ফার্স্ট লেডি জিল বাইডেন যেখানে অনন্য

যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি হয়ে হোয়াইট হাউসে গিয়েও নিজের শিক্ষকতার ক্যারিয়ার বিসর্জন দিচ্ছেন না নতুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের স্ত্রী ড. জিল বাইডেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের চারটি ডিগ্রিধারী জিল বাইডেন সবসময়ই জোর দিয়ে বলে এসেছেন, তাঁর স্বামী বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাজনীতিবিদ হলেও তিনি কমিউনিটি কলেজে অধ্যাপনা চালিয়ে যাবেন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দি ইনডিপেনডেন্ট এ খবর জানিয়েছে।

আলোচিত মার্কিন নির্বাচনের পর এবার আরো অনেক কিছুর মতো নতুন ইতিহাস তৈরি করছেন জিল বাইডেন। ফার্স্ট লেডি হয়েও জিল বাইডেন হোয়াইট হাউসের দায়িত্বের বাইরে পূর্ণকালীন পেশাজীবন রাখছেন।

এর আগে গত নভেম্বরে সিবিএস নিউজকে জিল বলেছিলেন, ‘আমরা যদি হোয়াইট হাউসে যাই, আমি অধ্যাপনা চালিয়ে যাব। এটা গুরুত্বপূর্ণ, আর আমি চাই মানুষ শিক্ষকদের মূল্যায়ন করুক এবং তাঁদের অবদানের কথা জানুক, এই পেশার সঠিক মর্যাদা দিক।’

নতুন মার্কিন ফার্স্ট লেডি সম্পর্কে কতটা কী জানা যাচ্ছে, তা এনটিভি অনলাইনের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।


আরও পড়ুন>>


শিক্ষিকা ছিলেন, থাকবেন

নির্বাচনি প্রচারের সময়ই জিল জানিয়ে দিয়েছিলেন, তিনি নর্দার্ন ভার্জিনিয়া কমিউনিটি কলেজের ইংরেজির অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যাবেন। কলেজে শিক্ষার্থীদের কাছে জিল একজন কড়া কিন্তু সঠিক মূল্যায়নকারী শিক্ষক হিসেবে পরিচিত।

ইউনিভার্সিটি অব ডেলাওয়ার থেকে ২০০৭ সালে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন জিল। এরপর থেকে তিনি কমিউনিটি কলেজগুলোতে শিক্ষার্থীদের ধরে রাখার বিষয়ে মনোযোগ দেন।

শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে নেওয়া জিল বাইডেনের ইংরেজি ও শিক্ষা বিষয়ে দুটি স্নাতকোত্তর ডিগ্রি রয়েছে।

স্বামীর নিরাপত্তায় জিল

অধ্যাপক জিল বাইডেনের আরেকটি পরিচয় রয়েছে। তিনি স্বামী বাইডেনের নিরাপত্তার একজন যোগ্য রক্ষাকারীও বটে। জিল সমাবেশে বাধা সৃষ্টিকারীদের ঠেকানো এবং তাদের বাইরে বের করে দেওয়ার কাজে স্বেচ্ছাসেবীদের সহায়তা করেছেন।

গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে নিউ হ্যাম্পশায়ারে একটি অনুষ্ঠানে এক ব্যক্তি জো বাইডেনের সামনে বাধা হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিলেন। ধাক্কা মেরে ওই ব্যক্তিকে সরিয়ে দেন জিল বাইডেন।

ওই ঘটনার পর জিল স্মিত হেসে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি ফিলির (ফিলাডেলফিয়ার বাসিন্দা) ভালো মেয়ে।’

এরপর গত মার্চে লস অ্যাঞ্জেলসে এক সমাবেশে দুই বিক্ষোভকারী বাইডেনের ওপর চড়াও হওয়ার চেষ্টা করলে সেবারও এগিয়ে আসেন জিল। তবে এখন বোধ হয় জিলকে আর সেরকম কিছু করতে হবে না। কারণ এখন তো প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের নিরাপত্তার সব দায়িত্ব সিক্রেট সার্ভিসের সদস্যেরাই দেখভাল করবেন।


আরও পড়ুন>>


হোয়াইট হাউসে প্রত্যাবর্তন

হোয়াইট হাউসে এবারই প্রথম আসেননি অধ্যাপক জিল বাইডেন। কারণ, সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার পুরো মেয়াদজুড়ে জিল ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সেকেন্ড লেডি। সেই সময়ও শিক্ষকতা চালিয়ে গেছেন জিল বাইডেন।

সেকেন্ড লেডি হিসেবে হোয়াইট হাউসে যাওয়ার পর সর্বশেষ ফার্স্ট লেডি হয়েছিলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশের স্ত্রী বারবারা বুশ, ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৩ সালে।

সেকেন্ড লেডি হিসেবে দ্বিতীয় দফায় দায়িত্ব পালনের সময় নারীদের বিভিন্ন সমস্যা, স্তন ক্যানসার থেকে সুরক্ষা, শিক্ষা ও কমিউনিটি কলেজের গুরুত্ব তুলে ধরা এবং সামরিক বাহিনীর পরিবারের সদস্যদের সহায়তায় কাজ করেছেন জিল।

জো আর জিলের পরিচয় যেভাবে

১৯৭২ সালে গাড়ি দুর্ঘটনায় জো বাইডেনের স্ত্রী নেইলিয়া ও শিশুকন্যা নাওমির মৃত্যু হয়। দুই ছোট ছেলেকে নিয়ে একা হয়ে পড়েন বাইডেন।

তিন বছর পর জিল জ্যাকবসের সঙ্গে পরিচয় হয় বাইডেনের। সেই সময় জো বাইডেন যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর, আর জিল ছিলেন কলেজের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক। জিলেরও আগে একবার বিয়ে হয়েছিল।

১৯৫১ সালে জন্ম নেওয়া জিল জ্যাকবস পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যের ফিলাডেলফিয়াতে বেড়ে ওঠেন। প্রথম স্বামীর সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদের প্রক্রিয়া যখন চলছে, তখনই জো বাইডেনের সঙ্গে দেখা হয় তাঁর। বাইডেন তখন মার্কিন সিনেটর। এরপর ১৯৭৭ সালে বাইডেনকে বিয়ে করে তাঁর দুই ছেলে হান্টার ও বিউকে কোলে তুলে নেন জিল। আর ১৯৮১ সালে জিল ও বাইডেনের ঘরে জন্ম নেয় কন্যা অ্যাশলে।

স্মৃতিচারণায় ২০০৭ সালে জো বাইডেন লেখেন, ‘সে (জিল) আমার জীবন ফিরিয়ে দিয়েছে। আবার নতুন করে পরিবার শুরু করার ব্যাপারে ও আমাকে ভাবতে শিখিয়েছে।’

জিল বাইডেন ভোগ ম্যাগাজিনকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আমাদের প্রথম ডেটিংয়ের দিন (সিনেমা দেখতে যাওয়া) জো বাইডেন একটি স্পোর্ট কোট আর লোফার জুতা পরে এসেছিল। আমি ভেবেছিলাম, হায় ঈশ্বর, কোনো কিছু হবে না, কোনো দিন এখানে (বাইডেনের সঙ্গে) সম্পর্ক হবে না। তিনি আমার চেয়ে নয় বছরের বড়।’

কিন্তু এরপর এই যুগলের সম্পর্কটা যেন তৈরি হয়ে যায়। সেই রাতের শেষে বিদায়ের সময় জিলের সঙ্গে করমর্দন করে বিদায় নেন জো বাইডেন।

মধ্যরাতে মাকে ফোন করে জিল বলেন, ‘মা, আমি অবশেষে একজন ভদ্রলোককে খুঁজে পেয়েছি।’

তবে এর পরও বিয়েতে জিলের সম্মতি পেতে জো বাইডেনকে অন্তত পাঁচ দফা চেষ্টা করতে হয়েছে। জিল প্রতিবারই বলেছেন, ‘এখনি নয়’, কারণ তিনি শতভাগ নিশ্চিত হতে চেয়েছিলেন যেন বিয়েটা বাইডেনের দুই ছেলে হান্টার আর বিউর জন্য ইতিবাচক কিছু হয়।

১৯৭৭ সালের জুনে নিউইয়র্কে ইউনাইটেড ন্যাশনস চ্যাপেলে জো-জিলের বিয়ে হয়। বিয়ের অনুষ্ঠানে জো বাইডেনের দুই ছেলেই উপস্থিত ছিল।

পরিবার সামলেই দুটি স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন জিল বাইডেন। এরপর পিএইচডি করে তিনি নর্দার্ন ভার্জিনিয়া কমিউনিটি কলেজে শিক্ষকতা শুরু করেন। এরপর আট বছর বাইডেনের ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে সন্তুষ্ট থাকা, ক্যানসারে ছেলে বিউ বাইডেনের মৃত্যু, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচার—সবকিছুতেই জো বাইডেনের হাতে হাত রেখে পাশে আছেন জিল বাইডেন। আর এবার হোয়াইট হাউসেও বাইডেনের হাত ধরে তিনি এখন যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি।

ড. জিল বাইডেন ‘সাদামাটা’ একজন ফার্স্ট লেডি হবেন বলে জানিয়েছেন তাঁর চার বোন।

এক বোন বনি জ্যাকবস বলেছেন, ‘আমার যেকোনো প্রয়োজনেই তাঁকে (জিল) পেতাম। তিনি আমার দেখভাল করেছেন। আমরা চার বোনই অভিভূত যে আমাদের বোন ফার্স্ট লেডি হতে পারে। তবে ফার্স্ট লেডি হওয়ার ব্যাপারটা ওর জন্য খুবই স্বাভাবিক।’

এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

Leave a Reply

লেখক

সর্বশেষ সংবাদ

%d bloggers like this: