ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও দেশপ্রেম এর কিংবদন্তি শেখ কামালের জন্মদিনে বিনম্র শ্রদ্ধা

বহুমাত্রিক অনন্য সৃষ্টিশীল প্রতিভার অধিকারী বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ শেখ কামাল ১৯৪৯ সালের ৫ই আগস্ট তদানীন্তন গোপালগঞ্জ মহকুমার টুঙ্গীপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জেষ্ঠ পুত্র তিনি। ঢাকার শাহীন স্কুল থেকে মাধ্যমিক ও ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগ থেকে বি এ (অনার্স) পাস করেন জাতির জনকের তনয় শেখ কামাল। তিনি দেশের শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি শিক্ষার অন্যতম উৎসমুখ ‘ছায়ানট’-এর সেতার বাদন বিভাগের শিক্ষার্থীও ছিলেন। ছিলেন উপমহাদেশের অন্যতম সেরা ক্রীড়া সংগঠন, বাংলাদেশে আধুনিক ফুটবলের প্রবর্তক আবাহনী ক্রীড়াচক্রের প্রতিষ্ঠাতা ও ঢাকা থিয়েটারের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। অভিনেতা হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যাঙ্গনে ছিলো সু-খ্যাতি। শৈশব থেকেই ফুটবল, ক্রিকেট, হকি, বাস্কেটবলসহ বিভিন্ন খেলাধূলায় প্রচন্ড উৎসাহ ছিল তাঁর।

শেখ কামাল স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ওয়ার কোর্সে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হয়ে মুক্তিবাহিনীতে কমিশনন্ড লাভ করে মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি জেনারেল ওসমানীর এডিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দেশ স্বাধীনের পর শেখ কামাল সেনাবাহিনী থেকে অব্যাহতি নিয়ে আবারো লেখাপড়ায় মনোনিবেশ করেন। তিনি বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের অন্যতম সদস্য ছিলেন এবং ঘাতক কর্তৃক শাহাদাত বরণের সময় বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগের অঙ্গ-সংগঠন জাতীয় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর সাথে স্ব-পরিবারে শাহাদাত বরণের আগে তিনি সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের এমএ শেষ পর্বের পরীক্ষা সমাপ্ত করেন। দেশী-বিদেশী স্বাধীনতা বিরোধী দুষ্টচক্রের ইন্ধনে সেনাবাহিনীর কতিপয় বিপদগামী ঘাতকদের হাতে ধানমন্ডির ঐতিহাসিক ৩২নম্বর বাড়ীতে পরিবার-পরিজনের সাথে মাত্র ২৬ বছর বয়সে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট তিনি শহীদ হন। স্বল্প জীবনে অসামান্য সাফল্যগাঁথা কর্মদিয়ে সুসজ্জিত করেছিলেন ব্যক্তিগত জীবন। দেশবাসীর কাছে নিজেকে সৃষ্ঠি করেছিলেন বাংলার ইতিহাসের অন্যতম সূর্য্য সন্তান হিসেবে। এমনকি অসাধারণ এক বিনয়ী ও সারল্যেভরা ছিলো জীবন বৈশিষ্ট্য। আজো যদি আমাদের মাঝে বেচে থাকতেন, তবে বহু আগেই আমরা পেতাম একটি মজবুদ ক্রীড়াঙ্গন। বিশ্বমানের ক্রিকেট এবং ফুটবল দল নিয়ে গর্বিত হতাম বিশ্ব দরবারে। নেতৃত্ব দিতাম শিল্প-সংস্কৃতিতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে। সদালাপী, হাস্যোজ্জ্বল খোশামোদী প্রানবন্ত শেখ কামাল অগ্রদূত হয়ে থাকতেন বাঙ্গালী জাতির স্বপ্ন নিয়ে।

জন্মে পর বঞ্চিত ছিলেন পিতার আদর-স্নেহ থেকে। জাতির কল্যাণ কর্মে নিজেকে উৎসর্গ রাখায় ভালোমতে দেখা সাক্ষাৎ হয়নি পিতার সাথে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে গেলো জেল থেকে মুক্তি পেয়ে বঙ্গবন্ধু টুংগীপাড়ার বাড়িতে আসবেন শুনে যখন আনন্দের বন্যা, এমনি এক সময় শেখ কামাল কাতর স্বরে কানের কাছে চুপিসারে বলতে থাকেন হাসু আপু, হাসু আপু তোমার আব্বুকে কি আমি আব্বু ডাকতে পারব ? বাঙ্গালী জাতির মুক্তিদূত হয়ে আন্দোলন সংগ্রামে দল গুছানোর জন্যে সারা বাংলা চষে বেড়ানো,পাকিস্থানী শোষকদের নির্মম শোষনের বিরুদ্ধে কথা বলার জন্য বার বার জেলে ছিলেন বঙ্গবন্ধু। পরিবারটিকে গুছিয়ে সুউজ্জ্বল করে হালধরে রেখেছিলেন বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা।

তাঁকে নিয়ে মিথ্যা-বানোয়াট ও অপপ্রচারের কল্পকাহিনী এত বছর শুনে আসছি, এখনও অনেক মানুষ তা মনে করেন। যা ছিলো একমাত্র চরিত্র হরণের লক্ষ্যে। এসবের মধ্যে একটি মেজর ডালিমের বউ উটিয়ে নেয়া। ডালিমের বউ নিয়ে সৃষ্টি করা রটনার দিন ঢাকা ল্যাডিস ক্লাবে খালাতো বোন তাহমিনার বিয়ের অনুস্টানে শেখ কামাল ছিলেন কর্নেল রেজার সাথে, সেই অনুস্টানে সামরিক-বেসামরিক অনেক লোক উপস্তিত ছিলেন। তৎকালীন ঢাকা জেলা আওয়ামীলীগ নেতা ও রেডক্রস এর সভাপতি গাজী গোলাম মস্তফার পরিবার ডালিমের কানাডা ফেরত শ্যালক বাপ্পি র চুল টানা নিয়ে গাজীর ছেলেদের সাথে কথা কাটাকাটি ও হাতাহাতি হয়। বিষয়টা নিয়ে গাজী সশস্ত্র লোকজন নিয়ে ক্লাবে এসে ডালিম ডালিমের বউ নিম্মিসহ পরিবারের আরো কয়েকজন কে নিয়ে যায়। যা বঙ্গবন্ধু নিস্পত্তি করে দেন।

আরেকটি ব্যাংক ডাকাতি রটনা, লন্ডনের ডেইলি টেলিগ্রামের তৎকালীন সাংবাদিক পিটার হেজেল হার্স্ট এসময় ছিলেন ঢাকায়। সেদিন তিনি মন্তব্য করেছিলেন প্রধানমন্ত্রীর ছেলের ব্যাংক ডাকাতির দরকার কি ? টাকা চাইলে ব্যাংক ম্যানেজারই তাকে টাকা এনে দেবেন। দৈনিক মর্নিং নিউজ এ প্রকাশিত হয় মুল সত্য ঘটনা। এর সম্পাদক ছিলেন এবিএম মুসা। তৎসময়ের পুলিশ সুপার মাহাবুব আলমকে (বীরবিক্রম)সবাই চিনেন। এসপি মাহবুব নামে যার নেতৃত্বে সেদিন পুলিশ দুস্কৃতিকারীদের ধরতে এসেছিলেন।
বর্তমান বিএনপি নেতা ইকবাল হাছান টুকু যে জিপে করে শেখ কামাল সর্বহারা পার্টির লোকজনের খোঁজে শেখ কামাল ও তার বন্ধুরা মিলে ধরতে গিয়েছিলেন সেটি ছিল টুকুর সে নিজেই ড্রাইভ করছিলেন। বর্তমান জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী ফিরুজ রশীদ তিনিও জিপে ছিলেন।

জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরী তার বইটিতে লিখেছেন, “এদিকে স্বাধীনতাবিরোধী ও আওয়ামী লীগ বিদ্বেষীরা এই ঘটনাকে ভিন্নরূপে প্রচার করে। ‘ব্যাংক ডাকাতি’ করতে গিয়ে কামাল পুলিশের হাতে গুলিবিদ্ধ হয়েছে বলে তারা প্রচারণা চালায় এবং দেশ-বিদেশে ভুল তথ্য ছড়াতে থাকে। যদিও এসব প্রচারণায় সত্যের লেশমাত্র ছিল না। ১৯৭৩ সালের বিজয় দিবসের আগের রাতে ঢাকায় গুজব ছড়িয়ে পড়ে, সিরাজ শিকদার তার দলবল নিয়ে এসে শহরের বিভিন্নস্থানে হামলা চালাতে পারে। এ অবস্থায় সাদা পোশাকে পুলিশ গাড়ি নিয়ে শহরজুড়ে টহল দিতে থাকে। সর্বহারা পার্টির লোকজনের খোঁজে শেখ কামালও তার বন্ধুদের নিয়ে ধানমন্ডি এলাকায় বের হন। সিরাজ শিকদারের খোঁজে টহলরত পুলিশ গাড়ীটি দেখতে পায় এবং আতংকিত হয়ে কোনো সতর্ক সংকেত না দিয়েই গুলি চালায়। শেখ কামাল ও তার বন্ধুরা গুলিবিদ্ধ হন। গুলি শেখ কামালের কাঁধে লাগে। তাকে তখনকার পিজি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।


আরও পড়ুন>>

প্যারেড শেষে মইনুল হোসেন চৌধুরী পিজিতে যান শেখ কামালকে দেখতে। হাসপাতালে বেগম মুজিব শেখ কামালের পাশে বসেছিলেন। বঙ্গবন্ধু তার ছেলের ওই রাতের অবাঞ্ছিত ঘোরাফেরায় ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন এবং শেখ কামালকে হাসপাতালে দেখতে যেতে প্রথমে অস্বীকৃতি জানান। পরে ১৬ ডিসেম্বর বিকেলে বঙ্গবন্ধু হাসপাতালে যান। (তথ্যসূত্র: মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরীর “এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য : স্বাধীনতার প্রথম দশক; পৃষ্ঠা ৬৫-৬৬)
বিভিন্ন সময় দেওয়া তাদের এবং বিভিন্ন গুনিজনের লিখনি ও বক্তব্যে বেরিয়ে আশে মিথ্যার ধ্বংশস্তুপ। আজ দীপ্তপ্রদীপ, সত্যের দীপ-শিখায় তোমার মহিমায় জ্বলে ছারখার মিথ্যার সব লীলাখেলা। তুমি আছো উজ্জ্বীবিত বাংলার হৃদয়ের মনিকুটে, তুমি থাকবে যুগ যুগান্তরে জাতির উৎসাহের প্রেরণা হয়ে। শুভ জন্মদিনে তোমাকে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।

লেখক ও রাজনীতিবিদ – এস এম সুজন সাবেক ছাত্রনেতা, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ।
সদস্য, যুক্তরাজ্য আওয়ামীলীগ।

এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

Leave a Reply

লেখক

সর্বশেষ সংবাদ

%d bloggers like this: