পদ্মার বুকের মানুষ

পদ্মার বুকের মানুষ

পদ্মাার সুবিশাল দেহের উপরে অবস্থিত গনেশপুর গ্রাম। পদ্মার কচি লতার মতো দেহটা একেঁ-বেকেঁ বয়ে, গ্রামটাকে অন্য গ্রাম থেকে আলাদা করেছে। পদ্মার পানিতে সূর্যের আলো পড়লে, হীড়ার দানা দিয়ে গ্রামটাকে মালাতে সাজায়। যা গ্রামটাকে অপরূপ সৌন্দর্যে সাজিয়েছে। নদীটিও নিজেকে নিরীহ অপরূপা, সুন্দরী ললনার পায়ের নুপুর হিসাবে প্রকাশ করেছে। ক্লান্ত রাত শেষে ললনা যখন নদীর শিশির ভেজা বালুর পথে হাটা দেয়, তখন নুপুরটা আপন মনে সুর তুলে তাল মেলায় ললনার সাথে। সেই সুরে মুগ্ধ হয়ে গ্রাম প্রহরিরা নৌকায় পাড়ি জমায় নদীতে। নদী থেকে নদীতে হীড়া খোঁজে চলে, তা দিয়ে ধনীদের মালা তৈরি করে দিতে। এভাবে সূর্যের আগমনকে স্বাগতম জানিয়ে পাড়ি জমায় পদ্মার সুবিশাল দেহ পেরিয়ে, কাঞ্চনপুর হাটে। হাটটা খুবই উন্নত। ধনীদের পদচারণা ধন্য করেছে হাটটাকে। ধনীদের শাষনের ফুলকি আলোকিত করেছে কাঞ্চনপুরকে।

যাইহোক গনেশপুর গ্রামে ফেরা যাক। তা না হলে গ্রামটাকে অবহেলা করা হবে। গ্রামটা এমনিতেই অনেক অবহেলিত। পদ্মার কোল ঘেষে দাড়িয়ে গ্রামটা। মাঝে মাঝে চঞ্চল, অস্থির পদ্মার সুবিশাল বুকের হাহাকার মেটাতে,পদ্মাবাসিরা নিজেদের স্ত্রী-সন্তানদেরকে বিলিয়ে দেয় পদ্মার বুকে। গত বছর দিলীপ তার সবকিছু বিলিয়ে তুষ্ট করেছে পদ্মাকে। ভরিয়েছে পদ্মার খালি বুকটাকে। শান্ত করেছে অশান্ত পদ্মাকে। এরকম অনেক দিলীপ পদ্মার কোলে শুয়ে ডুবেছে স্বপ্নের নদীতে। জানি না তাদের স্বপ্নের ইতি হবে কি ? দিলীপ এ গ্রামেরই বাসিন্দা। তবে কবে থেকে ? কিভাবে ? কেউ তা জানে না। হয়তো পদ্মা মা তার কোল থেকে তাকে নামিয়ে দিয়েছে। কিন্তু কখন ? সে তো অনেক দিন হলো এখানে রয়েছে। তার শক্ত ইস্পাতের দেহে মরিচা ধরেছে। অনেক নাট-বল্টু ঢিলা হয়ে পড়েছে। নুয়ে পড়েছে শরীরটা। কিন্তু জীবন যুদ্ধে তার ছুটি মেলে নি।

কয়েক বর্ষা আগের কথা। দিলীপ জীবন যুদ্ধের একজন শক্তিশালী সুঠাম কাঠামোর সৈনিক ছিল। তার একটি মাত্র সহায়। তার স্ত্রী মধুমালা । আর ছোট একটা গোয়াল। মানে তার একটা মাত্র ঘর। ঘরের মধ্যে নানা প্রয়োজনীয় জিনিস ঘরটাকে গোয়াল বানিয়েছে। ঘরের একপাশে খড়ির মাঁচা। বর্ষাকালে খড়ির খুব আকাল পড়ে। তাই মধুমালা সাধ্যমতো তার কিছু নিজ বুকে ধারন করে রেখেছে। জানে না সে কতদিন এই পাহাড়টাকে, তার বুকে ধারন করতে হবে। ঘরটা যেন তার বুক। ঘরের এককোণে দিলীপের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্বল। ছোট একটা কাটের বাক্স। তাতে কিছু কলম আর কালি। যার খোঁচায় সে মানুষের জুতা সারায় করে। নদীর পারের ঘাটে সে প্রতিদিন সময় দেয় নিজ জীবিকার সন্ধানে। দিনকাল ভালই কাটছিল। ভাল বলতে, তারা তো খারাপ শব্দটাকেই জানতো না। হটাৎ একদিন খারাপ শব্দটাই নিজে থেকে তাদের সন্ধানে চলে আসে।

সকাল বেলা। দিলীপ বাড়ি থেকে বের হয়ে দেখল, অনেক লোকের ভিড়। তার মধ্যে সভ্যতার জনকদের ছোট একটা মিছিল। দিলীপ পা বাড়ায় সে ধারায়। একজন কথা বলা শুরু করে। উনি নাকি স্থানীয় এমপি। দিলীপ ভাবে সেটা আবার কি ? কখনো তো একে দেখে নি। একবার শুধু ভোট না কি যেন একটা শব্দ শুনেছিল। সে মনোযোগ দিয়ে শুনতে থাকে, এমপি সাহেবের কথা। এমপি সাহেব কথা বলা শুরু করেন-“গ্রামটা আর অবহেলিত থাকবে না। উন্নয়নের জোঁয়ার বইবে এখানে। তৈরি হবে বিশাল এক সেতু। যার সাহায্যে গ্রামবাসীরা সহজেই শহরে যেতে পারবে। গ্রামটাও উন্নত সুযোগ সুবিধা পাবে।” তাতে সবাইকে সেতুটার জন্যে, একটু জমি দান করতে হবে। অবশ্য এর জন্য সবাই অন্য জায়গায় জমি পাবে। সাথে কিছু টাকা পাবে, যা টাকাটা ঘর তৈরির কাজে ব্যবহার করতে পারবে। ভদ্রলোকের কথা বলে, কথা। কেউ তো আর না করতে পারে না। সবাই রাজি হয়ে গেল। দিলীপ অবশ্য প্রথমে রাজি ছিল না। কিন্তু পরে অনিচ্ছা সত্ত্বেও রাজি হল। প্রথমে পদ্মার পাড়ে জন্মানো চরেই তাদের ঘর তৈরি করে দেওয়া হলো। আর বলা হলো বর্ষার আগেই অন্যত্র, ভাল জায়গায় সরে নেওয়া হবে। সবাই কিছু কিছু টাকা পেল। কিন্তু কত ? সেটা না বলাই শ্রেয়। তবে কেউ নিরাশ হলো না। আপন ইচ্ছায় টিপ দিল সভ্যতার ইতিহাস পত্রে। বালু , রড, সিমেন্ট সবই আসল। সবাই বাষ্প আশায় স্বপ্ন উড়তে দেখতে শুরু করল। কিন্তু বাষ্প জমাট বাধার পূর্বে হাওয়াই বাষ্প হয়ে গেল। সেখানে সেঁতু তৈরি হলো না। তৈরি হলো এক অন্য সেতু, যা ধনীদের সাথে ধনী শব্দটার যোগাযোগ ঘটায়। তৈরি হলো এক বিশাল কারখানা। এমপি সাহেব আর জায়গা দর্শনে আসার প্রয়োজান বোধ করলেন না।


আরও পড়ুন>>


বর্ষাও দিলীপদের এ আহম্মকির প্রতি রাগান্বিত হয়ে, অভিশাপের মতো আছড়ে পড়ে ওদের উপর। পদ্মাও সে ধারাই উন্মাদ হলো। নিজের অশান্ত খালি বুকটাকে ভরাতে কেড়ে নিল সবকিছু। সঙ্গে কেড়ে নেয় দিলীপের শেষ সম্বল মধুমালাকে। এভাবে পদ্মা আশ্রয় দেয়, আবার তা কেড়েও নেয়। দেওয়া নেওয়ার খেলা চলে। দিলীপ একটুও দুঃখ পেল না। দুঃখ বইতে বইতে সে ক্লান্ত। তাছাড়া সত্যি বলতে দুঃখ তাকে এতটা আলিঙ্গন করেছে যে আবারও আলিঙ্গন করতে লজ্জা বোধ করল। দিলীপ কারো প্রতি অভিযোগ তুললো না। তুলেই লাভ কি ? বিচার তো সবার পৈত্তিক সম্পত্তি না, যে সবাই তা ব্যবহার করবে। দিলীপকে দেখা যায় সেই নদীর ধারের ঘাটে। আর কাজ করতে পারে না। অন্যদের দয়াই তার জিবীকা চলে। মাঝে মাঝে দু-এক বেলা উপোস করতে হয়। তাতে আর কি ? সৃষ্টিকর্তা হয়তো তার বেশির ভাগ সুখের বরাদ্দ করেছেন ওপারের জন্য ।

লেখক: নাজির উদ্দিন

বি এ অনার্স, এম এ ইংরেজি( অধ্যয়নরত)

আজিজুল হক কলেজ, বগুড়া।

এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

Leave a Reply

লেখক

সর্বশেষ সংবাদ

কুষ্টিয়ায় দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে বিষাক্ত অ্যালকোহল পানে মৃত্যু: ৩

কুষ্টিয়া প্রতিনিধি।। কুষ্টিয়ায় পৃথক স্থানে বিষাক্ত অ্যালকোহল পানে তিন হিন্দু যুবকের মৃত্যু হয়েছে। এলাকাবাসী জানায়, শারদীয় দূর্গাপুজা উপলক্ষ্যে গেল রাতে এরা অ্যালকোহল পান করে। কুষ্টিয়া...

শরীয়তপুরে কিছুতেই থামছেনা মা ইলিশ শিকার: ৭৩ জেলের কারাদন্ড

ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে শরীয়তপুরে পদ্মা নদীতে কিছুতেই থামানো যাচ্ছেনা মা ইলিশ শিকার। জেল জরিমানা উপেক্ষা করে জেলেরা নদীতে মাছ শিকারে যেন হামলে পড়েছে। জেলা...

লালমনিরহাটের পাটগ্রামে সড়ক দুর্ঘটনায় ব্যবসায়ির মৃত্যু

এস এম আলতাফ হোসাইন সুমন, লালমনিরহাট জেলা প্রতিনিধি।। লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলায় ট্রাকের সাথে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় গোলাম কিবরিয়া ( ৫৫) নামের এক ব্যবসায়ির মৃত্যু হয়েছে। মঙ্গলবার (২৭...

লক্ষ্মীপুরে সাংবাদিকদের মাঝে প্রধানমন্ত্রী আর্থিক সহায়তার চেক বিতরন

লক্ষ্মীপুরে করোনা কালিন সময়ে ক্ষতিগ্রস্থ সাংবাদিকদের মাঝে প্রধানমন্ত্রীর আর্থিক সহায়তার চেক বিতরন করা হয়। ২৮ অক্টোবর (বুধবার) সকালে সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের সহযোগীতায় এবং জেলা প্রশাসনের...
%d bloggers like this: