নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে ডিএনএ প্রযুক্তির সম্ভাবনা, সমস্যা এবং করণীয়

বর্তমান সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতন একটি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।পত্রিকার পাতা খুললেই দেখা যায় শিশু ও নারী নির্যাতন যা আমাদের সমাজের ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। নারী নির্যাতনের মধ্যে যৌন নির্যাতন প্রকট আকারে ধারন করেছে। যার হাত থেকে কয়েক মাসের শিশু থেকে বৃদ্ধ কেউ রক্ষা পাচ্ছে না।

আমাদের সমাজের অধিকাংশ মানুষের অসচেতনতা বা না জানার কারণে অনেক ধর্ষিত নারী তাদের প্রাপ্য আইনী সুযোগ সুবিধা পাওয়ার পরও সঠিক ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তার কিছু কারন নিম্নে তুলে ধরছিঃ

১। যখন কোন নারী বা শিশু ধর্ষনের শিকার হন তখন তারা এটিকে গোপন রাখতে চেষ্টা করেন।
২। অনেক সময় তারা হাসপাতালে ভর্তি হতে চান না অথবা ভর্তি হলেও দেরীতে ভর্তি হয়ে থাকেন।
৩। অনেক ধর্ষিত নারী বা শিশু ধর্ষণের পরে গোসল করে থাকেন তারা জানেন না তাদের অজান্তে তারা ডিএনএ এর নমুনা সমূহ নষ্ট করছেন।
৪। ধর্ষণের ঘটনার সময় পরিহিত ধর্ষিতার বা ভিক্টিমের কাপড় যেমন সালোয়ার, কামিজ, অর্ন্তবাস, বেডসীট ইত্যাদি হল ডিএনএ নমুনার অন্যতম উৎস এগুলো তারা সঠিকভাবে সংরক্ষন করেন না।
৫। আমাদের দেশের অধিকাংশ থানার ধর্ষণ সংক্রান্ত মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার অজ্ঞতা বা না জানার কারণে সঠিক সময়ে ভিকটিমদের ডিএনএ আলামতসমূহ সংরক্ষণের জন্য তাগিদ দেন না ।

বর্তমানে অনেক নারী প্রকৃত ধর্ষিত হওয়ার পরও সঠিক ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারন হল উপরে উল্লেখিত বিষয়সমূহ না জানা বা না মেনে চলা। এমতাবস্তায় আমাদের সমাজের কোথাও যদি যৌন নির্যাতন বা ধর্ষণের ঘটনা ঘটে তাহলে আমাদের উচিত নিম্নের নির্দেশনাগুলি মেনে চলা:

১। যখন কোথাও কোন শিশু বা নারী যৌন নির্যাতনের শিকার হবে তখন যেন ধর্ষিত নারী বা শিশুকে গোসল বা লজ্জাস্থান ধৌত না করে তাকে দ্রুত হাসপাতাল এ ভর্তি করতে হবে বিশেষ করে আমাদের দেশের বিভাগীয় মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এর জরুরী বিভাগে ভর্তি করতে হবে। এটা অবশ্যই ধর্ষণের সময় হতে ৭২ ঘন্টা বা ৩ দিনের মধ্যে অবশ্যই হতে হবে। অনেক সময় দেরীতে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার কারনে যখন ভিক্টিমের কাছ থেকে ভ্যাজাইনাল সোয়াব সংরক্ষণ করা হয় তখন সেই নমুনাতে ধর্ষক সনাক্তকরণের জন্য শুক্রানু অনুপস্থিত থাকে ফরেনসিক টেস্ট করার সময় এটি একটা বড় কারন ধর্ষক সনাক্তকরনের ক্ষেত্রে। এরপর যখন আমরা ডিএনএ টেস্ট করি তখন অধিকাংশ সময় নেগেটিভ রেজাল্ট আসে। এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ভিকটিমের জন্য যার কারণে সে সঠিক বিচার হতে বঞ্চিত হতে পারে। সাধারণত সীমেন বা শুক্রানুর আয়ুষ্কাল ৭২ ঘন্টা বা ৩ দিন। এজন্য ধর্ষিত নারী বা শিশুর জন্য এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যে ধর্ষণের সময় হতে ৭২ ঘন্টার মধ্যে ফরেনসিক পরীক্ষা সম্পূর্ণ করতে হবে। একটু অসচেতনতা বা না জানার কারনে আপনার বা আমার পাশে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্খিত এই ধর্ষণ মামলার সঠিক বিচার হতে বঞ্চিত হতে পারে আপনার বা আমার বোন বা মা। আর প্রকান্তরে ধর্ষক প্রকৃত অপরাধ করার পরও শাস্তি পায় না।

২। আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ জানে না যে ধর্ষণের ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ অথাৎ ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয় ধর্ষিতার পরিহিত সালোয়ার, কামিজ বা বেডসীট ইত্যাদি হতে। অনেক সময় তারা এগুলো ধৌত করে ফেলেন এবং সঠিকভাবে সংরক্ষণ করে রাখেন না। উপরোক্ত এই দুটি বিষয়ের জন্য একজন নারী বঞ্চিত হতে পারে তার ন্যায় বিচার হতে।

৩। আমাদের দেশের অধিকাংশ তদন্তকারী কর্মকর্তা জানেন না ডিএনএ পরীক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়সমূহ যার কারণে তারা অনেকসময় নিজ উদ্যোগে ভিকটিমদের এ বিষয়গুলো বলেন না, এজন্য আমাদের সরকারের উচিত দেশের প্রত্যেকটি থানার যারা ধর্ষণ, পিতৃত্ব, মাতৃত্ব বা ডিএনএ সংক্রান্ত মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন তাদেরকে ডিএনএ পরীক্ষার বিষয়ে বিস্তারিত প্রশিক্ষণ দেওয়া যেমন ডিএনএ পরীক্ষা কি, কোথায় থাকে ডিএনএ নমুনা বা আলামত, কিভাবে সংরক্ষণ করতে হয়, ডিএনএ নমুনা সংরক্ষণের পদ্ধতি, কত সময়ের মধ্যে ধর্ষিত নারী ও শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে ইত্যাদি।

৪। অনেক সময় দেখা যায় তদন্তকারী কর্মকর্তা যখন ডিএনএ নমুনাসমূহ আমাদের কাছে প্রেরণ করেন ডিএনএ টেস্ট করার জন্য সেটা পলিথিন ব্যাগে সংগ্রহ করে থাকেন। যার কারণে ডিএনএ এর নমুণার গুনগত মান নষ্ট হয়ে যায়। অনেক সময় ভেজা অবস্থায় কাপড় সমূহ পলিথিন ব্যাগে ভরে রাখে যার ফলে সেটা ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক দ্বারা আক্রান্ত হয়ে ডিএনএ নমুণাসমূহ নষ্ট হয়ে যায়। এজন্য যখন ডিএনএ আলামত যেমন, সালোয়ার, কামিজ, অর্ন্তবাস, বেডসীট বা অন্যান্য আনুসঙ্গিক কাপড়সমূহ ভিকটিম এর কাছ থেকে জব্দ করবে তখন অবশ্যই কাগজের খাম বা বাঁশ কাগজের খামে রাখতে হবে। ভেজা থাকলে নরমাল বাতাসে শুকায়ে কাগজের খামের মধ্যে রেখে ডিএনএ ল্যাবরেটরীতে পাঠাতে হবে। রোদে শুকানো যাবে না বা আলোতে রাখা যাবে না, আলামত সমূহ নরমাল তাপমাত্রাতে রাখতে হবে।
আমাদের দেশের যে সমস্ত জায়গায় ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়। দেশের প্রত্যেকটি বিভাগীয় ডিএনএ স্ক্রিনিং ল্যাবরেটরীতে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে থাকে। যেমন ঢাকা, রাজশাহী, চিটাগাং, খুলনা, সিলেট, বরিশাল, রংপুর, ফরিদপুর এ অবস্থিত মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। আমাদের দেশের যে সমস্ত নারী সংগঠন রয়েছে তারাও নারীদের এ বিষয়ে সচেতন করতে পারেন বিভিন্ন সভা, সেমিনার ইত্যাদির মাধ্যমে।

সর্বোপরি আমি মনে করি একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের প্রত্যেকের উচিত এ বিষয়ে জানলে তা অপরকে জানানো। এভাবেই আমরা নিজেরা সচেতন হয়েই প্রকৃত ধর্ষকদের সনাক্ত এবং শাস্তি দেওয়ার মাধ্যমে নারী ও শিশু নির্যাতনমুক্ত একটি সমাজ বিনির্মাণ করতে পারি।

লেখক।।
রবিউল ইসলাম
বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা
বিভাগীয় ডিএনএ স্ক্রিনিং ল্যাবরেটরী,
ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল,
মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়, ঢাকা, বাংলাদেশ।
E-mail: [email protected]

এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

Leave a Reply

লেখক

সর্বশেষ সংবাদ

%d bloggers like this: