ছদ্মমার্কসবাদের ফেরীওয়ালা : বাসদের রাজনীতি (তৃতীয় পর্বের ২য় অংশ)

[প্রথম পর্ব ] [দ্বিতীয় পর্ব ] [তৃতীয় পর্বের ১ম অংশ]

তৃতীয় পর্বের ২য় অংশ

বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল- বাসদসহ অধিকাংশ বামপন্থী পার্টি যারা শ্রেনিসংগ্রামের বৈপ্লবিক তাৎপর্যকে না বুঝে কেবলই পুঁথি পড়ার মত মুখস্থ করে, তাদের কাছে সমসাময়িককালে গড়ে উঠা প্রচন্ড শ্রেনিসংঘর্ষ ও শ্রমিকশ্রেনির নেতৃত্বে গড়ে ওঠা শ্রেণিসংগ্রাম দেখা দেয় মূর্তিমান গুন্ডামীরুপে, সন্ত্রাসরূপে। এরা হলো মেনশেভিক, মেনশেভিক (আন্তর্জাতিকতাবাদী) সহ সমস্ত সংশোধনবাদী ও সংস্কারবাদী দলগুলোর প্রেতাত্না, যারা বিশ্বাস করে শ্রম ও পুঁজির দ্বন্দ্বের নির্ধারণবাদে। তা না হলে কেন তারা বাংলাদেশের সামাজিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক ইতিহাসে উপনিবেশবাদ দেখতে পায় না, উত্তর-উপনিবেশ রাষ্ট্র কাঠামো দেখতে পায় না। যারা নিজেরাই স্বীকার করে বাংলাদেশের শাসক দলগুলো জাতীয় অর্থনীতি গড়ে তোলেনি, তারা এদেশে পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থা দেখতে পান কোন চোখে?

বাসদ সাধারন সম্পাদকের মুখেই শুনুন ”…….. কি করে মুক্তিযুদ্ধের পর থেকেই গত ৪০ বছরে ধরে কীভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে যা কিছু লিপিবদ্ধ হয়েছিল, সে সমস্ত কিছুকে তারা লংঘন করেছে, নস্যাৎ করেছে, ফলে গনতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্ম নিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ তথা সাম্রাজ্যবাদের প্রভাব মুক্ত স্বাধীন জাতীয় অর্থনীতির বিকাশ-যেসব অঙ্গীকার’৭২ সালে অস্বীকার করা সম্ভব ছিল, আজ তা খুঁজে পাওয়া দুষ্কর ।”(বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি: অতীত ও বর্তমান,পৃ-১৯)

যদি বাংলাদেশ রাষ্ট্র বুর্জোয়া চরিত্রই অর্জন করে তাহলে কোথায় বুর্জোয়া গনতন্ত্র? ১৯৭১ সালের পর থেকে হাতে গোনা দুএকটি নির্বাচন বাদ দিলে, দেখা যাবে, কোনটিতেই জনগনের সামনে প্রতিনিধি নির্বাচনের পথ স্বচ্ছ ও স্বাধীন ছিল না। জাতীয় সংসদ ক্রমাগতভাবে পরিণত হয়েছে পদ্ধতিগত একনায়কতান্ত্রিক শাসনাগারে।

বুর্জোয়া রাষ্ট্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে ধর্ম হবে মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়। অথচ বাংলাদেশের সংবিধান দেখলেও রাষ্ট্র পরিচালনা পর্যবেক্ষন করলে স্পষ্টতই দেখা যায়, রাষ্ট্র এখন পর্যন্ত ধর্ম থেকে বিযুক্ত করে নি। অথচ বাসদের দাবী বাংলাদেশ বুর্জোয়া রাষ্ট্র, এখানকার উৎপাদন ব্যবস্থা পুঁজিবাদী। অর্থনৈতিক প্রশ্ন আমলে নিয়েই আমাদের কিছু সরল জিজ্ঞাসা রয়েছে-

ক. বুর্জোয়া রাষ্ট্র, বাংলাদেশের জনগণ কি নিজের রাষ্ট্রে তার যোগ্যতা থাকা সত্বেও কোন কাজ খুঁজে পায়? আমরা অবশ্যই উচ্চতর দক্ষতা সম্পন্ন মানুষদের কথা বলছি না। এই শ্রেণির মানুষেরা ( অর্থাৎ উচ্চ দক্ষতা বিশিষ্ট প্রকৌশলী, ডাক্তার, বিজ্ঞানী, গবেষক প্রমুখ) আমাদের প্রশ্নের ভেতর পড়ে না। কিন্তু রাষ্ট্রীয় অনাচার ও অবহেলার ফলে যে ব্যপক সংখ্যক মানুষ অশিক্ষিত ও অদক্ষরূপে বেড়ে ওঠে তারা কি চাইলেই এই বুর্জোয়া রাষ্ট্রে নিজের জীবিকা খুঁজে পান কিংবা পারেন? আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা-আইওএম সম্প্রতি ‘রিজিওনাল এভিডেন্স ফর মাইগ্রেশন এনালাইসিস অ্যান্ড পলিসি-(রিমেপ) প্রকল্পের আওতায় একটি স্ট্যাডি রিপোর্ট করে সেখানে দেখা যায়, কাজের নিশ্চয়তা পেলে ৯৯ শতাংশ প্রবাসীই দেশে থাকতে চান। আন্তর্জাতিক শ্রমসংস্থা-আইএলও তাদের এক জরিপে বলছে বাংলাদেশে আন্ডার জব করছে ৬৭ ভাগ মানুষ আর বিষয়ভিত্তিক (যে বিষয়ে পড়ালেখা করছে সেই বিষয়ে) চাকুরীর সুযোগ নেই শতকরা ৯৫ ভাগ মানুষের। বাংলাদেশের উৎপাদন ব্যবস্থা এতটাই পুঁজিবাদী যে জনগণের কর্মসংস্থানই সে করতে পারছে না। বামদের দৃষ্টিতে এটাই বুর্জোয়া রাষ্ট্র। তবে বাংলাদেশ পুঁজিবাদী রাষ্ট্র না হলেও যে এখানে বুর্জোয়া দল বা বুর্জোয়া ভাবমানসের অস্তিত্ব নেই এটাও আমরা দাবী করছি না। অর্থনৈতিকভাবে বুর্জোয়া রাষ্ট্র না হলে একই রাষ্ট্রে বুর্জোয়া প্রবনতা থাকতে পারে। এই অর্থে বাংলাদেশে বিদ্যমান ডানপন্থী দলগুলোকে আমরা বুর্জোয়া দল বলে থাকি, তবে সব থেকে ভাল হয় ‘বুর্জোয়া প্রবনতাসম্পন্ন দল’ শব্দটি ব্যবহার করলে।

খ. বাংলাদেশের উৎপাদন ব্যবস্থার সিংহভাগ উপকরণ আমদানি করতে হয় বাইরে থেকে। এছাড়াও বাংলাদেশের অর্থনীতি হলো আমদানি নির্ভর অর্থনীতি।

এদেশে যদি পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থাই থাকত, তাহলে উৎপাদনের উপকরণ ও যান্ত্রিক হাতিয়ার এদেশেই ব্যাপকভাবে উৎপাদিত হতো। তা হয় না, এর কারণ এই প্রশ্নের সাথে বিশ্বরাজনীতি, রাজনৈতিক পরমুখাপেক্ষিতা ও উত্তর উপনিবেশী শাসনব্যবস্থার প্রশ্ন বিজড়িত। বাংলাদেশের বুর্জোয়া দল একারনেই ফুলবাড়িতে নিজস্ব বিদ্যুৎকেন্দ্র চালাতে পারে, নিজেদের কয়লা নিজেরা তুলতে পারে না। রুপপুরে নিজস্ব বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরী করতে পারে না, রামপালের বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়লা নিজের উৎস থেকে সরবরাহ করতে পারে না। অর্থনৈতিক নিম্নমুখীতার কারনেই বাংলাদেশেসহ অনেক দেশকেই আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের জনবিরোধী শর্তসংবলিত চুক্তি মেনে নিতে হয়।

গ. বাংলাদেশে নূন্যতম বুর্জোয়া গনতান্ত্রিক অধিকার বিদ্যমান নেই, তা বোঝার জন্য রাজনৈতিক বিশ্লেষক বা বোদ্ধা হবার প্রয়োজন নেই। এখানকার রাষ্ট্রক্ষমতায় আসা প্রত্যেকটি শাসকদলই নিজেদের দল পরিচালনায় সামন্তীয় নীতি অনুসরন করছে এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় ক্ষেত্রে তাদের সেই চিন্তারই ছাপ দেখতে পাওয়া যায়। ঔপনিবেশিক আমলের শাসনকাঠামোয় কখনোই শাসনব্যবস্থায় জনগনকে সম্পুক্ত করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশের আইন ও শাসনব্যবস্থা হলো পাশ্চাত্য শাসনব্যবস্থার বিকৃত অনুকরন, যে ব্যবস্থার মাধ্যমে কেবল জনগনের রাজনৈতিক স্বাধীনতা কেড়ে নেয়াই সম্ভব রক্ষা করা নয়। এবং এই শাসনব্যবস্থার মাধ্যমে প্রত্যেকটি ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী ও ব্যবসায়ী রাষ্ট্রের সম্পদ তছরুপ করেছে, বিদেশে পাচার করেছে। সাইদ ইফতেখার আহমেদ এই প্রসঙ্গে সিদ্ধান্ত টানেন, স্বাধীন বাংলাদেশে গনতন্ত্রের সূচনাপর্বেই আমরা প্রত্যক্ষ করি যে ইউরোপ কর্তৃক চাপিয়ে দেওয়া ঔপনিবেশিক কাঠামোসমূহ এদেশের গণমানুষের আশা আকাঙ্খা পূরনে শুধু ব্যর্থই হয় নি, গনতন্ত্রের যে মূল উপাদান জনগনকে রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা, সেটি করতেও সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। (প্রতিচিন্তা, জুলাই-সেপ্টেম্বর, ২০১৪ সংখ্যা)

আমাদের আরো একবার ভাবতে হবে ঔপনিবেশিক কাঠামো বজায় থাকা অবস্থায় ও উত্তর উপনিবেশী রাজনৈতিক কর্তৃক বজায় থাকা অবস্থায় কি কোন রাষ্ট্র বুর্জোয়া উৎপাদন ব্যবস্থার বিকাশ সম্ভব? বাংলাদেশে যে বিপ্লবই সংগঠিত হোক জনগনের প্রবল চাওয়া হলো গণতান্ত্রিক অধিকারসমূহ ফিরে পাওয়া।

ঘ. বাংলাদেশের উৎপাদন ব্যবস্থা যাই হোক তথ্য-প্রযুক্তির অভূতপূর্ব বিকাশের জন্য বাংলাদেশের সাধারন জনগণের নিকট ব্যাপকভাবে বুর্জোয়া সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঘটেছে, যদিও সামন্তীয় সংস্কৃতির প্রকটতা এখনো রয়েই গেছে। অথচ এই সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে কীভাবে লড়াই হবে, লড়াইয়ের রূপ কী হবে এ নিয়ে কোন রূপরেখা আমরা বাসদসহ কোন প্রকাশ্য বুর্জোয়া রাজনীতির লেজুড়বৃত্তি করা বামপন্থী দলের কাছেই পাইনা। তারা শুধু সর্বহারা সংস্কৃতি বলে চিৎকার চেঁচামেচিই করে এসেছে এ যাবৎ। অথচ তাদের আশ্রয় আমরা দেখতে পাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বিপ্লবী কোন সংগীত, কোন কবিতা তারা সৃষ্টির জন্য কোর প্রচেষ্টা নেন না। অথচ বিপ্লব বিপ্লব করে করে জনগনের শ্রেণিক্ষোভকে বসন্তবরণ, মঙ্গল শুভযাত্রা করে প্রশমিত করতে চান। আমরা এসবের বিরোধী নই। কিন্তু যারা নিজেদের কমিউনিস্ট দল বলে দাবী করে, বিস্ময়ে চেয়ে দেখি তাদের কোন বিপ্লবী সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক হাতিয়ারই নেই।

এই পর্বের শুরুতেই বলা হয়েছে, সমসাময়িককালে সংঘটিত শ্রেণিসংঘর্ষ ও শ্রেণিসংগ্রাম বাসদীয় ধারার দলগুলো দেখে গুন্ডামীরুপে, সন্ত্রাসরুপে। ষাট ও সত্তর দশক থেকে পশ্চিমবঙ্গে শুরু হওয়া নকশালবাড়ী তথা মাওবাদী আন্দোলনকে তারা হঠকারীতা বলে অ্যাখ্যায়িত করে। অথচ ভারতবর্ষে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের প্রশ্নে তারাই সবচেয়ে সোচ্চার। আর বিপরীতক্রমে তারা তারা উদযাপন করে কর্ণেল তাহেরের মৃত্যৃবাষিকী। কী আশ্চর্য স্ববিরোধীতা!! জনগনের বিপ্লবী তৎপরতাকে যারা স্বাগত জানাতে জানে না, (অংশগ্রহন দুরের কথা) তারা যেন একটি বিশুদ্ধ বিপ্লবের আশায় নিদ্রাযাপন করছে। কার্ল মার্কস নিশ্চিতভাবেই এদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতেন, যেমনভাবে তিনি সোচ্চার ছিলেন প্যারী কমিউন বিরোধীদের বিরুদ্ধে। সংশোধনবাদী দলগুলোর একটি দল হয়ে বাসদ হয়তো আরো অনেকদিন টিকে থাকবে আর লড়াকু জনগণ দিনে দিনে তার স্বরূপ বুঝতে পেরে তাদের কাছ থেকে নিজেদের সরিয়ে আনবে, আর বিপ্লবী জনগন নিজেদের বিপ্লবী দল গঠন করে বিপ্লব রচনা করবে নিজেরাই।
দুনিয়ার মজদুর এক হও!

লেখক।।
মতিউর রহমান মিঠু
সমাজকর্মী

এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

Leave a Reply

লেখক

সর্বশেষ সংবাদ

%d bloggers like this: