ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ এর কতিপয় ধারা উপধারা এবং প্রাসঙ্গিক ভাবনা

0
87
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ এর প্রয়োগে গ্রেফতারকৃত মুশতাক আহমেদ এর জেলখানাতে মৃত্যু এবং এই মৃত্যুর প্রতিবাদে ফেসবুকে পোষ্ট নিয়ে শ্রমিক নেতা রুহুল আমিন এর গ্রেফতার একটি বিষয় সুস্পষ্ট করেছে যে, বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার সাধারনের কথা বলার অধিকার কেড়ে নিয়েছে এবং আইনের অপপ্রয়োগে গ্রেফতারকৃত ব্যাক্তিদের জামিনের আইনগত অধিকার কেড়ে নিয়ে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে। তাই আজকে প্রতিটি সচেতন মানুষের উচিত এই আইনটির ধারা উপধারা নিয়ে জানা, কারন তথ্য সমৃদ্ধতা আইন প্রণয়নকারী ও প্রয়োগকারীদের চরিত্র সুস্পষ্ট করে এবং ব্যাক্তিকে সামাজিক দায়িত্ব পালনে উদ্ভুদ্ধ করে।

আইনটির ২১ এর ১ ধারাতে বলা হচ্ছে,
“২১। (১) যদি কোনো ব্যক্তি ডিজিটাল মাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতির পিতা, জাতীয় সংগীত বা জাতীয় পতাকার বিরুদ্ধে কোনো প্রকার প্রপাগান্ডা ও প্রচারণা চালান বা উহাতে মদদ প্রদান করেন, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হইবে একটি অপরাধ।”

বাংলাদেশের প্রত্যেক নাগরিক বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গর্বিত। কারন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের সকল নাগরিকের অস্তিত্বের সাথে জড়িত। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে যদি গবেষণা করা হয়, তখন অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যাবে বর্তমান আওয়ামী সরকার স্বীকৃত ইতিহাসের সাথে অনেকেরই দ্বিমত আছে। অনেকেই ভিন্ন ভিন্ন আলোকে বিভিন্ন ঘটনার বিশ্লেষণ করছেন, যা দল হিসাবে আওয়ামী লীগ এর একাংশের এবং তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দের ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। এখন ভিন্ন দৃষ্টিকোন থেকে কেউ যদি ব্যাখ্যা করে দেখান যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে হলেও মর্মে তা ছিল একটি সর্বদলীয় সংগ্রাম কিন্তু আওয়ামী লীগ স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন সময়ে এবং স্বাধীনতার পরবর্তীতে এই সার্বজনীন রূপটিকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিলেন, তা হলেই তিনি কিন্তু এই আইনের ধারাতে অপরাধী হয়ে যাচ্ছেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাঁর বা তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের ও গ্রেফতার করতে পারবেন। অপরাধ প্রমান হলে, “অনধিক ১০ (দশ) বৎসর কারাদণ্ডে, বা অনধিক ১ (এক) কোটি টাকা অর্থদণ্ডে, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন”।

এই আইনের অপপ্রয়োগের সুযোগ এত বেশী যে, বাংলাদেশে ‘স্বাধীনতা’ নামের অহংকারের ও পবিত্র বিষয়টিকেও সরকার বা সরকারী নির্দেশে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কোন কর্মকর্তা নিজেদের স্বার্থ রক্ষা বা বিরোধী মত দমনের জন্য অনায়াসে ব্যবহার করতে পারবেন। এর অর্থ দাড়ালো স্বাধীনতার আওয়ামী ইতিহাস ছাড়া অন্য কোন ভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস নিয়ে, স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলার কোন অধিকার আর কারো রইল না। বাঙ্গালীর হাজার বছরের একমাত্র গর্বের বিষয় ‘স্বাধীনতা’ নিয়ে কথা না বলার আইন কি করে বাঙ্গালীর জন্য কল্যাণকর হয়?

যে কোন গনতান্ত্রিক দেশে সেই দেশের জাতীয় পতাকা বা জাতীয় সংগীত নিয়ে আলাপ আলোচনা, সমালোচনা চলতে থাকে। কারন এতে জাতীয় পতাকা বা জাতীয় সংগীত এর ঐতিহাসিক ভিত্তিটি স্থাপিত হয় শক্ত ভিত্তির উপর। কিন্তু এখানে আইনে এমনভাবে বলা হয়েছে যে এ নিয়ে কোন আলোচনাই করা যাবে না। ব্লাসফেমি আইনের মতই, কোন আলোচনা সমালোচনা নয়।

আইনটির শব্দাবলীর প্রতি দৃষ্টি আকর্ষন করছি, “…জাতীয় সংগীত বা জাতীয় পতাকার বিরুদ্ধে কোনো প্রকার প্রপাগান্ডা ও প্রচারণা চালান বা উহাতে মদদ প্রদান করেন, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হইবে একটি অপরাধ”। বলা হয় নি যে অসংগত, অপ্রাসঙ্গিক, মিথ্যা, অযৌক্তিক প্রপাগান্ডা ও প্রচারনা, বলা হয়েছে ‘কোন প্রকার প্রপাগান্ডা ও প্রচারনা’। ফলে কি দাঁড়াল? কেউ কিন্তু প্রশ্ন করতে পারবে না যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আরো অনেক দেশপ্রেম ও বাঙলা বন্দনার গান থাকার পরেও কেন আমরা ‘আমার সোনার বাংলা’কে আমাদের জাতীয় সংগীত হিসাবে গ্রহন করেছি অথবা রবীন্দ্রনাথই বা কেন? প্রশ্ন করতে পারবে না স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন সময়ে কেন আমরা আমাদের পতাকাতে মানচিত্র ব্যাবহার করেছি, কেনই বা তা পরবর্তীতে আর ব্যাবহার করা হয় না। অথবা, পতাকার পরিকল্পনাকারীদের তৎকালীন চিন্তাভাবনার সাথে আওয়ামী লীগের ঐ সময়কার অধিকাংশ নেতৃবৃন্দের কোন ঐক্য ছিল কিনা? ছিল কি আওয়ামী লীগ এর অধিকাংশের অনুমোদন? নির্দোষ এই প্রশ্নাবলীর কারনেই কিন্তু একজনের বিরুদ্ধে এই আইনের অধীনে মামলা দায়ের করা যাবে।

এই আইনটি কে জাতীয় সংগীত ও পতাকার জন্য ক্ষতিকর নয়? কারন বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত আর জাতীয় পতাকা হচ্ছে বাঙালীর চরম ত্যাগের অর্জন ও গৌরবের সম্পদ, তাঁর মর্যাদা রক্ষার জন্য অপরিহার্যভাবে দরকার বাধাবিঘ্নহীন আলাপ আলোচনার অধিকার; দলীয় দৃষ্টিকোন রক্ষার জন্য কোন আইন কি?

মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ব্যাখ্যাতে এই আইনে বলা হয়েছে, ‘‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’’ অর্থ যে সকল মহান আদর্শ আমাদের বীর জনগণকে জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে আত্মনিয়োগ ও বীর শহীদদিগকে প্রাণোৎসর্গ করিতে উদ্ধুদ্ধ করিয়াছিল জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্ম নিরপেক্ষতার সেই সকল আদর্শ…”।

কোন্ গনতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা? আওয়ামী গনতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা? সমাজতন্ত্রের কথা না হয় আলোচনাই করা হল না। এখন কেউ যদি আওয়ামী গনতন্ত্রের, আওয়ামী লীগ সরকারের সমালোচনা করেন, তখনি কিন্তু তিনি হয়ে যাচ্ছেন এই আইনের আওতায় অপরাধী। গণতন্ত্র আমাদের স্বাধীনতার চেতনা, অনস্বীকার্য; কিন্তু আজকে গণতন্ত্রের ব্যাখ্যা দেন সরকার, এর বাইরে কোন ব্যাখ্যা নেই। ধর্ম নিরপেক্ষতা হচ্ছে প্রয়োজনে হেফজত নিয়ে এগিয়ে যাওয়া, মাদ্রাসা শিক্ষার ক্রমবিস্তার ইত্যাদী। এর বিরুদ্ধে কথা বললেই আইনের আওতায় এনে শাস্তি দেয়া যাবে। প্রয়োজনে জামিনযোগ্য অপরাধ হওয়ার পরেও, জেলখানাতে বন্দী করে রাখা যাবে দিনের পর দিন। সরকারের সমালোচনা করে ফেসবুকে পোস্ট দেয়ার কারনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক থেকে শুরু করে অনেককেই হাজতবাস করতে হয়েছে।

এই আইনের মাধ্যমে কি খোদ আওয়ামী সরকার স্বাধীনতার চেতনার বিরোধীতা করছেন না? কথা বলার কারনে, ফেসবুকে পোষ্টিং এর কারনে যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক থেকে শুরু করে একজন সাধারন সচেতন ব্যাক্তিকে হাজতবাস করতে করতে মৃত্যুবরন করতে হয়, গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেয়ার এত বড় প্রমানের পরেও কি আওয়ামী লীগ দাবী করতে পারেন যে তাঁরা স্বাধীনতার চেতনার ধারক ও রক্ষক?

আইনের ধারাতে বলা হয়েছে, “যদি কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েবসাইট বা ডিজিটাল বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন বা করান, যাহা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন শ্রেণি বা সম্প্রদায়ের মধ্যে শত্রুতা, ঘৃণা বা বিদ্বেষ সৃষ্টি করে বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করে বা অস্থিরতা বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে অথবা আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটায় বা ঘটিবার উপক্রম হয়, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হইবে একটি অপরাধ”। এখন ধরা যাক কেউ একজন ফেসবুকে বা অনলাইন ব্লগে, পার্বত্য চট্টগ্রামে বিভিন্ন পর্যটন কর্মকান্ড পরিচালনা সহ অন্যান্য কারনে পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর অসহায়ত্বের এবং ক্রমশ অবলুপ্তির কথা তুলে ধরে একটা লেখা লিখলেন। এর পরে সংখ্যালঘুর অধিকার সংরক্ষণের সৎ উদ্দেশ্য নিয়েই এবং তাঁর সেই লেখার কারণে আইন সম্মতভাবেই প্রতিবাদ সংগ্রাম শুরু হলো। তখন কিন্তু সেই ব্যাক্তির বিরুদ্ধে এই আইন দিয়েই গ্রেফতার ও মামলা দায়ের করা যাবে। কারন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তার সৎ উদ্দেশ্যের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলী প্রদর্শন করে দেখাবে তাঁর লেখা তাঁর পোষ্ট, “অস্থিরতা বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে অথবা আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটায় বা ঘটিবার উপক্রম” করেছে।

অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে যে সরকার যদি মনে করেন যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের ডালকে অনেকেই হাত ধোয়ার পানি মনে করেন, এমন মন্তব্য অস্থিরতা ও বিশৃঙ্ঘলা সৃষ্টির উপক্রম হয়েছে, তখন কিন্তু আইনের প্রয়োগ করে গ্রেফতার ও জেল হাজত হবে। কারণ অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলার সংজ্ঞা নির্ধারণ করবে কে?

আইনটির ২৫ (১) এর খ ধারাতে বলা হয়েছে, “রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি বা সুনাম ক্ষুণ্ণু করিবার, বা বিভ্রান্তি ছড়াইবার, বা তদুদ্দেশ্যে, অপপ্রচার বা মিথ্যা বলিয়া জ্ঞাত থাকা সত্ত্বেও, কোনো তথ্য সম্পূর্ণ বা আংশিক বিকৃত আকারে প্রকাশ, বা প্রচার করেন বা করিতে সহায়তা করেন তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হইবে একটি অপরাধ”।

আসুন দেখি আমরা এখানে এই যে “রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি বা সুনাম ক্ষুণ্ণু করিবার, বা বিভ্রান্তি ছড়াইবার, বা তদুদ্দেশ্যে, অপপ্রচার” এর কথা বলা হয়েছে, তার একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যাখ্যাটি করবে কে? সাম্প্রতিককালেই রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন পাটকলগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়েছে সরকারী সিদ্ধান্তে। এখন সার্বিক বিষয়টি অর্থাৎ সরকার এর পাটকল বন্ধ এবং ব্যাক্তিগত মালিকানাতে তা হস্তান্তরের সিদ্ধান্তকে কেউ যদি বিশ্লেষণ করে দেখান যে, এ সিদ্ধান্ত মুলতঃ সরকারী পাটকল সমূহের বিশাল স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি ধনীক শ্রেনীর কাছে হস্তান্তরের একটি প্রক্রিয়া মাত্র। এই বিশ্লেষণটি দেখে যদি কোন আওয়ামী কর্মী সেই বিশ্লেষক এর বিরুদ্ধে থানায় মামলা করেন, তখন পুলিশ তাঁকে রাষ্ট্রের ভাবমুর্তি বা সুনাম ক্ষুন্ন করার, বিভ্রান্তি ছড়াবার অপরাধে অপরাধী করে “অনধিক ৩ (তিন) বৎসর কারাদণ্ডে, বা অনধিক ৩ (তিন) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত” করতে পারবেন। একই ভাবে পাটকল শ্রমিকদের আন্দোলনকে দমন করার জন্য, শ্রমিক আন্দোলনের নেতাদের বিরুদ্ধেও এই আইন প্রয়োগ করতে পারবেন। তাহলে দেখা যাচ্ছে আইনটি সম্পর্কে অজ্ঞ ব্যাক্তিও, শুধু দলীয় দৃষ্টিকোন থেকে যে কোন বক্তব্যকে রাষ্ট্রের ভাবমুর্তি বা সুনাম ক্ষুন্ন করার দায়ে দায়ী করে মামলা করতে পারবেন। এমনকি এই লেখাটিকেও রাষ্টের ভাবমুর্তি বা সুনাম ক্ষুন্ন করার উদ্দেশ্যে অপপ্রচার এর অভিযোগে অভিযুক্ত করতে পারে; যদিও কোথাও এ লেখাটির লেখা ও প্রকাশের মাধ্যমে দেশের ভাবমুর্তি বা সুনাম ক্ষুন্ন করার কোন ইচ্ছাই লেখক বা প্রকাশকের নেই, কারন দেশটির ভাবমুর্তি বা সুনাম লেখক বা প্রকাশক নন, সরকারই ক্ষুন্ন করেছেন, এ হেন একটি কাল আইন এর প্রয়োগ করে। জাতিসংঘের হিউম্যান রাইটস বিষয়ক হাই কমিশনার মিশেল ব্যাচেলেট যখন এই আইনটিকে পুণঃমূল্যায়ণের কথা বলেন তখন এটা বুঝতে কষ্ট হয় না যে, আইনটির ধারা উপধারা মানবিক অধিকারের নিশ্চয়তা নিয়ে সন্দেহের উদ্রেক করে।

পরোয়ানার মাধ্যমে অথবা বিনা পরোয়ানাতে তল্লাশী ও জব্দের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে যে, “যদি কোনো পুলিশ অফিসারের এইরূপ বিশ্বাস করিবার কারণ থাকে যে,—
(ক) এই আইনের অধীন কোনো অপরাধ সংঘটিত হইয়াছে বা সংঘটিত হইবার সম্ভাবনা রহিয়াছে,”
এবং
৪৩। (১) যদি কোনো পুলিশ অফিসারের এইরূপ বিশ্বাস করিবার কারণ থাকে যে, কোনো স্থানে এই আইনের অধীন কোনো অপরাধ সংঘটিত হইয়াছে বা হইতেছে বা হইবার সম্ভাবনা রহিয়াছে বা সাক্ষ্য প্রমাণাদি হারানো, নষ্ট হওয়া, মুছিয়া ফেলা, পরিবর্তন বা অন্য কোনো উপায়ে দুষ্প্রাপ্য হইবার বা করিবার সম্ভাবনা রহিয়াছে, তাহা হইলে তিনি, অনুরূপ বিশ্বাসের কারণ লিপিবদ্ধ করিয়া, নিম্নবর্ণিত কার্য সম্পাদন করিতে পারিবেন”।

পুলিশ অফিসার মনে করার কারন লিপিবদ্ধ করে ক্ষেত্র অনুযায়ী পরোয়ানা সংগ্রহ অথবা পরোয়ানা ছাড়া তল্লাশী ও ফৌজদারী কার্যবিধি অনুযায়ী ব্যাবস্থা নিতে পারিবেন।

পুলিশ অফিসার এর মনে করার কারণের গাইড লাইনটি কি? নাকি গত কয়েকদিন যাবত সন্দেহভাজন ব্যাক্তি যে বিল্ডিং এ থাকেন, সেই বিল্ডিং এর নিরাপত্তা রক্ষী এবং বৃদ্ধা কাজের বুয়া বলেছে, ‘সাব সারাদিন ছোট্ট টেলিভিশনের সামনে টাইপ করেন’ বক্তব্যে বিশ্বাস করার কারণ রয়েছে যে তিনি … এবং … ধারায় অপরাধী। বাস্তবেতো তাই ঘটেছে বলেই সংবাদ পাওয়া গেছে। একজন পুলিশ অফিসারকে এই আইনের মাধ্যমে মুলতঃ যে কোন কম্পিউটার ব্যাবহারকারী ব্যাক্তি বা ব্যাক্তিবর্গকে গ্রেফতার করার সীমাহীন ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। এহেন জওয়াবদেহিতাহীন প্রক্রিয়া কতটুকু গনতান্ত্রিক নাকি পুলিশের মাধ্যমে সরকার বিরোধীদের দমনের হাতিয়ার।

আমি মাত্র কিছু পয়েন্ট তুলে ধরলাম। আইনবিদ ও বিশেষজ্ঞগণ নিশ্চই আরো কিছু দিক তুলে ধরবেন।

সারা বিশ্বব্যাপী হ্যাকিং বিরোধী আইন আছে, প্রয়োগও আছে আবার একই সাথে এ ধরনের আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রাম চলছে। হ্যাকিং এর অর্থ যদি হয় বিনা অনুমতিতে ব্যাক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ অথবা ডিজিটাল ডিভাইস এর স্বত্বাধারীকে হেয় প্রতিপন্ন করা বা অন্য কোন উদ্দেশ্য উক্ত ডিজিটাল ডিভাইসের তথ্য চুরি করা তবে সেটা ব্যাক্তির ক্ষেত্রে যেমন সত্য তেমনি সত্য সরকার এর ক্ষেত্রেও। সরকার এর কি নৈতিক কোন অধিকার আছে যে কোন ব্যাক্তির ব্যাক্তিগত ডিজিটাল ডিভাইস এর ব্যাক্তিগত তথ্যাবলী সরকারের বিরুদ্ধ মত দমনের কাজে ব্যাবহার করার? ২০১৯ সালে ইউরোপীয় হিউম্যান রাইটস আদালতে এ ব্যাপারে মামলা দায়ের করা হয় যেখানে এ যুক্তি দেখানো হয় যে, রাষ্ট্রের এই হ্যাকিং এর ক্ষমতা হিউম্যান রাইটস এর জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। মোশতাক তাঁর ফেসবুক একাউন্টে কি মন্তব্য করেছেন অথবা কিশোর কি কার্টুন প্রচার করেছেন, এটা তো তাঁদের নিজস্ব মতামত মাত্র। রাষ্ট্র এবং রাষ্টের নির্বাহী সরকার যদি ফেসবুকের একটি মন্তব্যের কারনে একজনকে দশ মাস হাজত বাস করায় তখন কি সরকারের এ ক্ষমতার নৈতিক ভিত্তি নিয়েই প্রশ্ন উত্থাপিত হয় না?

মানুষের কথা বলার স্বাভাবিক অধিকার যারা কেড়ে নেয় তাঁদের মৌল চরিত্র মুলতঃ ফ্যাসিবাদী, এ তথ্য আজ গবেষনার বিষয় নয়, প্রতিষ্ঠিত সত্য। সারা বিশ্বব্যাপী মানুষের মুক্তির সংগ্রামে বাঙ্ঘালী তার অতীত ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতাতে এই কালো আইনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলে আইন বাতিলে সরকারকে বাধ্য করবেন, এই আশা ব্যাক্ত করছি।

লেখক।। রেজ্জাকুল চৌধুরী, অনলাইন এক্টিভিস্ট, নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র।

Leave a Reply