বদরুদ্দীন উমরের ৯০ বছর ও রাজনৈতিক চিন্তার কয়েকটি দিক

- Advertisement -

আজ সর্বজন শ্রদ্ধেয় বদরুদ্দীন উমর ভাই এর ৯০ তম জন্মদিন। পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ পর্বের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের অন্যতম মুখ বদরুদ্দীন উমর তার ৯০ বছরের জীবনে শাসকগোষ্ঠীর প্রতি তীব্র ঘৃণা বজায় রেখেছেন। তার সমসাময়িক বুদ্ধিজীবিদের মত করে তিনি হারিয়ে যান নি । বিভিন্ন সময়ে তার কাছে আসা বুর্জোয়া প্রতিষ্ঠাকামিতাকে তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন। দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশের জনগনের পক্ষে কলম ধরেছেন। হাটে-বাজারে মাঠে-ঘাটে জনগনের পক্ষে লড়াইয়ে দৃঢ় ভূমিকা পালন করেছেন । এদেশের গণতান্ত্রিক ধারার লড়াই-সংগ্রামের পক্ষে দাড়ানো বুদ্ধিজীবিদের নেতৃত্ব দিয়েছেন। তার সমগ্র জীবন ব্যাপী ইতিহাসের নানা দিক নিয়ে আলোচনা করেছেন ,চিন্তার খোরাক জুগিয়েছেন ।মার্কসবাদী দৃষ্টিতে ঘটনাকে বিশ্লেষণের চেষ্টা চালিয়েছেন ।তাই তাকে নিয়ে আলোচনার সময়ে আমাদের সর্বদায় তার ইতিবাচক ভূমিকাকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে।

সারাজীবনব্যাপী লড়াকু ভূমিকা পালনকারী বদরুদ্দীন উমরকে আমরা কিভাবে দেখবো? এটা একটা জরুরী প্রশ্ন। এটা যদি সঠিক মার্কসবাদী দৃষ্টিতে দেখা না যায় তবে আমরা আমাদের বন্ধু নির্ধারণে বড় ভুল করে বসবো। শ্রদ্ধেয় উমরকে দেখার দুটি প্রবনতা লক্ষণীয়। তার কাজের বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা ব্যতিরেকে ব্যাপক ব্যক্তি বিষেদাগার এবং অন্যদিকে তাকে প্রশ্নহীন সমর্থন, যা আসে ক্ষুদে মালিকানাজাত উপমহাদেশের পীরবাদী মনোভাব থেকে (যা তিনি নিজেও চান বলে মনে হয় না)। এই উভয় ধারায় উমর ভাইকে যথাযোগ্য মর্যাদা দিতে সক্ষম নয়। আমরা খুব সংক্ষেপে তার ভুমিকার মৌলিক প্রশ্নে কথা বলবো। এক্ষেত্রে তার রাজনৈতিক জীবনকেই/লাইনকে প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। যা কিনা তার লেখালেখিতেও প্রভাব রেখেছে।

উমর ভাই, যিনি কিনা এদেশের মার্কসবাদী এবং বিপ্লবী রাজনীতির একনিষ্ঠ সমালোচক। তিনি নিজেকে মার্কসবাদী-লেনিনবাদীও দাবি করেছেন ।আমরা এখন তার মতাদর্শিক অবস্থান নিয়ে কিছুটা কথা বলবো।

মতাদর্শগত অবস্থান ও ক্রমবিকাশ

বদরুদ্দীন উমর তার বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরী ছেড়ে যোগ দিয়েছিলেন পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিষ্ট পার্টি(এমএল)-এ। যে পার্টিটি রুশ-চীন মহাবিতর্কের প্রেক্ষাপটে সঠিকভাবে মাও চিন্তাধারাকে উর্ধে তুলে ধরেছিল এবং বিপ্লবী রাজনীতিকে আকড়ে ধরার চেষ্টা করেছিল। ৬০ এর দশকে যারা মাও চিন্তাধারাকে জনপ্রিয় করেছিলেন, বদরুদ্দীন উমর তার মধ্যে অন্যতম। তিনি সমসাময়িক সময়ে সবচেয়ে অগ্রসর মতাদর্শ মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাও চিন্তাধারা গ্রহণ করে তা প্রয়োগের প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। এটাকে কোনভাবেই বিস্মৃত করাটা কোন বিপ্লবীর সঠিক হবে না ।

এরপরে ৭১-এর বিশেষ সময়ে পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিষ্ট পার্টি (এম এল)-র ভুল কেন্দ্রীয় লাইন বদরুদ্দীন উমরের চিন্তাকে নেতিবাচকবাবে প্রভাবিত করে। তিনি পার্টির কেন্দ্রীয় লাইনকে ভুল মনে করলেও, ৭১ এর বিশেষ পরিস্থিতিতে নিজে উদ্যোগ নিয়ে সঠিক লাইন যেটা তিনি মনে করেছিলেন তা প্রয়োগ করতে ব্যর্থ হন এবং এক প্রকার বাস্তব যুদ্ধে নিস্ক্রীয় ভূমিকা পালন করেন। এই কথার সাথে একটু যুক্ত করলে পাঠক সহজেই বুঝবেন। ৭১ এর পরিস্থিতিতে ইপিসিপি (এম এল) এর এই যান্ত্রিক কেন্দ্রীয় অবস্থানের সাথে দ্বিমত করেই যশোর-খুলনায় মুক্তিযুদ্ধের আত্মনির্ভর্শীল পাক বিরোধী বিপ্লবী ঘাটি গড়ে উঠেছিল নুর মোহাম্মদদের নেতৃত্বে।শ্রদ্ধেয় উমর এমনকি ৭১ এর এপ্রিলের শুরু পর্যন্ত যশোরই ছিলেন!

তিনি সে সময়ে পার্টির মধ্যকার এসব বিপ্লবী কর্মীদের একসূত্রে বাধতেও ব্যর্থ হন। একজন মার্কসবাদী কখনো কখনো এমনকি পার্টির ভুল লাইনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে সঠিক অবস্থানকে প্রয়োগে নেন। যা করতে ৭১ এর বিশেষ সময়ে তিনি ব্যর্থ হন। এটা এক দুঃখজনক ইতিহাসই বটে। যা থেকেও আমাদের শেখা দরকার।

এরপরে উমর ভাই যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে নিজেই পার্টি গঠনের উদ্যোগ নিলেন। ৭১ এ চীনের ভূমিকার সমালোচনা সহই তিনি ৭৬ পর্যন্ত মাও চিন্তাধারাকে বজায় রাখলেন। কিন্তু ১৯৭৬ সালের অক্টোবরে, মাও সেতুং এর মৃত্যুর পরবর্তীতে এক কুখ্যাত ক্যুদেতার মাধ্যমে চীনের ক্ষমতা সংশোধনবাদী তেং গ্রুপ দখল করে নিল এবং চীনের সমাজতন্ত্র বিয়োগাত্মকভাবে পরাজিত হলো। এরপরে বিশ্ব পরিসরে এক নতুন বিতর্ক শুরু হলো। আলবেনিয়ার আনোয়ার হোজ্জা অতি দ্রুত গোঁড়ামীবাদী কায়দায় মাও সেতুং এবং সাবেক বিপ্লবী চীনকে জাতীয়তাবাদী বলা শুরু করলেন। উমর ভাই আনোয়ার হোজ্জার লাইনকে গ্রহণ করলেন এবং মাও বিরোধী অবস্থানে গড়িয়ে পরলেন। এই সময়ে উমর কমিউনিষ্ট হিসেবে নিজেকে আর রক্ষা করতে পারলেন না। তিনি মানব ইতিহাসের গণবিপ্লবের এযাবৎকালের সর্বোচ্চ চূড়া মহান সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবকে ধারন করতে পারলেন না। এমনকি ৬০ এর দশকে মাও কর্তৃক স্তালিন সম্পর্কে হওয়া সঠিক সারসংকলন সম্পর্কে এক ভুল অবস্থান নিলেন ।উমর ভাই এর তাত্বিক বিভ্রান্তির ফলাফল আমরা তার পরবর্তী বিভিন্ন ঘটনা বিশ্লেষণেও দেখব।

বদরুদ্দীন উমর এর ফলেই সমাজতান্ত্রিক সমাজে শ্রেণী সংগ্রামকে অস্বীকার করলেন। তিনি মার্কসবাদের মেীলিক নিয়ম অনুধাবনে ব্যর্থ হলেন। বস্তুর অভ্যন্তরীণ শর্তকে অপ্রধান করার মধ্য দিয়ে তিনি মার্কসবাদী অবস্থান থেকে বিচ্যূত হলেন। সোভিয়েতে সমাজতন্ত্রের পরাজয় এবং ক্রুশ্চেভের ক্ষমতা দখলকে উপরিভাবে দেখলেন এবং এটাকে মূলত সাম্রাজ্যবাদীদের দ্বারা ষঢ়যন্ত্রের সমস্যা আকারে দেখলেন। এটা মারাত্মকভাবে তার পরবর্তী রাজনৈতিক জীবনে প্রভাব ফেলেছে।

নকশালবাড়ির বিপ্লবী সংগ্রামের নেতিকরনে উমরের ভূমিকা

১৯৬৭ সালের নকশালবাড়ির কৃষক অভ্যুত্থান এবং নকশালবাড়ি অন্দোলন, যা কিনা এই উপমহাদেশের বিপ্লবী আন্দোলনের মৌলিক গতিপথ নির্দেশ করেছিল, উমর ভাই ৭০ এর শেষ থেকেই এর বিরুদ্ধে দাড়ালেন। তিনি নকশালবাড়িকে দ্বান্দিকভাবে দেখতে ব্যর্থ হয়েছেন। এর পরিবর্তে নকশালবাড়িকে তিনি দেখেছেন যান্ত্রিক অমার্কসবাদী বুর্জোয়া মানবতাবাদী দৃষ্টিতে। নকশালবাড়িকে এক হঠকারী কাজ হিসেবে বর্ণণা করে চলেছেন শ্রদ্ধেয় উমর! যা তার বিপ্লবী ভূমিকাকে প্রায়ঃশই প্রশ্নের সম্মুখীন করেছে। এই প্রসঙ্গ আসলেই তিনি শ্রেণী সংগ্রামের বিপ্লবী ধারা থেকে সরিয়ে নিয়ে, নিজেকে শুধুমাত্র গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতায় পরিণত হন ।

বিপ্লবী পার্টি গঠনের সমস্যা

উমর ভাই তার ৭৬ পরবর্তী সময়ে যখন নিজেই পার্টি গঠনের উদ্যোগ নিলেন তখন তিনি ব্যর্থতার পরিচয়ই দিলেন। তিনি বরাবর তার পার্টিকে বিপ্লবী ক্ষমতা দখলের দিকে তথা শ্রেণী সংগ্রামের লক্ষ্যে পরিচালিত করতে পারেন নি। বরং বারংবার গণতান্ত্রিক আন্দোলনেই সীমাবদ্ধ থেকেছেন। যে সমালোচনা তিনি তৎকালীন ইপিসিপি (এম এল) সম্পর্কে করেছেন ,একই সমালোচনার দোষে তিনি নিজেও পরেন। একটা বিপ্লবী পার্টি কিভাবে গঠিত হবে, সেই প্রসঙ্গে উমর মতাদর্শিক কারনেই ভ্রান্তিতে পরেছেন। এজন্যেই তিনি মধ্য শ্রেণীর উপর ভর করেছেন। মধ্য শ্রেণীর পুনর্গঠন না হওয়ায় বিভিন্ন সময়ে আক্ষেপ করেছেন। এটা তার শ্রেণী দৃষ্টিভঙ্গীর দূর্বলতাকে প্রকাশ করে। উমর সঠিক মতাদর্শকে ধারণ করতে না পারায় পরবর্তীতে তিনি শ্রেণী সংগ্রাম তথা বিপ্লবী বল প্রয়োগের ক্ষমতা দখলের পথে যেতে পারেন নি।

এইসব মৌলিক বিচ্যূতির পরেও শ্রদ্ধেয় উমর আমাদের দেশের সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী গণতান্ত্রিক সংগ্রামের আলোকোজ্জ্বল মুখ। আমাদের কাছে উমর ভাই এর বিপ্লবী দিকের শিক্ষা হলো, কখনো শাসকশ্রেণীর সাথে আপোষ না করা, একই সাথে তার ভুল দিক এর শিক্ষা হলো কখনো, সঠিক অগ্রসর মতাদর্শকে ত্যাগ না করা। গভীর মনোযোগের সাথে বিকশিত মতাদর্শকে গ্রহণ করা এবং এর মৌলিক শিক্ষাকে আকড়ে ধরে একই সাথে বিকশিত করা!

শুভ জন্মদিন বদরুদ্দীন উমর !লাল সালাম জানাই আপনাকে।

লেখক।।
আতিফ অনিক, রাজনৈতিক কর্মী।

এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

Leave a Reply

প্রতিবেদক

সর্বশেষ সংবাদ