুরোকে মাদক-সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে অভিযুক্ত করেছে


এই দৃষ্টিকোণ থেকে, আমরা একটি অভূতপূর্ব বিষয় প্রত্যক্ষ করছি। শুরুতে চীন একটা সংকটকালীন সময় অতিক্রম করেছে। উহানে তাদেরকে জোর করে কারখানা বন্ধ করতে হয়েছে, কখনও কখনও জনগণের উপর বল প্রয়োগ করতে হয়েছে। তারা ভিষণভাবে মানবিক ও আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। তার পরেও এক সময় তারা সংকটকালীন মূহুর্ত কাটিয়ে উঠেছে। এক কথায় এটা ছিল চীনের সামনে অগ্নী পরীক্ষা, আর তার সফলভাবে সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছ। অন্যদিকে এই মূহুর্তে ইউরোপ ও আমেরিাকা কোভিড-১৯ প্রকোপে পর্যদুস্ত। তাদের অর্থনীতি ভেঙ্গে পড়ছে।

অন্যদিকে চীন তার অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিস্থিতি সামলে উঠার বদলে একের পর এক নেতিবাচক বক্তব্য তার সহযোগী রাষ্ট্রগুলোকে আশ্বস্ত করতে পারছে না। অন্যদিকে তার বলয়ে থাকা ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভুক্ত দেশগুলি যেমন নিজেরাও পরিস্থিতি ভাল ভাবে মোকাবেলা করতে পারছে না, অন্যদেরকেও সহযোগীতা করতে পারছে না। চীন সেখানে আন্তর্জাতিকভাবে সহযোগীতার হাত বাড়িয়ে বিশেষকরে ইতালী ও সার্বিয়ার মতো দেশগুলির কাছে ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছে। উদীয়মান বিশ্বে চীন এখন এমন শক্তি হিসাবে উপস্থিত হচ্ছে যে কিনা আন্তর্জাতিকভাবে সহায়তাও করতে পারে। একসময় যুক্তরাষ্ট্রের এই ভূমিকাই তাকে বিশ্বমোড়লের স্থান করে দিয়েছিল।

চীন সম্ভবত এই প্রচার যুদ্ধকে খুব বেশি দূরে নিয়ে যেতে আগ্রহী না। এটিকে স্থায়ী বা নিরাপদও মনে করেনা। সে এটাকে একটা হাতিয়ার হিসেবেই ব্যবহার কতে চায়। যাই হোক এখন কর্তৃত্ববাদ, সস্তা জনপ্রিয়তা ও উদারপন্থার এগুলো নিয়ে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হবে। সেই বিতর্কে অবশ্যই পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানিক দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও সহযোগীতাই বিশেষভাবে স্থান পাবে। যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা আর তার সস্তা বাগাড়াম্বরে ভুলতে চাইবে না। অন্যদিকে এটা প্রমাণিত হয়েছে যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন অকার্যকর ও অপ্রাসঙ্গিক প্রমাণিত হয়েছে। তাই তারাও সার্বভৌমত্ববাদী ধারণায় অনুপ্রাণিত হয়ে তাদের নিজ নিজ সীমান্তে নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠায় আগ্রহী হয়ে উঠবে।
আরেকটি বিষয় লক্ষ্যনীয় তা হচ্ছে চীনের “নব্য কর্তৃত্ববাদ”। কোভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণ করাটাকে তারা যুদ্ধ জয়ের মতো করেই দেখছে। সেটাকে পুঁজি করে এখন সে বিশ্বের প্রান্তে প্রান্তে ছুটে বেড়াচ্ছ তার কর্তৃত্ব স্থাপন করার জন্য। মনে হচ্ছে কোভিড-১৯, কয়েক দশক ধরে চলমান “শীতল যুদ্ধকে” মূর্ত করে তুলেছে।

যাই হোক এই পর্যবেক্ষণগুলো আরো ভালভাবে বিচার করা দরকার। এর জন্য আমাদেরকে আরও সময় নিয়ে ভাবতে হবে, বিশ্বমোড়লদের পর্যবেক্ষণ করতে হবে। তবে এটা সত্যি, কোভিড -১৯ বিশ্বের শাসন কর্তাদের একটা অগ্নিপরীক্ষার মধ্যে ফেলেছে। ইরান এসংকট মোকাবেলায় প্রথমবারের মতো আইএমএফের কাছে ত্রাণ সহায়তা চেয়েছে। পুতিন তার সাংবিধানিক সংস্কারের পথে এগিয়ে যেতে সচেষ্ট। তিনি এখনও তেলের মূল্যকে কেন্দ্র করে সৌদি আরব এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অঘোষিত যুদ্ধ জারি রেখেছেন। আগামীতে আমেরকিায় নির্বাচন। ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা অব্যহত রেখেছেন। এজন্য ফ্লোরিডা রাজ্যে বিজয় নিশ্চিত করার জন্য ভেনিজুয়েলার মাদুরোর বিরুদ্ধে মাদক পাচারের অভিযোগ এনেছেন। তারপরেও তার বিজয়ের অনেকটাই নির্ভর করবে কোভিড -১৯-এর বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে তিনি তার জনগণকে সন্তুষ্ট করতে পারবেন কিনা।

এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

Leave a Reply

লেখক

সর্বশেষ সংবাদ

%d bloggers like this: