পুতিনের ঘনিষ্ঠ ৯ অলিগার্কের রহস্যজনক মৃত্যু

- Advertisement -

চলতি বছর রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ঘনিষ্ঠ অন্তত ৯ অলিগার্ক ছাড়াও দেশটির শীর্ষ কয়েকজন কর্মকর্তার রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে। তাদের কেউ লাক্সারি প্রমোদতরী থেকে আবার কেউ হাসপাতালের জানালা দিয়ে পড়ে মারা গেছেন। অনেকে আবার আত্মহত্যা করেছেন বলেও দাবি করা হচ্ছে। যাদের অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে তাদের সবাই অলিগার্ক বা রুশ ধনকুবের হিসেবেই পরিচিত।

অলিগার্কের মৃত্যু

রুশ গণমাধ্যম বলছে, চলতি বছর অন্তত ৯ খ্যাতিমান রুশ ব্যবসায়ীর রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে। তাদের সবাই আত্মহত্যা বা দুর্ঘটনায় মারা গেছেন বলে উল্লেখ করা হয়। এদের মধ্যে ছয়জন রাশিয়ার রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত জ্বালানি সংস্থায় কাজ করতেন। ছয়জনের মধ্যে আবার চারজন রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন জ্বালানি প্রতিষ্ঠান গ্যাজপ্রম ও এর একটি সহযোগী সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বাকি দুজন রাশিয়ার বৃহত্তম ব্যক্তিগত মালিকানাধীন তেল ও গ্যাস কোম্পানি লুকওয়েলে কাজ করতেন বলে জানিয়েছে মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএন।

সের্গেই প্রোটোসেনিয়া
রুশ জ্বালানি জায়ান্ট নোভাটেকের সাবেক শীর্ষ ব্যবস্থাপক ছিলেন সের্গেই প্রোটোসেনিয়া। ১৭ এপ্রিল স্পেনে একটি ভিলায় স্ত্রী ও মেয়ের সঙ্গে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সেখানে ইস্টারের ছুটি কাটাচ্ছিলেন বলে বিভিন্ন খবরে বলা হয়েছে। কাতালোনিয়া পুলিশ ৫৫ বছর বয়সী এই ধনকুবেরের লাশ বাগানে ঝুলন্ত অবস্থায় উদ্ধার করেছে। তার স্ত্রী ও মেয়েকে বিছানায় ছুরিকাঘাতের জখমে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। প্রোটোসেনিয়ার মরদেহের পাশে একটি কুড়াল ও ছুরি পাওয়া যায়। পুলিশের দাবি স্ত্রী ও মেয়েকে হত্যার পর আত্মহত্যা করেছেন প্রোটোসেনিয়া অথবা পুরো পরিবারকে হত্যার পর এটিকে হত্যার পর আত্মহত্যা হিসেবে সাজানো হয়েছে। নোভাটেক রাশিয়ায় প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদনে দ্বিতীয় বৃহত্তম কোম্পানি।

ভ্লাদিস্লাভ আভায়েভ
স্পেনে প্রোটোসেনিয়ার মরদেহ উদ্ধারের একদিন পর ১৮ এপ্রিল গ্যাজপ্রম ব্যাংকের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিস্লাভ আভায়েভের মরদেহ মস্কোর কোটি ডলারের বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। একই বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয় তার স্ত্রী ও মেয়ের মরদেহ। কয়েক দিন ধরে যোগাযোগ করতে না পারা আভায়েভের এক আত্মীয় তাদের মরদেহ প্রথম দেখতে পান। আভায়েভের হাতে একটি পিস্তল পাওয়া গেছে বলে জানায় গণমাধ্যম। পুলিশের ধারণা, নিজের স্ত্রী ও ১৩ বছরের মেয়েকে হত্যার পর আত্মহত্যা করেছেন তিনি। বেসরকারি মালিকানাধীন গ্যাজপ্রম ব্যাংক সম্পদের হিসাবে রাশিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম ব্যাংক।

ভাসিলি মেলনিকভ
গত ২৪ মার্চ রুশ দৈনিক পত্রিকা কমারসান্ট এক প্রতিবেদনে জানায়, ধনকুবের ভাসিলি মেলনিকভের মরদেহ তার বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট থেকে উদ্ধার করা হয়। তিনি মেডস্টম মেডিক্যাল সংস্থায় কাজ করতেন। তার সঙ্গে স্ত্রী গ্যালিনা ও দুই ছেলের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তাদের সবার মৃত্যু হয়েছে ছুরিকাঘাতে এবং ঘটনাস্থলে হত্যায় ব্যবহৃত ছুরি পাওয়া গেছে। তদন্তকারীরা জানান, ৪১ বছর বয়সী স্ত্রী এবং ১০ ও ৪ বছরের দুই ছেলেকে হত্যার পর আত্মহত্যা করেছেন মেলনিকভ। কিন্তু প্রতিবেশী ও আত্মীয়রা এমন ব্যাখ্যা মানতে নারাজ। মেলনিকভের কোম্পানি পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ব্যাপক ক্ষতির মুখে ছিল বলে জানিয়েছে গণমাধ্যম। পুলিশ বাইরের হস্তক্ষেপ বা ধস্তাধস্তির কোনো চিহ্ন পায়নি মেলনিকভের অ্যাপার্টমেন্টে। ছেলেদের মরদেহ তাদের কক্ষে এবং মেলনিকভের স্ত্রীর মরদেহ বেডরুমে পাওয়া গেছে। বাথরুমে পাওয়া গেছে মেলনিকভের মরদেহ।

মিখাইল ওয়াটফর্ড
ইউক্রেনীয় বংশোদ্ভুত ধনকুবের মিখাইল ওয়াটফর্ডের মরদেহ গেল ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাজ্যের সারেতে নিজ বাড়িতে উদ্ধার করা হয়। ১৯৫৫ সালে সোভিয়েত ইউক্রেনে জন্ম নেওয়া টলস্তোশেয়া নিজের নাম পাল্টে ফেলেন। তেল ও গ্যাস ব্যবসা থেকে বিপুল অর্থ অর্জন করেন তিনি। গ্যারেজে ঝুলন্ত অবস্থায় তার মরদেহ প্রথম দেখতে পান একজন মালি। সারে পুলিশ বলছে, তার মৃত্যুর ঘটনা সন্দেহজনক নয়।

আলেক্সান্ডার তাইয়ুলিয়াকভ
২৫ ফেব্রুয়ারি গ্যাজপ্রমের ইউনিফায়েড সেটেলমেন্ট সেন্টার ফর করপোরেট সিকিউরিটির উপমহাপরিচালক আলেক্সান্ডার তাইয়ুলিয়াকভের মরদেহ সেন্ট পিটার্সবার্গের একটি কটেজে উদ্ধার করা হয়। গ্যারেজে ঝুলন্ত অবস্থায় তার মরদেহ পাওয়া যায়। তার মরদেহের পাশে একটি চিরকুট পায় পুলিশ। তদন্তকারীদের ধারণা, এই রুশ ধনকুবের আত্মহত্যা করেছেন।

লিওনিদ শুলম্যান
জানুয়ারিতে রুশ জ্বালানি জায়ান্ট গ্যাজপ্রমের শীর্ষ ব্যবস্থাপক লিওনিদ শুলম্যানের মরদেহ লেনিনগ্রাদ অঞ্চলে উদ্ধার করা হয়। গ্যাজপ্রম ইনভেস্ট জানিয়েছে, তারা শুলম্যানের মৃত্যুর ঘটনা তদন্ত করছে। একটি কটেজের বাথরুমে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পাশে পাওয়া একটি চিরকুটের কারণে পুলিশের ধারণা তিনি আত্মহত্যা করেছেন। রুশ সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, মৃত্যুর সময় শুলম্যান অসুস্থ ছিলেন।

ইভান পেচোরিন
সবশেষ ১২ সেপ্টেবর রাশিয়ার ভ্লাদিভোস্টকে রুশ ব্যবসায়ী ইভান পেচোরিনের মৃতদেহ পাওয়া গেছে। তিনি করপোরেশন ফর দ্য ডেভেলপমেন্ট অব দ্য ফার ইস্ট অ্যান্ড আর্কটিকের শীর্ষ ব্যবস্থাপক। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আরআইএ নভোস্তির মতে, ভ্লাদিভোস্টকের প্রশাসন জানিয়েছে, বেরেগোভো গ্রামের কাছে একটি মৃতদেহ পাওয়া গেছে। আঞ্চলিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পেচোরিন ১০ সেপ্টেম্বর ভ্লাদিভোস্টকের কেপ ইগনাতিয়েভের কাছে ডুবে যায়। এই বছরের শুরুর দিকে, সংস্থাটি ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধের বিরুদ্ধে কথা বলে জনসাধারণের মধ্যে আলোচনার সৃষ্টি করেছিল। তারা ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি সহানুভূতি এবং সংঘাতের অবসানের আহ্বান জানিয়েছিল।

হত্যা না আত্মহত্যা?
চলতি বছরের শুরুর দিকে, রাশিয়ার তেল ও গ্যাস কোম্পানি লুকওয়েল ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলো বলে জানিয়েছে সিএনএন। সে সময় ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি সহানুভূতি এবং সংঘাতের অবসানের আহ্বান জানায় লুকওয়েল। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা তাস জানায়, লুকওয়েলের চেয়ারম্যান রাভিল ম্যাগানভ চলতি মাসের শুরুতে মস্কোর একটি হাসপাতালের জানালা থেকে পড়ে মারা যান। লুকওয়েলের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। যেখানে বলা হয় ম্যাগানভ গুরুতর অসুস্থতার পর পরে গিয়ে মারা গেছেন তিনি। তবে কীভাবে পড়েছেন তার উল্লেখ করা হয়নি। ওয়েবসাইটের বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ম্যাগানভ শুধু কোম্পানির নয় গোটা রাশিয়ান তেল ও গ্যাস সেক্টরের উন্নয়নে ব্যাপকভাবে অবদান রেখেছেন। এর আগে গেল মে মাসে লুকওয়েলের ম্যানেজার আলেকজান্ডার সাববোটিনেরও রহস্যজনক মৃত্যু হয়। মস্কোর কাছ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিনি একজন ধর্মীয় গুরুর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন বলে জানায় গণমাধ্যম তাস। ওই ঘটনায় তদন্ত শুরু করেছে রাশিয়ার পুলিশ।

অলিগার্কদের প্রতি পশ্চিমা অবরোধ
রুশ ধনকুবেরদের রহস্যজনক মৃত্যুর সঙ্গে পুতিন জড়িত থাকতে পারেন বলে অনেকে সন্দেহ প্রকাশ করলেও ওলিগার্কদের প্রতি কঠোর অবস্থানের কারণে অনেকেই আবার পশ্চিমাদের দিকেও সন্দেহের আঙুল তুলছেন। রাশিয়া, ইউক্রেন এবং পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে সংঘাতের জেরে আন্তর্জাতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠে রাশিয়ার অলিগার্করা। রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা চালানোর পর পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার বেশকিছু ব্যাংক এবং পুতিনের ঘনিষ্ঠ সহচর হিসেবে পরিচিত অলিগার্কদের অর্থ লেনদেনের ওপর অবরোধ আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা। শুধু তাই নয় গেল মার্চে রুশ ধনকুবেরের বিলাসবহুল ইয়ট জব্দ করে ইতালি। আরটির প্রতিবেদনে বলা হয়, ইয়টটির মালিক রাশিয়ার ধনকুবের আন্দ্রে মেলনিচেঙ্কো।

এর দাম ৫৭ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলার। ইউক্রেনে মস্কোর সামরিক অভিযানের জেরে রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এতে অনেক রুশ ধনকুবেরের পাশাপাশি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানও নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ে। রাশিয়ার ধনকুবের আন্দ্রে মেলনিচেঙ্কোও এই তালিকায় রয়েছেন। এর আগে গত মাসে ৬০ কোটি মার্কিন ডলার মূল্যের একটি ইয়ট জব্দ করে জার্মানি।

এটির মালিক রুশ ধনকুবের আলিসার উসমানোভ। তিনিও ইইউ নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রয়েছেন।তাই অলিগার্কদের মৃত্যু রহস্য কী তা এখনো পরিষ্কার নয়। পুতিনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ায় অলিগার্কদের হত্যা করা হচ্ছে না কি পশ্চিমারা এর সঙ্গে দায়ী সময়ই হয়তো বলে দেবে।

এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

Leave a Reply

প্রতিবেদক

সর্বশেষ সংবাদ