ছদ্মমার্কসবাদের ফেরীওয়ালা : বাসদের রাজনীতি (তৃতীয় পর্বের ১ম অংশ)

[প্রথম পর্ব ] [দ্বিতীয় পর্ব ]
তৃতীয় পর্বের ১ম অংশ
বিপ্লবের স্তর নির্ধারণে বাসদের বিশ্লেষণ সম্পর্কে পর্যালোচনা:

লেনিনবাদী পার্টি গঠনের নীতি অনুসারে কোন রাষ্ট্রে বিপ্লব সাধন করতে হলে সঠিক রাজনৈতিক তত্ত্ব প্রয়োজন। একটি বিপ্লবী দল রাষ্ট্র চরিত্রের সঠিক ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিপ্লবের স্তর নির্ধারণের মধ্যদিয়ে তার রণনীতি ও রণকৌশল প্রয়োগ করে। তবে একই সাথে মজার ও পরিহাসের বিষয় হলো, পৃথিবীর প্রায় সমস্ত দেশেই প্রায় প্রত্যেকটি বামপন্থী দলই নিজেদের সঠিক কমিউনিস্ট পার্টি মনে করে এবং তাদের রাজনৈতিক বিশ্লেষণকেই সঠিক মনে করে! কার্যক্ষেত্রে অবশ্য মেকী ও ছদ্ম মার্কসবাদীদের সমস্ত মুখোশই উন্মোচিত হয়। যদিও জনসাধারণকে তারা তাদের ছদ্ম বিপ্লবী তত্ত্বের দ্বারা সাময়িকভাবে বিভ্রান্ত ও অন্ধ করে রাখতে পারে। কমিউনিস্ট আন্দোলন সংগ্রামের শুরু থেকেই এ বিষয়টি লক্ষ্য করা গেছে। রাশিয়া, জার্মানীতে প্লেখনভ, ট্রটস্কি কিংবা বার্নাস্তাইন এর নেতৃত্বাধীন পার্টিসমূহ বিপ্লবী তত্ত্বের বুলির আবরণে বরং দেখা যায়, রাজতন্ত্র বা বুর্জোয়া শাসকদের হাতকেই শক্তিশালী করতো। অবশ্য দৃষ্টিভঙ্গীর সীমাবদ্ধতার কারণেও অনেক সময় পার্টিগুলো বিপ্লবের স্তর নির্ধারণসহ রাজনৈতিক তত্ত্ব নির্মাণে ভ্রান্তির পথে পা বাড়াত।

বাংলাদেশে গোপন ও প্রকাশ্য ও মিশ্র ধারার অনেকগুলো মার্কসবাদী-লেনিনবাদী দাবীকারী বামপন্থী পার্টি রয়েছে। ভারতবর্ষের প্রথম বামপন্থী পার্টি গঠিত হয় ১৯২০ সালে এবং শুরুর দিকে এর কেন্দ্র ছিল বাংলা প্রদেশেই সুনির্দিষ্ট করে বললে বাংলার রাজধানী কলকাতাতে। এরপর ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিতে কয়েকবার ভাঙ্গন দেখা দেয় যা আজও চলমান। আর ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান গঠিত হওয়ার পর এই অঞ্চলে পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি আলাদাভাবে রাজনৈতিক আন্দেলন শুরু করে, যা প্রথম বড় ধরনের ভাঙ্গনের মুখে পড়ে ষাটের দশকে পিকিং ও মস্কোর মধ্যে অনুষ্ঠিত মহাবিতর্কের ফলে। এই কমিউনিস্ট পার্টি থেকে বেরিয়ে গিয়েই তৎকালে ১৯৭১ এর পূর্বেই বেশ কয়েকটি কমিউনিস্ট পার্টি গঠিত হয়, যেমন পূর্ব বাংলার সর্বহারা দল, পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী) ইত্যাদি।

১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর একেবারেই ভিন্ন প্রেক্ষাপট থেকে- সুনির্দিষ্ট করে বললে জাতীয়তাবাদী ধারার বুর্জোয়া প্রবনতা সম্পন্ন রাজনৈতিক দল আওয়ামীলীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ থেকে একাংশ বেরিয়ে গিয়ে গঠন করে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ। পরবর্তীতে জাসদ ভেঙ্গে দুভাগ হওয়ার পূবেই জাসদের একাংশ কমরেড খালেকুজ্জামান ভুঁইয়াকে সামনে রেখে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল – বাসদ গঠন করে। ১৯৮০ সালে বাসদ গঠিত হবার দুই বছরের মাথায় ১৯৮২ সালে ভাঙ্গনের মুখোমুখি হয়। সেই সময় থেকে বাসদ (মাহবুব) নামে একটি দল ক্রিয়াশীল আছে। এরপর ২০১৩ সালে বাসদ আবার ভাঙ্গনের মুখে পড়ে এবং বাসদ (মার্কসবাদী) নামের আরেকটি দল গড়ে তুলে বাসদের একাংশ। সম্প্রতি এই লেখা যখন লিখছি ২০২০ সালে, দেখা যাচ্ছে বাসদ (মার্কসবাদী) থেকে কিছু মানুষ বেরিয়ে গিয়ে অথবা বিপরীতভাবে বললে বহিস্কৃত হয়ে বাসদ (পাঠক ফোরাম) নামে রাজনৈতিক কর্মসূচী প্রনয়ণ ও পালন করছে।

উপরে এই সব কথা লেখার ক্ষেত্রে বলার কারন রয়েছে। ছাত্রলীগ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সৃষ্টি হওয়া জসদই প্রথম বাংলাদেশে এমন একটি দল যাদের মূল হলো বুর্জোয়া ধারার রাজনীতি (বুর্জোয়া প্রবণতা সম্পন্ন দল আওয়ামী লীগ থেকে বের হয়ে আসা)। এবং স্বাধীন বাংলাদেশে জাসদই প্রথম বিপ্লবের স্তর সমাজতান্ত্রিক বলে নির্ধারন করে। জাসদের এই সিদ্ধান্ত গ্রহনের পিছনে ভারতের সোশ্যালিস্ট ইউনিটি সেন্টার অব ইন্ডিয়া-এসইউসিআই এর প্রতিষ্ঠাতা সাধারন সম্পাদক কমরেড শিবদাস ঘোষের যথেষ্ট প্রভাব আছে বলে প্রমান পাওয়া যায়। পরবর্তী জাসদ থেকে সৃষ্ট প্রতিটি দলই বাংলাদেশের বিপ্লবের স্তর সমাজতান্ত্রিক বলে নির্ধারন করে। যদিও রনকৌশলগত পার্থক্য আছে দলগুলির মধ্যে। বাসদও তার প্রকাশিত পুস্তিকা “বাংলাদেশের উৎপাদন পদ্ধতি ও রাষ্ট্র চরিত্র” বইতে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে-“সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের রণনৈতিক কর্মসূচীর মধ্যেই এই কাজগুলিকে (গণতান্ত্রিক কার্যক্রম) অঙ্গীভূত করে নিতে হবে।”

বাসদের দাবীকৃত বিপ্লবের স্তর ‘সমাজতান্ত্রিক হবার পূর্ব শর্ত হলো বাংলাদেশকে একটি পুঁজিবাদী রাষ্ট্র হতে হবে। বাসদ, শুধু বাসদ নয় জাসদ উদ্ভূত প্রত্যেকটি দলের দাবী হলো বাংলাদেশ একটি পুঁজিবাদী রাষ্ট্র এবং বিপ্লবের স্তর সমাজতান্ত্রিক। বাসদ অবশ্য দাবী করে পরিপূর্ণভাবে বিকশিত পুঁজিবাদী রাষ্ট্র নয়, অনুন্নত পুঁজিবাদী রাষ্ট্র। এই বিষয়ে বিস্তারিত আলাপ আছে বাসদ কর্তৃক প্রকাশিত পুস্তিকা‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি: অতীত ও বর্তমান’ বইয়ে। সেখানে কমরেড খালেকুজ্জামান একটি গল্পের অবতারনা করেন এবং রুপকের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত টানেন বাংলাদেশের পুঁজিবাদ হলো মূমুর্ষূ, অনুন্নত পুঁজিবাদ। (কমরেড খালেকুজ্জামান উদাহরন দিতেন ‘বিড়ালের দোড় প্রতিযোগিতা হবে যেখানে আমেরিকা আর সোমালিয়ার বিড়াল অংশগ্রহন করবে। ঘটনাক্রমে দেখা গেল সোমালিয়ার বিড়াল জিতে গেল এটা নিয়ে বিস্তর গবেষণার পর জানা গেল সোমালিয়ার ওটা বিড়াল ছিল না, ছিল বাঘ! না খেয়ে না খেয়ে সে দেখতে বিড়ালের মতো হয়ে গেছে। কমরেড খালেকুজ্জামান উদাহরণ টেনে বলতেন বাংলাদেশের পুঁজিবাদও ঠিক সোমালিয়ার সেই বিড়ালের মত মূমুর্ষূ, রুগ্ন, অনুন্নত পুঁজিবাদ)।

একটি পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য হলো ঐ রাষ্ট্রে একটি শক্তিশালী জাতীয় অর্থনীতি অস্তিত্ববান থাকবে। উৎপাদনের হাতিয়ার উন্নত হবে এবং শ্রম ও পুঁজির দ্বন্দ্বই নির্ধারক দ্বন্দ্ব হবে এবং ব্যাপকভিত্তিক শিল্প কারখানা ও শিল্প কারখানা উদ্ভূত পন্য ও দ্রব্য উৎপাদন থাকবে। বুর্জোয়া গনতন্ত্র কার্যকর থাকবে। তাহলে দেখা যাচ্ছে বাসদের দাবীমতে বাংলাদেশে এই বৈশিষ্ট্যগুলো বিদ্যমান তবে কম মাত্রায়। এর পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে যুক্তির অনুষঙ্গরুপে তারা কিছু অদ্ভূত টাইপের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। “বাংলাদেশের উৎপাদন পদ্ধতি ও রাষ্ট্র চরিত্র” পুস্তিকায় তারা সামান্ততন্ত্রের বৈশিষ্ট্য হিসেবে বলছেন, সামন্ততন্ত্রে জমির মালিকানা একান্ত (absolute) এবং হস্তান্তর অযোগ্য। স্তরীভূত স্বত্বাধিকার (hierarchical proprietorship)-এর ভিত্তিতি জমি নিয়োগ (allotment) হয় উপর থেকে নীচে এবং খাজনা দিতে হয় নীচ থেকে উপরে। সকলের নিচে যে চাষী জমিতে চাষ করে তাকে ভূমিদাস হিসাবে খাটতে হয়। খাজনা আদায় এখানে শোষনের মূল প্রক্রিয়া। বাসদ এমনভাবে সিদ্ধান্ত টানছে যেন মনে হয় উপনিবেশপূর্ব ভারতবর্ষ বা বাংলা এবং উপনিবেশের অধীন ভারতবর্ষে বা বাংলায় একই পদ্ধতি ছিল। তাদের সদয় অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে ইউরোপের সামন্ততন্ত্র ও বাংলার সামন্ততন্ত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। প্রাচীন ভারতবর্ষে জমির মালিক ছিল খোদ কৃষকই, কৃষক রাজাকে যে একের ছয়ভাগ কর দিতো তা রাজকার্য নির্বাহের জন্য, রাজা যে জমির মালিক সে হিসেবে নয় (বিস্তারিত দেখুন, গৌতম ভদ্র রচিত মুঘলযুগে কৃষি অর্থনীতি ও কৃষক বিদ্রোহ বইয়ের প্রথম অধ্যায়) আমরা মনে করি বাসদ যে সিদ্ধান্ত টেনেছে তা মূলত উপনিবেশিক ভারতবর্ষের বৈশিষ্ট্য। এবং বলা বাহুল্য উপনিবেশের অভিজ্ঞতা ভারতবর্ষসহ এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বহু দেশেরই ইতিহাসের স্বাভাবিক গতিপথ বিকৃত করেছিল। এছাড়াও খালিমপুর লিপিসহ অন্যান্য লিপিতেও দেখা যায়, বাংলায় প্রাচীনযুগে (যেমন, পাল আমলে) ভূমি বিক্রয়মূলেসহ অন্যান্য পদ্ধতিতেও হস্তান্তর করা যেত। এছাড়া সেই সময়েও বণিক ব্যবসায়ী ছিল। (বিস্তারিত, শাহানা হোসেন রচিত (history of ancient Bengal)। তাহলে বাসদীয় চিন্তাপদ্ধতি অনুযায়ী বলা যায়, প্রাচীন বাংলায়ও পুঁজিবাদ ছিল (!), যেমন আজকের বাংলাদেশে বিদ্যমান অবস্থাকে পুঁজিবাদ বলছেন যা অনুন্নত।

বাংলাদেশের ইতিহাস বিশ্লেষণে বাসদের যে সীমাবদ্ধতা তা অনন্য নয় বরং এই সীমাবদ্ধতা প্রায় প্রতিটি বামপন্থী দলের রয়েছে। এর প্রধান কারণ, মার্কস-এঙ্গেলের বিশাল রচনার খুব কম অংশ তারা অধ্যায়ন করেন এবং মার্কসীয় চিন্তাপদ্ধতি অনুসরন না করে মার্কসের কথাকেই মার্কসবাদ বলে মনে করেন। মার্কস মূলত ব্রিটিশ আমলা ও ইতিহাসবিদদের রচনা ও সংবাদপত্র থেকে ভারতবর্ষ সম্পর্কে জেনেছেন এবং এই বলে সিদ্ধান্ত টেনেছেন যে ভারতবর্ষের সমাজকাঠামো ছিল স্থির, অচঞ্চল এবং এই অঞ্চলের উৎপাদন পদ্ধতি হলো ‘এশীয় উৎপাদন পদ্ধতি’। কিন্তু বর্তমানে আমরা এই সম্পর্কে আরো সূক্ষরূপে জানি যা দামোদর ধর্মানন্দ কোশাম্বী বা ইরফান হাবীব মার্কসীয় চিন্তার আলোকেই ব্যাখ্যা ও পর্যালোচনা করেছেন, যে ভারতবর্ষের উৎপাদন পদ্ধতি এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চল হতে আলাদা এবং ভারতবর্ষের সামন্ততন্ত্র ইউরোপের সামন্ততন্ত্রের অনুরুপ নয়। (ভারত বর্ষের ইতিহাস চর্চা-ডিডি কোশাম্বী এবং ভারতের ইতিহাস প্রসঙ্গে-ইরফান হাবিব)

বাসদের উপরোল্লিখত পুস্তিকাটিতে তারা মার্কসের উন্নত পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে বিপ্লবের প্রসঙ্গকে উত্থাপন করেছেন এবং সে প্রসঙ্গে লেনিনের বক্তব্যকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করেছেন যেন চিরায়ত পুঁজিবাদী প্রক্রিয়ার উৎকর্ষ ছাড়া সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের কথা মার্কস চিন্তা ও উল্লেখ করেন নি। অথচ আজকে আমরা জানি ১৮৭২ সালে রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক নেত্রী ভেরা জাসুলিসের এক চিঠির জবাবে মার্কস অধনবাদী রাষ্ট্র রাশিয়ার বিপ্লবের অন্য সূত্র দেখিয়েছিলেন যা রাশিয়ার সোভিয়েত (পরিষদ) ব্যবস্থার মধ্যে নিহিত ছিল।

চলবে……………

এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

Leave a Reply

লেখক

সর্বশেষ সংবাদ

সালমান শাহর জন্মদিন আজ

আচ্ছা, সালমান শাহ যেখানে আছেন, সেখান থেকে কি ভক্তদের ভালোবাসা টের পান? তিনি নেই ২৪ বছর, এত দীর্ঘ সময় পরও তাঁর জন্য বিচার চেয়ে...

শিবিরের পক্ষে ভিপি নূর, হুশিয়ারী ঢাবি ছাত্রলীগের

জামায়াত শিবিরের পক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সাবেক ভিপি নুরুল হক নুররের প্রকাশ্য অবস্থান নেয়ার ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। ক্যাম্পাসে সমাবেশ করে...

জন্মদিনে মোদিকে শুভেচ্ছা জানায়নি চীন ও পাকিস্তান

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ৭০তম জন্মদিন ছিল গতকাল বৃহস্পতিবার। এদিন বিশ্বের বিভিন্ন দেশ মোদিকে শুভেচ্ছা জানালেও প্রতিবেশী চীন ও পাকিস্তান জানায়নি। আনন্দবাজার পত্রিকার এক প্রতিবেদনে...

পাটগ্রামে ধরলা নদী থেকে ভারতীয় যুবকের লাশ উদ্ধার

এস এম আলতাফ হোসাইন সুমন, লালমনিরহাট জেলা প্রতিনিধি।। লালমনিরহাটে পাটগ্রাম উপজেলায় বুড়িমারী সীমান্তে ধরলা নদীর প্রবল স্রোতে ভারত থেকে আলীবুল ইসলাম (২০) নামের এক যুবকের...
%d bloggers like this: