ধানের মাঠে পিকনিক নয়, নেতাদের কাছে মানবিক সহযোগিতা চায় কৃষক

বোরহান মেহেদী, সংবাদ কর্মী ।।
মানুষ যা করবে তা হতে হবে বিশ্বাসী ও স্বাভাবিক। হতে হবে দিব্যচোখে সত্য ও সুন্দর। এমনটিই কাম্য সবার।

করোনা কারনে দেশ আজ ভাইরাস প্রতিরোধে মুলতঃ অচল। সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলা, লকডাউনের ফলে কর্মজিবী মানুষ আজ নানা অসুবিধা ও কষ্টে দিন যাপন করছে। ছোট বড় গাড়ি, চলাচলের যানবাহন সব বন্ধ। কিছুতেই কাউকে পথে নামতে দিচ্ছেনা প্রশাসন। অন্যদিকে কলকারখানা, ব্যবসাপাতি সব বন্ধ। এই অবস্তায় দেশবাসির খাদ্য ও নগদ অর্থের অভাব চরমে উঠেছে।

এরপরও জীবন বাঁচাতে সব মানছে জনগন। দেশব্যাপি চলছে পাকা ধান কাটার মৌসুম। সামনে বর্ষা বাদলের দিন। কখন তলিয়ে যাবে ধান মাঠ, সেই ভাবনাতে কৃষক দিশেহারা।

করোনা সংকট কাল সামাল দিতেই কঠিন সময় পার করছে সরকার প্রধান জননেত্রী শেখ হাসিনা। এসময় যখন নেত্রী কানে এলো কৃষকের এমনি সমস্যার কথা। তখন উদ্বিঘ্ন হয়ে, তিনি দলীয় নেতাকর্মীদের নির্দেশ দিলেন যে যেভাবে পারো মাঠ থেকে কৃষকের ধান কেঁটে বাড়ি পৌছে দাও। সবাই দেশের সেবায় কাজ করো।

এরপরই শুরু হলো ধান কাঁটা। প্রথমে ছাত্রলীগ ধান কাঁটতে মাঠে এবং তারা সত্যি সত্যি ধান কেঁটে কৃষকের ঘরে তুলে দিতে লাগলো। তাদের এমন কাজে খোদ নেত্রীসহ দেশবাসী সন্তুষ্ট। দেশের বাহিরেও ছাত্রদের এমন এই দেশপ্রেমে বাহবা আসতে লাগলো। ছাত্রনেতারাও তাদের কাজে আরো বেশী উৎসাহ পেতে লাগলো।

এদৃর্শ্য যখন দেশের বিভিন্ন স্হানে ভ্যাইরাল হল, তা দেখে একদল নেতা মজা লুঠতে মাঠে পিকনিক শুরু করলো।ব্যস্ত হয়ে পড়লো সিনেমার সুটিংয়ে। বাহ্ দেখা দেখি নেতানেত্রীরা মাঠে নেমেই গেলো। সাথে কর্মীরা তেলমারার ছবি ভ্যাইরাল করতে লাগলো। তাতেও কি শেষ সব মজার দৃশ্য। যা হচ্ছে তা ফেক অভিনয়কে হার মানাতে বাধ্য।

এমপি। বড় মাপের নেতা। ছোট নেতা এবার পাকা ধানের বদলে কাঁচা ধানই কাঁটতে লাগলো। কোন বাছ বিচার মানতে নারাজ। কারন নেতার ছবি তুলতে কর্মীরা চরম পাগল। কার আগে কে সট নিবে। আহা কি কান্ড! চারিদিকে তেলমারা কর্মীরা দাঁড়িয়ে আছে, নেতা একা ধান কাঁটছে। কি অবাক করা দৃশ্য। নেতা একা কাস্তে হাতে। অন্যেরা সাথে পিছনে দাঁড়িয়ে ছবি তোলার হিড়িকে। বোধে নাই এতে লাভের চেয়ে সুনাম ক্ষতিই হবে।

সোমবার এক সাংবাদিক বন্ধু আমাকে কয়েকটি ধানকাঁটার ছবি দেখালো। একটিতে একনেত্রীর হাতে একগুছা কাঁচা ধান নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, পাশে বেশকিছু নেতাকর্মী ছবি তোলায় ব্যস্ত। আরেকটিতে তেমনি এক নেতার হাতে একমুঠো ধান। পাশে ২০/৩০ জন নেতাকর্মী গা ঘেসে অবস্হান নিয়ে ছবি উঠাচ্ছে। ওদের একজনের হাতেও কাস্তে নেই। আবার ফটো উঠাতে ব্যস্ত কর্মীদের সংখ্যাও বুঝা যাচ্ছে ওরা সংখ্যায় অনেক। ছবিওয়ালাদের কেউ কেউ আবার ভাড়াতেও এসেছে।

প্রথম দিকে ছাত্ররা যেটুকু সুনাম অর্জন করেছিলো তা ধূলিসাৎ করে দিলো কিছু পাতানো ধান কাটার পিকনিক করে। আসলে এখন যা করছে সবটাই যে একেবারে সাজানো সেটি বুঝতে কারো বাকি নেই। সোজা কথা কিছু কান্ডজ্ঞানহীন নেতার এহেন হীনকর্মে দেশ প্রেমের বারোটা বাজাতে বাকি রইল না।

দেশ করোনা ভাইরাস প্রকোপের ভয়ে মহা সংকটে ডুবে যাচ্ছে। এতে সাধারন মানুষ ভীত হয়ে আছে। দেশ চতুূর্দিকে লকডাউনে পুরো স্থবির। ব্যবসা নেই। উৎপাদন নেই। অফিস নেই। এককথায় মহা বিপদ গ্রস্ত, মহাশংকায় চলছে দেশ। মানুষ প্রয়োজনীয় খাদ্য চায়। নগদ টাকা চায়। বাঁচার অনুপ্রেরনা চায়। করোনা থেকে বাঁচতে চায়।

কৃষকেরা সরল। ওদের অভাব বারো মাস। তারপর এখন করোনা কারনে তারা মস্ত বেহালে আছে। এসময় ঘরে চালের অভাব। আবার নগদ অর্থেরও অভাব। সবমিলে বেসামাল তাদের বাঁচার পথ। তারা এইমুহুর্তে ধান কেটে ঘরে তুলতে হিমশিম খাচ্ছে সত্যি। কিন্তু কৃষক সমাজ চায়না উপকারের নামে বজ্জাতি আর উপহাস। ধান কাটার বেশে মাঠে নেমে ছবি তোলা এবং পিকনিক করা।

নাম না বলার শর্তে একজন প্রবীণ কৃষক জানান, বর্তমানে ধান কেটে কৃষকের ঘরে তোলার নামে যারা ছবি তুলে ভ্যাইরাল করছে, তাদের এই লজ্জাস্কর কাজ থেকে বিরত থাকা উচিত। এতে কিন্তু নেতাদের সুনাম না বেড়ে নষ্ট হচ্ছে। আর এখনতো মানুষ করোনা ভাইরাস মুখামুখি মৃত্যুর ভয়ে আতংকিত, এসময় সবাইকে অনুরোধ লোক দেখানো কিছু করে নীজের দুর্গতি ডাকবেন না। এতে আপনাদের লাভের চেয়ে ক্ষতি হবে। তিনি গায়ের কথায় আরো বললেন, “বাহে ছবি সুটিং ন করেন, মুগো ধান কাইটে দেন।”

লৈখক: বোরহান মেহেদী, সংবাদ কর্মী
২৮/০৪/২০২০

এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

Leave a Reply

লেখক

সর্বশেষ সংবাদ

%d bloggers like this: