ধর্মনিরপেক্ষতা, যুক্তিবাদে আজও প্রাসঙ্গিক বিদ্যাসাগর

বাংলার নবজাগরণের শ্রেষ্ঠ সন্তান ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, তার জন্মের দু’শ বছর পূর্ণ হল আজকের এই দিনটিতে (২৬ সেপ্টেম্বর ২০২০)। তিনি প্রায় এককভাবে তৎকালীন বাংলায় আধুনিক প্রকরণে পাশ্চাত্যের উন্নত চিন্তা চর্চার উপর জোর দিয়ে এক সুসংবদ্ধ শিক্ষাপদ্ধতির প্রচলন করতে চেয়েছিলেন। সাধারণ শিক্ষার বিস্তৃতি ঘটাতে চেয়েছেন, বিদ্যালয় ও কলেজ স্থাপন করেছেন, নারীশিক্ষা প্রসারে সচেষ্ট হয়েছেন এবং পাশাপাশি, উপযুক্ত পাঠ্যপুস্তকের অভাব দূর করতে বাংলায় সেগুলি নিজেই লিখে শিশুশিক্ষার্থীদের কাছে ‘বস্তুবাদের’ মূলকথাটি তুলে ধরেছেন।

আবার এর জন্যে সমালোচিতও হয়েছেন। যেমন, পাদ্রি জন মার্ডকের মতে (১৮৭২) বিদ্যাসাগর তাঁর রচিত পাঠ্যপুস্তকে ‘চূড়ান্ত বস্তুবাদ’ শেখাতে চেয়েছেন, ‘নিরীশ্বরবাদী নীতিশিক্ষা’ প্রচার করেছেন যা চরিত্রগতভাবে হচ্ছে ‘সেক্যুলারিস্ট’। তিনি নারী অধিকার ও নারীমুক্তির লড়াইয়ে সর্বশক্তি নিয়োজিত করেছেন। জীবনযাপনে ছিলেন সাধারণ কিন্তু একই সাথে ব্যক্তির মর্যাদাবোধের ধারণায় ভাস্বর। এরকম একটি মানুষকে নিয়েই তো কবি মধুসূদন বলেছিলেন, ‘প্রাচীন ঋষির মত প্রাজ্ঞ, ইংরাজের মত তেজ আর বাঙালি মায়ের মত হৃদয়’। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘বিদ্যাসাগর এই বঙ্গদেশে একক ছিলেন……ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের চরিত্রে প্রধান গৌরব তাঁহার অজেয় পৌরুষ, তাঁহার অক্ষয় মনুষ্যত্ব’। মহাত্মা গান্ধীর মতে বিদ্যাসাগরের মত মানুষ পৃথিবীতে খুব কমই আসেন। বড়-ছোট, ধনী-নির্ধনী নির্বিশেষে তিনি প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে বিরাজমান। এরকম একজন মহান মানুষকে শ্রদ্ধা জানিয়ে আমরা নিজেরাই গৌরবান্বিত হতে চাই।

বিদ্যাসাগরের মত একজন ‘হিমালয়-সদৃশ’ মানুষের উত্থান তৎকালীন বাংলায় কিভাবে হল?

ইতিহাসে আমরা জেনেছি, ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তার বাণিজ্যিক স্বার্থেই এদেশে ইংরাজি শিক্ষার প্রচলন করতে চেয়েছিল। এই ইংরাজি শিক্ষার হাত ধরে আমাদের দেশে ঢুকে পড়ল ইউরোপিয়ান রেনেশাঁসের চিন্তাভাবনা যা সামন্তী ভারতের অচলায়তনে জোর ধাক্কা দিল। ইউরোপীয় নবজাগরণের প্রভাবে বাংলাদেশে এক নতুন সামাজিক আন্দোলনের সূচনা ঘটে যা একটা সামাজিক চিন্তাধারা হিসাবে রামমোহন রায়ের মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত হয়। সামন্তী ধর্মীয় মূল্যবোধ, চিন্তা ও বিশ্বাসের ভিত্তিমূল আঘাতপ্রাপ্ত হল এবং যুক্তিবাদ, ব্যক্তি স্বাধীনতা, নারী মুক্তির ধারণাকে ভিত্তি করে মানবতাবাদী দর্শন গড়ে উঠল। এই নতুন দর্শন মানুষকে সমস্ত জাগতিক ক্রিয়াকলাপের কেন্দ্রে স্থাপন করতে চাইল। ধর্মীয় চিন্তায় বিশ্বাসী মানুষ ধর্মভাবনা থেকে মুক্ত হয়ে বৈজ্ঞানিক মূল্যবোধ ও পদ্ধতিতে আস্থা রাখতে চাইল। মানুষের দৈনন্দিন জীবনে অজ্ঞেয়বাদ তথা ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তাধারা জায়গা করে নিতে থাকল যা জন্ম দিল এক তেজোদ্দীপ্ত মানবতাবাদের।


আরও পড়ুন


ধর্মীয় ও সমাজ সংস্কার আন্দোলনের পথে রামমোহনের (১৭৭২-১৮৩৩) মাধ্যমে বাংলার নবজাগরণের সূচনা। পৌত্তলিকতাবাদ, ধর্মীয় গোঁড়ামি ও বহুবিধ প্রচলিত কুসংস্কারের বিরুদ্ধে ছিল তাঁর লড়াই। রামমোহন রায়ের উদার ও সংস্কারমুক্ত চিন্তাধারার পথ বেয়ে একে একে বাংলার নবজাগৃতির অগ্রদূত হিসাবে দেখা গেল ডিরোজিও (১৮০৮-১৮৩১) ও তাঁর ছাত্রদের, দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ (১৮১৯-১৮৮৬), অক্ষয়কুমার দত্ত (১৮২০-১৮৮৬), রাজেন্দ্রলাল মিত্র (১৮২২-১৮৯১), দীনবন্ধু মিত্র (১৮৩০- ১৮৭৩) এবং সর্বোপরি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে (১৮২০-১৮৯১)। এঁরা পাশ্চাত্যের উদারনৈতিক ভাবধারায় সমৃদ্ধ হয়ে প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে চলতে চেয়েছিলেন, এদেশে সমাজ ও নৈতিকতার ক্ষেত্রে ধর্মকে বাদ দিয়ে চলার প্রবণতাকে একটা সামাজিক আন্দোলন হিসাবে আনার চেষ্টা করেছেন।

বাংলার নবজাগরণের প্রাথমিক পর্বে, ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বণিকী পুঁজির আধিপত্য আর ১৮৫৮ পরবর্তী সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ পুঁজির শাসন এক নয়। প্রাক-১৮৫৮ সময়পর্ব ছিল বাংলার নবজাগরণের উদারনৈতিক পর্ব, জাতীয়তাবোধের ধারণা তখনো গড়ে ওঠেনি। প্রথম পর্বের যাঁরা পুরোধা ছিলেন তাঁরা কিন্তু এই ভেবে চিন্তিত হয়ে পড়েননি যে তৎকালীন ভারতের অনেক ভূখন্ড দেশীয় নৃপতিদের হাত থেকে ক্রমাগত ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আয়ত্ত্বাধীন হয়ে যাচ্ছে। তাঁরা এটাকে বরঞ্চ আশীর্বাদ হিসেবে দেখেছিলেন কারণ এর মধ্য দিয়ে পাশ্চাত্যের উদারনৈতিক ভাবনাসমূহের সাথে এদেশের মানুষ পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।


আরও পড়ুন


নবজাগৃতির নেতৃবৃন্দ চেয়েছিলেন ইউরোপের যুক্তিবাদ, মানবতাবাদ ও উদারনীতিবাদের চিন্তা ইংরাজদের মাধ্যমে এদেশে প্রবেশ করুক। বাংলার নবজাগরণের এই উদারনৈতিক পর্বে যে বিষয়গুলির উপরে রামমোহন, বিদ্যাসাগর, অক্ষয়কুমার প্রমুখ মূল গুরুত্ব আরোপ করতে চেয়েছিলেন সেগুলি হলঃ ১) মানুষ এবং সমাজ সম্পর্কে একটা বিশ্বজনীন ধারণার সৃষ্টি করা; ২) জীবন ও চিন্তাধারা সম্বন্ধে একটি যুক্তিসঙ্গত বিচারবিন্যাস গড়ে তোলা; ৩) আরোপিত কর্তৃত্বের ধারণাকে অস্বীকার করা; ৪) নবোদিত ব্যক্তি চেতনাকে দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করার জন্যে মানুষকে প্রণোদিত করা এবং সর্বোপরি ৫) নিজের জীবনে মানবিক মূল্যবোধ প্রয়োগ করা। রামমোহন ও বিদ্যাসাগর – এই দুজনে ছিলেন এই উদারনৈতিক ধারার দুই প্রান্তের দুই প্রতিভূ- রামমোহনে শুরু আর বিদ্যাসাগরে শেষ।

রেনেশাঁসের এই উদারনৈতিক চিন্তাধারা কিন্তু তৎকালীন বাংলার বৌদ্ধিক জগতে মূলধারা ছিল না। বাংলার নবজাগরণের প্রথম পর্যায়ে প্রগতির ধারা যথেষ্ট শক্তিশালী হলেও এই ধারাটি ছিল মুদ্রার একটি মাত্র দিক। রামমোহন, বিদ্যাসাগর, অক্ষয়কুমারের প্রগতির ধারার বিরুদ্ধে ধর্মীয় গোঁড়ামির আরেকটি প্রবল ধারা ছিল। রাজা রাধাকান্ত দেব এবং তাঁর সহযোগীরা পাশ্চাত্য চিন্তাধারার সাথে পরিচিত হয়েও নবজাগরণপ্রসূত ভাবধারা এবং সতীদাহর মতো হিন্দু ধর্মীয় সংস্কারের বিরুদ্ধে বিভিন্নভাবে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের রাস্তায় নেমেছিলেন। নবজাগরণের মানবতাবাদী, যুক্তিবাদী, উদারনৈতিক কন্ঠস্বর এই আন্দোলনের অভিঘাতে রুদ্ধ হয়ে যায়। এই পথ বেয়েই হিন্দু পুনরুজ্জীবনবাদী একটি আন্দোলন প্রবলভাবে গড়ে ওঠে। এই প্রচন্ড বিরুদ্ধ শক্তির মুখোমুখি দাঁড়িয়েও বিদ্যাসাগর নিজের বিশ্বাসে অটল থেকেছেন।

বাংলা ভাষা, গদ্য রীতি ও সাহিত্যে বিদ্যাসাগরের অমূল্য অবদানকে কটাক্ষ করে বঙ্কিমচন্দ্র তাঁকে সামান্য অনুবাদক ও শিশুপাঠ্য রচয়িতার বেশি মর্যাদা দিতে অস্বীকার করেন। রবীন্দ্রনাথ অবশ্য বঙ্কিমের এই মতকে সমর্থন করেননি। তাঁর মতে, ‘বিদ্যাসাগর বাংলা ভাষায় প্রথম যথার্থ শিল্পী ছিলেন’। বিধবাবিবাহ প্রসঙ্গে বঙ্কিমচন্দ্র লিখলেন, ‘…আর একটা হাসির কথা। ঈশ্বর বিদ্যাসাগর নামে কলিকাতায় কে নাকি এক বড় পন্ডিত আছেন, তিনি আবার একখানি বিধবাবিবাহের বহি বাহির করিয়াছেন। যে বিধবার বিবাহের ব্যবস্থা দেয়, সে যদি পন্ডিত, তবে মূর্খ কে?’ তৎকালীন পত্র-পত্রিকায় লাগাতার বিধবা বিবাহের বিরুদ্ধে লেখা হতে থাকে, বক্তৃতার আসর হয়। সে রকম একটি সভায় সভাপতিত্ব করেছিলেন গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, যিনি অল্প দিন পরেই প্রথম ভারতীয় হিসাবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হন। অথচ, বিদ্যাসাগরের মতে তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ কীর্তি হচ্ছে বিধবাবিবাহ আইন পাশ করানো। এমনকি বিদ্যাসাগর-লিখিত বর্ণ পরিচয় ১৮৮৬ সালের ২৯শে মে বঙ্গবাসী পত্রিকায় নিন্দিত হল। বিবেকানন্দও বিদ্যাসাগরের শিশুপাঠ্য গ্রন্থে ‘ভারতীয়তা’র সন্ধান পাননি। তিনি মনে করতেন- বিদ্যাসাগরের বই পড়লে ছাত্রদের ভাল হবে না, মন্দ হবে। বিদ্যাসাগর বা অক্ষয়কুমার যে শিক্ষার প্রচলনে জীবনপাত করেছেন তাকে আক্রমণ করে বিবেকানন্দ বলেছেন, ‘মানুষগুলো একেবারে শ্রদ্ধা-বিশ্বাস বর্জিত হচ্ছে। গীতাকে প্রক্ষিপ্ত বলবে; বেদকে চাষার গান বলবে’। বিদ্যাসাগরের লেখা জীবন-চরিত সে যুগে ভৎর্সিত হয়েছে; তিনি কেন ইউরোপীয় জ্ঞানী ও কর্মবীরদের প্রসঙ্গ বললেন, এই হল আপত্তি। শিল্প, সংস্কৃতি, রাজনীতি – প্রায় সমস্ত ক্ষেত্রেই নব্য হিন্দুয়ানি জায়গা করে নেয়। নবজাগরণ প্রসূত সংস্কারমুক্ত উদারচিন্তাধারা একটা সংকীর্ণ ধারা হয়ে টিঁকে থাকল।

বিদ্যাসাগর ছিলেন তাঁর আদর্শ রূপায়নের ক্ষেত্রে নির্মম, কঠোর ও আপোসহীন। বিবেকানন্দ ১৮৮৬ সালে বিদ্যাসাগর পরিচালিত মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউশনের বৌবাজার শাখার প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পান। কিন্তু কর্তব্যকর্মে অবহেলার কারণে একমাসের মধ্যেই সেখান থেকে বরখাস্ত হন। সে সময়ের বিখ্যাত বাগ্মী তথা পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রগুরু বলে পরিচিত সুরেন্দ্রনাথকে তাঁর অসুবিধার সময়ে চাকরী দিয়েছিলেন, কিন্তু সুরেন্দ্রনাথের নিষ্ঠার অভাব দেখে তাঁকে চাকরি থেকে সরিয়েও দিয়েছিলেন। নিজের জামাই সূর্যকুমারকে স্কুলের দায়িত্ব থেকে এক কথায় অপসারিত করেন, বিদ্যালয় তহবিলে সামান্য গরমিল লক্ষ্য করে। পুত্র নারায়ন বিধবাবিবাহ করতে সম্মত হওয়াতে বিদ্যাসাগর পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ করেও এই বিবাহ সম্পন্ন করেন। আবার যখন জানলেন পুত্র নারায়ন ‘যথেচ্ছাচারী ও কুপথগামী’ হয়েছেন তখন পুত্রের সাথে সমস্ত ‘সংস্রব ও সম্পর্ক’ পরিত্যাগ করেন। এই ধরণের মানুষ ছিলেন বিদ্যাসাগর। এমন মানুষ এখন আর কোথায় পাব?

বিদ্যাসাগরের ঋজু মেরুদন্ডের পরিচয় অজস্র ছড়িয়ে আছে। স্যার সেসিল বিডন বাংলার গভর্ণর ছিলেন ১৮৬২-১৮৬৬। তিনি ছিলেন বিদ্যাসাগরের খুবই গুণগ্রাহী। সেই সময়ে নিজের খরচে বিধবা বিবাহ দিতে গিয়ে বিদ্যাসাগর প্রচন্ড ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন। বিডন বিদ্যাসাগরের এই আর্থিক সমস্যা জেনে তাঁকে প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যাপনার অনুরোধ করেন। বিদ্যাসাগর রাজী হন কিন্তু সাথে সাথে এটাও লেখেন যে তাঁর এই গুরুতর আর্থিক অসুবিধা সত্ত্বেও যদি তাঁকে ইউরোপীয়ান অধ্যাপকদের সমান মাইনে দেওয়া না হয় তাহলে তিনি এই কাজ গ্রহণ করতে পারবেন না। সমমর্যাদার উচ্চপদে কেবলমাত্র ভারতীয় বলে ইউরোপীয়দের থেকে কম বেতন পাবেন, এই ব্যবস্থায় তাঁর ‘আত্মমর্যাদাবোধ’ আহত হয়েছিল।

বিদ্যাসাগর সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন ১৮৫১ থেকে ১৮৫৮ সাল পর্যন্ত। উচ্চ বেতনের অত্যন্ত মর্যাদাসম্পন্ন এই পদ। স্বাধীনভাবে কাজ করার দায়িত্ব পেয়ে বিদ্যাসাগর শিক্ষক ও ছাত্রদের নিয়মমত কলেজে আসা এবং ক্লাস করানো সুনিশ্চিত করলেন। প্রতি অষ্টমী ও প্রতিপদে কলেজ বন্ধ থাকত। সিদ্ধান্ত নিলেন কলেজ বন্ধ থাকবে প্রতি রবিবার। শিক্ষাপ্রণালীর সংস্কার করলেন এবং কাশীর সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ ব্যালেন্টাইনের মতের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে পাশ্চাত্যের আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাথে ছাত্রদের পরিচিত করাতে গুরুত্ব দিয়ে ইংরাজি ভাষার সুশিক্ষার ব্যবস্থা করলেন। সেই সঙ্গে প্রাচীন ভারতীয় অঙ্কশাস্ত্রের পঠনের পরিবর্তে শুরু করলেন পাশ্চাত্য গণিত ও প্রকৃতিবিজ্ঞান। ভারতীয় দর্শনের পাশাপাশি পঠন চালু করলেন পাশ্চাত্য দর্শনের যাতে ছাত্ররা উপলব্ধি করতে পারে যে প্রাচীন ভারতীয় দর্শনে ‘কোন সারবত্তা নেই’। তিনি বলেছিলেন, ‘এই সাংখ্য ও বেদান্ত যে ভ্রান্ত দর্শন- আজ আর এ নিয়ে কোন বিতর্ক নেই’ (৭ সেপ্টেম্বর ১৮৫৩)। কিন্তু ১৮৫৭-৫৮ সালে এসে বিদ্যাসাগর দেখলেন যে জনশিক্ষা ও স্ত্রীশিক্ষা বিস্তারে তাঁর প্রস্তাবসমূহ বাংলা সরকার ক্রমাগত উপেক্ষা করে যাচ্ছে। একই সাথে, ১৮৫৭র মহাবিদ্রোহের সময়ে সংস্কৃত কলেজের বাড়ি অধিগ্রহণ করা নিয়ে তৎকালীন শিক্ষা অধিকর্তা গর্ডন ইয়ং এর সাথে তাঁর মতবিরোধ হয়। এই ঘটনা শিক্ষার স্বাধিকারের ধারণায় বিশ্বাসী বিদ্যাসাগরের মনে এক গভীর ক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল। এক কথায় বিদ্যাসাগর সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষতা ছেড়ে দিলেন। জানতেন, এর ফলে আর্থিক অনিশ্চয়তায় পড়বেন কিন্তু নিজের নীতি-আদর্শের সাথে আপোসে বিন্দুমাত্র রাজি ছিলেন না। এই হচ্ছেন, আমাদের বিদ্যাসাগর।

একথা অনস্বীকার্য যে বিদ্যাসাগর রক্ষণশীল হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীর শত প্রতিবন্ধকতার বিরুদ্ধে অটল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি ছিলেন ভারতীয় রেনেশাঁসের ‘বলিষ্ঠতম ও সবচেয়ে উন্নত’ চরিত্র। তিনি যে তেজোদ্দীপ্ত নবজাগরণের পরিচয় দিয়েছিলেন তাঁর দৈনন্দিন চলনে ও বলনে, দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, আমরা আজ তার থেকে শত যোজন দূরে। যুক্তিবাদ বা উদারনীতিবাদকে পরিহার করে ধর্মভিত্তিক যে চিন্তা আজ সারা পৃথিবী জুড়ে পরিব্যাপ্ত তার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে গেলে বিদ্যাসাগর আমাদের প্রধান অবলম্বন।

ঋণ স্বীকার- অমিয় কুমার সামন্ত, বিদ্যাসাগর (২০১২), সংবর্তক, বিদ্যাসাগর বিশেষ সংখ্যা (২০২০)

লেখক।।
বিকাশ রঞ্জন দেব
অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
সূর্য সেন মহাবিদ্যালয়
শিলিগুড়ি, ভারত।

এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

Leave a Reply

প্রতিবেদক

সর্বশেষ সংবাদ