ঘুরে যেতে পারেন সৌন্দর্যের লীলাভূমি প্রাচ্যের ভেনিস বরিশাল

ইনজামুল সাফিন।।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আঁধার ধান-নদী-খালের বরিশাল। ইতিহাস ও ঐতিহ্যে বরিশাল এক স্বনামধন্য জনপদ। নান্দনিক নগর ও অপরুপ গ্রাম বাংলার রূপবৈচিত্র দেখতে ছুটে আসতে পারেন প্রাচ্যের ভেনিস বরিশালে।

বরিশালের পর্যটন কেন্দ্রগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি নিয়ে লিখছি। অবসর কাটাতে আসতে পারেন একা কিংবা বন্ধুবান্ধব, পরিবার-পরিজন নিয়ে। একইসাথে বিলাসবহুল লঞ্চে ভ্রমণের আয়েশ মিটাতে পারেন।

১. দূর্গা সাগর দীঘি: প্রাচীন চন্দ্রদ্বীপ রাজা এই সুবিশাল দীঘি খনন করেন। দীঘির চারপাশে নয়নাভিরাম বৃক্ষরাজি, কয়েকটি ঘাটলা, পিকনিক ও পার্টির জন্য শেড, অনেকগুলো ছাতা, খাঁচায় ও মুক্তভাবে বিভিন্ন পশুপাখির বিচরণ রয়েছে। দূর্গাসাগরের মাঝে একটি সুন্দর দ্বীপ রয়েছে। দ্বীপে বিভিন্ন প্রাণীর বিচরণ। দীঘির জলে বিভিন্ন প্রজাতির ছোট বড় মাছ, সরীসৃপ রয়েছে। শীতকালে বিপুল সংখ্যক অতিথি পাখির আগমন ঘটে। বিভিন্ন সময়ে জেলা প্রশাসন কতৃক সৌখিন মংস্য শিকারীদের জন্য টিকিট কেটে মাছ ধরার সুযোগ দেয়া হয়।প্রতিবছর দুরদুরান্ত থেকে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষজন এখানে পুণ্যস্নান করতে আসেন। আপনি দীঘির স্বচ্ছ জলে গোসল করতে পারেন। নৌকায় দীঘির জলে ভেসে ভেসে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ রয়েছে।

২. বায়তুল আমান জামে মসজিদ ও ঈদগাহ কমপ্লেক্স: গুঠিয়া মসজিদ নামে সমধিক পরিচিত। বরিশাল জেলার উজিরপুর উপজেলার গুঠিয়া ইউনিয়নে মসজিদটির অবস্থান। ২০০৩ সালে বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও সমাজসেবক এস. সরফুদ্দিন আহমেদ সান্টুর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় মসজিদটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।পৃথিবীর সুন্দর মসজিদগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম । কারো কারো মতে এটা এশিয়া মহাদেশের সবচেয়ে সুন্দর মসজিদ। বিভিন্ন দেশের স্থাপত্যশৈলীর সমাবেশ ঘটিয়ে এ আধুনিক মসজিদটি নির্মাণ করা হয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে থেকে সংগ্রহকৃত অনন্যসুন্দর মার্বেল পাথর ও আলোকসজ্জার জন্য দৃষ্টিনন্দন বাতির সমাহারে মসজিদটি আকর্ষনীয় হয়ে উঠেছে. দিনেরবেলায় মার্বেল পাথরের ওপর সূর্যের আলো এক অসাধারণ সৌন্দর্যের আবহ তৈরি করে। রাতে রংবেরঙের আলোয় মসজিদটি সৌন্দর্যপিপাসুদের মন কেড়ে নেয়। মসজিদটিতে নারী ও পুরুষদের নামাজের আলাদা ব্যবস্থা রয়েছে। মসজিদ কমপ্লেক্সের মধ্যে আছে সুপরিসর পার্কিং, ঘাট বাঁধানে পুকুর, ফুলের বাগান ইত্যাদি। পুকুরে সারাবছর কৃত্রিমভাবে বিশুদ্ধ, স্বচ্ছ পানির প্রবাহ নিশ্চিত করা হয়। মসজিদ কমপ্লেক্সে জাতি, ধর্ম নির্বিশেষে সকলের প্রবেশাধিকার রয়েেছ।

৩. শের-ই-বাংলা স্মৃতি জাদুঘর: উপমহাদেশের প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ, অবিভক্ত বাংলার প্রথম মুখ্যমন্ত্রী, লাহোর প্রস্তাবের (পাকিস্তান প্রস্থাব হিসেবে পরিচিত) প্রণেতা শের-ই-বাংলা এ. কে. ফজলুল হক এর স্মৃতি বিজড়িত চাখার গ্রামে “শের-ই-বাংলা স্মৃতি জাদুঘর” অবস্থিত। এখানে বিভিন্ন সময়কার ঐতিহাসিক ছবি, শের ই বাংলার ব্যবহৃত তৈজসপত্র, মূর্তি ও একটু কুমিরের মমি রয়েছে। এছাড়া জাদুঘরের মধ্যেই একটি লাইব্রেরি কক্ষ রয়েছে। জাদুঘরের সামনে রয়েছে ফুলের বাগান। পাশেই ফজলুল হক সরকারি কলেজ।

কিভাবে আসবেন?
* রাজধানী ঢাকা থেকে রাত ৯.০০ টায় বরিশালের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশের সর্বাধুনিক ও বিলাশবহুল লঞ্চগুলো ছেড়ে আসে। রাতে একটা ঘুম দিয়ে সকাল সকাল উঠে কীর্তনখোলার স্বচ্ছ জলপ্রবাহের দৃশ্য দেখে দিনটা শুরু করতে পারেন। ঢাকা থেকে লঞ্চের ডেকে জনপ্রতি ২০০-২৫০ টাকা (কখনও কখনও আরো কম খরচ), সিঙ্গেল সোফা ৫০০-৬০০ টাকা, সিঙ্গেল কেবিন ৮০০-১৫০০ টাকা, ডাবল কেবিন ১৮০০-২৪০০ টাকা, ফ্যামিলি কেবিন ২৫০০-৩৫০০ টাকা এবং ভিভিআইপি কেবিনে সর্বোচ্চ ৮০০০/= টাকা পর্যন্ত ভাড়া আছে। এছাড়াও গ্রিনলাইন ওয়াটার বাসে ইকোনমি ক্লাস ৭০০/= এবং বিজনেস ক্লাস ১০০০/= টাকা জনপ্রতি ভাড়া দিয়ে জীবনানন্দের শহরে পৌছানো যায়। ওয়াটার বাস ঢাকা থেকে সকাল ৯.০০টায় এবং ২.০০ টায় বরিশালের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে মাত্র ৫/৬ ঘন্টায় বরিশালের ঘাটে ভিড়ায়। এছাড়া বিআইডব্লিউটিএ’র রকেট ও জাহাজে করে ঢাকা, নারায়নগঞ্জ, চাঁদপুর, লক্ষীপুর(মজু চৌধুরীর হাট)সহ বিভিন্ন জেলা থেকে বরিশালে যাতায়াত করা যায়।


আরও পড়ুন>>


* লোকাল বাসে মাওয়া রুটে লঞ্চ পারাপার করে বাস বদল করে জনপ্রতি ৩০০/= টাকা এবং মাওয়া কিংবা আরিচা রুটে ডাইরেক্ট বাসে জনপ্রতি ৪৫০ -৭০০ টাকায় বরিশাল পোঁছানো যায়। ঢাকা থেকে গ্রিনলাইন, ঈগল, হানিফ, সাকুরাসহ বিভিন্ন পরিবহন সংস্থার বাসে দিন ও রাতের বিভিন্ন সময়ে যাত্রা করা যায়। এছাড়া বাংলাদেশের যেকোন অঞ্চল থেকে বাসে বরিশালে যাতায়াত করা যায়।

* আকাশপথে ঢাকা বিমানবন্দর থেকে জনপ্রতি ২৫০০-৪৫০০০ টাকায় মাত্র ৩৫ মিনিটে বরিশাল বিমানবন্দর পৌঁছাতে পারবেন। বরিশাল রুটে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস, ইউএস বাংলা এয়ারলাইনস এবং নভোএয়ারের বিমান চলাচল করে।

বিস্তারিত:-
আপনি আকাশ – নৌ – স্থলপথের যেকোন একটি মাধ্যমে বরিশাল শহরে পৌঁছাতে পারেন। স্থলপথে বাসে আসলে নথুল্লাবাদ কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালেই পৌঁছাতে পারবেন। যদি লঞ্চে আসেন তবে লঞ্চঘাট থেকে ১০-২০ টাকা জনপ্রতি খরচ করে অটো / সিএনজি / মাহিন্দ্রায় নথুল্লাবাদ বাস টার্মিনাল আসতে হবে। আপনি আকাশপথে বরিশাল এয়ারপোর্ট পৌঁছালে সেখান থেকে বিমান কতৃপক্ষের বাসেই গরিয়ারপাড় কিংবা নথুল্লাবাদ কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল যেতে পারবেন। বরিশাল নথুল্লাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে রওনা হয়ে বাস অথবা মাহিন্দ্রায় জনপ্রতি ২০-৩০ টাকা খরচ করে দূর্গাসাগর যেতে পারবেন। এছাড়া ২০০-৩০০ টাকার মধ্যে ৭/৮ সিটের মাহিন্দ্রা রিজার্ভ করেও যেতে পারেন। দূর্গাসাগর প্রবেশ ফি জনপ্রতি ২০/= টাকা। পুরো চতুর্ভুজাকৃতির জলাধার ঘুরে দেখা, আড্ডা দেয়া, গান গাওয়া, স্বচ্ছ জলে স্নান করা, এখানে বসে স্নাক্স খাওয়া যেতে পারে। তবে খাবার বাহির থেকে নিয়ে যেতে হবে। ভিতরে বাদাম, আচার, ঝালমুড়ি ইত্যাদি পাওয়া যায়। এরপর অটো অথবা মাহিন্দ্রা অথবা বাসে করে গুঠিয়া বায়তুল আমান জামে মসজিদ যাবেন। জনপ্রতি ভাড়া ১৫-২০ টাকা। আপনি চাইলে মসজিদের পূর্বে গুঠিয়া বন্দরে নেমে বিখ্যাত গুঠিয়ার সন্দেশ খেতে পারেন। এরপর অটো অথবা বাস অথবা টেম্পুতে জনপ্রতি ৫/= খরচ করে বায়তুল আমান জামে মসজিদ যাওয়া যাবে।


আরও পড়ুন>>


মসজিদ কমপ্লেক্সে কোন প্রবেশ ফি নেই। মসজিদে সালাত আদায় করা, ঘুরে দেখা, ছবি তোলা যাবে। মসজিদের সামনে স্থানীয় খাবার হোটেলে ভাত, মাছ, গোসত, সবজি, ডাল ইত্যাদি বাংলা খাবার দিয়ে লাঞ্চ করতে পারবেন। কেউ চাইলে বরিশাল নথুল্লাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে সকালে আসার পথে স্পেশাল বিরিয়ানি বা যেকোন পছন্দের খাবার সঙ্গে করে এনে থাকলে মসজিদ প্রাঙ্গনে গাছতলায় বসে কিংবা মসজিদের আশেপাশে বসে খেয়ে নিতে পারেন । এরপর কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে চাখার শের ই বাংলা জাদুঘর ভ্রমণের উদ্দেশ্যে রওনা হবেন। বাস বা মাহিন্দ্রা বা অটোতে করে ২০/২৫ টাকায় গুয়াচিত্রা বাজার যেতে হবে। সেখান থেকে অটো বা মাহিন্দ্রায় জনপ্রতি ১০ টাকায় শের ই বাংলা জাদুঘর যাওয়া যাবে। জাদুঘরে ২০/=টাকা প্রবেশ ফি নেয়া হয়।

জাদুঘর ঘুরে দেখা, লাইব্রেরিতে বই পড়া, মন্তব্য করা যাবে। আপনি চাইলে জাদুঘরের পূর্ব পাশে ফজলুল হক সরকারি কলেজের সুন্দর প্রাঙ্গণে বিকেলটা কাটাতে পারেন। চাখারের স্থানীয় দোকানে চায়ের কাপে কয়েক চুমুক দিয়ে গুয়াচিত্রার উদ্দেশ্যে ফিরে আসবেন। গুয়াচিত্রা থেকে লোকাল বাসে বরিশাল শহরে ফিরতে পারবেন। হাতে সময় থাকলে বরিশাল শহরে কীর্তনখোলা নদীর পাড়ে ত্রিশ গোডাউন বধ্যভূমি ঘুরে আসতে পারেন। বরিশাল শহরে এছাড়াও বঙ্গবন্ধু উদ্যান, মুক্তিযোদ্ধা পার্ক, স্বাধীনতা পার্ক রয়েছে। বরিশাল থেকে রাত ৯ টায় ঢাকার লঞ্চ ধরতে পারবেন। এছাড়া বাসযোগে দেশের যেকোনো অঞ্চলে ফিরতে পারেন। আপনি চাইলে রাতটা শহরের একটি হোটেলে কাটিয়ে পরদিন আকাশপথে ঢাকা ফিরতে পারেন।

এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

Leave a Reply

প্রতিবেদক

সর্বশেষ সংবাদ