ধর্ষণ বিরোধী আন্দোলন, বাম জোটের বিক্ষোভ এবং ছোট্ট একটি পর্যালোচনা ও প্রস্তাবনা

ধর্ষণ ও বিচারহীনতার বিরুদ্ধে আজ বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি জেলা শহর গুলোতে আন্দোলন চলছে। রাজধানীর শাহবাগ-প্রেসক্লাব-মিরপুর, চট্টগ্রাম,নোয়াখালী,সিলেটে এ আন্দোলন যেভাবে জোরে সোরে হচ্ছে অন্য শহরগুলোতে সেই তুলনায় এ আন্দোলন বেশ দূর্বল। তবে কমবেশি অনেকগুলো জেলাতে আন্দোলন না হলেও বামপন্থী দল ও প্রগতিশীল সংগঠন- ব্যক্তিদের উদ্যোগে কর্মসূচি পালিত হচ্ছে।

আর যারাই এ আন্দোলনে আসছে বা দুরে দাঁড়িয়ে সমর্থন করছে তাদের একটি বড় অংশের দাবি হল ধর্ষকদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা, বিচারহীনতা সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসা।

এখন সংক্ষেপে যদি আমরা একটি সমাজে বা দেশে ধর্ষণের মত অপরাধগুলো বৃদ্ধির কারন অনুসন্ধান করতে যায়, তাহলে কি দেখতে পাব ?

একটি সমাজে বিচারহীনতার সংস্কৃতি যদি বলবৎ থাকে তবে সেখানে অপরাধ প্রবণতা চক্রবৃদ্ধি হারে বেড়েই চলে। মনস্তাত্ত্বিক ভাবে অপরাধীরা ভাবে, সে অপরাধ করেও রেহাই পেয়ে যাবে। তবে একটা শর্ত হল, যে ক্ষমতা কাঠামোর বদৌলতে এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে , সেই ক্ষমতা কাঠামোর রাজনীতির সাথে থাকা। তাহলেই সে নিরাপদ। যে কারনে দেখবেন,আমাদের দেশে যারাই অপরাধ করুক না কেন, তাদের একটি বড় অংশই এই ক্ষমতা কাঠামোর রাজনীতির সাথে কোনো না কোন ভাবে সম্পৃক্ত । আর একটি বিষয় হলো, অপরাধ প্রবণতার সাথে অসুস্থ পরিবেশের একটি মনস্তাত্ত্বিক সম্পর্ক আছে। যে পরিবেশ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ভাবে অসুস্থ, সেই পরিবেশই অপরাধ প্রবণতার আতুর ঘর।

আবার একটি দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি গড়ে ওঠার পিছনে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে সে দেশের সরকার। একটি সরকার কিভাবে পরিচালিত হচ্ছে, কোন প্রক্রিয়া অবলম্বন করে সে রাষ্ট্র ক্ষমতায় টিকে আছে, সেই প্রশ্নটিও খুব গুরুত্বপূর্ণ। সে কি জনগণের সর্বোচ্চ মতামতের ভিত্তিতে রাষ্ট্রক্ষমতায় গেছে, নাকি জোর করে টিকে আছে। যদি জনগণের পরিপূর্ণ মতামতের ভিত্তিতে না গিয়ে, জোর করে সামরিক- প্রশাসনিক-দলীয় ও বাইরের শক্তিকে ব্যবহার করে রাষ্ট্রক্ষমতায় টিকে থাকে তাহলে সেখান থেকেই সূত্রপাত ঘটে সকল ধরনের বিচারহীনতার সংস্কৃতি। যেখানে রক্ষকই ভক্ষক, সেখানে অন্যত্র প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই।

কেবলমাত্র ক্ষমতায় টিকে থাকার প্রশ্নে একটি দেশের অভ্যন্তরে যত দমন পীড়ন বাড়তে থাকে, সেখানকার মানুষের মধ্যে থাকা অপরাধ প্রবণতা সমূহও বেড়ে চলে।

সুতরাং আজকে দেশের অভ্যন্তরে খুন-ধর্ষণ-নারী নিপীড়ন সহ যত ধরনের অপরাধ প্রবণতা গড়ে উঠেছে তার জন্য প্রধানত দায়ী আমাদের সরকার ও রাষ্ট্র। তারাই এর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ পৃষ্ঠপোষক।

রাষ্ট্রের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড জনগণকেও উৎসাহিত করে, ক্ষমতা দখল ও টিকে থাকার প্রশ্নে সরকারের দমন-পীড়ন জনগণের মধ্যেও সঞ্চারিত হয়, সংসদ ও রাষ্ট্র ক্ষমতায় বসে সরকার ও তার কর্তাব্যক্তিদের মিথ্যাচার দেশবাসীর মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। আর সেই সাথে নিজেদের রক্ষা করার প্রয়োজনে গড়ে তোলা হয় দেশ-জাতি ও সভ্যতা পরিপন্থী বিচারহীনতার এক ভয়ংকর সংস্কৃতি।

তাই আজকে সবার আগে প্রশ্ন করতে হবে, অবৈধভাবে ক্ষমতায় টিকে থাকা সরকার ও রাষ্ট্রকে। সেই প্রশ্নের মিমাংসা না করে, বানরের কাছে পিঠা ভাগ করার দ্বায়িত্ব দিলে আম ও যাবে, ছালাও যাবে। পেট ভরবে বানরের।


আরও পড়ুন


অন্যায় কারীকে টিকিয়ে রেখে, তার কাছে ধর্না ধরে কোন লাভ হবে না। বরং এতে করে তার আয়ু বৃদ্ধিই ঘটবে। আর নিজেরা (দলীয় নেতার) হালুয়া-রুটির ভগ্নাংশ পেতে যেয়ে যদি মূল প্রশ্নকে এড়িয়ে গিয়ে তার আশপাশ দিয়ে ঘোরাঘুরি করতে থাকেন, তাহলে এই আন্দোলন হবে বর্তমান সরকারের আর একটি গণজাগরণ মঞ্চ। যেখানে শ্রম দিবে জনগণ, কিন্তু সুফল নিবে সরকার ও রাষ্ট্র স্বয়ং।

যে কারনে, বাম গনতান্ত্রিক জোট কর্তৃক ঘোষিত- “ধর্ষকদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করা এবং আশ্রয়দাতা-পৃষ্ঠপোষকদের বিচারের আওতায় আনার দাবিতে ১২ অক্টোবর সারাদেশে বিক্ষোভ কর্মসূচিকে আমরা সম্পূর্ণভাবে দেশ ও জনগণের স্বার্থ পরিপন্থী এবং সরকারকে টিকিয়ে রাজনীতি বলে মনে করি।

আমরা মনে করি, প্রতিটি দেশের জন্য আইন খুব গুরুত্বপূর্ণ। আইন হল সরকার ও জনগণের গাইডলাইন। সরকার দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু এটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ যে, আইনের শাসন যিনি প্রতিষ্ঠা করবেন, তিনি কি আইন মানেন। দেশের প্রচলিত আইনেই যেখানে খুনের মৃত্যুদন্ড প্রাপ্ত আসামি রাষ্ট্রপতির সাধারণ ক্ষমায় মাফ পেয়ে, যাবৎ জীবন কারাদণ্ড প্রাপ্ত আসামী জেলে থেকেই বিয়ের আসর সাজায়, আবার বছরের পর বছর সাগর-রুনি, তকি, তনুদের বিচার কার্য ফাইল বন্দি হয়ে থাকে, বিনা অপরাধে বছরের পর বছর জেল খাটতে হয়, সেখানে ধর্ষণ করলে তার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হলেই কি এই সমস্যার সমাধান হবে?

বাম গনতান্ত্রিক জোটকে আমরা এ বিষয়ে ভাববার জন্য অনুরোধ জানাই। সচেতন বা অচেতন ভাবে আপনারা যে দাবি সরকারের কাছে তুলে ধরেছেন, তা টোটকা চিকিৎসা মাত্র, সমাজের স্বাস্থ্য ভাল করার দাবি এটা নয়।

আমরা মনে করি, যারা অবৈধভাবে দীর্ঘদিন রাষ্ট্র ক্ষমতায় বসে আছে তারাই আজ ধর্ষণ সহ সকল ধরনের অপরাধের জন্য দায়ী। আগে তাকেই বিচারের আওতায় আনতে হবে। সেই কেন্দ্রকে ধরেই আমাদের সকল কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হবে। এর বাইরে এক চুলও নয়।

 

লেখক।।
রুহুল আমিন
সংগঠক
শ্রমিক-ছাত্র-জনতা ঐক্য।

এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

Leave a Reply

লেখক

সর্বশেষ সংবাদ

%d bloggers like this: