ভুখ এক অদৃশ্য ভূত। মানব চোখে তাকে দেখা যায় না। তবু সবাই তাকে ভয় করে। বিশেষ করে গরিব দরিদ্র শ্রেনী। ধনীরা তাকে শাসন করেলেও, দরিদ্র জাতিকে সে শোষন করে চলেছে তা প্রতিনিয়ত। যদিও ধনীরা তাকে নানা রকম প্রহার করে, শাসন করে । কিন্তু দরিদ্ররা নিজ রক্ত দিয়ে তাকে শান্ত করে। নিজেকে বাঁচানোর জন্যে, নিজ পরিবারের সদস্যদের বাঁচানোর জন্যে। তবুও যখন রক্ত কমে যায়, রক্তের তেজ কমে যায়, তখন ভুখ রাগে ফেটে পড়ে। কেড়ে নেয় পরিবারের কোন এক সদস্যকে। কিন্তু প্রতিবাদ করতে পাড়ে না কোন দরিদ্র। এমনিভাবে গ্রামের পর গ্রাম, সমাজের পর সমাজ, দেশের পর দেশ, সর্বত্র একই অবস্থা। ভুখ ভূত সানন্দে দরিদ্র জাতিকে শোষন করে চলেছে। দরিদ্রদের প্রতি ভুখের ঘৃণার মাত্রা, তাদের উপর ভুখের নির্যাতনের মাধ্যমে ফুটে ওঠে। ধনীদের প্রহারের থালা অনাদরে, অবহেলায়, অভিমানে নষ্ট হলেও; ভুখের নির্যাতনে দরিদ্রদের লাশের সারি এখানে সেখানে নষ্ট হয়ে, বায়ু দুষিত করে।

শ্রীপুর গ্রাম। গ্রামে ভুখের নির্যাতনের শিকার, এমন পরিবারের সংখ্যা আধিক্য। সব দরিদ্র পরিবার কর্তা প্রাণপনে চেষ্টা করে নিজ রক্তের বিনিময়ে, নিজের আপনজনদেরকে বাঁচাতে। কিন্তু সবাই সফল হতে পারে না। অনেকের রক্ত নিস্তেজ হয়ে পড়ে, সেই রক্ত পানি হয়ে যায়। যা দিয়ে ভুখ ভূতের খোড়াক জোটে না। এমনি এক নিস্তেজ রক্তের দিনমজুর আকু। পরিবারের সদস্য সংখ্যা আটজন। আকু, তার বউ, আর তাদের দুই ছেলে ও চার মেয়ে। যার মধ্যে বড় মেয়ের বয়স বারো বছর। যদিও সেই সংখ্যা গত বছরে দশে ছিল। ভুখ ভূতকে রক্তের জোগান দিতে পারে নি বলে, ভুখ যন্ত্রনার পৃষ্ঠে ডুবিয়ে, পিষে মেরে ফেলেছে দুজনকে। আকুর বৃদ্ধ মা ও তার ছোট চার বছরের ছেলেকে। তাই আকুর খুব ভয় অন্য সদস্যদের নিয়ে। নিজের নিস্তেজ দেহে রক্ত বিক্রি করে যেটুকু আহাড় জোটে, তা দিয়ে ভুখের মন জয় করার চেষ্টা করে। কিন্তু এভাবে আর কত ? আকু যেখানে রক্ত বেঁচে, সেখানকার কর্তা আবুল খাঁ। বিশাল সম্পদের মালিক। আকুর মতো অনেকেই তার কাছে রক্ত বিক্রি করে। যে রক্তে তার সম্পদের পাহাড় উচুঁ থেকে উচুঁতে পরিণত হয়। ভুখ তার বাড়ির সীমানা মাড়ায় না। কেননা আবুল খাঁ ও তার পরিবারের সদস্যরা নানা রকম মন্ত্রের থালা দিয়ে ভুখ ভূতকে প্রহার করে প্রতিদিন। তাই আবুল খাঁর বাড়ি দেখে ভুখ ভূতের ব্যপক ভয়। আবুল খাঁ ভুখ ভূতের সহযোদ্ধা রুপে নিজেকে উন্মোচন করেছে। কিন্তু যাদের রক্তে মন্ত্রের থালা, মন্ত্রস্ফুত হয়, সেই লোকদের উপর ভূতের খুব হিংসা। আকুর মতো অনেকে ভুখ ভূতের কাছে তাদের প্রিয়জনকে উৎস্বর্গ করেছে। যদিও তাদের এ আত্মত্যাগ অনিচ্ছায়। শোষনের যাতায় পিষিত হয়ে নির্মম বলির শিকার হয়।

এমনি অবস্থা অন্যান্য সকল রক্ত বিক্রির বাজারের। সেসব রক্ত বিক্রির বাজারের ইজারাদাররা ভুখ ভূতের দৃশ্যমান মূর্তি। দরিদ্ররা সারাদিন নিজ রক্তের বিন্দু বিন্দু ফোটায় সেচ দিয়ে তাদের বাজারকে প্লাবিত করে, যাতে তাদের রক্তের বাজার সবুজ থেকে সবুজতর হয়। কখনো কখনো নিজ রক্ত দিয়ে বাজারকে ধুয়ে আর্বজনামুক্ত করে, বাজারের রক্ত উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য। সময়ের পালে বাজারে সোনালী রক্তে ভরে ওঠে। ইজারাদাররা সেই সোনালী রক্তে নিজ ভান্ডার পরিপূর্ণ করে। কিন্তু যাদের রক্ত চুষে সোনালী রক্তগুলো প্রাণ পায়, তাজা হয়, সেই দরিদ্রদের অবস্থা অবর্ণনাযোগ্য। দরিদ্ররা নিজ রক্তে অন্যের ভান্ডার সমৃদ্ধ করে, বিনিময় কিছু রক্তের আশায়। কেননা তাদের নিজস্ব কোন রক্ত বিক্রির বাজার নেই। তবু দিন শেষে দরিদ্ররা তাদের রক্তের বিনিময় হিসাবে পায় ছলনা, প্রতরনা। ইজারাদাররা তাদের রক্তের যথাযথ মূল্য না দিয়ে, তাদের পাওনা রক্তকে ঋণ হিসাবে প্রদান করে। যার চাপ তাদের রক্ত বিক্রি করা ক্লান্ত শরীরটাকে আরো নিস্তেজ করে দেয়, রক্তে পানির পরিমাণ বৃদ্ধি করে। তবু তারা ভুখ ভূতের হাত থেকে বাঁচতে তার দৃশ্যমান মূর্তিদের নির্যাতন সানন্দে, হাসি মুখে গ্রহন করে। কিন্তু অভিযোগ করে না।

তাই একটি ভয়ে সব গ্রামবাসি সকালে ঘুম থেকে ওঠে। ভুখ ভূতের রক্তের জোগান দিতে পাড়ি জমায় আবুল খাঁর বাড়িতে। গত বৈশাখের কথা। বিধু তার চৌদ্দ বছরের মেয়ে ঐশিকে হারিয়েছে। ইতিহাসের পাতা উল্টাতেই স্মৃতির মূর্তি দৃশ্যপটে ভেসে ওঠে। দরিদ্রের আভায় গঠিত শরীরে যৌবনের অলংকারগুলো দারুনভাবে শোভা পেয়েছে। গোসল শেষে ভেজা কাপড়ে নদী থেকে বাড়ি ফেরার পথে, যৌবন অলংকারগুলো মানব ডাকাতদের নজর কাড়ে। লালসার পানি জিভ গড়িয়ে কাপড় ভেজায় অনেকের। আবুল খাঁ তার অন্যতম। প্রায় বিধুকে বলে,তার মেয়েকে আনতে। তার যৌবন সেবা নিয়ে, বিনিময়ে বিধুকে ঋণ মুক্ত করতে চায়। পিতা হিসাবে বিধু নিজেকে, নিজে হত্যা করতে চাইলেও, অসহায় হয়ে নিজ অন্তরটাকে হত্যা করে। আরও পরিশ্রম করে ঋণ পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু প্রতিবাদ করতে পারে না। অপমানের জবাব দিতে পারে না। কেননা এই রক্ত বিক্রির হাট থেকে বিতাড়িত হলে ভুখ ভূতের পায়ে পিষে মরবে সে ও তার পরিবার। তাই সকল অপমানটাকে ভাসিয়ে দেয় অন্তর জলে। তবুও শেষ রক্ষা হয় না। কোন এক কালবৈশাখি ঝড়ের রাতে, আবুল খাঁর বাড়ির পাশের বাগানটাতে ঐশির নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়। পোষাকের উপরের নির্যাতনের চিহ্নগুলো, পোষাকের নিচের নির্যাতনের চিহ্নগুলোকে প্রলোপ দিয়ে ঢেকে রেখেছে। গুজব রটে, ঝড়ে গাছের ডাল পড়ে মারা গেছে। বিধু সবকিছু বুঝতে পারলেও ঋণমুক্ত হয়ে নির্বাক থাকে। গ্রামের অন্য বাসিন্দারাও সেই মৌণ মিছিলে যোগ দিয়ে বাড়ি ফিরে। আকু তার ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু আকু মুখের মৌণতা সত্ত্বেও, অন্তরের ভাষায় গভীর চিন্তা মগ্ন হয়ে পড়ে। চোখ মুখে সেই দূর্ভাবনার জোয়ার বয়। জোয়ার ভাটায় দুশ্চিন্তা অন্যের হতে আড়াল করতে পারলেও, নিজেকে সে সারিতে স্থান করাতে পারে না। সারি হতে শৃঙ্খলাভঙ্গ করে, এলোমেলো ভাবনায় বিশৃঙ্খলা করে।
আকুও আবুল খাঁর হতে অগ্রিম রক্তের দাম নিয়ে রেখেছে। তারও বারো বছরের মেয়ের যৌবন সূর্য ঠিক মধ্যাহ্নে, উজ্জল আলোর আভা ধারন করেছে। তা অন্যের দৃষ্টিগোচর থাকলেও, আবুল খাঁ তাতে মুখিয়ে আছে। আকু নিরুপায়। এখন তার রক্তে পানির পরিমান বেশি। যা দিয়ে আকু কোন মতে ভুখের জন্যে রক্ত জুটিয়ে তার নির্যাতন থেকে নিজেকে ও পরিবারকে রক্ষা করে চলেছে। কিন্তু তার সহযোদ্ধার সাথে যুদ্ধ করার মতো তার কাছে প্রয়োজনীয় রসদ নেই। তাই ঋণ পরিশোধের প্রতিজ্ঞা করে, নিস্তেজ দেহে থেকে বেশি বেশি রক্ত করে। যার থেকে কিছু রক্ত দিয়ে ভুখ ভূতের আহাড়ের ব্যবস্থা করে। আর বাকি রক্তটুকু সামান্য সামান্য করে জমায়। শরীরের জমানো রক্ত আর রক্ত বিক্রির পরিমনের মধ্যে পাথর্ক্য দিন দিন প্রবল থেকে প্রবল হয়। কিন্তু আকু রক্ত বিক্রি জারি রাখে। কেননা সে যে নিরুপায়। সব ভূতের হাত থেকে পরিবাবের সদস্যদের বাঁচাতে হবে। এমনি করে সময় পালে হাওয়া বদল চলে। কিন্তু আকু, আবুল খাঁর দেওয়া ঋণের বিপরীত পাল্লা সমান করতে পারে না। কেননা আকু কষ্টে যে পরিমাণ রক্ত জমায়, ঋণের পাল্লা তার দ্বিগুণ হারে বেড়ে চলে। কেননা ঋণের প্রতি আবুল খাঁর টান প্রতিনিয়ত বেড়ে চলে। যা ঋণের পাল্লাকে ভাড়ি করে চলে। আকু অসহায়ের সমুদ্রে হাবুডুবি খেতে থাকে। প্রায় ডুবু ডুবু অবস্থা। যেখান থেকে নিস্তেজ রক্তের দেহ ওঠা প্রায় অসম্ভব। তবুও শেষ চেষ্টায় ভূতের সহযোদ্ধার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে। বাড়ি ভিটে বিক্রি করে ঋণ শোধ করে। কিন্তু রক্ত বিক্রির বাজার হতে নিজ দোকানের উচ্ছেদ হয়। ভুখ ভুতের আহার জোটাতে বহু রক্ত বিক্রির হাটে ঘুরে ফিরে। কিন্তু তার পানি যুক্ত রক্ত বিক্রি হয় না। সবাই নিস্তেজ রক্তকে ফিরিয়ে দিয়ে আরো নিস্তেজ বানিয়ে দেয়।


আরও পড়ুন>>


সোমবার। অনেকটা হতাশ মনে আকু শেষ চেষ্টা করে। সর্বত্র দাপিয়ে ভুখের খোড়াক সন্ধান করে। নিজ রক্ত বিক্রির জন্যে উন্মাদ হয়ে চারিদিকে আছড়ে পড়ে। রক্ত বিক্রির ভাবনায় আকুল হয়ে সকল জ্ঞান হারিয়ে অজ্ঞানে ভাসতে থাকে। কেননা তিনদিন হলো ভুখ ভূতের আহাড়ের উনুন অলস। ভুখ তার নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে চলেছে। যা আকুর কপালের ঘামটাকে পরিমানে বৃদ্ধি করে। রক্তের বাজারের ইজারাদারদের দ্বারে দ্বারে ভুখ ভূতের আহাড় জোগাতে ভিখ মাঙ্গে। কিন্তু ইজারাদাররা নিজ মূতির বহিস্থলন করে না। নিরুপায় হয়ে অনেক ঘোরাঘুরি করে, শেষে দরিদ্রদের দ্বারে করুণা প্রার্থী হয়। দরিদ্রদের করুনার জল তার হাত ভেজালেও তার হাতটাকে ধুয়ে দিতে পারে না। কয়েকজনের কাছে থেকে কিছু পয়সা ধার পায়। হিসাব করে পাঁচ পয়সার বেশি হয় না। কিন্তু এত সস্তায় আটসদস্যর পক্ষে ভুখ ভূতের জন্যে রক্ত কেনা অসম্ভব। কিছুক্ষণ নিস্তব্দতার সাগর পাড়ি দিয়ে কোলাহলের স্রােতে ভাসা শুরু করে। তিন পয়সা দিয়ে ভুখের জন্যে শেষ রক্ত কিনে। আর বাকি দু পয়সায় বাজারের কোণের দোকান হতে সবুজ রঙের একটা শিশি কিনে। রাতের খাবার আগে সবার অজান্তে, ভুখ ভূতের রক্তের সাথে সবুজ রক্ত মিশিয়ে দেয়। । তারপরে সবাই একসাথে রাতের খাবার খায়। আকু খাওয়া শুরু করার আগে অনেকক্ষণ একদৃষ্টিতে সবার দিকে ছলছল আখি স্থির রাখে। ঠিক যেমন বর্ষায় বৃষ্টি শেষে আকাশে রংধনু ওঠে, পৃথিবীর দিকে অপলক দৃষ্টিতে নির্বাক থাকে। তারপরে রংধনু অদৃশ্য হয়ে গেলে দু ফোটা বৃষ্টি পড়ে খাবার থালায়। বুকের ভিতর বজ্রপাত শুরু হলেও সে শব্দ অন্যকে কম্পিত করে না। সবাই সবার পানে নিশ্চুপ চেয়ে রয়। ভুখ ভূতকে পরাজিত করার আনন্দে সবাই বুকের মধ্যেকার ভুমিকম্পটাকে চোখে মুখে কম্পিত হতে দেয় না। এভাবে আকু ভুখ ভূতকে পরাজিত করে,পাড়ি জমায় বিজিত রাজ্যে চিরশান্তির নিদ্রায়। মিছিলের পিছনের সারিতে পরিবারের অন্য সদস্যরাও ভেসে চলে।
সমাপ্ত।

লেখকঃ নাজির উদ্দিন।
বি.এ (অনার্স), মাস্টার্স (অধ্যয়নরত),
ইংরেজি বিভাগ, সরকারি আজিজুল হক কলেজ, বগুড়া।

এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

Leave a Reply

লেখক

সর্বশেষ সংবাদ

সালমান শাহর জন্মদিন আজ

আচ্ছা, সালমান শাহ যেখানে আছেন, সেখান থেকে কি ভক্তদের ভালোবাসা টের পান? তিনি নেই ২৪ বছর, এত দীর্ঘ সময় পরও তাঁর জন্য বিচার চেয়ে...

শিবিরের পক্ষে ভিপি নূর, হুশিয়ারী ঢাবি ছাত্রলীগের

জামায়াত শিবিরের পক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সাবেক ভিপি নুরুল হক নুররের প্রকাশ্য অবস্থান নেয়ার ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। ক্যাম্পাসে সমাবেশ করে...

জন্মদিনে মোদিকে শুভেচ্ছা জানায়নি চীন ও পাকিস্তান

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ৭০তম জন্মদিন ছিল গতকাল বৃহস্পতিবার। এদিন বিশ্বের বিভিন্ন দেশ মোদিকে শুভেচ্ছা জানালেও প্রতিবেশী চীন ও পাকিস্তান জানায়নি। আনন্দবাজার পত্রিকার এক প্রতিবেদনে...

পাটগ্রামে ধরলা নদী থেকে ভারতীয় যুবকের লাশ উদ্ধার

এস এম আলতাফ হোসাইন সুমন, লালমনিরহাট জেলা প্রতিনিধি।। লালমনিরহাটে পাটগ্রাম উপজেলায় বুড়িমারী সীমান্তে ধরলা নদীর প্রবল স্রোতে ভারত থেকে আলীবুল ইসলাম (২০) নামের এক যুবকের...
%d bloggers like this: