ঘরের বাতাস বিশুদ্ধ করে যে সব ইনডোর প্লান্ট

ঘর সাজাতে বা গাছ ভালোবেসে ঘরের বিভিন্ন জায়গায় সবুজের ছোঁয়া রাখেন। পরিবেশবিদদের মতে, জীববৈচিত্রের পাশাপাশি বিশুদ্ধ অক্সিজেনের জন্য ঘরে কিছু উদ্ভিদ রাখতে পারেন। এতে আপনার নিজের সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশ রক্ষায়ও কাজ হবে। পরিবেশের উন্নতির জন্য আমাদের একটি ছোট্ট উদ্যোগও বড় আকার ধারণ করতে পারে। প্রকৃতি আমাদের যা দিয়েছে তার মূল্য বোঝা কিন্তু সবারই উচিত। এমন কিছু গাছ আছে যেগুলো আপনি আপনার বাড়িতে লাগিয়ে চারপাশের বাতাসকে বিশুদ্ধ করতে পারেন।

বিষাক্ত কেমিকেল যে শুধু রাস্তাঘাটেই রয়েছে তা কিন্তু নয়, আমাদের বাড়িতেও রয়েছে এমন অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত রাসায়নিক পদার্থ যা সম্পর্কে হয়ত আমাদের ধারনাও নেই। এই জিনিসটি বোধ হয় আমাদের অনেকেরই অজানা যে কিছু কিছু গাছ রয়েছে যেগুলো বাসায় রাখলে তা বাসায় থাকা বিভিন্ন ক্ষতিকর পদার্থ দূর করে ঘরের বাতাস বিশুদ্ধ করতে সাহায্য করে। এতে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করতে পারবেন।

আসুন জেনে নেয়া যাক এরকম কয়েকটি গাছপালা সম্পর্কে-

অ্যালোভেরা :

রূপচর্চা থেকে শুরু করে প্রায় সব কিছুতেই এর জয়জয়কার। এই অ্যালোভেরার যে আরও একটি গুন আছে সেটা কি আমরা জানি? হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন, ঘরের বাতাস বিশুদ্ধ করতেও অ্যালোভেরার অবদান রয়েছে।
ঘরের বাতাস বিশুদ্ধ করতেও অ্যালোভেরার অবদান রয়েছে। এটি বাতাসে থাকা বেনজিন, ফরমালডিহাইড দূর করতে খুব কার্যকরী। তবে অ্যালোভেরা সম্পর্কে একটি মজার তথ্য হচ্ছে যখন বাতাসে থাকা ক্ষতিকর কেমিকেলের পরিমাণ খুব বেশি বেড়ে যায় তখন এর পাতায় ছোট ছোট বাদামি দাগ পড়ে যায় যার মাধ্যমে আপনি সহজেই আপনার ঘরে থাকা বিষাক্ত পদার্থের মাত্রা বুঝে নিতে পারবেন। অ্যালোভেরার যত্ন বিষয়ে একটি কাজ অবশ্যই করতে হবে, আর সেটি হচ্ছে একে সূর্যের আলোতে রাখতে হবে। কারণ পর্যাপ্ত সূর্যের আলোতেই অ্যালোভেরা সবচেয়ে ভালো মতো বেড়ে উঠে।

মানি প্ল্যান্ট:

এটি সাধারণত তবে খুব সুন্দর ইনডোর প্ল্যান্ট। তেমন কোনো যত্ন ছাড়াই এটি বেঁচে থাকে। আর সামান্য যত্ন পেলেই এই গাছ রূপের ছটা ছড়িয়ে তরতরিয়ে বেড়ে ওঠে। অনেকেই বিশ্বাস করেন যে, ঘরে মানি প্ল্যান্ট রাখলে গৃহস্থের আর্থিক উন্নতি অবধারিত। তবে এর কোনো প্রমাণ না পেলেও আপনার ঘরের সৌন্দর্য বাড়াতে এর জুড়ি নেই। এছাড়াও ঘরের বাতাস শুদ্ধ রাখতে এই গাছ বিশেষ সহায়ক। এই গাছটি রাতে অক্সিজেন দেয় এবং বায়ুকে পরিশুদ্ধ করে।

স্নেক প্ল্যান্ট:

স্নেক প্ল্যান্ট লিলি গোত্রের একটি বিশেষ ঘরোয়া উদ্ভিদ। একে মাদার-ইন-ল’স টাং নামেও অভিহিত করা হয়। এই গাছটি বাড়ির এমন জায়গায় রাখতে হবে যেখানে হালকা আর্দ্রতা আছে। এই গাছ বৃদ্ধি করতে আর্দ্রতা প্রয়োজন। এই উদ্ভিদটি অনেক ক্ষতিকর পদার্থ শোষণ এবং বায়ু পরিশোধন করে।
নাসার একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, এই গাছ আপনার চারপাশের বাতাস থেকে ফর্মালডিহাইড, নাইট্রোজেন অক্সাইড, জাইলিন, বেনজিনের মতো টক্সিন অপসারণ করে বাতাসকে শুদ্ধ করে তোলে। অনেক সময় স্নেক প্ল্যান্ট বাতাসে আর্দ্রতা নিঃসরণ করে এলার্জিবাহী কণাকে হ্রাস করে। এই গাছ সিক বিল্ডিং সিন্ড্রোমের জন্য দায়ী বিষাক্ত উপাদানগুলো ফিল্টার করে বায়ু বিশোধক হিসেবে কাজ করে।

ফার্ন :

ফার্ন ঘরের বাতাস পরিষ্কার করতে খুব কার্যকরী হিসেবে বিবেচিত। তবে এটি ফরমালডিহাইড দূর করতে বেশি কার্যকর বলে গণ্য করা হয়। এটি কাঠের তৈরি আসবাবপত্র, কেবিনেট, ফার্নিচার ইত্যাদিতে থাকা ফরমালডিহাইড দূর করতে খুব উপকারী। এছাড়াও বাতাসের জাইলিন, টলুইন ইত্যাদি দূর করে এই ফার্ন। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গিয়েছে যে, এটি মাটিতে থাকা বিভিন্ন বিষাক্ত পদার্থ যেমন মারকারি, আর্সেনিক দূর করতেও উপকারী। ফার্ন গাছ খুব তাড়াতাড়ি বড় হয় এবং এতে কোন ফুল হয় না। তবে এটি সবচেয়ে ভালো ভাবে বৃদ্ধি পায় যখন এটি বারান্দায় বা দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখা যায়। এভাবে রাখলে খুবই দ্রুত এর শাখা প্রশাখা বেড়ে উঠে।

ছোট জাতের বাঁশ গাছ বা ব্যাম্বো পাম :

এই ধরনের বাঁশ গাছ গুলো সর্বোচ্চ ৩-৬ ফুট লম্বা হয়ে থাকে। এই গাছ ঘরের এক কোনায় বা অফিসে রাখার মাধ্যমে যেমন সৌন্দর্য বাড়িয়ে তোলা যায়, তেমনি পরিবেশ রক্ষায়ও এর কাজ তুলনাহীন। বেনজিন, ট্রাই ক্লোরোইথিলিন এবং আরও অনেক ধরনের বিষাক্ত কেমিকেল বাতাস থেকে দূর করে এই গাছ। এবার আসা যাক এই গাছের যত্ন সম্পর্কে। এই গাছটি সরাসরি সূর্যের আলোতে রাখা যাবে না। এমন জায়গায় রাখুন যেখানে আলো আছে তবে তা যেন সরাসরি গাছের উপর না পড়ে। গাছের টবের মাটি যেন সব সময় ভেজা থাকে সেজন্য নিয়মিত পানি দিতে হবে। আর ভালো মতো বৃদ্ধির জন্য মাসে একবার এতে লিকুইড ফার্টিলাইজার দিতে হবে।

রাবার গাছ :

রাবার গাছ ঘর থেকে বিষাক্ত ফরমালডিহাইড দূর করতে সবচেয়ে বেশি কার্যকরী। এছাড়াও অন্যান্য কেমিকেল যেমন কার্বন মনোঅক্সাইড, ট্রাই ক্লোরো ইথিলিন ইত্যাদিও করতেও এই গাছ খুব উপকারী। রাবার গাছ উজ্জ্বল আলোতে খুব ভালো বাড়ে। রাবার গাছ ৮ ফুট লম্বাহয়ে থাকে। এই গাছ যখন বাড়ন্ত পর্যায়ে থাকে তখন নিয়ম মতো পানি এবং মাসে একবার নাইট্রোজেন ফার্টিলাইজার দিতে হবে। গাছের সাইজ ঠিক রাখার জন্য কয়েক
মাস পর পর এর ডালপালা ছেঁটে দিতে পারেন এবং গাছের পাতা যাতে ঝকঝকে থাকে সেজন্য কয়েকদিন পর পর একটি ভেজা কাপড় দিয়ে পাতা গুলো মুছে ফেলতে পারেন।

স্পাইডার প্ল্যান্ট:

এই গাছটি আপনি চিনে থাকবেন। স্বল্প আলো-বাতাসেই বেড়ে উঠতে পারে বলে গাছটি অনেকের কাছেই প্রিয়। তবে গাছটি কেবল সুন্দরই নয়, এর অনেক গুণ রয়েছে। পরিশুদ্ধকারক গাছ হিসেবে নাসার তালিকায়ও এর নাম আছে। ঘরের বাতাসে বেনজিন, ফরম্যালডিহাইড, কার্বন মনোক্সাইড, জাইলিন প্রভৃতি দূষিত পদার্থ পরিশোধন করতে এই স্পাইডার প্ল্যান্টের জুড়ি নাই। নিশ্চিন্তে আপনার ঘরে লাগাতে পারেন এই স্পাইডার প্ল্যাট।

ফিকাস:

অন্যান্য গাছের বেঁচে থাকতে যতটা আলে-বাতাসের প্রয়োজন হয়, ফিকাসের ততটা না হলেও দিব্যি চলে যায়। এই গাছটি ঘরে রাখার জন্য উপযুক্ত। কারণ ফিকাসের বাঁচতে খুব কম আলো ও তাপমাত্রার প্রয়োজন হয়। ফলে ঘরের মধ্যে সহজেই বাঁচে এই গাছ। বাতাসের টক্সিন শুষে নিতে পারে ফিকাস। ফলে এটি ঘরের মধ্যে বিশুদ্ধ বাতাস সরবরাহ করে।

পিস লিলি:

নামের মধ্যেই কেমন শান্তি শান্তি ভাব। আসলেই তাই। এটি ঘরে থাকলে আর প্রশান্তির অভাব হবে না। ঘরের যেকোনো জায়গায় বসানো যায় এই গাছটি। বাঁচার জন্য পানি, বাতাসেরও বেশি প্রয়োজন পড়ে না। ফলে সহজেই বেঁচে থাকে পিস লিলি। ঘরের মধ্যে থাকা বাতাস থেকে ক্ষতিকর উপাদান নষ্ট করে এই গাছ।

তুলসি:

ঘরে তুলসি গাছ লাগানো শুধুমাত্র আমাদের সংস্কৃতিরই অংশ নয়, পাশাপাশি এর ঔষধি গুণাগুণও প্রচুর। এটি বাড়ির আঙ্গিনায় লাগানো হয়। এটি সামান্য সূর্যের আলোতেই বেড়ে উঠতে পারে। এটি মশা, পোকামাকড় দূর করে এবং বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ বাড়িয়ে তোলে। দারুণভাবে বায়ু-পরিশোধনকারী এই গাছটি। এছাড়া, এটি বাতাস থেকে অনেক ক্ষতিকারক রাসায়নিক এবং ব্যাকটেরিয়া পরিষ্কার করে।

চন্দ্রমল্লিকা :

চন্দ্রমল্লিকা গাছ দেখতে যেমন সুন্দর তেমনি আপনার বাসার পরিবেশও করে তুলবে সুন্দর ও নিরাপদ। এটি বাতাসে থাকা ফরমালডিহাইড, জাইলিন, বেনজিন এবং এমোনিয়া সহ বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ দূর করতে খুব উপকারী। তবে এই গাছের পরিচর্যা নেয়ার ক্ষেত্রে খানিকটা সতর্ক থাকতে হবে। কারণ সঠিক ভাবে যত্ন না করলে এই গাছ বেশি দিন বাঁচেনা।

এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

Leave a Reply

লেখক

সর্বশেষ সংবাদ

%d bloggers like this: