চলুন মরার আগেই সোজা হই– মাঈদুল ইসলাম মুকুল

চলুন একটা গল্প শোনা যাক। একদিন এক বিষাক্ত সাপ গাছের ডাল পেঁচিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলো। ঠিক উপরের ডালে বসেছিল ছোট্ট একটি বাবুই পাখি। বাবুই সাপকে ডেকে বলল- দাদা, সোজা হয়ে শুয়ে থাকুন। নিচ থেকে আপনাকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। কেউ গাছের তলা থেকে দেখে ফেললে বিপদ হবে আপনার।

দাম্ভিক সাপের আঁতে ঘা লাগলো। পিচ্চি বাবুই কিনা তাকে উপদেশ দিচ্ছে। সে খেঁকিয়ে উঠলো-তোর সাহস তো কম নয়। তুই আমাকে জ্ঞান দিস? বাবুই ভয় পেয়ে কাচুমাচু করে বললো- আমার ভুল হয়ে গেছে দাদা, আপনার সোজা হবার কোন দরকার নাই। আপনি যেমন খুশি শুয়ে থাকুন।

কিছুক্ষণ পর এক ক্লান্ত পথচারী বিশ্রাম নেওয়ার জন্য গাছের তলায় এসে বসলো। হাই তুলতে তুলতে উপরের দিকে তাকাতেই গাছের ডালে পেঁচানো বিষাক্ত সাপ দেখে সে আঁতকে উঠলো। সাপটি তখন আরামে ঘুমোচ্ছিলো। সে লোক জড়ো করে সাপটিকে ফলায় বিদ্ধ করে মাটিতে নামিয়ে আনলো। কিছুক্ষণ বেধড়ক পেটানোর পরে সাপটি মারা গেলে উৎসুক জনতা সাপটির মাথায় এবং লেজের দিকে দুটি পেরেক গুঁজে দিয়ে টান টান সোজা করে কাঠি দিয়ে এর দৈর্ঘ্য মাপতে লাগলো – এক হাত….দুই হাত….তিন হাত…….

মগ ডালে বসা বাবুই পাখি এই দৃশ্য দেখে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো- সেই তো সোজা হইলি,তয় মরার পরে।

বাঙালিরাও ঠিক তাই। সোজা ঠিকই হবে,তবে মরার আগে নয়।

বিশ্বব্যাপী মৃত্যুর হাহাকার চলছে। বাংলাদেশেও করোনা তার নিষ্ঠুর থাবা বসাতে শুরু করেছে। আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে প্রতিদিন। ইতালি,স্পেন,ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, জার্মানীর মতো যুক্তরাষ্ট্রও শুরুর দিকে করোনাকে ততটা পাত্তা দেয়নি। আসলে করোনার ভয়াবহতা সম্পর্কে তাদের কোন জ্ঞানই ছিলো না। তারা এটাকে সাধারণ ফ্লু মনে করেছিলো। লক্ষ লক্ষ মৃত্যুর বিনিময়ে এখন তারা তাদের ভুলের মাশুল দিয়ে যাচ্ছে। বাকি বিশ্বের কাছে তাদের বার্তা হচ্ছে- করোনাকে অবহেলা করো না। পুর্ব এশিয়াসহ পৃথিবীর বেশ কিছু দেশ সে বার্তা কাজে লাগিয়ে পরিস্থিতি বেশ ভালো মতোই সামাল দিচ্ছে। আল্লাহর রহমতে সচেতন হবার জন্য একটু বেশি সময় আমরা পেয়েছিলাম। কিন্তু করোনার ভয়াবহ বার্তা অধিকাংশ মানুষের কানে সেভাবে পৌছে নি। আজকের আশংকাজনক পরিস্থিতিই তার প্রমান। লক ডাউন, হোম কোয়ারান্টাইন, সামাজিক দুরত্ব, ঘরে থাকা, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এসব কথা অনেকের কাছে আর দশটা হিতোপদেশের মতোই মূল্যহীন। বাঙালি চিরদিনই অপরকে হিতোপদেশ দিতে পারদর্শী কিন্তু নিজেরা তা মানতে চায় না।

পরিসংখ্যান বলছে সংক্রমনের মেয়াদ বিবেচনায় যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থা বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থার চেয়ে অনেক ভালো ছিলো। জাতিসংঘসহ বেশ কিছু আন্তর্জাতিক সংস্থা চলমান এপ্রিল মাসকে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে ক্রিটিক্যাল সময় হিসেবে উল্লেখ করেছে। এ সময় বাংলাদেশ কে তারা সর্ব্বোচ্চ সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। অন্যথায়, জনসংখ্যার ঘনত্ব, প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা, আর্থ সামাজিক অবস্থা ইত্যাদি বিবেচনায় বাংলাদেশে ২০ লক্ষ লোকের প্রানহানীর আশংকা করেছেন তারা। প্রশাসন,স্বাস্থ্য বিভাগ, পুলিশ, আর্মি, মিডিয়া ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে যাচ্ছে- নির্দেশনা মেনে চলুন নইলে সামনে ভয়ংকর দিন। কিন্তু আমাদের কানের নেট ওয়ার্ক গ্রামীণ ফোনের নেট ওয়ার্কের চাইতেও দুর্বল।

দেশকে মৃত্যুপুরী বানাতে না চাইলে অন্তত এপ্রিল মাসটা ঘরে থাকা আবশ্যক। তবে একান্ত প্রয়োজনে বাইরে যেতে নিষেধাজ্ঞা নেই। সরকার কর্মহীনদের জরুরী ত্রাণ সহায়তা দেওয়ার প্রানান্ত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। উদ্দেশ্য একটাই- মানুষকে ঘরে রেখে করোনা সংক্রমনের চেইনটা ভেঙ্গে দেয়া। কিন্তু এসব গভীর ভাবনা ভাববার টাইম নাই আমাদের। এমন বিপদের দিনেও যারা জীবন জীবীকার একান্ত প্রয়োজনে ঝুঁকি নিয়ে বাইরে বেরুচ্ছেন তাদের কাছ থেকে সামাজিক দুরত্বসহ অন্যান্য জরুরি স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলা অনেক বেশি প্রত্যাশিত। কিন্তু করোনার ভরা মৌসুমেও বাজারগুলো আগের মতই রমরমা। সামাজিক দূরত্বের বালাই নেই এখানে। এছাড়াও বিনোদনমূলক চোর পুলিশ খেলা, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতাদের জানাযায় লক্ষ লোকের সমাবেশ, বাইরে বেড়িয়ে লক ডাউন দেখার কৌতূহল, ত্রাণ বিতরণে সেলফি উৎসব, ত্রাণের চাল আত্মসাৎ, খাটের নিচে তেলের খনি, মালবাহী পরিবহনে মানুষের ঢল, তথ্য গোপন করে চিকিৎসককে ঝুঁকিতে ফেলা, হাসপাতাল থেকে করোনা রোগীর পলায়ন- এসব কোন মতেই থামানো যাচ্ছে না। ফলে আশংকাজনকভাবে বেড়েই চলেছে সামাজিক সংক্রমন। খোদ স্বাস্থ্য মন্ত্রী বলছেন, কাজ হচ্ছে না, আমরা অসহায়।

বিশ্বাস করুন, কোন বিষয় না মানতে চাইলে অনেক অজুহাত দেখানো যায় কিন্তু মানার জন্য একটি কারণই যথেষ্ট। আপদকালীন জরুরী নির্দেশনাগুলো একটু সচেতনভাবে মেনে চললে সংক্রমণের চেইনটা ভেঙ্গে দেওয়া সম্ভব। এটা কঠিন কোন কাজ নয়। আর তো মাত্র ১৫ টা দিন। কিন্তু এসব কথা শোনার সময় আমাদের কানে নেটওয়ার্ক থাকেনা।

ইতোমধ্যে বাংলাদেশের ৬৪ জেলার ৫৫ টিতেই ছড়িয়ে পরেছে করোনা। ৪৩ তম দিনে সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে ৩০৩৮২ জন যা ইউরোপ আমেরিকার চেয়ে ঢের বেশি। চিকিৎসাকালীন আক্রান্তদের শতকরা ৮৯ মারা যাচ্ছে। পৌনে দুইশো চিকিৎসক সহ প্রায় ৪০০ জন স্বাস্থ্য কর্মী ইতোমধ্যেই আক্রান্ত। প্রশাসনের সামনের সারির অনেকেই আক্রান্ত হচ্ছেন।

নিশ্চিতভাবে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতে এর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি আমরা। তবুও বাংলাদেশের উর্বর ভুমিতে অবাধে চলছে করোনার চাষ। ক্রমাগত ধেয়ে আসছে মহামারীর লেলিহান শিখা।

তবে বাঁচার সময় এখনও আছে। প্রয়োজন শুধুই সচেতনতার। এটাই একমাত্র রক্ষা কবজ। কিন্তু আগুন স্পর্শ না করে আগুনের উত্তাপ মানতে নারাজ বীর বাঙালী।

এমন মহা দুর্যোগ কালেও কি আমরা বদলাবো না? নাকি সর্পের মতো সোজা হবো, কেবল মরার পরেই?

হে সৃষ্টিকর্তা, আমাদের রক্ষা করুন।

তারিখঃ ২২/০৪/২০

লেখকঃ মাঈদুল ইসলাম মুকুল

কলামিস্ট, সাংবাদিক ও স্ক্রিপ্ট রাইটার

এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

Leave a Reply

লেখক

সর্বশেষ সংবাদ

%d bloggers like this: