নানকার কৃষক বিদ্রোহ: অধিকার আদায়ের প্রথম সফল সংগ্রাম

নানকার কৃষক বিদ্রোহ, বাঙালি জাতির সংগ্রামের ইতিহাসে বিশেষ করে অধিকারহীন মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য যেসব গৌরবমণ্ডিত আন্দোলন-বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছিল তার মধ্যে অন্যতম।

নানকার বিদ্রোহ সিলেট অঞ্চলের একটি কৃষক-আন্দোলন, যা ১৮ আগস্ট ১৯৪৯ সালে সংগঠিত হয়। জমিদারের ভূমিদাসদের একটি প্রথাকে “নানকার প্রথা” বলা হতো। বিংশ শতাব্দীর ২০-এর দশকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন ১৯৫০ সালে জমিদার প্রথা বিলুপ্ত করার মাধ্যমে সমাপ্ত হয়।

‘নান’ ফার্সি শব্দ, এর অর্থ রুটি এবং ‘কার’ অর্থ যোগান বা কাজ করা; অর্থাৎ ‘নানকার’ শব্দটি দ্বারা বোঝানো হয় সেসব কর্মীদের যারা খাবারের বিনিময়ে কায়িক শ্রম দান করে। কেবল খাবারের বিনিময়ে যে জমির ভোগস্বত্ব প্রজাদেরকে দেওয়া হতো সে জমিকেই নানকার জমি বলা হতো। এই নানকার প্রজারা ছিলো ভূমির মালিকের হুকুমদাস; প্রজাই নয় তাদের স্ত্রী-সন্তানরাও বংশানুক্রমে ভূমি মালিকের দাস হতো। সাধারণতঃ নিম্নবর্ণের হিন্দুরাই; যেমন: কিরান, নম-শূদ্র, মালি, ঢুলি, নাপিত, পাটনি প্রভৃতি শ্রেণীর লোকেরাই নানকার শ্রণীর প্রজা ছিল।

বিংশ শতাব্দীর শুরুর ভাগে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতার মাঝখানে গোটা ভারতবর্ষ জুড়ে যে ছোট ছোট আন্দোলন গুলো ভারতবর্ষের মানুষগুলোকে একত্রিত হতে সাহায্য করেছে, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বইপত্র না ঘাঁটলে এসকল আন্দোলনের অধিকাংশই জানাশোনার আড়ালে রয়ে যায়। মধ্যযুগীয় সামন্তবাদী আমলের একটি অর্থনৈতিক সামাজিক ব্যবস্থাকে ঘিরে তৎকালীন সিলেট ও এর পার্শ্ববর্তী জেলাসমূহের তেমনই একটি আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে মূলত “নানকার বিদ্রোহ” নামে, যা পরবর্তীতে স্বাধীন ভারতবর্ষের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনে গরীব কৃষক শ্রেণীর বলিষ্ঠ ভূমিকা গ্রহণে অগ্রদূতের ন্যায় কাজ করে।

যেহেতু বিদ্রোহের ঘটনাক্ষেত্র সিলেট, তাই সিলেট জেলায় নানকার শব্দটির সাথে পরিচিতি থাকলেও বাকি জেলায় তেমন নয়। নান বা ‘রুটি’ থেকেই নানকার শব্দের উৎপত্তি। রুটি দিয়ে যে লোক রাখা হয় তাকেই নানকার বলে। এর অন্যান্য প্রতিশব্দগুলো হচ্ছে, বেগার প্রথা, চাকরান প্রথা ইত্যাদি। সেকালে জমিদারগণ একখণ্ড জমি বরাদ্দ করে নানকারের খোরাক যোগানোর দায়িত্ব শেষ করে ফেলত। জমিই আসলে রুটির অর্থ বহন করত। নানকারকে ক্ষুদ্র একটি ভিটাসহ দু’চার বিঘা জমি বরাদ্দ করা হত। জমি থাকলেই জীবিকা নির্বাহ করা যায়, এটিই ছিল সামন্তবাদী যুগের বিশ্বাস। কিন্তু খোরাকি উৎপাদনে যে শ্রম শক্তি ব্যয় হত তা ছিল মূল্যহীন এভাবে নানকারকে যে জমি বরাদ্দ করা হত, তা হচ্ছে নান (রুটির জন্য) জমি। তাকে খানে (খাবার জন্য) বাড়িও বলা হত। এই ‘নানজমি’ বা ‘খানেবাড়ি’ ভোগ করার পরিবর্তে নানকারদের জমিদারের প্রয়োজনে অনির্দিষ্ট পরিমাণে তার শ্রমশক্তি ব্যয় করতে হত। জমিদার যখনই তার প্রয়োজনানুসারে ডাকত, সশরীরে উপস্থিত হয়ে নানকার হুকুম তামিল করতে বাধ্য ছিল। বিনা মজুরির এই খাটুনিকে বলা হত ‘হদ’ বা ‘বেগারি ‘। একদিকে নানজমি আরেকদিকে বেগারি, এছাড়া নানকার প্রথার কোন প্রান্তে অন্য আর কিছুর আদান প্রদান ছিল না। নানকাররা জমিদারদের প্রজা হিসেবে পরিগণিত হত, খানেবাড়ির প্রজা, হদুয়া প্রজা, বেগার প্রজা, চাকরান প্রজা নানকারদের এসকল নামেই ভূষিত করা হত।

নানকার জমির ক্রয় বিক্রয়, হস্তান্তর, বন্ধকী কোন কিছুই প্রজাদের অধীনে ছিল না। এমনকি স্থায়ী ফল ফসলের বাগানও তাদের অধিকারে ছিল না। জমিতে কোন বড় আকারে গাছ বা মূল্যবান কাঠ উৎপন্ন হলে তা ছিল জমিদারের অধিকারে। অথচ গাছ রোপণ, রক্ষণাবেক্ষণ এমনকি যথাসময়ে ফল আহরণ করে তা জমিদারবাড়িতে পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব ও ছিল নানকার প্রজার। প্রজার অধিকার ছিল কেবল ভিটের মাটিতে। ধান, ডাল, তামাক, তরিতরকারি প্রভৃতি মৌসুমি ফসলের উপর নির্ভর করেই তাকে বেঁচে থাকতে হত। অথচ বিনিময়ে তাকে যে মূল্য দিতে হত, তার সীমানা নির্ধারিত ছিল না। কেউ যদি বিনিময় মূল্য দিতে অস্বীকার করত তার কপালে বরাদ্দ ছিল ভয়াবহ সব শাস্তি। দুটি আস্ত বাঁশের ফাঁকে বা তক্তার তলায় হাত, পা বা আস্ত দেহটা ফেলে দুপাশে চেপে চেপে নাকেমুখে রক্ত বের করা, ছিল অন্যতম। এসব কিছুর মধ্যে কদর্যতম অত্যাচার ছিল জমিদারগণের লাম্পট্য চরিতার্থ করা। স্পষ্টতই নানকার প্রজাদের ঝি বেটিরা সুরক্ষিত ছিল না। কোন জমিদার যেঁ কোন মুহূর্তে তলব করলেই মেয়েদের যেতে হত। নানকার রমণীরা বিনামূল্যে বেশ্যাবৃত্তি গ্রহণে বাধ্য হয়েছিল। চরিত্রহীনতা হয়ে দাঁড়িয়েছিল তৎকালীন সমাজে একটি সাধারণ ব্যাপার। এ কদর্যতার আবেশ নানকার সমাজকেও প্রভাবিত করেছিল। এ অসহনীয় অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পাবার পথ খুঁজে পেতেই প্রথম বিদ্রোহের সূচনা হয়। অসম সাহসিকতার বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা এ সময় “ইতরজনের কাহিনী” বলে ভদ্রসমাজে উপেক্ষিত ছিল। তেমনি একটি ঘটনা লোকমুখে অনেক শোনা যায়।

বাহাদুরপুর জমিদার রইছ মিয়া তার নানকার প্রজা মথুরা ধূপীকে তুচ্ছ এক কারণে জুতাপেটা করলে লাঞ্ছিত প্রজা চুপচাপ কাছারি থেকে বের হয়ে যান। কিন্তু অন্তরে তার প্রতিশোধের আগুন জ্বলতে থাকে। দেখা যায়, জমিদার কাজকর্ম সেরে আহার ও নিদ্রাশেষে বিকেলবেলায় দিঘির পাড়ে কাছারিবাড়ির বারান্দায় আরামকেদারায় শুয়ে হাওয়া খায়। ও সময় তার কাছে চাকরবাকর কেউ থাকে না। যদিও জমিদারের হাকে ডাকে তৎক্ষণাৎ কেউ ছুটে আসার শঙ্কা অজানা নয় তবুও মথুরা সাহস সঞ্চয় করে পরিকল্পনা করে। একদিন সন্ধ্যাবেলা জমিদার উঠি উঠি করছে, এমন সময় আড়াল থেকে ছুটে এসে সে জমিদারেরই জুতাজোড়া হাতে নিয়ে তাকে অকস্মাৎ দু গালে পটাপট আঘাত করে বসল। বিরামহীন ভাবে তারপর সে তার চাষাড়ে হাতের পাদুকাঘাতে জমিদারকে জর্জরিত করে আহত অবস্থায় কাছারি বারান্দায় ফেলে রেখে যায়। পরবর্তীতে জমিদারেরে জ্ঞান ফিরলে আততায়ীকে ধরে আনবার জন্য লোক ছুটলে গিয়ে দেখা যায় মথুরা ধূপী তার পরিবার শুদ্ধ হাওয়া।

নানকার বিদ্রোহের প্রথম রোষাগ্নি প্রজ্বলিত হয় সুখাইড় গ্রামের একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে। সে গ্রামের জমিদার পরিবারের কারণে গোটা গ্রামটা লাম্পট্যের আখড়ায় পরিণত হয়েছিল। গ্রামের এক নানকার রমণীর প্রতি একদিন জমিদারের চোখ পড়ে এবং তাকে সে ডেকে পাঠায়। রমণীটি চিরাচরিত প্রথামত ছুটে না গিয়ে জমিদারের লোককে সেদিন আচ্ছামত দু কথা শুনিয়ে দেয়। প্রতিক্রিয়া স্বরুপ অগ্নিশর্মা হয়ে জমিদার তার লোকবল নিয়ে রমনীটির ঘরে গিয়ে চড়াও হয়। টেনে হিচড়ে তাকে বাড়ি এনে আটক করে রাখে। একে তো এই বর্বর প্রথা নিয়ে গ্রামের মানুষ গুমড়ে মরছিল, তার উপর উক্ত ঘটনায় তাদের চাপা ক্রোধ মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। সকলে ক্ষেপে গিয়ে জমিদার বাড়িতে তাদের যাতায়াত ও কাজকর্ম বন্ধ করে দিয়ে নিজেদের ভিটেমাটি আগলে বসে রইল। জমিদার নিজের গ্রামেই একদম কোণঠাসা হয়ে পড়ল।

সুখাইড় গ্রামের নানকার প্রজাদের সূত্র ধরে পরবর্তীতে এ বিদ্রোহ সুনামগঞ্জ মহকুমা, সিলেট সদর মহকুমা এ সকল জায়গাতেও ছড়িয়ে পড়ে।

১৯২২ থেকে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত কমিউনিস্ট পার্টি ও কৃষক সমিতির সহযোগিতায় সিলেটের বিয়ানীবাজার, গোলাপগঞ্জ, বড়লেখা, কুলাউড়া, বালাগঞ্জ, ধরমপাশা থানার অনেকে নানকার আন্দোলনে অংশ নেয়। নানকার বিদ্রোহের কেন্দ্রভূমি হলো বিয়ানীবাজার থানার শানেশ্বর এলাকা। লাউতা ও বাহাদুরপুরের জমিদারদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে নানকাররা জমিদারদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। কমরেড অজয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে নানকাররা সংগঠিত হলে নানকার আন্দোলন জোরদার হয়ে ওঠে।

১৯৪৭ সালে নানকার আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখন পাকিস্তান সরকার এই আন্দোলন নস্যাৎ করতে চায়। মুসলিম লীগ সরকার ও জমিদাররা নানকারদের ওপর জুলুম-নিপীড়নের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। ষড়যন্ত্র করে হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সৃষ্টি করতে চায়। ১৯৪৯ সালের ১৫ আগস্ট নানকাররা কৃষক সমিতি ও কমিউনিস্ট পার্টির সাহায্যে পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস পালন করে; কিন্তু বিষয়টিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে জমিদাররা পাকিস্তান সরকার ও মুসলমানদের কাছে প্রচার করে যে ১৫ আগস্ট শানেশ্বরে হিন্দু দিবস এবং ভারতের স্বাধীনতা দিবস পালন হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তান সরকার সে এলাকায় পুলিশ ও ইপিআর পাঠিয়ে বিদ্রোহীদের দমনের নির্দেশ দেয়।

১৯৪৯ সালের ১৮ আগস্ট সূর্য ওঠার আগেই তৎকালীন মুসলিম লীগ সরকারের পুলিশ, ইপিআর ও জমিদারদের নিজস্ব পেটোয়া বাহিনী হামলা চালায় শানেশ্বর গ্রামের নানকারদের ওপর। শানেশ্বর ও পাশের উলুউরী গ্রামের নানকাররা ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেশি অস্ত্র নিয়ে শানেশ্বর ও উলুউরী গ্রামের মধ্যবর্তী সুনাই নদীর তীরে বাহিনীর মুখোমুখি হয়। জন্ম নেয় এক নির্মম ইতিহাস। রক্তে রঞ্জিত হয় শানেশ্বরের মাটি আর সুনাই নদীর জল। রণেক্ষেত্রেই নিহত হন ব্রজনাথ দাস (৫০), কুটু মণি দাস (৪৭), প্রসন্ন কুমার দাস (৫০), পবিত্র কুমার দাস (৫০) ও রজনী দাস (৫০)। আহত অমূল্য কুমার দাস (১৭) পরবর্তী সময়ে বন্দি অবস্থায় শহীদ হন। সশস্ত্র বাহিনীর নির্মম নির্যাতনে নানকার আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী অন্তঃসত্ত্বা অর্পণা পাল চৌধুরীর ঘটনাস্থলেই গর্ভপাত ঘটে। ১৯৩৭ সালের নানকার প্রথার বিরুদ্ধে প্রথম যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল তার রক্তাক্ত পরিসমাপ্তি ঘটে শানেশ্বর গ্রামে এসে। ১৯৪৯ সালের ১৮ আগস্ট ছয় কৃষক তাঁদের বুকের তাজা রক্তে পূর্বসূরিদের ঋণ শোধ করেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৫০ সালে সরকার জমিদারি প্রথা বাতিল করে এবং নানকার প্রথা রদ করে কৃষকদের জমির মালিকানার স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়।

এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

Leave a Reply

লেখক

সর্বশেষ সংবাদ

%d bloggers like this: