ফেসবুক যেন ‌গাঁজার আসর!

- Advertisement -

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ব্যবহার করে অনেকটা খোলামেলাভাবেই বিক্রি হচ্ছে মদ, গাঁজাসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য। এসব বিক্রির জন্য রয়েছে অসংখ্য গ্রুপ ও ম্যাসেঞ্জার চ্যাট গ্রুপ। যেখানে সদস্য সংখ্যাও একেবারে কম নয়। সময় সংবাদের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে মদ ও গাঁজা কেনাবেচার চাঞ্চল্যকর এসব তথ্য।

শুধু গাঁজাই নয়, মেসেঞ্জারে অর্ডার করলেই বাড়িতে চলে আসে বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য। এমনকি ফেসবুক লাইভেও চলছে মাদকদ্রব্যের কেনাবেচা আর অবাধ প্রদর্শনী। শুনতে অবাক লাগলেও এমনটাই চলছে জনপ্রিয় এ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমটিতে। অসাধু চক্রের খপ্পরে পড়ে দিন দিন এ মাধ্যমটি যেমন অনিয়ন্ত্রিত হয়ে উঠছে তেমনি অসামাজিক কার্যকলাপে ভরে উঠছে সামাজিক এ যোগাযোগ মাধ্যমটি।

রাত গভীর হলেই, সক্রিয় হয় গ্রুপের সদস্যরা। ফেসবুক পোস্ট এমনকি ফেসবুক লাইভ করে খুঁজে নেওয়া হয় মাদকসেবী বন্ধুদের। পয়সা কম থাকলেও ক্ষতি নেই, ভাগাভাগিতেও কেনা যায় মাদকদ্রব্য। রয়েছে নিরাপদ স্থানে আসর বসানোর নিশ্চয়তাও। এমন একটি গ্রুপের মাদক বিক্রেতার সঙ্গে কৌশলে যোগাযোগ করে সময় সংবাদের এ প্রতিবেদক। যিনি ফেসবুকে মাদকের অর্ডার নিয়ে সরাসরি পৌঁছে দেন বাসায়।

৮ নভেম্বর বিকেল ৪টা। স্থান রাজধানীর কাজীপাড়া, মিরপুর। ফেসবুক গ্রুপের মাধ্যমে পরিচিত হওয়া অনলাইন বিক্রেতার সাথে যোগাযোগ হয় সময় সংবাদের প্রতিবেদকের। দেওয়া হয় মাদকের অর্ডার। এ সময় তিনি জানান, ১ ঘন্টার মধ্যে পৌঁছে দেওয়া হবে অর্ডার করা মাদকটি।

বিকেল ৫টা ১০। সময় সংবাদের প্রতিবেদকের সাথে আবারো যোগাযোগ হয় মাদক বিক্রেতার। এ সময় তিনি জানান, অসুস্থতাবোধ করায় তার আসতে কিছুটা দেরি হবে। সেক্ষেত্রে আরো ১ ঘণ্টা সময় লাগতে পারে। তাই আমরা তাকে পরদিন সকালে আসার অনুরোধ জানাই।

৯ নভেম্বর সকাল সাড়ে ১১টা। আবারো সেই নির্ধারিত স্থানে হাজির সময় সংবাদের ইউনিট। যোগাযোগ করা হয় সেই বিক্রেতার সঙ্গে। তিনি জানান তিনিও চলে এসেছেন প্রায় কাছাকাছি। এরপর পরিচয় গোপন রেখেই অর্ডারের প্যাকেটটি গ্রহণ করে সময় সংবাদের প্রতিবেদক।

রাজধানীর পাশাপাশি সারা দেশে যেখানে প্রতিদিনই চলে মাদকবিরোধী অভিযান সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে কীভাবে ফেসবুকে অবাধে চলছে এসব গ্রুপের মাদক বিকিকিনি-এমন প্রশ্ন ছিল প্রশাসনের এ কর্তা ব্যক্তির কাছে।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ-কমিশনার মশিউর রহমান বলেন, একদল ভোগের জন্য মাদক সেবন করে, অন্যদল এসব বিক্রি করে ধনী হয়ে যাচ্ছে। এ কারণে অনেকেই মাদক কেনা ও বেচায় আগ্রহী হচ্ছে। আমরা অনেককেই গ্রেপ্তার করেছি। অনলাইন বা অফলাইন যেখানেই তারা সক্রিয় থাকুক না কেন, তাদের ব্যাপারে আমাদের অভিযান চলমান আছে।

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাদকের ভয়াল থাবা থেকে তরুণ সমাজকে রক্ষা করতে হলে অভিভাবকদের সবার আগে সজাগ হতে হবে। এছাড়া শক্তিশালী করতে হবে পুলিশের সাইবার ইউনিটকে।

অপরাধ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক হাফিজুর রহমান কার্জন সময় সংবাদকে বলেন, সমাজে যদি মাদকের চাহিদা থাকে তাহলে সেটা আইন করে বন্ধ করা যাবে না। আমাদের দেশে সাইবার পুলিশের সদস্য সংখ্যা ৭০০ জন। তারা কতজনকে নজরদারি করতে পারবে? এক্ষেত্রে বাবা-মা অথবা পরিবারের সদস্যদের সতর্ক হতে হবে।

এদিকে ফেসবুকের কমিউনিটি গাইউ লাইনে মাদকদ্রব্য বিক্রি নিয়ে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও নিয়ম নীতির ফাঁক গলে কীভাবে এসব গ্রুপ তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারছে সে বিষয়ে জানালেন তথ্যপ্রযুক্তিবিদ তানভীর হাসান জোহা।

তিনি বলেন, ফেসবুক কমিউনিটির যে গাইডলাইনটি আছে তা মূলত এআইএমএল ভিত্তিক। এখানে মানুষের কোনো সিদ্ধান্ত থাকে না। ওই সব গ্রুপে যারা যুক্ত আছে, তারা কেউ যদি সেই গ্রুপগুলোর ব্যাপারে রিপোর্ট দিতো তাহলে অবশ্যই ফেসবুক এসবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারতো। কিন্তু এসব গ্রুপে মূলত নেশাকারীরাই যুক্ত আছে। ফলে তারা কেউ রিপোর্টও করছে না, গ্রুপগুলোও বন্ধ হচ্ছে না। আরেকটা বিশেষ কারন হলো, এসব গ্রুপগুলো প্রায়ই বাংলা ভাষায় খোলা হয়েছে। যদি ইংরেজি ভাষায় খোলা হতো তাহলে কোনো না কোনোভাবে অবশ্যই এই গ্রুপগুলো বন্ধ হয়ে যেতো।

তরুণ প্রজন্মের কাছে মাদক হয়ে উঠছে বাহাদুরীর খেলা। আর অনলাইনে এভাবে বেচা-কেনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কতটা অভিভাবকহীন। যদি ভাবেন, সন্তান বাসায় আছে মানেই ভালো আছে, নিরাপদে আছে, সেটাও হতে পারে আপনার ভুল ধারণা। ফেসবুকসহ সামাজিকযোগাযোগ মাধ্যমগুলো এখনো এতটাই অনিয়ন্ত্রিত যে, ঘরে বসেই মাদকের কালো থাবার শিকার হতে পারে যে কেউ।

এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

Leave a Reply

প্রতিবেদক

সর্বশেষ সংবাদ