বেকার || তাসফীর ইসলাম

একটা বেকার জীবন। শিকড়হীন বৃক্ষের মতো। আসলে এটা অসহ্য যন্ত্রনার মতন যেন অন্তজ্বালা পাতালের ন্যায় নিষ্ঠুর আবার বহু জল ঢালার পরেও হয় না নির্বান। বেকার জীবনটা ঠিক যেন এমন। তবুও প্রতিটি বেকারের জীবন শত আশার স্বপ্ন দিয়ে বোনা। দুর ভবিষ্যতে–
এমন গোটা কয়েক স্বপ্ন নিয়ে জীবনটা গড়া প্রতিটি বেকারের, আসবে কোনো একদিন সুদিন। সেই আশায় পথ চেয়ে থাকে প্রতিটি বেকার।

আয়ান, মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। চার বছর হয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করেছে। তার মা-বাবার স্বপ্ন সে একজন সরকারি চাকরিজীবী হবে। আসলে বর্তমান সময়ে সরকারি চাকরি পাওয়াটা আর সোনার হরিন ধরা একই কথা। তবুও থেমে নেই আয়ান প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সে বর্তমানে এখন বেকার আছে। তার বন্ধুরা অনেকেই সরকারি চাকরি পেয়েছে। তার বাবা বাজার করতে যাচ্ছে বাজারে এমন সময় চায়ের দোকান থেকে আয়ানের বন্ধু সাদিকের বাবা ডাক দিচ্ছে –

– ভাইসাব…ভাইসাব এদিকে আসেন এক কাপ চা খেয়ে যান।
– না ভাই চা খাবো না, সময় নেই।
– আরে ভাই আসেন তো একটা খুশির খবর আছে।
– ও আচ্ছা। বলেন তাহলে।
– আপনার ভাতিজার তো সাব-ইনস্পেক্টর এ চাকরি হয়েছে।
– আলহামদুলিল্লাহ ভালো।
– তা ভাইসাব আপনার ছেলে কি করে?
– মাথাটা নিচু করে আয়ানের বাবা বললো সরকারি চাকরির জন্য চেষ্টা করতে আছে।

আসলে বেকার সন্তানের বাবার কাছে যখন কেউ জেনে শুনে প্রশ্ন করে আপনার ছেলে কি করে? তখন বাবার যে কি অবস্থা হয় সেটা একমাত্র সেই বেকারের বাবা ই জানে।

দুপুরে একসাথে সবাই খাবার খাচ্ছে –

– কি খবর বাবা, চাকরি – বাকরি কিছু কি হবে?
– জ্বী বাবা চেষ্টা করতে আছি। হবে ইনশাআল্লাহ।
– তোর সরকারি চাকরির বয়স আর কতোদিন আছে?
– ৬ মাস আছে বাবা। একটা বড় মাপের মানুষ ধরেছি বাবা ১০ লক্ষ টাকা হলেই হবে।
– আমি এতো টাকা কোথায় পাবো বাবা।
– দেখি বাবা। আল্লাহ ভরসা। ভাগ্যে থাকলে হবে।
– একটু মেজাজ খিটখিট করে বললো তোর ভাগ্যই খারাপ। আর সবার ভাগ্য ভালো। কি পড়ালেখা করিস নিজের যোগ্যতায় চাকরি নিতে পারিস না। ছোটবেলা থেকে তোর সব আবদার রেখেছি। আর এখন তুই বুড়ো বাবার পিটে উঠে রয়েছিস। কিছু করে দেখা না হলে বাসা দিয়ে নেমে যা।
– ভাত না খেয়েই চলে যায় আয়ান।

পিছনে পিছনে আয়ানের মা যাচ্ছে বাবা তুই ভাত খেয়ে যা। আসলে একজন বেকারের আপন বলতে শুধু তার মা।

বেকারত্বের চাদরে ঢাকা মুখগুলো বাক্শক্তিহীন
কোথাও মেলেনা মনোবল, চাহনিতে পরিহাস,
সবশেষের অন্ধকোনায় “মা” একমাত্র আশ্বাস…

বাবা আমি জানি তুই একদিন অনেক বড় চাকরি করবি। আমি সেদিন গর্ব করবো। পাড়ার লোকেরা আজেবাজে কথা বলে তাই তোর বাবা একটু রাগ দেখালো। কিছু মনে করিস না বাবা।

ইসমিতার ফোন-
ইসমিতা হলো আয়ানের গার্লফ্রেন্ড। মেয়েটা জীবনের থেকেও অনেক বেশি ভালোবাসে আয়ানকে। ইসমিতার জন্য দৈনিক বিয়ের প্রস্তাব আসে। নানা অজুহাত দেখিয়ে সব গুলো বাদ করে দেয়। বাসায় আয়ানের কথাও বলতে পারে না। কারন, আয়ান বেকার। ইসমিতার বাবার শেষ কথা ইসমিতাকে সরকারি চাকরিওয়ালা পোলা ছাড়া বিয়া দিবে না। কিন্তু আয়ান কি পাবে সরকারি চাকরি?
কাল ৩৬ তম বিসিএস পরীক্ষা আয়ানের। পরীক্ষা শেষেই ইসমিতার সাথে দেখা করে।

– জানো! আজ আমার পরীক্ষা খুব ভালো হয়েছে।
– তোমার পরীক্ষা তো সবসময় ই ভালো হয়। শুধু রেজাল্টের সময় গোল। এবার কিছু একটা করো। টাকা দিয়ে,লোক দিয়ে! যেভাবে পারো চাকরিটা জোগাড় করো। তা না হলে আমাকে ছেড়ে দাও।
– ইনশাআল্লাহ এবার চাকরিটা হবে আমার। তুমি দেখে নিও আমি সরাসরি এএসপি হয়ে যাবো।
-গোবরে আবার পদ্নফুল ফুটবে! এ আশা ছেরে দাও তুমি। এএসপি লাগবে না’; একটা সরকারি চাকরি নাও আগে।
– আচ্ছা তুমি বিয়ের কথা বাসায় বলে দাও।
– বাবা জিঙ্গেস করবে ছেলে কি করে? তখন কি বলবো আমি। বলবো বিসিএস গাইড পরে। একদিন চাকরি হবে! আগে একটা চাকরি নাও পরে সব দেখা যাবে।

এই রকম দিন কাল কাটে আয়ানের। বাসায় জাইলে দেখে বাবার মুখ কালো। পরিবারের কারো মুখে হাসি নেই।
বাসায় আসলো আয়ান। এসে দেখে সবাই ঘুমাচ্ছে, খাবার টেবিলে কোনো খাবার নেই। মাকে খাবারের কথা জিঙ্গেস করতেই বাবা রেগে ওঠে। না খেয়েই রাত কাটায় আয়ান। কিছুদিন পর ইসমিতার সাথে দেখা-

– আয়ান।
-জ্বী বলো।
– ভারাক্রান্ত মন নিয়ে ইসমিতা বলে উঠলো- আয়ান তুমি আমাকে ক্ষমা করে দিও। আমি পারলাম না তোমার হতে। কাল আমার বিয়ে। বাবার পছন্দ করা ছেলের সাথেই। কাল রাতে বাবা হার্টএ্যাটাক করে। তখন সে বলে তুমি আর বাবা দুজনের একজন কে বাঁচাতে হবে। আমি কি করবো বলো? আমি না হয় বাবাকে বাঁচাতে গিয়েই তোমার সাথে মরে গেলাম। তুমি কি কষ্ট পাচ্ছো?
– কষ্ট? এই দুনিয়ায় সবার কষ্টের দাম আছে। একটা বাচ্চা কান্না করলে মানুষের মায়া লাগে। একটা বুড়া মানুষ কান্না করলে মানুষের খারাপ লাগে। শুধু এই পৃথিবীতে একটা বেকারের কান্নার কোনো দাম নাই। বেকারদের কোনো চাওয়া থাকতে নাই।
‘ নানা অজুহাত দিয়ে আয়ানের জীবন থেকে চলে যাচ্ছে ইসমিতা।
শুধু একটাই কথাই বলে গেলো- নিজের খেয়াল রেখো তুমি। আর একটা বিরামচিহ্ন দিয়ে গেলো “ভালো থেকো তুমি”
– তোমার কোনো দোষ নেই আয়ান। সব দোষ আমার।
– না, দোষ এই বেকার আয়ানের। খুব কান্না করতে ইচ্ছা করে আমার কিন্তু পারি না আমি। কারন,আমি বেকার। বেকারের সবকিছুতেই দোষ। তবে আমিও এই আয়ান বেকার ও চাকরি পাবে। সেদিন হয়তো তোমাকে পাবো না। আমি জানি একদিন আমার সব হবে সেদিন শুধুই তুমিই থাকবে না। তবে, কোনোদিন হয়তো আবার তোমার সাথে আমার দেখা হবে সেদিন হয়তো সবাই জানবে আমি অনেক সুখি। কিন্তু না শুধু তুমিই জানবে আমি অনেক দুঃখী।

বাসায় ফিরে বাবার সাথে ঝগড়া করে বাসা থেকে বের হয়ে যায় আয়ান। আয়ান রাস্তায় একা একা হাঁটছে আর ভাবছে-

আজ চাকরি বিনে আমি কস্মিনকালে ও ফুটপাত
আমার যদি একটা চাকরি থাকতো তাহলে,
হতো না চষতে আর পরিশ্রমী কুকুরের মতো;
হারাতে হতো না ভালোবাসাকে;
একটি হাড়ের খোঁজে ক্রমাগত গর্ত খুঁড়ে খুঁড়ে,
হতাম না ক্লান্ত আমি। আপাতত এই শীর্ণ হাত
করি সমর্পণ দুস্থ জ্যোতিষীর কাছে, ভাগ্যহত-
রুপালি পর্দার লীলা অবিরত থাকে চোখ জুড়ে!

হঠাৎ একটি ট্রাকের সাথে আয়ান ধাক্কা খেয়ে নদীতে পরে যায়।

সকাল বেলা টিভি দেখছে আয়ানের বাবা- একটি খবর – গতকাল নদীর পাড়ে এক অজ্ঞাত যুবকের লাশ পাওয়া গেছে। খবরটা শুনেই অজ্ঞান হয়ে পরে আয়ানের মা। খোঁজখবর নিয়ে জানা যায় লাশটা আয়ানের।
ঠিক সাত দিন পরে। আয়ানের বাসায় চিঠি আসে – আয়ানের ৩৬ তম বিসিএস এ এএসপি পদে সরকারি চাকরি পেয়েছে।

কি হবে এখন এই খুশির খবর দিয়ে? সেই আয়ান ই তো আর নেই। নিষ্টুর সমাজ তাকে বাঁচতে দেয় নি।

সরকারি চাকরি ই কি জীবনে সুখ আনতে পারে? নিজের জায়গায় থেকে একজন উদ্যেক্তা হলেই তো হয়। সমাজে ব্যাবসায়ীরা তো বেশি সুখী আছে। তাহলে সরকারি চাকরি কেন? সরকারি চাকরি এখন কি পারবে আয়ানকে ফিরিয়ে দিতে! আমাদের সমাজ এতোটা নিষ্টুর কেন? সমাজ বদলালে অবশ্যই দেশের কাঠামো বদলাবে।

এখন এই নিষ্টুর সমাজ পেয়ে যাবে ফ্ল্যাট বাড়ী,
কিংবা নতুন স্বপ্ন ফেক্সিলোড হবে।
আর এখন আয়ানের বেকারত্ব ঘোচাবে
গলায় জড়িয়ে রশি।

ধিক্কার জানাই এই সমাজের প্রতি।

লেখক।।
তাসফীর ইসলাম (ইমরান)
অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী
বাসাই – রামমালা, কুমিল্লা
বিভাগঃ সার্ভে ইঞ্জিনিয়ারিং
(১০৪ তম ব্যাচ)

এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

Leave a Reply

লেখক

সর্বশেষ সংবাদ

ছাতকে পৌরসভার ৬নং ওয়ার্ডের বাগবাড়ী এলাকায় বিট পুলিশিং সভা অনুষ্ঠিত

সেলিম মাহবুব, ছাতক (সুনামগঞ্জ)।। বিট পুলিশিং বাড়ী বাড়ী, নিরাপদ সমাজ গড়ি এই শ্লোগান কে সামনে রেখে ছাতক থানা পুলিশের আয়োজনে ছাতকের পৌরসভার ৬নং ওয়ার্ডের বাগবাড়ী...

মুজিববর্ষ উপলক্ষে নড়াইলে সাংস্কৃতিক সংগঠন নোঙরের বৃক্ষরোপন

মির্জা মাহমুদ রন্টু, নড়াইল জেলা প্রতিনিধি।। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশত বার্ষিকী উপলক্ষে সাংস্কৃতিক সংগঠন নোঙরের পক্ষ থেকে নড়াইলে বিভিন্ন প্রজাতির গাছেরচারা রোপন করা হয়েছে। সোমবার...

যশোর সদর উপজেলার উপ-নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী নীরা

স্বাধীন মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ, যশোর প্রতিনিধি।। আসন্ন যশোর সদর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকে মনোনয়ন পেয়েছেন জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি, বর্তমান উপজেলা...

ছাতকে মাদক ও অসামাজিক কার্যক্রমের বিরুদ্ধে এলাকাবাসীর প্রতিবাদ সভা

সেলিম মাহবুব, ছাতক(সুনামগঞ্জ)।। ছাতকে সরকারী ভুমিতে অবৈধভাবে বসবাস করা নূপুর বেগম ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসা ও অসামাজিক কার্যক্রমের অভিযোগ এনে এলাকাবাসীর উদ্যোগে প্রতিবাদ...
%d bloggers like this: