ব্যর্থ আফগানিস্তানের বোঝা পাকিস্তানের ঘাড়েই পড়বে

কাবুলে সরকার গড়েছে তালেবান। খবরটি যারপরনাই পুরোনো হয়ে গেলেও আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে এর রেশ রয়ে যাবে বহুদিন। ৩৩ সদস্য বিশিষ্ট নতুন এই সরকারে বেশ কিছু চমক দেখিয়েছে আফগান নেতৃত্ব, যা সার্বিকভাবে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইকে যথেষ্ট পরিমাণ হুমকির মুখেই ফেলে দিয়েছে।

দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন হাক্কানি গোষ্ঠীর প্রধান নেতা সিরাজউদ্দিন হাক্কানি, যার উপর ৫ মিলিয়ন ডলারের পুরস্কার ঘোষণা করেছিলো ন্যাটো জোট। আফগানিস্তানে ভারতীয় বিভিন্ন সম্পদ এবং স্থাপনায় হামলার পেছনের মাস্টারমাইন্ডও এই সিরাজউদ্দিন। অথচ নিন্দিত জঙ্গী সিরাজউদ্দিনই বর্তমান তালেবানের সবচেয়ে ক্ষমতাধর মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছে।

এছাড়াও, আফগান সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন গুয়ানতানামো ফেরত বন্দী সহ জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের তালিকায় থাকা প্রায় ১৭ জন শীর্ষ সন্ত্রাসী। তাই সার্বিকভাবে নতুন তালেবান নেতৃত্ব দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে কতোটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে, সে প্রশ্ন রয়েই যায়। তাছাড়া, তালেবান নেতৃত্বাধীন আফগানিস্তানে অন্য জঙ্গী সংগঠন গুলো বিকশিত হওয়ার চেষ্টা করবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

আর এসব কিছু তালেবান করতে পারছে প্রতিবেশী রাষ্ট্র পাকিস্তানের সার্বিক মদদ এবং সহায়তায়। সম্প্রতি মার্কিন নেতৃত্বাধীন ন্যাটো বাহিনী আফগানিস্তান ত্যাগ করার পর থেকেই পাকিস্তানের গোপন এবং প্রত্যক্ষ সমর্থনে ভূখন্ডটি থেকে আশরাফ ঘানির সরকারকে সরিয়ে পুনরায় ক্ষমতা দখলে নেয়ার লড়াইয়ে মেতে উঠে আফগান তালেবান। অবশেষে প্রায় বিনা বাঁধায় কাবুল দখল এবং সরকার গঠনেও সক্ষম হয় তাঁরা। ফলস্বরূপ গোটা অঞ্চল জুড়ে সৃষ্টি হয়েছে নতুন এক ভূ-রাজনৈতিক খেলার।

এ কথা অনস্বীকার্য যে, কাবুলে তালেবান নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের পেছনে পাকিস্তানের ভূমিকা ছিলো মূখ্য এবং স্পষ্ট। সরকার গঠনের কিছু পূর্বেও গোপন কাবুল সফরে যান পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থার মহাপরিচালক। তাছাড়া, দেশটির বিভিন্ন রাজ্যের বর্তমান নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তাগণও পাকিস্তানপন্থী হিসেবে পূর্ব চিহ্নিত।

তালেবান সরকারকে মদদ জোগাতে ইতোমধ্যে বিশ্ব নেতৃত্বের প্রতি কট্টর মনোভব দেখাচ্ছে পাকিস্তান। কাতারের দোহায় আফগান ইস্যু সমাধানে অনুষ্ঠিত হওয়া প্রতিটি আলোচনায় পাকিস্তানের এমন উগ্র মনোভবের ফলে লাভবান হচ্ছে মূলত আফগান তালেবান এবং নিষিদ্ধ সংগঠন হাক্কানী নেটওয়ার্কের সদস্যগণ। তবে তালেবান ইস্যুতে পাকিস্তানের এমন হঠকারিতা কদিন টিকবে, সেটাই এখন দেখার অপেক্ষা।

তালেবান নেতৃত্বকে ইতোমধ্যে স্বীকৃতি দিয়েছে পাকিস্তানের মিত্র চীন। খুব স্বাভাবিকভাবেই মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট বিদায়ের পর দেশটিতে প্রসার জমাতে চাইবে পাকিস্তান এবং চীন নেতৃত্ব। তবে তালেবান নেতৃত্বও নিশ্চয়ই এ দুটো দেশের উপর নির্ভরশীল হয়ে বসে থাকতে চাইবেন না। তারাও আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ে সচেষ্ট হবেন, ধারণা করি। কিন্তু নবগঠিত সরকারটি নিয়ে ইতোমধ্যে বিশ্বজুড়ে নানা কারণে নিন্দার ঝড় বয়ে যাচ্ছে।

এর মধ্যে প্রথম কারণ, সরকারটিতে সকল জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধির অন্তর্ভূক্তি না থাকা। সরকারে রয়েছে ৩০ জন পশতুন, দুজন জাতিগত তাজিক এবং ১ জন উজবেক। অন্যদিকে, দেশটির অন্যতম প্রধান গোত্র হাজারা সম্প্রদায়ের কোনো প্রতিনিধি সরকারে ঠাঁই পাননি; যা সার্বিকভাবে দেশটিতে আবারও অস্থিরতা তৈরী করবে।

আবার, সরকারে কোনো মহিলা প্রতিনিধি না থাকায় বিশ্বজুড়ে ব্যাপক সমালোচিত হচ্ছে বর্তমান আফগান নেতৃত্ব। এছাড়া, সম্প্রতি মহিলাদের একটি বিক্ষোভ সমাবেশে গুলি নিক্ষেপ করায় তালেবানের প্রতি আস্থা রাখতে পারছে না কেউই।

উপরোক্ত কারণ গুলো বিবেচনা পূর্বক, তাই ধারণা করা হচ্ছে, মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা বিশ্ব আফগানিস্তানে বরাদ্দ এবং পূর্বে সরবরাহ করা অর্থ তহবিল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তে অটল থাকবে। এক্ষেত্রে তাই আফগানিস্তানে ইতোমধ্যে সৃষ্ট ব্যাপক অর্থনৈতিক সঙ্কটের দ্রুত সমাধান হবে বলে মনে হচ্ছে না।

যদিও চীন ইতোমধ্যে দেশটিকে প্রায় ৩১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সাহায্যের ঘোষণা দিয়েছে, কিন্তু সে অর্থ দিয়ে আফগান সরকার কী পরিকল্পনা গ্রহণ করবে, কিংবা কীভাবে দেশের অর্থনীতির চাকা ঘুরাবে, সে বিষয়টি যারপরনাই অস্পষ্ট।

তাছাড়া, চীনের মূল উদ্বেগ ইস্ট তুর্কিস্তান ইসলামিক আন্দোলন। সেজন্যেই তাঁরা তালেবান নেতৃত্বের পাশে দাঁড়িয়েছে। কাজ ফুরোলে চীনকেও কতোদিন পাশে পাবে তালেবান, সে প্রশ্ন রয়েই যায়! পাশাপাশি আফগানিস্তানের আভ্যন্তরীণ খনিজ সম্পদেও নজর রয়েছে বেইজিং এর, যা আদতে আফগানিস্তানের জন্যই ক্ষতি বয়ে আনতে পারে।

দেখার বিষয় হচ্ছে, যদি চীন তালেবানের কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, কিংবা তালেবান চীন সম্পর্কে বিন্দুমাত্র আঁচও আসে, তাহলে খুব স্বাভাবিকভাবে ভেঙ্গে পড়বে আফগানিস্তানের অর্থনীতি। তাছাড়া, সার্বিক বিবেচনায় চীনের একার পক্ষে দেশটির বোঝা বয়ে বেড়ানোও সম্ভব হবেনা। ফলস্বরূপ দেশটির অভ্যন্তরে উত্থান ঘটবে আরও নিত্য নতুন জঙ্গী সংগঠনের। পাশাপাশি সার্বিকভাবে আফগান জনগণ আবারও পাকিস্তান অভিমুখেই রওনা করবে।

বিষয়টি পাকিস্তান বেশ ভালোভাবেই জানে। আর এজন্যেই এখন থেকেই তালেবান সরকারের জন্য সমর্থন আদায় এবং অর্থনৈতিক মন্দা কাঁটিয়ে উঠার পথ খুঁজছে দেশটি। যদিও পাকিস্তান নিজেই অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু দশায় রয়েছে, তথাপি পাক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস এম কুরেশি বারবার বিশ্ব সম্প্রদায়কে তালেবানদের সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার এবং আফগানিস্তানে মানবিক সংকট ও অর্থনৈতিক মন্দা রোধ করার আহবান জানাচ্ছেন।

কিন্তু সন্ত্রাসবাদ বিরোধী যুদ্ধ পরিচালনা করা বিশ্ব নেতৃত্ব খুব স্বাভাবিকভাবেই এতো সহজে তালেবান নেতৃত্বের সহায়তায় এগিয়ে আসবেনা। সে প্রমাণ পেয়েছি গত কিছুদিনে সিআইএ, এমআই ((ব্রিটিশ সিক্রেট সার্ভিস) এবং জার্মানির ফেডারেল ইন্টেলিজেন্স সার্ভিসের প্রধান কিংবা উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ঘনঘন ভারত সফরে।

তালেবানের উত্থানে এখনও অবধি সবচেয়ে উদ্বীগ্ন এবং ক্ষতিগ্রস্ত দেশ নিঃসন্দেহে ভারত। তবুও ভারত ধৈর্য্য সহকারে গোটা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং নিজেদের পক্ষে বৈশ্বিক জনমত তৈরীতে কাজ করছে। নিরাপত্তা পরিষদের বর্তমান সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করায় ভারতের পক্ষে কাজটি আগের চেয়ে সহজতর হয়েছে। ফলে ভারত স্বভাবত সম্ভব সব ধরণের পদক্ষেপ নেয়ার কাজটি এগিয়ে রাখছে। রাশিয়াও একদিকে যেমন তালেবানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে পশ্চিমা জোটের সঙ্গেও সদ্ভাব বজায় রাখতে সচেষ্ট।

সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় তাই বলতেই হয়, এখনও অবধি কাঁটার উপর ঝুলছে আফগানিস্তানে পাকিস্তান ভাগ্য। আফগানিস্তানে তালেবান নেতৃত্বের যেকোনো ধরণের ব্যর্থতা দেশটির উপর বয়ে আনবে ব্যাপক অর্থনৈতিক মন্দা এবং শরণার্থীর স্রোত। পাশাপাশি সন্ত্রাসীদের প্রশ্রয় দাতা হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দেশটিকে বইতে হয়েছে ব্যাপক সমালোচনার তীর।

সূত্র জানিয়েছে, ইতোমধ্যে আফগানিস্তানে ব্যাপক খাদ্য সঙ্কট এবং নগদ অর্থ সঙ্কট দেখা দিয়েছে। অতীতে এ ধরণের যেকোনো সঙ্কটে দেশটির জনগণের পাশে থেকেছে ভারত সহ পশ্চিমা জোট। কিন্তু এবার পাকিস্তানের প্রত্যক্ষ সমর্থনে এবং পরোক্ষভাবে পাকিস্তানের হয়ে প্রক্সি যুদ্ধ পরিচালনাকারী তালেবানের উত্থানে দেশটিতে সহায়তা পাঠানো বন্ধ রেখেছে অধিকাংশ রাষ্ট্র এবং জাতিসংঘও। প্রয়োজনের তুলনায় চীনের অনুদান নেহায়েতই তুচ্ছ। তাই বোধ করি, এর উত্তাপ ইতোমধ্যে আঁচ করতে পারছে পাকিস্তান।

ইরান এবং পাকিস্তান ছোট ছোট কিছু অর্থ সহায়তার ঘোষণা দিলেও এখনও অবধি সেভাবে কোনো আমল দেখা যায়নি। তাই দেশটিতে চোরাকারবারী সহ অন্যান্য অপরাধও দ্রুতই বাড়তে চলেছে বলেই মনে হচ্ছে অবস্থাদৃষ্টে।

শেষ খবর পাওয়া অবধি, আফগানিস্তানে কিছু মানবিক সহায়তা দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে জাতিসংঘ। কিন্তু ঘোষণা দেয়ার বাইরে এখনও কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। তাই তালেবান নেতৃত্বও স্বাভাবিকভাবে পাকিস্তানের দিকেই তাকিয়ে থাকবে অনেকাংশে। আর পূর্ব থেকেই অর্থনীতির ঋণের ভারে ভেঙ্গে পড়া পাকিস্তান আফগান তালেবানদের কীভাবে সন্তুষ্ট করবে, সেটাই দেখার!

লেখক।।
মেজর জেনারেল (অবঃ) হর্ষ কাকর
ভারতীয় সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল, কৌশলগত কূটনীতি এবং নিরাপত্তা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ।
(প্রকাশিত লেখনী সম্পূর্ণই তাঁর নিজস্ব অভিমত)
সূত্র: ইন্ডিয়া নিউজ নেটওয়ার্ক

এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

Leave a Reply

প্রতিবেদক

সর্বশেষ সংবাদ