ব্যাকল হরনকারীদের রাজ্যে

হটাৎ গ্রামের হাওয়াটা আবার গরম। সে হাওয়াই দূর্বলদের চামড়া ঝলসে যাওয়ার উপক্রম। কিন্তু সবলদের গায়ের পশমটাকেও সে হাওয়া আচঁদিতে পারে না। তবু দূবূল শরীর নিয়ে মুক্ত স্থানে গেলাম। দেখি হাওয়া গরম হলেও, সকল দূর্বলরাই সে খোলা স্থানে গরম হাওয়াটাকে আরও গরম করার চেষ্টা করছে। সে দলে যোগ দিতেই দৃষ্টিগত হয়, বিবস্ত্র এক সেগুন বৃক্ষের নিস্তেজ কান্ড। যে বৃক্ষ একসময় বাতাসে নিজ কান্ডটাকে দুলিয়ে সবাইকে শাসাতো, সে কান্ডটা ব্যাকল হরনকারীদের থাবায় অকালে ভেঙ্গে পড়েছে। গ্রামের সবাই পরিবেশবাদী। তাই গ্রামের সবাই মিলে নির্বাচিত করেছেন, বৃক্ষ রক্ষা কমিটির সদস্যদের। বৃক্ষ রক্ষার জন্য তাদের বানিয়েছে অসীম ক্ষমতাধর। তারা সবাই বৃক্ষের প্রয়োজনীয়তা ভালোভাবেই বোধ করতে জানে। কেননা এ বৃক্ষই মানব জাতির প্রাণশক্তি। যদি সে বৃক্ষ একে একে হারিয়ে যায়, তাহলে অক্সিজেন নামক প্রাণশক্তির অভাবে তাদের প্রাণপাখি উড়ে যাবে অচেনা জগতে। তাই তাদের বন রক্ষার আন্দোলন গরম হাওয়া থেকে ঘূণিূঝড়ে রুপ নেয়। সবকিছু তছনছ করে অপশক্তিকে উড়িয়ে নিতে প্রবল বেগে ধেয়ে আসে। কিন্তু সে দমকা ঝড়ো হাওয়া খড়চালার ঘর সহজে উড়াতে পারলেও, অপশক্তির কংক্রিটের দালানগুলোর কাছে এসে অসহায় হয়ে থমকে যায়। এর আগেও ব্যাকল হরনকারীদের বিরোদ্ধে অনেক আন্দোলন করেছে। কিন্তু তাদের মনে কোন ভয় ধরাতে পারে নি। বৃক্ষ রক্ষা কমিটির নিয়ম-কানুনের লাইনের সীমাবদ্ধতায় ব্যাকল হরনকারীদের সে লাইনে বাঁধতে পারে না। তাই এ হরনকারীরা অধরাই রয়ে যায়।


আরও পড়ুন>>


শ্রীপুর গ্রাম। গ্রামের বিশাল সেগুন নিকুঞ্জের ছায়াই, এখানে সেখানে মানব বসতি গড়ে ওঠেছে। মানব বাসিন্দার সংখ্যা সময়ের পায়চারিতে ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। গ্রামের সেগুন বাগানটি গ্রামের মানব বসতির প্রাণপাখি। যার হত্যা মানে মানব নিদর্শনের ধংস সাধন। তাই সকলে সে বাগানের বৃক্ষগুলোকে শ্রদ্ধা করে, ভক্তি করে, স্নেহ করে। মানব স্নেহে কচি দেহগুলো ধন্য হয়ে বিশাল কান্ডে পরিনত হয়। মানুষদের ক্ষুধা নিবারন করে। এ গ্রামের মানুষদের বিশেষ এক ধরনের ক্ষুধা আছে। কিশোরী সেগুন বৃক্ষের দেহ হতে নিঃসৃত বিশেষ এক ধরনের রস, এ গ্রামের মানুষদের প্রিয় পানীয়। যা পান করে তারা, তাদের বিশেষ ক্ষুধাকে তৃপ্ত করে। তাদের তৃপ্তির লালা বৃক্ষকে অপবিত্র করে। কিন্তু জলের ফোয়ারাই সে লালা ধুয়ে, শুভ্র হয়ে বৃক্ষ খোলা হাওয়াই পাতা শুকায়। গ্রামের মানুষরাও লোক চক্ষুর আড়ালে নিজ নিজ বৃক্ষের ব্যাকল স্বল্প পরিসরে উলঙ্গ করে, বৃক্ষের ক্ষুধা উদব্রেককারী রসে নিজেদের ক্ষুধাটাকে নিবারন করে। রাতের অন্ধকার ঘুচালে সূর্যের আলোতে সে ব্যাকল প্রকৃতির নিয়মে আবার সবস্ত্র হয়। এটাকেই প্রকৃতির নিয়ম মেনে, সবাই সে নিয়মে চলে সুসভ্য জাতি হিসাবে। এমনি সুসভ্য জাতির এক সদস্য বদিনাথ।


আরও পড়ুন>>


গ্রামে তার ক্ষমতা ও শক্তির সুরটা কখনো নিজ বাড়ির আঙ্গিনাকে ছাপিয়ে যেতে পারে না। তাই তার দুটি সেগুন বৃক্ষের একটিকে ব্যাকলবিহীন অবস্থায় ভেঙ্গে পড়ে থাকতে দেখে। বৃক্ষ রক্ষা কমিটির শরনাপন্ন হলে তাদের নির্ধারিত ফরম পূরনের ব্যাপ্তিতেই, মূল উদ্দেশ্যটা স্মৃতির পাতা থেকে মুছে যায়। মূল বাক্যটা রচনা করা হয়ে ওঠে না আর। বধিনাথ নিজ বৃক্ষকে হারিয়ে যে আঘাত পায়, তা বৃক্ষ রক্ষা কমিটির সদস্যদের অন্তরে অনুভূতির সৃষ্টি করতে না পারায়, নিজ রাজ্যে অদম হিসাবে আবিষ্কৃত হয়।


আরও পড়ুন>>


কিন্তু আজকাল গ্রামে ব্যাকল হরনকারীদের সংখ্যা বেড়ে গেছে। অনেকে নিজেদের ক্ষুধা মেটাতে অন্যের সেগুন বৃক্ষের ব্যাকলকে খুবড়ে তুলে বৃক্ষকে উলঙ্গ করে, সে বৃক্ষের রসে নিজেদের স্মান করায়। তাদের থাবায় বৃক্ষের কচি দেহের মাংস ছিড়ে, ক্ষত গর্তের সৃষ্টি হয়। ব্যাকলহীন বৃক্ষের উপর তাদের উপুর্যুপরি আরোহনের ফলে অনেক কচি বৃক্ষ ভেঙ্গে পড়ে। আর যে বৃক্ষ তাদের উপুর্যুপরি আরোহনের আঘাতে আধভাঙ্গা হয়ে হেলে পড়ে, ব্যাকল হরনকারীরা রস চুষে নেওয়ার পালাশেষ হলে, সে নিরস কান্ডটাকে ভেঙ্গে ফেলে। পরে ধরা পড়ার ভয়ে। গ্রামের সর্বত্র উলঙ্গ নিথর কান্ডগুলো ছড়িয়ে থাকে। যেটা আগে বৃক্ষ রক্ষা কমিটির দ্বারা, তুচ্ছ তৃষ্ণা নিবারনের ঘটনা বলে বিবেচিত হতো, সে তৃষ্ণা নিবারন এখন রীতিমতো মদ্যপানের নেশায় পরিণত হয়েছে। যা অনেকেই শখের বশে, বিলাসিতার ঢঙ্গে, আধুনিকতার অজুহাতে মদ্যপানের মতোই পান করে থাকে। কিন্তু ব্যাকল হরন হওয়া সেগুন বৃক্ষগুলো তাদের বিবেক দন্ড দ্বারা প্রহারিত হয়ে অসহনীয় যন্ত্রনার নরকে যমদূতের পৃষ্টে পিষে, যমদূতের কাছে জীবন যুদ্ধে পরাজিত হয়। আর ব্যাকল হরনকারীরা প্রকাশ্যে দুনিয়ার সুখ সাচ্ছন্দের রাজ্যে রাজত্ব করে। অপরদিকে বদিনাথদের সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পায়।


আরও পড়ুন>>


অন্ধকারের ঘুম এখনো গভীর। সুধীনের একটি মাত্র সেগুন বৃক্ষ। পিতৃ স্নেহে সে বীজটাকে চারাতে রুপ দেয়। চারা গাছটাও সে স্নেহে কচি কান্ডে রুপ নেয়। সুধীন সর্বদা সে বৃক্ষকে চোখে চোখে রাখে। প্রতিটি মুহুর্তের বিদায় কালে, সেগুন বৃক্ষের ছায়ায় নিজ ছায়া মিলায়। সেগুন বৃক্ষ রসে রসে সতেজ প্রৎফুল্ল কান্ডে পরিনত হয়। কিন্তু সেদিন সুধীন অন্ধকারের মায়াজালে নিজ দায়িত্ব ভুলে, ঘুমের সুরা পান করে কাষ্ঠের পাটায় দেহটাকে মগ্ন রাখে। ব্যাকল হরনকারীরা সুযোগটাকে কার্যে পরিণত করতে ভূল করে না। কার্য সম্পাদনের পরে, তা নিয়ে সমালোচনা-পর্যালোচনার পর্বে অংশ নিতে অন্ধকারকে নিজেদের আলোতে বিদায় জানিয়ে, গ্রামবাসিরা ভেঙ্গে পড়া সুধীনের বৃক্ষটাকে কেন্দ্র ধরে তার চারপাশে বৃত্ত অঙ্কন করে। সেই বৃত্তের জ্যাঁ হিসেবে সুধীন নিজেকে বৃত্তে স্থান করায়। অনেক আলোচনা-সমাালোচনার ভরে হাওয়া গরম হলে, সে গরম হাওয়াই সবাই গরম হয়ে ব্যাকল হরনকারীদের বিরোদ্ধে নিজেদের ক্রোধগুলো ছুড়ে প্রতিবাদ জানাায়। কিন্তু ক্রোধগুলো হরনকারীদের কাছে পৌছে দেওয়া যাদের দায়িত্ব, সেই বৃক্ষ রক্ষা কমিটি বৃত্তের ভাঙ্গনের সময় এসে সে শূণ্য পথে নিজেদের প্রবেশ ঘটিয়ে, গুনীরে দার্শনিক মতবাদ শুনায়। আর বদিনাথ, সুধনিরা ব্যাকল হরনকারীদের লাইনের শেষ ‘সমাপ্ত’ শব্দটা সন্ধানে নিজেদের সমাপ্তের পথে হাঁটে।

লেখক: নাজির উদ্দিন

বি এ অনার্স, এম এ ইংরেজি( অধ্যয়নরত)

আজিজুল হক কলেজ, বগুড়া।

এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

Leave a Reply

লেখক

সর্বশেষ সংবাদ

প্রেমিকাকে দিয়ে গণধর্ষণ মামলায় ফাঁসাতে গিয়ে ফেঁসে গেলেন নিজেই

ফেনীর সোনাগাজীতে প্রেমিকাকে দিয়ে প্রতিপক্ষের লোকদের বিরুদ্ধে গণধর্ষণ মামলা সাজাতে গিয়ে আরিফুল ইসলাম সাকিব নামে এক যুবক ধর্ষণ মামলায় নিজেই ফেঁসে গেছেন। রোববার (১৮ অক্টোবর)...

লক্ষ্মীপুরে বিএনপি নেতাকর্মীসহ ৬১ জনের বিরুদ্ধে মামলা

লক্ষ্মীপুরে সড়কে ফাঁদ পেতে স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা তাজুল ইসলাম ভূঁইয়া ও মনির হোসেন মনুর ওপর হামলা ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় মামলা করা হয়েছে। সোমবার...

তানোরে ৮ম শ্রেণীর ছাত্রী অপহরন মামলার আসামি গ্রেপ্তার

সোহানুর রহমান, পুঠিয়া (রাজশাহী) প্রতিনিধি ll রাজশাহীর তানোরে ৮ম শ্রেণীর ছাত্রী অপহরন মামলার আসামি শেরপুর জেলার নকলা উপজেলা থেকে গ্রেপ্তার করেছে তানোর থানা পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃত শরিফুল...

স্থানীয় সরকারের ২ শতাধিক প্রতিষ্ঠানের ভোট মঙ্গলবার

সারা দেশে জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদসহ দুই শতাধিক প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন ও উপনির্বাচন মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হবে। এদিন সকাল ৯টা থেকে বিরতিহীনভাবে বিকেল...
%d bloggers like this: