বাংলাদেশ-নেপাল-ভূটান-ভারত সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরীর সম্ভাবনা

মোহাম্মদ মেহদী হাসান খান।।

সন্দেহ নেই বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়াতে নতুন শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এর একটি কারণ। আঞ্চলিক ও ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থান কারণগুলোর আরেকটি। একসময় যেই ভারতবেষ্টিত হওয়াকে আমাদের দূর্বলতা ভাবা হত ঘটনাচক্রে সেটিই আমাদের একটি সুবিধাজনক জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে। একপাশে দেশটির কৌশলগতভাবে নাজুক অঞ্চল (সেভেন সিষ্টারস) এর অবস্থান তাদের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আমাদের গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে; বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ অবস্থান সেখানকার বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দমন এবং সুলভে পণ্য সরবরাহের জন্য তাদের কাছে অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। আরেকপাশে রয়েছে সুবিশাল ভূখণ্ডের তুলনায় মুরগীর গলা (চিনেকস নেক) সদৃশ বা তার থেকেও চিকন ‘শিলিগুড়ি করিডোর’। কিছু বছর আগে ভারতের একটি বিশাল সমুদ্র সীমানা সম্পন্ন বঙ্গোপসাগরের উত্তর দিকে শীর্ষ প্রান্তে অবস্থানের কারণে মালাক্কা চ্যানেলের নিরাপত্তার জন্যে এবং ভারতের থেকে একটি সুবিধাজনক অবস্থানে থাকার কৌশল হিসেবে পরাশক্তি চীনের কাছে বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব প্রকাশিত হয়। ইদানীং নতুন কৌশল হিসেবে বাংলাদেশকে ব্যবহার করে ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সবথেকে দূর্বল স্থান এই শিলিগুড়ি করিডোরের কাছাকাছি আসার চীনা প্রচেষ্টা সম্পর্কে খোদ ভারতেই ব্যপকভাবে আলোচনা চলছে। নিঃসন্দেহে বিষয়টিতে চীন ও ভারত উভয়ের জন্যে বাংলাদেশকে আরও গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয় রসদ রয়েছে।

বাংলাদেশের আরও দুইটি নিকট প্রতিবেশী দেশ নেপাল ও ভূটান। উল্লেখ্য, এ অঞ্চলে ভারত ও পৃথিবীর অন্যান্য দেশের সাথে দ্বিপাক্ষিক সমতার ভিত্তিতে স্বার্বভৌম রাষ্ট্র শুধু বাংলাদেশই প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে। সক্ষমতার অভাবে নেপাল ও ভুটান দুটি দেশই কোন না কোন দিক দিয়ে প্রশাসনিকভাবে ভারতের ওপর নির্ভরশীল। উদাহরণস্বরূপ, প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ভূটান ঘোষণা দিয়েই ভারতকে দ্বায়িত্ব দিয়ে রেখেছে। আর, এই ত সেদিন পর্যন্ত নেপালে ভারতীয় রুপি স্থানীয় মুদ্রার পাশাপাশি ব্যবহৃত হত একইভাবে।

আঞ্চলিক অবস্থান আরও শক্ত করবার জন্যে বাংলাদেশের উচিত হবে এই দুটো দেশের ওপর প্রাসঙ্গিক প্রভাব বিস্তারে সচেষ্ট হওয়া। দুটি দেশের অনেকগুলো দূর্বলতার ভেতরে একটি হলো দুটি দেশই স্থলবেষ্টিত (ল্যান্ডলকড)। ফলশ্রুতিতে আমদানীর ক্ষেত্রে প্রচন্ডভাবে ভারতের ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশ ঠিক এখান থেকেই শুরু করতে পারে। এখন, বাংলাদেশ চেষ্টা করে নাই ভাবলে ভুল হবে। ১৯৭৬ সাল থেকেই কাগজে কলমে নেপালের সাথে চুক্তি আছে। কিন্তু, উল্লেখযোগ্য কোন আমদানী বাংলাদেশের বন্দর ব্যবহার করে তাদের পক্ষে করা সম্ভব হয়নি।

এমতাবস্থায়, শিলিগুড়ি করিডোর বা কাছাকাছি কোনও দূরত্ব হয়ে নেপালে ও একইরকম সর্বনিম্ন দূরত্ব হয়ে ভূটানে ভারতের নীচ দিয়ে ভূ-গর্ভস্থ সুরঙ্গ (আন্ডারগ্রাউন্ড টানেল) তৈরী করে যদি সরাসরি নেপাল ও ভুটানের সাথে সড়ক যোগাযোগ তৈরী করা সম্ভব হয়, তাহলে দেশ দুটির সাথে কোন তৃতীয়পক্ষকে সংযুক্ত না করে সংযোগ স্থাপন করা যাবে। তিনটি দেশের পক্ষেই সম্ভব হবে বাণিজ্য ও যাতায়াতের ক্ষেত্র ভারতের মতনই সহজলভ্য করে তোলা।

উল্লেখ্য, এই সুবিশাল কর্মযজ্ঞটি পরিচালিত করতে হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি দেশের অনুমোদন এবং আইনানুগ বৈধতা বাধ্যতামূলক। যেহেতু টানেলটি ভারতের স্থলভাগ ব্যবহার করে যাবে সে ক্ষেত্রে এ ব্যপারে বাংলাদেশ-নেপাল-ভূটানকে ভারতের সাথে কূটনীতিক আলোচনার মাধ্যমে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। নিঃসন্দেহে বিষয়টির বাস্তবায়ন দক্ষিণ এশিয়াকে পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় যোগাযোগ ও সম্প্রীতির ক্ষেত্রে এক ধাপ এগিয়ে রাখবে। যেভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এগিয়ে আছে।

এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ-নেপাল ও বাংলাদেশ-ভূটান আন্ডারগ্রাউন্ড টানেলের কিছু লুপ ভারতেও থাকতে পারে। অথবা বাংলাদেশ-ভারত-নেপাল-ভূটান একসাথে একটি টানেল দিয়েই সংযুক্ত হতে পারে। তবে, এ ক্ষেত্রে সড়ক বা টানেলটিকে শুধু আন্তর্জাতিক চলাচলের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে হবে। অন্যথায় এর আসল উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে।


আরও পড়ুন


কোনও দেশের ওপরে আকাশসীমা দিয়ে অন্য কোনও দেশের যান চলাচল করতে পারে, এতে অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন থাকে যার অন্যতম কারণ হলো আকাশসীমা ব্যবহারের সময় সহজেই নজরদারী বা ক্ষতিসাধন করা সম্ভব। আন্ডারগ্রাউন্ড টানেলের মাধ্যমে সে ধরণের সুযোগ নেই। আবার, টানেলটি এমন গভীরতা দিয়ে ও প্রযুক্তি নিরোধক করে করা তৈরী করা যেতে পারে যাতে কোনভাবে নজরদারী অথবা নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রসঙ্গে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের অপব্যবহার না করা যায়। ভারতের অভ্যন্তরে কোন লুপ ছাড়া তৈরী করবার ক্ষেত্রে প্রয়োজনে আমরা ভূ-গর্ভস্থ জায়গা ভারতের কাছ থেকে কিনতে বা লিজ নিতে পারি। অথবা ভারত, বাংলাদেশ ও সাথে যথোপযুক্ত ক্ষেত্রে প্রযোজ্য দেশ (নেপাল ও ভূটান) এর ত্রি-পাক্ষিক সমঝোতা ও আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে এটি হতে পারে।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ কখনোই তার সুবিধার সর্বোচ্চটুকু আদায় করতে পারবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না অর্থনৈতিকভাবে একটি অবস্থানে যাচ্ছে যাতে করে প্রয়োজনে কারও মুখাপেক্ষী না হতে হয়। সে ক্ষেত্রে এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে এই উদ্যোগটি নিতে পারলে বাংলাদেশের প্রভাব বাড়বে কোন সন্দেহ নেই।

সামরিক সহায়তার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ-নেপাল-ভূটানের নতুন একটি সম্ভাবনা তৈরী হবে। সরাসরি যোগাযোগ থাকার কারণে নেপালের সাথে তাৎক্ষণিকভাবে ও ভূটানের সাথে চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে বাংলাদেশ সামরিক যোগাযোগ ও সহায়তার ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে পারবে সহজেই। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব বৃদ্ধির সম্ভবনাও তৈরী হবে।

বাংলাদেশ ভারতকে যতটুকু সহায়তা উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলোর জন্য করেছে সেই প্রসঙ্গ উল্লেখ করে যথাযথ কূটনীতি করা সম্ভব হলে এবং আইনগত কোন বাধা না থাকলে এটি করা যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আঞ্চলিক গুরুত্ব তো বাড়বেই, তার সাথে খুলে যাবে অর্থনৈতিক সম্ভাবনার এক নতুন দুয়ার।

লেখক।।
মোহাম্মদ মেহদী হাসান খান
শিক্ষার্থী, জিওম্যাটিকা বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ
কুয়ালালামপুর, মালয়েশিয়া।।

এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

Leave a Reply

লেখক

সর্বশেষ সংবাদ

%d bloggers like this: