জীবনের ইতি পথের খোঁজে

রমজান মাস। সবে মাত্র ইফতার শেষে নামায পড়ে গাঁ টাকে একটু বাতাসে বাড়িয়েছি। হটাৎ নানীর গলার আওয়াজ শুনতে পেলাম। অন্ধকার রাত। জোৎসনা নিজ দায়িত্ব শেষে অন্ধকারকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে নিজ গৃহে। গিয়ে দেখি একজন বৃদ্ধা। কুঁজো দেহটা শরীরটাকে হামাগুড়ি দিতে বাধ্য করেছে। বুড়ির বাকলটা গ্রীষ্মের খরায় চৌচিড় খেতের ন্যায় রুপ ধারন করেছে। বুড়িটাকে আগে থেকেই চিনতাম। আমাদের গ্রামের পূর্বপাশের ছোট একটা গ্রাম, নামাজপরের বাসিন্দা। তার স্বামী গ্রামের আধুনিক সামন্ত ছিল। সামন্তদের মতো সুযোগ সুবিধা ভোগ না করলেও, তাদের মতো ভূমি ভোগ করতো। স্বামী বিয়োগে সকল ভূমি, বুড়ির নামের সাথে যোগ হয়। কিন্তু তার মুর্খতার কারনে পৃথিবী তার সর্বস্ব কেড়ে নিয়ে এ বিকল দেহটাকে দান করেছে। বুড়িও তার চলার সকল যানবাহগুলোকে তার মেয়েকে দিয়ে, সকল বোঝা নিজ কাঁধে নিয়ে শরীরটাকে কুজোঁ বানিয়েছে। মেয়েটার বাড়িও আমাদের আরেক পাশ্ববর্তী গ্রামে। মেয়েকে সকল সম্পত্তি লিখে দেওয়ার জন্য, ছেলেরা নিঃস্বার্থ সেবার প্রয়োজনবোধ করেনি। তাই ছেলেরা তাকে খাবার দেয় না। মেয়েটিও তার সকল সম্পত্তি নিয়ে আর এ বোঝাটাকে রাখার মতো খালি জায়গা পায় নি। তাই বুড়িটি রোজকার রুটিন মাফিক সারাদিন মেয়ের বাড়িতে কাটিয়ে, রাতের খাবারটা তাড়াতাড়ি শেষ করে সন্ধ্যার আগেই রাতের আশ্রয়ের খোঁজে, পথের আবিষ্কারে বের হতো। কিন্তু ভ্রান্তির ধুলায় মোহিত হয়ে সেই একই পথে আবিষ্কৃত হতো। এভাবেই আমাদের গ্রামের মধ্য দিয়ে পদধুলি ছিটতো প্রতিদিন। কিন্তু আমাদের গ্রামের কেউই বুড়িটাকে পছন্দ করতো না। কারন মাঝে মধ্যেই এ জমি ও জমি হতে লাউ, কুমড়া চুরি করতো। অনেক দিন ধরাও পড়ে। কখনো কখনো অনেকে বেধে রাখে। কিন্তু কোন লাভ হয় না। বুড়িটার স্বভাব পাল্টায় না। বুড়িটার আর কি দোষ ? বুড়িটাও যে নিরুপায়। জীবনের সর্বস্ব দিয়েও মেয়েকে খুশি না করতে পেরে, এ সামান্য জিনিসে মেয়ের মনটাকে রক্ষা করতে চাইতো। তাই আর কেউ কিছু বলে না।
যাক ঘটনায় ফেরা যাক।


আরও পড়ুন>>


নানীকে বললাম- এই অন্ধকারে এরকম রাস্তায় এমন শরীরটা নিয়ে কিভাবে যাবেন ? বর্ষাকালে ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে রাস্তাটা কাদাময় ও পিচ্ছিল হয়ে গেছে। আমাকে দেখে নানী বলল লাইট নিয়ে একটু এগিয়ে দিতে। বাড়ি থেকে লাইট নিয়ে এসে যাত্রা শুরু করলাম। বুড়িটাকে সামনে দিয়ে লাইট হাতে পিছু নিলাম। সরু আইলের রাস্তা। তারও মাঝে মাঝে অনেক জায়গায় আইলটা কাঁটা। যদিও ভাল সড়ক আছে। কিন্তু সেটা বেশ দীর্ঘ। আর রাস্তাটা খুব সংক্ষিপ্ত। তাই এটি বুড়ির প্রিয় রাস্তা। প্রিয় বলতে, প্রতিদিনের বন্ধু বলে কথা। কিন্তু রাস্তাটা বুড়ির চাহিদা অনুযায়ী যথেষ্ট সরু। অন্ধকারে বৃষ্টিভেজা অবস্থায় এ পথে চলা প্রায় এভারেস্টে চূড়ায় ওঠার প্রাথমিক স্তরের মতোই। ধনীরা, তাদের সাথে গরিবদের যোগাযোগ যেন কখনোই না হয়, তাই রাস্তাটাকে চলাচলের অনুপোযোগী করে রেখেছে। কেননা বেশির ভাগ ফসল তো আইলের কাঁটা জমিটুকুতেই হয়। বুড়িটা এভারেস্টের চূড়ায় উঠার জন্য একেবারেই অনুপোযোগী ছিল। কিন্তু তার জীবন যে এ পথে স্থির রাখলে চলবে না। মাথার মধ্যে অনেক দুচিন্তা ঝিঝি পোকার ন্যায় বিশঙ্খল শব্দের সৃষ্টি শুরু করেছে। এমনিতে এ পথে রাতের বেলা ভূতের গল্প বাতাসে ভেসে বেড়াতো। কিন্তু আজকে কেন জানি সে ভয়ের বাতাসটা, মনটাকে দোলাতে পারলো না। বুড়ির হাতটা ধরার দরকার ছিল। কিন্তু বুড়ির গায়ের দূর্গন্ধটা হাতটাকে বারবার তার থেকে সরিয়ে দিচ্ছিল। মনে হয় অনেক দিন শরীরটা জলের পিপাসাতে কাতর। তাই পিপাসার আর্তনাদটা গন্ধের চিৎকারে প্রকাশ করছে। আর কাপড়টাও মনে হয় সেই গুহা যুগ থেকে ধোয়া পড়ে নি। কিন্তু বুড়িরই বা কি দোষ ? সে যখন এসব করতে পারতো, তখন হয়তো এরকম ছিল না। এমন সময় বুড়িটা হটাৎ আইলের কাটা ফাকা জায়গায় পা দিয়ে পড়ে গেল। তখন আমার অজান্তেই বুড়ির গায়ের গন্ধ নিলাম। অনেক কষ্টে বুড়ির হাতটা ধরে দাড় করালাম। এবার হাতটা ধরে আস্তে আস্তে এগোতে লাগলাম। কিন্তু পথ যেন শেষ হয় না। কেননা বুড়িটা প্রতিটি ধাপে বিশ্রাম নিচ্ছিল। এমনিতেই বিরক্ত লাগছিল। মনে মনে ভাবতে লাগলাম, তারাবির নামাযটা এর জন্যে আজকে আর ধরতে পারবো না। কিন্তু বুড়ির জন্যে দয়ার অনুভূতিগুলো মনের মধ্যে ইতিমধ্যে একত্র হয়ে জনমত গড়ে তুলেছে। সে আন্দোলনে আমার আমিতেই পরাজিত হলাম। তাই তাকে ছেড়ে যেতে মন সাই দিল না।


আরও পড়ুন>>


আগে থেকেই মনের আকাশে প্রবল উঁচুতে একটা ইচ্ছের ঘুড়ি উড়তেছিল। আমি যদি কখনো বড় হয় তাহলে একটা বৃদ্ধাশ্রম ও একটা এতিমখানা বানাবো। কিন্তু আমার পরিবারই পৃথিবীর এতিমখানায় পালিত হচ্ছিল। বাবা পৃথিবীর নিষ্টুরতায় পরাজিত হয়ে সব হারিয়ে অন্যের আশ্রয়ে ছিল। আর আমরা দুই ভাই ও মা সেই আশ্রয়টাকে ভারি করেছিলাম মাত্র। সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রতি নিঃশ্বাসে প্রার্থনা করতাম, কখনো যদি বড় হয় তখন যেন এ ইচ্ছেটা এখনকার মতো তরুণ থাকে। আমি জীবনে বড় হতে চাই। এ পৃথিবীতে থাকতে চাই ইতিপর্যন্ত, তার বিদায় সঙ্গী হয়ে। কিন্তু আমার তো নজরুল বা রবীন্দ্র প্রতিভা নেই। তাই অনন্ত জীবনের আশায় অনেকটা জীবন বৃথা ব্যয় করে, তা খোঁজার চেষ্টা করি।


আরও পড়ুন>>


অবশেষে বড় রাস্তার মাথা পেলাম। নামাযেরও খুব বেশি সময় নেই। তাই বুড়িটাকে পথে তুলে দিয়ে আমার পথ নিলাম। রাতে খুব ভালো আর ঘুম হলো না। দুশ্চিন্তা সারারাত ঘুমের সাথে গল্পের আড্ডায় অন্ধকারটাকে জাগিয়ে রাখলো। মনের মধ্যে একটা প্রশ্ন উত্তরের খোঁজে মনটকে একদন্ড স্থির হয়ে বসতে দিল না। দুদিন পরে বিকেল বেলা মনের অপেক্ষিত বন্দি প্রশ্নের মুক্তি মিলল। বুড়িটাকে আবার সেই চিরচেনা পথে যাত্রা করতে দেখলাম। হয়তো জীবনের ইতিপথ খুঁজছে।

এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

Leave a Reply

লেখক

সর্বশেষ সংবাদ

%d bloggers like this: