জেলা জুড়ে সয়াবিনের সোনা ফসলের স্বপ্ন বুনছেন কৃষকরা; প্রাকৃতিক দূর্যোগে আতঙ্কিত কৃষক

- Advertisement -

লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার মেঘনা উপলকূলবর্তী অঞ্চলে জেগে ওঠা বিস্তীর্ণ ৫টি চর ও ৪টি ইউনিয়নে হাজার হাজার একর জমিতে সয়াবিনের চাষ হয়। জেলার ব্র্যান্ডিং পন্য সয়াবিনের এবার বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানা গেছে। চর ইন্দুরিয়া, কানিবগারচর, জালিয়ারচর, চরঘাশিয়া, চর কাচিয়ার চরে এবং উত্তর চর আবাবিল, দক্ষিন চর আবাবিল, উত্তর চরবংশী ও দক্ষিন চরবংশী ইউনিয়নে এবার সয়াবিনের প্রচুর ফলন হওয়ার কারনে এখানকার কৃষকের মুখে হাসি ফুটে উঠেছে। হাজার হাজার একর জমিতে চাষ হওয়া সয়াবিনের সবুজ চারা যেন নতুন এক আবহের সৃষ্টি করেছে। বর্তমানে এটি রায়পুর উপজেলার প্রধান অর্থকরি ফসল হিসেবে পরিচিত। ফলে এখানে সয়াবিনের চাষাবাদ দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।সয়াবিন চাষ দিন দিন বিকশিত হচ্ছে। বর্তমানে জাতীয় উৎপাদনের প্রায় ৭০ ভাগ সয়াবিন এ জেলায় উৎপাদিত হচ্ছে।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, রায়পুরে মোট ৭ হাজার ৩৭৯ হেক্টর জমিতে সয়াবিন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেও আবাদ হয়েছে ৩০০ হেক্টর গত বছর। প্রতিবছর এ উপজেলায় সয়াবিন মৌসুমে ৩৫০ কোটি টাকার সয়াবিন বেচাকেনা হয়। এবার আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে বাম্পার ফলনের কারনে এর মাত্রা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলেও জানা গেছে।কৃষক ও কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাস হলো সয়াবিন আবাদের উপযুক্ত সময়। সার ও কীটনাশক তেমন দিতে না হওয়ায় এবং আগাছা কম থাকায় এর উৎপাদন খরচও অনেক কম। আগামী সপ্তাহের মধ্যে পাকা সয়াবিন ঘওে তুলতে পুরোদমে ব্যস্ত হয়ে পড়বেন এখানকার ব্যবসায়ী, মজুর ও কৃষকরা। উপজেলার কয়েকটি বাজারসহ হায়দরগঞ্জ বাজারে দেশের উৎপাদিত ৭৫ ভাগ সয়াবিন এখানে কেনাবেচা হয়। সয়াবিনকে কেন্দ্র করে হায়দরগঞ্জ বাজারে পাঁচটি চাতাল ও ৬০-৭০টি পাইকারী দোকান গড়ে উঠেছে। এছাড়া হাজীমারা, আখনবাজার, মোল্লারহাট ও খাসেরহাটে ২৫-৩০টি পাইকারী দোকানে সয়াবিন কেনাবেচা হয়।

সয়াবিন বাংলাদেশের উপকুলীয় এলাকার একটি সোনালি সম্ভাবনাময় ফসল। আমিষ ও ভোজ্য তেলের উৎস হিসেবে বর্তমানে এটি পৃথিবীর অনেক দেশে চাষ করা হলেও আমাদের দেশের উপকূলীয় অঞ্চল বিশেষ করে লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, চাঁদপুর, বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী, ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইল জেলায় ফসল হিসেবে সয়াবিনের চাষ হচ্ছে। আর লক্ষ্মীপুর জেলাই একক ভাবে দেশের মোট সয়াবিনের প্রায় ৬৫-৭০ ভাগ যোগান দেয়। তাই লক্ষ্মীপুরে এখন এটি কৃষকের মেঠো সোনা হিসেবে হিসাবে পরিচিতি লাভ পেয়েছে। সয়াবিন লক্ষ্মীপুরের ঐতিহ্যের ফসল। তাই সয়াল্যান্ড খ্যাতি পাচ্ছে লক্ষ্মীপুর।লক্ষ্মীপুর জেলার সয়াবিন অর্থনীতি নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন তুলে ধরা হল।

লক্ষ্মীপুরে সয়াবিন চাষের ইতিহাস সয়াবিন চাষী ও জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিস জানায়, উৎপাদন খরচ কম, ভালো দাম ও ফলন পাওয়ায় বর্তমানে জেলার চাষীরা অন্য রবি শস্যের পরিবর্তে দিন দিন সয়াবিন চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।

লক্ষ্মীপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিস সূত্রে জানা যায়, সর্ব প্রথম ১৯৮২ সালে রামগতি উপজেলায় মাত্র ১ হেক্টর জমিতে পরীক্ষামূলক ভাবে সয়াবিন চাষ হয়। এরপর ১৯৯২ সালে এমসিসি(এমএমসি) ও ডরপ নামক দুটি বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা সয়াবিন চাষে কৃষকদের কে ব্যাপক উদ্বুদ্ধ করে। তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে সয়াবিনের নানা ব্যবহারের উপর গৃহিনী ও কৃষানীদের কে হাতে কলমে প্রশিক্ষণ প্রদান করে। তখন থেকেই আস্তে আস্তে অন্য রবি ফসলের সাথে সয়াবিনের আবাদ বৃদ্ধি পেতে থাকে। এভাবে প্রতি বছর ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়ে চলতি ২০১৪ সালে দাঁড়িয়েছে ৪৪ হাজার ৪শ ৪৫ হেক্টর। অন্যেিদক লক্ষ্মীপুরে যে পরিমাণ সয়াবিন উৎপাদন হয় তা জাতীয় উৎপাদনের ৬৫-৭০ শতাংশেরও বেশি।

বিগত ও বর্তমান বছরের লক্ষ্যমাত্রা লক্ষ্মীপুর জেলার সার্বিক সয়াবিন উৎপাদনের চিত্রে দেখা যায় যে, ২০০৯-২০১০ সালে এ জেলায় মোট ৩৫ হাজার ৬শ ২২ হেক্টর জমিতে সয়াবিন চাষ করা হয় এবং উৎপাদন হয় ৬৬ হাজার ৬শ ১০ মেট্রিক টন, ২০১০-১১ সালে মোট ৩৯ হাজার ২শ ৮৭ হেক্টর জমিতে সয়াবিন চাষ করা হয় এবং উৎপাদন হয় ৭০ হাজার ৫শ ২০ মেট্রিক টন। ক্রমানয়ে প্রতি বছরই এ জেলায় সয়াবিনের চাষ সম্প্রসারিত হয়ে চলতি ২০১৪ সালে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৩ হাজার ৭শ ৯২ হেক্টর আর উৎপাদন ধরা হয়েছে সাড়ে ৭৭ হাজার মেট্রিক টন । যার আনুমানিক বাজার মূল্য ৪শ কোটি টাকা। রবি শস্যের এত বড় লক্ষ্যমাত্রা আর কোন ফসল থেকে এ জেলায় আশা করা যায় না।

সয়াবিন মৌসুম ও অন্য ফসলে প্রভাব : এক সময় লক্ষ্মীপুর জেলার চরাঞ্চলে প্রচুর খেসারী, মরিচ, বাদাম, তিল,তিশি,মিষ্টিআলু,কাইন,খিরা,তরমুজ,ভাংগি, হেলন ও মুগ ডাল সহ বিভিন্ন রবিশস্য চাষ করলেও এখন সয়াবিনের কারণে এ সকল বৈচিত্র্যময় ফসল এখন বিলুপ্ত প্রায়। তার পরিবর্তে এখন মাঠ জুড়ে শুধু সয়াবিন ছাড়া অন্য ফসল তেমন চোখে পড়ে না। রবি মৌসুমে মধ্য ডিসেম্বর থেকে মধ্য ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ে সয়াবিন বপন করে ৯০ থেকে ১১০ দিন সময় পর মে -জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত ফসল সংগ্রহ করা হয়। অন্যান্য রবি ফসলের চেয়ে সয়াবিন চাষ অনেক বেশি লাভজনক। হেক্টরে সর্বোচ্চ উৎপাদন খরচ পড়ে ২০ হাজার টাকা। ভালো ফলন ও দাম পাওয়া গেলে উৎপাদন খরচের চেয়ে প্রায় ৪ গুণ বেশি লাভ হয়; যা অন্য কোনো ফসল আবাদ করে পাওয়া যায় না।

সবচেয়ে বেশি সয়াবিন উৎপাদনকারী উপজেলা রামগতি: জেলার পাঁচটি উপজেলায়ই কম-বেশি সয়াবিন চাষ হয়ে থাকে। কিন্তু পরিসংখ্যানে দেখা যায় কমলনগর ও রামগতি উপজেলায় সবচেয়ে বেশি সয়াবিন চাষ হয়ে থাকে। সয়াবিন চাষের সাথে দু’উপজেলাতে প্রায় ১ লাখ প্রান্তি কৃষক প্রত্যক্ষ ভাবে জড়িত।

পরের অবস্থান রয়েছে সদর ও রায়পুর উপজেলা। নিম্নাঞ্চল হওয়ায় রামগঞ্জ উপজেলায় সয়াবিন চাষ কম হয়। এ বছর রামগতি উপজেলায় ১৮ হাজার ৭শ ১২ হেক্টর, কমলনগর উপজেলায় ১৪ হাজার ২শ, রায়পুর উপজেলায় ৬ হাজার ৬শ ৫, সদর উপজেলায় ৪ হাজার ১শ৭৫ এবং রামগঞ্জ উপজেলায় ১শ হেক্টর জমিতে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারন করা হয়েছে। যার মধ্যে ফেব্রুয়ারির মধ্য সপ্তাহ পর্যন্ত জেলায় সয়াবিন চাষ হয়েছে ৩৮ হাজার ৪৭ হেক্টর জমিতে। ফেব্রুয়ারি শেষ নাগাত নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক বেশি জমিতে সয়াবিনের চাষ হয়েছে।

জেলার সবচেয়ে বড় সয়াবিন চাষী, পল্লী চিকিৎসক আলী হোসেন: কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ এবং বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি)র সূত্র মতে লক্ষ্মীপুর জেলার সবচেয়ে বড় সয়াবিন চাষী কমলনগর উপজেলার দক্ষিণ চর মার্টিন গ্রামের পল্লী চিকিৎসক মোঃ আলী হোসেন (৫০)। যিনি দেশের সর্বশেষ্ঠ সয়াবিন বীজ উৎপাদনকারী চাষী হিসাবে খ্যাতি অর্জন করেছেন। আলী হোসেন জানান, গত বছর তিনি ৪০ একর জমিতে সয়াবিন চাষ করে ছিলেন। এ বছর করেছেন প্রায় ৫০ একর জমিতে। তার উৎপাদিত সব সয়াবিনই বিএডিসির বীজ হিসাবে ব্যবহৃত হয়।

বিএডিসির বড় সয়াবিন বীজ উৎপাদন জোন কমলনগর: ইলিশের পর কমলনগরবাসীর গর্বের ফসল সয়াবিন। সরকারী কৃষিবীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণকারী সরকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি)র প্রধান বীজ উৎপাদন জোন হচ্ছে এ কমলনগর। প্রতি বছর কমলনগর ও রামগতির ১শ ৫০ জন কৃষকের ৪শ ২০ একর জমি থেকে সয়াবিন বীজ সংগ্রহ করে বিএডিসি যার বেশির ভাগই কমলনগরের। যা দিয়ে পুরো দেশের বীজ সরবরাহ করা হয়ে থাকে।

সিন্ডিকেট ও মজুদদারী কাছে জিম্মি কৃষক: অনুসন্ধানে জানা যায়, ক্যাশ ক্রপস খ্যাত এ সয়াবিনকে ঘিরে এ অঞ্চলে বিশেষ করে রামগতি ও কমলনগরে মাথাছাড়া দিয়ে উঠে দাদন ব্যবসা। বেশির ভাগ কৃষক প্রান্তিক ও বর্গাচাষী হওয়া সয়াবিন বোনার মৌসুমে তাদের হাতে নগদ টাকা থাকে না। টাকার অভাবে তারা দ্বারস্থ হন মহাজনের কাছে। কৃষকের দারিদ্রতার সুযোগে মহাজনরা নামমাত্র মূল্যে আগাম কিনে নেন ক্ষেতের সয়াবিন। এতে করে ফসলের ন্যায্যমূল্য পায় না কৃষক। দাদন শোধ করার পর কৃষকের জন্য কিছুই থাকে না। এমনকি উল্টো কৃষকরা আরো দেনার দায় থাকেন। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৮ সালে কৃষকদের এ বঞ্চনা নিয়ে স্থানীয় ও জাতীয় পত্রিকায় লেখালেখি হলে নজরে পড়ে তৎকালীন জেলা প্রশাসনের। শুরু হয় দাদন বিরোধী অভিযান। টাকার অভাবে ক্ষেতের যে সয়াবিন কৃষক নামমাত্র মূল্যে মহাজনের কাছে বিক্রি করে দিয়েছিলেন দাদন বিরোধী অভিযানের মুখে মহাজনরা ওই বছর ক্ষেতের সয়াবিন তুলে নেয়ার সাহস করেনি। উৎপাদিত সয়াবিন কৃষক বাজার মূল্যে বিক্রি করেই ফেরত দেন দাদনের টাকা। এতে করে প্রতিমণ সয়াবিনে কৃষকের লাভ হয় ৭-৮শ’ টাকা। এ লাভের টাকা জমিয়ে রেখে পরের বছর দাদন ছাড়াই বেশিরভাগ প্রান্তিক ও বর্গাচাষী চাষ করেছেন সয়াবিন। মহাজনের মুখাপেক্ষী না হয়ে তারা ঘুরে দাঁড়িয়েছেন নিজের পায়ে। এ ছাড়া বর্গাচাষীর নিজস্ব জমি জমা না থাকায় ব্যাংক ঋণ পায় না তারা। ফলে বর্গাচাষীর ভাগ্য শুধু দাদনের হাতে বন্ধী। কিন্তু বর্তমানে এই দাদন ব্যবসা ও ব্যাংক ঋণ পাওয়া আবার প্রকট আকার ধারণ করেছে।

সেচ-খালের অভাব ও ভেজার সার-কীটনাশকের দৈরাত্য বৃদ্ধি: সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, চরাঞ্চলে সয়াবিন ক্ষেতে সেচ দেওয়ার কোন ব্যবস্থাই নেই। কিন্তু সয়াবিনে কমপক্ষে তিন বার সেচ দিলে ফলন বৃদ্ধি পায় তিনগুন। আবার অতি বৃষ্টি থেকে সয়াবিন রক্ষা করার জন্য ও নেই কোন খালের ব্যবস্থা। লক্ষ্মীপুর জেলার সবচেয়ে বড় সয়াবিন চাষী কমলনগর উপজেলার দক্ষিণ চর মার্টিন গ্রামের পল্লী চিকিৎসক মোঃ আলী হোসেন (৫০) জানান, আগাম বৃষ্টি থেকে সয়াবিন রক্ষায় মাঠে নতুন নালা খালের ব্যবস্থা সরকার যেন করে দেন এবং সেচের জন্য ও বিকল্প ব্যবস্থা করতে হবে। রামগতির কৃষক আঃ রব বলেন, বাজারে এখন ভেজাল সার আর ভেজাল কীটনাশক বেশি। ভেজাল সার ও ভেজাল কীটনাশক ব্যবহারের ফলে কাংখিত ফলাফল যেমনি পাওয়া যায় না তেমনি সঠিক সার এবং খাটিঁ কীটনাশকের অভাবে প্রতি বছর কৃষকরা লোকসান দিচ্ছে । সংশ্লিষ্ট বিভাগ কে এ ব্যাপারে তদারকি বাড়াতে হবে।

সয়াবিন ভিত্তিক শিল্প স্থাপনের উদ্যোগ নেইঃ দেশের ভোজ্যতেল,মাছ ও পোলট্রি ফিডের চাহিদা পূরণে সয়াবিন উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে। এছাড়া সয়াবিনজাত খাবার মানুষের পুষ্টির অন্যতম উৎস। লক্ষ্মীপুর জেলার উৎপাদিত সয়াবিন দিয়ে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে গড়ে উঠেছে পোলট্রি খাদ্য,মাছের খাদ্য তৈরি,সয়াবিস্কুট, সয়ামিট, সাবান, সয়াদুধ ও শিশুখাদ্য তৈরির কলকারখানা। অথচ লক্ষ্মীপুর জেলাতে সয়াবিন ভিত্তিক কোন শিল্প প্রতিষ্ঠান আজও গড়ে উঠেনি।এ জেলার সয়াবিনকে শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করে কৃষিভিত্তিক শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহন করা যেতে পারে। অন্যদিকে বীজের সজীবতা ও শতভাগ অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা বজায় রাখার জন্য তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রিত একটি উন্নতমানের অধিক ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন আধুনিক বীজ সংরক্ষণাগার স্থাপন জরুরী। জেলার পরিত্যক্ষ অনেক খাদ্য গুদাম কে ও সয়াবিন সংরক্ষণাগার হিসাবে রুপান্তর করা যেতে পারে।

সয়াবিনের ব্যবহার: জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিস সূত্রে জানা যায়, সয়াবিন তেলবীজ হলেও আমাদের দেশের উৎপাদিত সয়াবিন থেকে তেল উৎপাদন করা হয় না। এ দেশের সয়াবিন মূলত পোলট্রি খাদ্য,মাছের খাদ্য তৈরি,সয়াবিস্কুট, সয়ামিট, সাবান, সয়াদুধ, শিশুখাদ্য সহ নানা রকমের ৬১টি পুষ্টিকর খাবার ও পথ্য তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া খুব সামান্য পরিমাণ সয়াবিন বিদেশ রপ্তানি করা হচ্ছে।

সয়াবিনের পুষ্টিগুন ও ক্যান্সার প্রতিরোধ : পুষ্টি বিজ্ঞানীদের মত্যে খাদ্য হিসাবে সয়াবিনের ব্যাপক ব্যবহারের কারণ হচ্ছে এতে শতকরা ৪০ ভাগের অধিক আমিষ এবং ২০ থেকে ২২ ভাগ তেল রয়েছে। এ ছাড়া সয়াবিন শর্করা চর্বি, ক্যালসিয়াম, আয়রন, ফসফরাস, পটাসিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ এবং ভিটামিন এ, বি ও সির উন্নত উৎস হিসেবে কাজ করে।

সয়াবিন শুধু কোলেস্টেরলমুক্তই নয়; বরং রক্তে কোলেস্টেরলের পরিমাণ কমানোর মাধ্যমে হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে। মানুষের সুস্বাস্থ্য ও রোগ প্রতিরোধে সয়াবিনজাত প্রোটিনের কার্যকর ভূমিকা রয়েছে। এ কারণে স্তন ক্যানসার, অন্ত্রের ক্যানসার ও গ্রন্থির ক্যানসার প্রতিরোধে সহায়তা করে সয়াবিন। সয়াবিন পেশি গঠন এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। তাছাড়া সয়াবিন হজম বৃদ্ধি, কোষ্ঠকাঠিন্য এবং পাইলস রোগ নিরাময় করে। মেয়েদের মাসিককালীন প্রদাহ, আকস্মিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং অস্বাভাবিকতা নিয়ন্ত্রণ করে। সয়াবিন নিয়ে এ অঞ্চলের প্রত্যাশা: জেলার সয়াবিনকে শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করে কৃষিভিত্তিক শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহন করতে হবে। যেখানে সয়াবিন তেল, সয়াবিন বীজ ও সয়াপ্রোটিন উৎপাদন হবে।এতে এ অঞ্চলের কৃষকের উৎপাদিত সয়াবিন ন্যায্যমূল্যে সহজে বাজারজাতকরণ যেমন নিশ্চিত হবে তেমনি সুযোগ তৈরি হবে হাজার হাজার বেকার যুবকের কর্মসংস্থানেরও। কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হোক দাদন ব্যবসায়ীদের। এতে কৃষক ন্যায্যমূল্য পেয়ে সয়াবিন চাষে আরো বেশি আগ্রহী হবে। আর এভাবেই সয়াবিন কে কেন্দ্র করে এ অঞ্চলে উন্মোচিত হবে অর্থনৈতিক উন্নয়নের নতুন সম্ভাবনার।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএআরআই) নোয়াখালী অঞ্চলের সরেজমিন গবেষণা বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মুহাম্মদ মহীউদ্দীন চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, দেশের অন্তত ৩৩ জেলার ৭২টি উপজেলায় ৩-৪ লাখ হেক্টর জমিতে সয়াবিন চাষ হয়। যেখান থেকে বছরে ১০ লাখ টন সয়াবিনের উৎপাদন হয়। যার শতকরা ৭০ ভাগ সয়াবিন উৎপাদিত হয় লক্ষ্মীপুরে।

অন্যদিকে স্থানীয়ভাবে জানা যায়, সয়াবিন উৎপাদনে শীর্ষে থাকার কারণে ২০১৫ সালে বাংলাদেশ সরকার উপকূলীয় জেলা লক্ষ্মীপুরের ‘ব্র্যান্ডিং নাম’ রাখে সয়াল্যান্ড। ওয়ার্ল্ড এটলাসের তথ্যমতে, বাংলাদেশ সয়াবিন উৎপাদনে বিশ্বের ৩৫তম দেশ। বাংলাদেশে সয়াবিন উৎপাদনে প্রধান জেলা লক্ষ্মীপুর।

রায়পুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জোবায়ের হোসেন বলেন, রায়পুর উপজেলায় ব্যাপক হারে সয়াবিন উৎপাদিত হয়। আমরা সয়াবিন চাষীদের মাঠে যেয়ে বিভিন্ন রকম পরামর্শ দিয়ে থাকি, ১২ একর জমিতে সরকারিভাবে সহযোগিতা করেছি অতীতে।

এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

Leave a Reply

প্রতিবেদক

সর্বশেষ সংবাদ