মধ্যযুগের বাঙালি ও রাজশক্তিঃ বখতিয়ার-আগমন থেকে সিরাজ-পতন অবধি বাঙালির রাজনৈতিক অবস্থান

অ্যাবস্ট্র্যাক্টঃ এই আলোচনায় মধ্যযুগে বাঙালির রাজশক্তির বহুমুখী মানচিত্রের একটি রূপরেখা নির্মাণ করা হয়েছে। সর্বাগ্রে মধ্যযুগ, বাঙালি এবং রাজশক্তি – এ তিনটি চাবিকাঠিকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এরপরে গুরুত্বপূর্ণ রাজব্যক্তিত্বদের উত্থানের উৎস ও পটভূমি ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সেযুগের মিলিটারি কালচারাল কমপ্লেক্সকে বিশ্লেষণ করার উদ্দেশ্যে মধ্যযুগের অর্থনৈতিক ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ইতিহাসের গতিপ্রকৃতি আলোচিত হয়েছে এই সন্দর্ভে। বাঙালির দেশজ ধর্ম এবং বাঙালির দেশজ রাজশক্তির পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ণয় করা হয়েছে। সর্বোপরি, মধ্যযুগকে বাঙালির হিরোইক এজ বা বীরত্বব্যঞ্জক যুগ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, এবং মধ্যযুগে দেশজ রাজশক্তির ইতিহাসকে বাঙালির প্রতিরোধের ইতিহাস হিসেবে দেখা হয়েছে।

কি-ওয়ার্ডঃ মিলিটারি কালচারাল কমপ্লেক্স, মধ্যযুগ, পাঠান, মোগল, রাজা, রায়, জমিদার, গৌড়বঙ্গ, বাঙালির ইতিহাস, রাজশক্তি, শাক্তধর্ম, গৌড়ীয় বৈষ্ণব আন্দোলন, চৈতন্য, নিত্যানন্দ, যবন হরিদাস, রূপ সনাতন, গর্গযবনান্বয়প্রলয়কালরুদ্র, লক্ষ্মণসেন, পরচক্রভয়, কেশবসেন, বিশ্বরূপসেন, মধুসেন, নৌজা বা দনুজ রায় বা অরিরাজদনুজমাধব দশরথদেব, কিংবদন্তী-চন্দ্রকেতু, শ্রীহট্ট-গৌড়গোবিন্দ, মহাস্থানগড়-পরশুরাম-শিলাদেবী, দ্বিতীয় বল্লালসেন-বায়াদুম্ব, গণেশ, চণ্ডীচরণপরায়ণ দনুজমর্দনদেব, চণ্ডীচরণপরায়ণ মহেন্দ্রদেব, প্রতাপাদিত্য, সীতারাম, মেনাহাতি, রাণী ভবানী, কৃষ্ণচন্দ্র, রাজবল্লভ, মধ্যযুগের সমাজসংস্কার, সুবর্ণগ্রাম, সপ্তগ্রাম, বেণী রায়, দেবীদাস (ঠাকুর কুশলী), কাল যোগলা, কাল চণ্ডিয়া, একটাকিয়া ভাদুড়ি, ভূষণা, সাঁতোড় সান্যাল, কংসনারায়ণ, দিনরাজ, সিন্দুরী, বাহিরবন্দ।

***

এ সন্দর্ভের শুরুতেই বাঙালি এবং রাজশক্তি এবং মধ্যযুগ, এ তিনটি ধারণাকে স্পষ্ট করা প্রয়োজন। প্রথমেই আরেকবার বলা দরকার বাঙালি অর্থে নিছক বাংলাভাষী মনে করি না, বাঙালিত্বকে আমরা সাংস্কৃতিক সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত করি, এবং তন্ত্রের প্রকৃতি-পুরুষ দ্বৈতবাদ এই সাংস্কৃতিক বাঙালিত্বের নিউক্লিয়াস। মধ্যযুগে এই বাঙালির রাজনৈতিক অবস্থানেরই নানা দিক বিচার করব আমরা। অবশ্যই এই জাতির নাম চিরকাল তো বাঙালি ছিল না। রামমোহন এই সেদিনও গৌড়ীয় ভাষার ব্যকরণ লিখেছেন। মধ্যযুগে বিজাতীয় শাসকরাই আমাদের সমগ্র প্রদেশকে বাঙ্গাল বলতে শুরু করেন, এবং এর আদি বাসিন্দাদের অর্থাৎ নেটিভদের বাঙ্গালি বলতে শুরু করেন। এখানে শব্দটি কেবল ভাষাভিত্তিক হতে পারে না, কেবল ভৌগলিকও নয়; সাংস্কৃতিকও বটে। তবে কিনা নিছক বাংলাভাষী অর্থেও তো বখতিয়ার থেকে সিরাজ – কাউকেই বাঙালি বলা যেত না। কেন গৌড় শব্দটা মধ্যযুগের শাসকদের ব্যবহারের বাইরে চলে গেল, তার অনেক কারণ থাকতে পারে। ফার্সি ভাষায় গৌড় লেখা যায় না, লিখতে হয় গোর, যার অর্থ কবর (সুখময় ১৩১), ফলে এ নামটা অব্যবহৃত হয়ে থাকতে পারে। এছাড়া সম্ভবত গৌড় নগরী পুরো evacuate করা হয়েছিল পরচক্রভয় (শত্রুর আক্রমণজনিত ভয়, এর নিবারণার্থে লক্ষ্মণসেন যজ্ঞ করেছিলেন)-এর ফলে, প্রাচুর্য পুরোটা সরে গিয়েছিল পূর্বদিকে, ফলে বঙ্গ ও বঙ্গাল যখন দখল হল, পুরো সুবাহ্‌ এই নামে আখ্যা পেয়েছিল, কারণ সম্পদ ছিল বঙ্গালে, পশ্চিম তখন প্রায় পোড়ামাটি। বাঙ্গালি শব্দটি অবশ্য স্থানবাচক অর্থে মধ্যযুগে ব্যবহৃত হয়েছে ব্যাপকতর অর্থে। নুর কুতবুল আলম, যিনি “কাফির” রাজা গণেশের বিরুদ্ধে সৈন্য অভিযান করার জন্য জৌনপুরের সুলতান ইব্রাহিম শাহ শারকি-কে চিঠি দেন, পাণ্ডুয়ার এই সুফি সন্তকে সমসাময়িক নথি শেখ নুর বাঙ্গালি নামেও উল্লেখ করছে (রমেশ মজুমদার হিস্ট্রি অভ মেডায়েভাল বেঙ্গল ২৯), যদিও নুর কুতবুল আলম বাঙালি ছিলেন না, বাংলা ভাষাটাও ঠিকঠাক জানতেন বলে প্রমাণ নেই। এখানে বাঙ্গালি একটা স্থানবাচক নাম। ছোটবেলায় হিন্দি চিনি ভাই ভাই নামে একটা স্লোগান শুনে বেশ অবাক হয়েছিলাম, সে স্লোগান অবশ্য আমার জন্মের অনেক বছর আগেকার। হিন্দি জানতাম একটা ভাষা, আর চিনি জানতাম একটা খাদ্য। এরা কি করে একে অপরের ভাই ভাই হল, সেটা কিছুতেই বোধগম্য হত না। পরে বুঝলাম এখানে হিন্দের লোক মানেই হিন্দি, আর চীনদেশের লোক মানেই চিনি। অর্থবিভ্রাট আর কি। শেখ নুর বাঙ্গালির নামের শেষাংশ এরকমই একটা বিশেষণ। যে ভাবে ওই হিন্দি চিনি ভাই ভাই স্লোগানে চিনি মানে মিষ্টি নয় আর হিন্দি মানে ভাষা নয়, সেরকম এই বাঙ্গালি কিন্তু সাংস্কৃতিক অর্থে যে বাঙালি আমরা বুঝি, সেটা নয়। কিন্তু এই অর্থটাও আছে, এটা জিওগ্রাফিক অর্থ। যদিও এ অর্থ আমাদের এই প্রবন্ধে আমরা বাঙালির সংজ্ঞায় নিচ্ছি না। এই অর্থেই পশ্চিম পাকিস্তানের লোকেরা পূর্ব পাকিস্তানের সবাইকে, হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে বাঙ্গালি বলত। হিন্দিভাষীরাও আমাদের এই অর্থেই বাঙ্গালি (বংগালি, যারা বংগলা ভাষায় কথা বলে) নামে ডাকে। এটি জাতিবাচক নাম নয়, এই নামে আমাদের জাতিকে আমরা অভিহিত করি না, অন্তত বেশ কয়েক শতাব্দী হয়েছে আর করি না, কিন্তু এই নামে অন্যে আমাদের ডাকে বটে। এই স্থানবাচক অর্থেই, আমরা জানি, এখনও সম্ভবত ভারতের মুসলমানকে অনেক ইসলামিক দেশে হিন্দু মুসলমান বলে। দিল্লিতে এবং উত্তর ভারতে অনেক ফকির নামের পরে বাঙ্গালি লাগায়, শাহ বাঙ্গালি, বাবা বাঙ্গালি, ইত্যাদি, এরা সবাই জাদুটোনা ইত্যাদি করে পেট চালায়, বলা বাহুল্য একজনও বাঙালি নয়। আরও বিস্তারিত বলা যায়, তবে দরকার নেই। এই প্রবন্ধের প্রয়োজনে নুর কুতবুল আলম ওরফে শেখ নুর বাঙ্গালি একজন বাঙালি নন, যেমন তামিল আর বাঙালিকেও ওই হিন্দের বাসিন্দা অর্থে হিন্দি বলা যায়, কিন্তু আমরা বলার দরকার দেখি না। প্রসঙ্গত আমি লক্ষ্য করেছি কিছু হিন্দুত্ববাদী ইদানিং আদর্শগতভাবে বাঙ্গলা (বাংলা নয়) এবং বাঙ্গালি (বাঙালি নয়) বানান চালাতে চাইছেন, আমার মতে এটা তাঁদের অবচেতনে হিন্দির সঙ্গে তাঁদের নৈকট্য সূচিত করে।

বাঙালির সংজ্ঞা এইভাবে আমরা স্পষ্ট করলাম।

প্রসঙ্গ রাজশক্তি। আমরা জানি সিন্ধু সরস্বতী সভ্যতা খুব সম্ভবত রাজতান্ত্রিক ছিল না (মিশেল দানিনোর দ্য লস্ট রিভার বইয়ের অন্যতম বক্তব্য এটাই), কারণ রাজতন্ত্রের চিহ্ন মোটের ওপরে তার প্রত্নপ্রমাণে অবর্তমান, যেটা বেশ আশ্চর্যের। বরং একটা দৃষ্টিগ্রাহ্য সাম্য ছিল। আমার ব্যক্তিগত মতে ও সভ্যতাটি গুরুতান্ত্রিক ছিল, এবং উপমহাদেশে বাঙালির তান্ত্রিক শেকড়ও ওখানেই। এই সভ্যতায় কোনও রাজপ্রাসাদ ছিল না, অদ্ভুত সাম্য ছিল নগরপরিকল্পনায়, মানুষের অস্তিত্ব ছিল সামগ্রিক ও সমষ্টিগত। সমসাময়িক পৃথিবীর অন্যান্য সভ্যতাগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে পার্থক্য চোখে পড়ে। আমি এই সভ্যতাকে তন্ত্রনির্ভর ও গুরুতান্ত্রিক মনে করি। এরপরে আমরা জানি প্রাচীন ভারতে একাধিক গণরাজ্য ছিল। এই সেদিনও গোপাল নির্বাচিত হয়েছিলেন প্রকৃতিপুঞ্জের দ্বারা। বাঙালির সাম্যময় অতীত ছিল, সে তো বৌদ্ধ সহজিয়া থেকে চৈতন্য আন্দোলন তার সাক্ষ্য দিচ্ছে। ফলে বাঙালি তার রাজাকে মূলত গুরু হিসেবে, এবং গুরুকে রাজা হিসেবে দেখতে চায়। উল্লেখ্য, হাটের রাজা নিত্যানন্দ, পাত্র হল শ্রীচৈতন্য, এরকম প্রচলিত স্লোগান ছিল মধ্যযুগে।

বিংশ শতকে যখন পশ্চিমী উদারবাদী গণতন্ত্রের বিশ্বজয় ঘটছে, অথবা সমাজতন্ত্রের প্রসার ঘটছে, যখন নীহাররঞ্জন রায় বাঙালির ইতিহাস লিখছেন, তিনি রাজবৃত্তকে একটি পৃথক ও সংক্ষিপ্ত চ্যাপ্টার হিসেবে বাদবাকি বাঙালি-অস্তিত্ব থেকে প্রায় নির্বাসিত করে দেন। সম্ভবত এজন্যই জয়নাগ নিয়ে এত দায়সারাভাবে কাজ সেরেছেন নীহাররঞ্জন। বিংশ শতকের বাঙালি রাজশক্তিকে ইতিহাসের বিগত যুগের বদভ্যেস ভেবেছে। কিন্তু ভাবনাটা অনৈতিহাসিক। মতুয়া আন্দোলনের স্থপয়িতা হরিচাঁদ একবার বলেছিলেন, যে জাতির রাজা নাই, সেই জাতি তাজা নাই। কথাটা মিথ্যে নয়। উদাহরণস্বরূপ, বাংলার বৈদ্যজাতি রাজা রাজবল্লভের নেতৃত্বে অসীম উপকৃত হয়েছিল। আধুনিক বাংলার শাক্ততন্ত্রের ইতিহাসে রাজা কৃষ্ণচন্দ্র বা রাণী রাসমণির অবদান অসামান্য। রাণী রাসমণি মাহিষ্য জাতির অহঙ্কার। একদা বল্লালসেন ঢাকেশ্বরী ও কালীঘাট তৈরি করেছিলেন, এমন জনশ্রুতি আছে। রাণী আমাদের দক্ষিণেশ্বর দিয়েছেন, বাংলা রেনেসাঁসের অতীব গুরুত্বপূর্ণ ফাউন্টেনহেড। দিগ্বিজয়ী পালসম্রাট ধর্মপাল বাঙালিকে বিক্রমশীলা বিশ্ববিদ্যালয় দিয়েছেন এককালে। অতএব রাজশক্তি মানেই ভয়ানক খারাপ একটা ব্যাপার ভাবা বিংশ শতকের বাঙালির কুসংস্কার ছিল, এ কুসংস্কার কাটিয়ে উঠতে হবে, নইলে ইতিহাসের সম্যক বস্তুনিষ্ঠ পাঠ সম্ভব হবে না।

চৈতন্য আবির্ভাবের কিছু পূর্বে, নবদ্বীপে ব্রাহ্মণ রাজা হবে এই প্রবাদ প্রচলিত হয়। অতএব গৌড়ের সুলতানের অত্যাচার শুরু, বাসুদেব সার্বভৌম উৎকলে আশ্রয় নিলেন, তাঁর পিতা কাশীবাসী হন। বাসুদেব, আমরা জানি, উৎকলের রাজগুরু হবেন এবার। এই নবদ্বীপে ব্রাহ্মণ রাজা হবে ব্যাপারটা কি চৈতন্য আন্দোলন কিছুটা সত্যিই রূপায়িত করেনি?

মধ্যযুগের ন্যারেটিভে যেভাবে রাজশক্তি এসেছে, মঙ্গলকাব্য বা বৈষ্ণবপদাবলীতে উদাহরণস্বরূপ, সেখান থেকে বাঙালির দেশজ রাজশক্তি নির্মাণের একটা রূপরেখা পাওয়া যায়, কিন্তু স্থানাভাবে সেটা নিয়ে আজ বিস্তারিত আলোচনা সম্ভব নয়।

অন্যদিকে মধ্যযুগের মুসলমান রাজশক্তির এক দীর্ঘ রক্তাক্ত ইতিহাস আছে, রাজহন্তাদের ক্ষমতায় বসার ইতিহাস, সেটার বিস্তারিত আলোচনা সঙ্গত কারণেই এই প্রবন্ধের বাইরে। তবে এটি মধ্যযুগের গৌড়বঙ্গে রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ট্রোপ, মধ্যযুগে বখতিয়ার থেকে সরফরাজ সবাই নিহত হয়েছেন, আলিমর্দান খিলজি থেকে আলিবর্দি খান সবাই ঘাতকের ভূমিকায়। আর হিন্দুর হাতে বেশি ক্ষমতা গেলে উদাহরণস্বরূপ রাজা গণেশ, তিনিও ইলিয়াস শাহী বংশের একজন অপদার্থ সুলতানকে হত্যা করে সিংহাসনে বসেন। অর্থাৎ গৌড়ের মুসলমান রাজশক্তি সর্বদাই শঙ্কিত ছিল। সিরাজপতনের ইতিহাস পর্যালোচনার সময় বাঙালি এই জিনিসটা প্রায়শ ভুলে যান, রাজহত্যা নিয়ে এমন মেলোড্রামার প্রয়োজন নেই, ওটা আকছার হত এবং মিরজাফর এমন কোনও নতুন বিশ্বাসঘাতকতা করেন নি যা তার আগে হত না। স্বাধীন নবাব কথাটাও কাঁঠালের আমসত্ত্ব, কারণ মোগল বাদশার অধীনস্থ, তবে সে অন্য প্রসঙ্গ।

মধ্যযুগের রাজশক্তির প্রসঙ্গে পিরালী আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মোটিফ। কমপ্রাদর শ্রেণীর একাংশ শাসকের ধর্মে প্রবেশ করেছেন। বস্তুত গণেশ সম্পর্কেও বলা হয়েছে যে তিনি ইসলামিক আচার ব্যবহার এতদূর পর্যন্ত গ্রহণ করেছিলেন যে তাঁর মৃত্যুর পরে তাঁকে কবর দেওয়ার দাবি উঠেছিল (কালীপ্রসন্ন ৩০)।

রাজা দনুজমর্দনদেব এবং মহেন্দ্রদেব, দুজনেরই মুদ্রায় চণ্ডীচরণপরায়ণ লেখা আছে, এবং মধ্যযুগে বাঙালির রাজশক্তি এইভাবে বাঙালির মাতৃকাউপাসনা থেকে তার শক্তি সঞ্চয় করেছে। দেশজ রাজশক্তির প্রয়োজন আছে একটি জাতিকে শক্তিশালী করার জন্য। উপরন্তু বাঙালি একাই সাধারণতন্ত্র করবে, প্রান্তবিলাস করবে, শক্তিকেন্দ্রকে বিলীন করে দেবে নৈরাজ্যবাদী-অ্যানার্কিস্ট ইউটোপিয়ায়, নেতৃত্ববিহীন থাকবে, আর বাকি জাতিগুলি সেই সুযোগে বাঙালির ঘাড় ভাঙবে, এও তো কোনও কাজের কথা নয়। মধ্যযুগের বাঙালির রাজশক্তি চর্চা নিয়ে কাজেই আমরা এই সন্দর্ভ নির্মাণে ব্রতী হয়েছি। আরেকটি খুবই প্রয়োজনীয় কথা হল এই যে মধ্যযুগের রাজনৈতিক ইতিহাস মানেই বিজাতীয় তুরস্ক-পাঠান-মোগল রাজশক্তির একাধিপত্য, এরকম একটা ভাবনা কাজ করে। যদুনাথ সরকারের সম্পাদনায় হিস্ট্রি অভ বেঙ্গল দ্বিতীয় খণ্ড মুসলিম পিরিয়ড ১২০০-১৭৫৭ এই ধারণার বহুলপ্রচলনের সাক্ষ্য দিচ্ছে। কিন্তু চাঁদের অন্য পিঠের মত, মধ্যযুগের রাজনৈতিক ইতিহাসের আরেকটা দিক আছে। তার ছবি আমাদের চাই। আরবী ফার্সি তুর্কি পাঠান মোগল সংস্কৃতির তলায় চাপা থাকা সেই বাঙালির মধ্যযুগে বাঙালি দেশজ রাজশক্তির ইতিহাস কিন্তু নির্মাণ করা প্রয়োজন, এবং সে নির্মাণে দেখব, সমস্ত ব্যর্থতা, সমস্ত অন্ধকার, সমস্ত পরাজয়ের পরেও, সম্ভবত সমস্ত ব্যর্থতা, সমস্ত অন্ধকার, সমস্ত পরাজয়ের ফলেই মধ্যযুগ প্রকৃত অর্থেই বাঙালির হিরোইক এজ। “যশোহরে পুকুর কাটিতে কাটিতে একটি বাসুদেব-বিগ্রহ পাওয়া গিয়াছিল, তাঁহার চারিদিক অর্দ্ধছিন্ন নরকঙ্কাল-বেষ্টিত – যশোহরের ইতিহাস-লেখক স্বর্গীয় সতীশচন্দ্র মিত্র মহাশয় আমাকে ইহা জানাইয়াছিলেন” (দীনেশচন্দ্র ৬৬৯)।

এই সময়ে বাঙালি নিজের শেকড় রক্ষার্থে জন্য এমন প্রতিরোধ করেছে, এই সময়ে বিখ্যাত ও অনামা এতজন বাঙালি নায়ক এসেছেন, যা আশ্চর্য করে। অন্য কোনও সময়ে এমনটা পাওয়া যায়নি, আদিযুগে না, আধুনিক যুগেও না। বস্তুত সেই চীনদেশের প্রবাদ এবং ব্রেশটের সেই বিখ্যাত উক্তি থেকে ধার নিয়ে বলা যায়, মধ্যযুগের কাল ছিল বাঙালির ইন্টারেস্টিং টাইমস এবং মধ্যযুগের বাংলা ছিল আনহ্যাপি ল্যান্ড। এই সময়েই ঝড় ওঠে, রাত্রির অন্ধকারে বিদ্যুৎ চমকায়, নায়কেরা অবতীর্ণ হন।

প্রসঙ্গ মধ্যযুগ। মধ্যযুগ কাকে বলব? আজকের এই সন্দর্ভে যে সময়কাল আলোচিত হবে, অর্থাৎ বখতিয়ার খিলজির গৌড় বিজয় – ১২০৫ খ্রীষ্টাব্দে তিনি সাময়িকভাবে লখনৌতি দখল করে একটি মুদ্রা প্রচলন করেন, যদিও পাকাপাকিভাবে লখনৌতি দখল করতে আরও বছর দশেক লেগেছিল, সেই বিখ্যাত আঠেরো অশ্বারোহীর নদীয়ায় হামলা সম্ভবত ১২০৩-এ, তবে সেটি বিজয় ছিল না, অতর্কিতে অ্যামবুশ করে পুনরায় বাংলা থেকে ফিরে গেছিলেন বখতিয়ার – বখতিয়ারের গৌড় বিজয় থেকে পলাশীর যুদ্ধে সিরাজের পতন (১৭৫৭ খ্রীষ্টাব্দ), এই সুদীর্ঘ ৫৫২ বছর বাংলার ইতিহাসে মধ্যযুগ হিসেবে যদি ধরি – যদিও গুপ্তসাম্রাজ্যের পতনের পরেই ভারতে মধ্যযুগ শুরু হয়েছিল বর্তমানে ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ইতিহাসবিভাগে এই মর্মে একটা ঐক্যমত্য ঘটেছে এবং সেই অর্থ নিলে শশাঙ্ক থেকে সিরাজ সবটাই মধ্যযুগ হয়ে যাবে, সবই হযবরল’র বেয়াল্লিশ ইঞ্চি আর কি, সেটার বিপদ অবশ্য এই ইতিহাসবিদরাও জানেন এবং সেজন্য শশাঙ্ক থেকে সেনযুগ আর্লি মেডায়েভাল এবং বখতিয়ার থেকে সিরাজ লেট মেডায়েভাল বলে আখ্যা দেন, অর্থাৎ আদি মধ্যযুগ আখ্যা দেন শশাঙ্ক থেকে সেনযুগকে, এবং তুর্কি আক্রমণ থেকে একটা ওয়াটারশেড, একটা স্পষ্ট বিভাজন তারাও ধরতে বাধ্য হন, তাদেরকে মানলে সেক্ষেত্রে একে লেট মিডল এজেস বলতে বাধ্য থাকব। যদিও গুপ্তযুগের সঙ্গে জয়নাগ ও শশাঙ্ক এবং পালসাম্রাজ্যের স্পষ্ট কন্টিনিউটি ছিল, এবং মগধসাম্রাজ্য বাঙালির নেতৃত্বের অধীনে তো জয়নাগ-শশাঙ্কের আগেও এসেছে, কাজেই এই বিশেষ রকমের মধ্যযুগের সংজ্ঞায় গোঁজামিল আছে, এখানে সম্ভবত তুর্কি আক্রমণকে আড়াল করার একটা প্রয়াস আছে। বড় ধরণের একটা এপিস্টেমিক ব্রেক দরকার, একটা যুগান্তর ঘটার জন্য। সেটা আমার মতে এই খিলজি আক্রমণে হয়েছিল। জয়নাগ বা শশাঙ্ক সর্বার্থেই গুপ্ত লেগেসি বহন করতেন, গুপ্তযুগের সঙ্গে কোনও এপিস্টেমিক ব্রেক ঘটেনি। এমনকি একশো বছরের মাৎস্যন্যায় পর্যন্ত এই ধরণের কোনও বিভাজন ঘটাতে পারেনি বাঙালির ঐতিহাসিক ট্র্যাজেক্টরিতে। যে বিভাজন খিলজি হামলাপরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ দেখলে স্পষ্ট হয়। ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বখতিয়ার খিলজি থেকে সিরাজ-উদ-দৌলা পর্যন্ত যুগকেই আমরা এই সন্দর্ভে মধ্যযুগ ধরব এবং এই যুগে দেশজ বাঙালির রাজনৈতিক অবস্থানের একটি পর্যালোচনা করব।

মধ্যযুগের রাজনৈতিক ইতিহাস মানেই নানা বিজাতীয় শাসকের নামে কণ্টকিত, আমরা ভাবি, কিন্তু কোনও মুসলমান শাসকের কোনও ইন্সক্রিপশন, কোনও লিপি কিন্তু নাগরিক কেন্দ্রের বাইরে পাওয়া যায় নি। আদিপর্বের ইতিহাসে যেমন দেখি প্রত্যন্ত গ্রামেও বারবার ভূমিদানপট্টোলী পাওয়া যাচ্ছে, এখানে একদমই সেটা হয়নি। এদের শাসন সীমাবদ্ধ ছিল মূল ঘাঁটিতে, তার বাইরে বিস্তীর্ণ অঞ্চলের সঙ্গে এদের সম্পর্কটা বেশ জটিল ছিল। বিষ্ণুপুরের মত তথাকথিত স্বাধীন রাজ্য তো ছিল বটেই, যেগুলো মোগলের বশ্যতা স্বীকার করে করদ রাজ্যে পরিণত হলেও বহুলাংশেই স্বতন্ত্র, কিন্তু তথাকথিত বিজিত অঞ্চলগুলোর ক্ষেত্রেও আমরা দেখব, এই মুসলমান শাসকদের ভূমিকা ছিল অনেকটা বর্তমানকালের extortionistদের মত, অর্থাৎ তোলাবাজ। একটা কর সংগ্রহের নেটওয়ার্ক কাজ করত এইমাত্র, তবে সবসময় সেটাও কাজ করত না। কিন্তু একদম প্রথম থেকে শুরু করা যাক।

বাঙালির সঙ্গে মধ্যযুগের পরিবর্তিত রাজনৈতিক সমীকরণের প্রথম সূত্র তাহলে এই। বাঙালির স্বাধীনতা বজায় ছিল ঘাঁটি থেকে, কেন্দ্র থেকে, নগর থেকে দূরে।

শুধু নগর থেকে দূরে নয়, মধ্যযুগে অনেক সময় শরদিন্দুর ‘তুঙ্গভদ্রার তীরে’ উপন্যাসের নায়কদ্বয়ের মত বাঙালি স্বদেশ থেকে দূরে গিয়েও বসতি করেছে এবং অবাঙালি রাজশক্তির অঙ্গীভূত হয়েছে। সুকুমার সেন থেকে উদ্ধৃত করছি

“ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রথম পাদে পরমার-বংশীয় মালব-রাজ অর্জুনবর্মদেবের মহামন্ত্রী ও গুরু “বালসরস্বতী” মদন ছিলেন বাঙালী, “গৌড়ান্বয়-পুলিনরাজহংসঃ”। এঁর পিতার নাম ছিল গঙ্গাধর। অর্জুনবর্মদেবের তিনখানি তাম্রপট্টানুশাসন মদনের রচনা। ইনি লিখেছিলেন একটি কাব্য ‘বালসরস্বতীয়’; আর একটি নাটিকা ‘পারিজাতমঞ্জরী’ বা ‘বিজয়শ্রী’। সমগ্র নাটিকাখানি দুই খণ্ড সুবৃহৎ শিলাপট্টে উৎকীর্ণ হয়েছিল। প্রথমখানি পাওয়া গেছে। তাতে প্রথম ও দ্বিতীয় অঙ্ক মাত্র আছে।

মধ্যপ্রদেশে রায়পুরে প্রাপ্ত কলচুরি-বংশীয় রতনপুর-রাজ প্রতাপমল্লদেবের প্রশস্তিকে একটি ক্ষুদ্র কাব্য বলা চলে। এটির লিপিকাল ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রথম পাদ। এই প্রশস্তির রচয়িতা ও লেখক ছিলেন বাঙালী কায়স্থ” (সুকুমার ৪৬)

নগরে যে বাঙালি ছিলেন, তিনি মূলত কোল্যাবরেটর। দক্ষিণ আমেরিকার ইতিহাসের অনুসরণে এঁদের আমরা কম্প্রাদর বলতে পারি। বিভিন্ন উচ্চপদে বাঙালিরা কাজ করেছেন মধ্যযুগে। যেমন রাজশক্তির খুব ঘনিষ্ঠ সাহচর্যে থাকতেন বলেই রাজচিকিৎসকের পদটিকে আদিযুগে অন্তরঙ্গ বলা হত। এই প্রথা মুসলমান শাসকরাও বজায় রেখেছেন, অন্তরঙ্গ পদে নিযুক্ত রাজবৈদ্য নিঃসন্দেহে মধ্যযুগে কম্প্রাদর বাঙালির রাজনৈতিক শক্তির সান্নিধ্যের একটি বড় উদাহরণ। বৈদ্যবংশীয় অনন্ত সেন ছিলেন রুকনুদ্দিন বারবক শাহের অন্তরঙ্গ। অনন্ত সেনের পুত্র শিবদাস সেনও বিখ্যাত রাজচিকিৎসক ছিলেন, তিনি ‘চক্রদত্ত’ নামক বিখ্যাত আয়ুর্বেদগ্রন্থের টীকা রচনা করেছিলেন। চৈতন্য পারিষদদের অন্যতম শ্রীখণ্ডের মুকুন্দ সরকার ছিলেন হোসেন শাহের অন্তরঙ্গ (সুকুমার ৩১)।

তাই বলে অসামরিক ক্ষেত্রেই কেবল বাঙালি চাকরি পেয়েছে, এমন নয়। চতুর্দশ শতকের প্রথম দিকে সুলতান জালালুদ্দিন একজন বাঙালিকে মহামন্ত্রী ও সেনাপতি পদে নিযুক্ত করেছিলেন। পুঁথি কীটদষ্ট হওয়ায় এঁর নাম পাওয়া যায় নি, তবে এঁর উপাধি ছিল রায়-রাজ্যধর, এঁর পিতার নাম জগদত্ত। এই মহামন্ত্রী-সেনাপতি নিয়মিত ব্রাহ্মণদের দানধ্যান করতেন, এবং এঁর অনুরোধে বৃহস্পতি মিশ্র ‘স্মৃতিরত্নহার’ নামক গ্রন্থ রচনা করেন। এই বৃহস্পতি মিশ্রর উপাধি ছিল “মহিন্তাপনীয় কবিচক্রবর্তী-রাজপণ্ডিত-পণ্ডিতসার্বভৌম-কবিপণ্ডিতচূড়ামণি-মহাচার্য-রায়-মুকুটমণি”। সুকুমার সেন বলছেন যে একাধিক সুলতানের সভাপণ্ডিত হিসেবে এই বৃহস্পতি মিশ্র কাজ করেছেন। ‘স্মৃতিরত্নহার’ ছাড়া ‘ব্যাখ্যাবৃহস্পতি’ (রঘুবংশ ও কুমারসম্ভবের টীকা) এবং ‘নির্ণয়বৃহস্পতি’ (শিশুপালবধের টীকা) লিখেছিলেন, এবং তাঁর শেষ রচনা ‘পদচন্দ্রিকা’ (অমরকোষের টীকা), রচনাকাল সম্ভবত ১৪৩১-৩২ খ্রীষ্টাব্দ। এই বৃহস্পতি মিশ্রের ছেলেরাও (নাম পাওয়া যাচ্ছে রাম এবং বিশ্রাম) প্রসিদ্ধ পণ্ডিত এবং রাজসভায় মন্ত্রীত্ব লাভ করেছেন। পরম বৈষ্ণব হলেও একটি চিত্তাকর্ষক শ্লোকে তিনি নির্গুণ ব্রহ্মের স্তব করেছেন ‘পদচন্দ্রিকা’য়, স্তবটি মুসলমান সুলতানের সঙ্গে সাহচর্যের সাক্ষ্য দিচ্ছে বলে সুকুমার সেন মনে করেনঃ “ধ্রুব যিনি সকল ব্যাপ্ত করে আছেন, ‘এইরকম’ – এই বাক্য দ্বারা যাঁকে নির্দেশ করা যায় না, যিনি অহম্‌ এই বিজ্ঞানের বিষয়, সেই পুরাতন পরমপুরুষদের জয় হোক” (সুকুমার ৫০-৫৩)। ধরে নেওয়া যায়, যাঁরা সভাপণ্ডিত বা সভাকবির কাজ করেছেন, তাঁদের একটি বড় দায়িত্ব ছিল শাসনাদর্শ এবং শাসকের ধর্মকে রক্ষা করা, এবং শাসককে দেশজ সংস্কৃতির সঙ্গে যথাসম্ভব ইন্টিগ্রেট করা। এই কাজে এসেছিল সম্ভবত ব্রহ্ম ধারণা, শাক্ত ধারণা অবশ্যই আসেনি। মোটামুটি মধ্যযুগের ইসলামমতাবলম্বী শাসকের রাজসভায় যে হিন্দু টেক্সটগুলি রচিত হয়, সেগুলো দেখলেই একটা ধারণা পাওয়া যাবে, কোন ন্যারেটিভগুলো নিরাপদ ছিল।

হোসেন শাহর কেশব ছত্রী নামে হিন্দু সেনাপতি ছিলেন, বৈষ্ণব কবিদের কাব্যে জানা যায় (কালীপ্রসন্ন ৪১)। হোসেনের রাজসভায় সনাতন ছিলেন দবীর খাস, আপ্তসহায়ক, এবং রূপ ছিলেন সাকর মল্লিক, বা মুখ্যসচিব। এদের বংশের একটি প্রাচীন রাজসংযোগ ছিল। কর্নাটদেশে অনিরুদ্ধ নামে একজন রাজা ছিলেন। তাঁর প্রয়াণের পর জ্যেষ্ঠপুত্র রূপেশ্বর কনিষ্ঠ পুত্র হরিহর দ্বারা পিতৃরাজ্যে বঞ্চিত হয়ে পশ্চিমবঙ্গের প্রান্তদেশে এসে বসবাস করেন। রূপেশ্বরের পুত্র পদ্মনাভ রাজা দনুজমর্দনের অনুরোধে নবহট্টক গ্রামে (নৈহাটি) বসবাস করেন। সেখানে তিনি বিষ্ণু-উপাসনা করতেন। পদ্মনাভের কনিষ্ঠ পুত্র কুমার বঙ্গদেশে চলে গেছিলেন। কুমারের তিন পুত্র, সনাতন, রূপ এবং বল্লভ (বল্লভের পুত্র জীব গোস্বামী)। এরা ভরদ্বাজগোত্রীয় ব্রাহ্মণ ছিলেন (সুকুমার ৫৪)।

এ থেকে এমন সিদ্ধান্ত করা অনুচিত হবে যে কেবলমাত্র বৈষ্ণবরাই বা কেবলমাত্র ব্রাহ্মণরাই কোল্যাবরেটরের কাজ করেছেন। জগাই মাধাই ঘোর শাক্ত ছিলেন, এবং তারা মুসলমান রাজশক্তির নগরকোটাল পদেই নিযুক্ত ছিলেন। তবে এটা সত্যি যে একটা বড় অংশের কোল্যাবরেটর ধর্মে বৈষ্ণব ছিলেন (আধুনিক যুগে যেমন ইংরেজের কোল্যাবরেটরদের একটা বড় অংশ ব্রাহ্ম)। এক্ষেত্রে একটা ডায়ালেকটিক্স কাজ করত। যেমন খ্রীষ্টধর্মের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন, তেমনই খ্রীষ্টধর্মের প্রভাব বিস্তার আটকেছেন ব্রাহ্মরা; যেমন ইংরেজের শাসনের স্তম্ভ ছিলেন, তেমনই রেনেসাঁসের পথ সুগম করেছেন ব্রাহ্মরা। বৈষ্ণবরা অনেকেই বিজাতীয় শাসকদের ঘনিষ্ঠ, কিন্তু তারা বাঙালির দেশজ ধর্মকে রক্ষা করেছেন।

অর্থাৎ মধ্যযুগের রাজশক্তির ধর্ম সংক্রান্ত সূত্রটি এই। যতদিন রক্তক্ষয়ী প্রতিরোধ চলেছে এবং যতদিন পাঠান আমল, রাজশক্তি মূলত শাক্ত। দনুজমর্দনদেব মহেন্দ্রদেব দুজনেই শাক্ত। বারোভুঁইয়ার মধ্যে বৃহত্তম দুজন – কেদার রায় এবং প্রতাপ দুজনেই শাক্ত। বাংলার রাজারা মোগল আমলের আগে পর্যন্ত অধিকাংশই শাক্ত। মোগল আমলে বৈষ্ণবধর্ম দেশজ রাজশক্তির বিশেষ আনুকূল্য পায়। তবে বৈষ্ণব ধর্মের প্রতি কিছুটা tilt অবশ্যই পাঠান আমলেই শুরু হয়,নতুবা এত বড় গৌড়ীয় বৈষ্ণব আন্দোলন সম্ভব হত না। এও সত্যি যে বাংলার শাক্ত আধুনিক যুগের আগে কোনও গণ আন্দোলনের জন্ম দিতে পারেন নি (অগ্নিযুগ একটি শাক্ত আন্দোলন)। সম্ভবত মধ্যযুগে বাঙালি চিন্তানায়কেরা মুসলমান শাসকের সঙ্গে দ্বন্দ্বের সমাধান করার স্ট্র্যাটেজিক কারণে শুধু নয়, হিন্দুদের মধ্যে একতা গড়ে তুলতেও বৈষ্ণব আন্দোলনের জন্ম দিয়েছেন।

রূপরামের ‘ধর্মমঙ্গল’ কাব্যে “কুলীন গ্রামের বসুবর্ণ বকশী”দের উল্লেখ আছে, রূপরাম আরও বলছেন “কায়স্থ কারকুন যত করে লেখা-পড়া”। রুকনুদ্দিন বারবক শাহের রাজসভায় এই কুলীন গ্রামের মালাধর বসু গুণরাজ খাঁ উপাধি পেয়েছিলেন। হোসেন শাহের এক সেনাপতি (লস্কর) রামচন্দ্র খান কায়স্থ ছিলেন। চৈতন্য যখন ছত্রভোগ হয়ে নীলাচলে যান, এই রামচন্দ্রর সহায়তায় গৌড়-উড়িষ্যা সীমান্ত পার হয়েছিলেন মহাপ্রভু (সুকুমার ৫৪)।

শ্রীখণ্ড অঞ্চলের অনেক বৈদ্য গৌড় সরকারে কাজ করতেন। মহাকবি দামোদর শাসকের দরবারে যশোরাজ খান উপাধি পেয়েছিলেন, এঁর কৃষ্ণমঙ্গল কাব্যে হোসেন শাহের উল্লেখ আছে। এই দামোদরের দৌহিত্র ছিলেন বিখ্যাত পদকর্তা গোবিন্দদাস। আরেক রাজকর্মচারী কুলধর ছিলেন জাতিতে বণিক। সুলতান এঁকে প্রথমে সত্য খান ও পরে শুভরাজ খান উপাধি দেন। ইনি গোবর্ধন পাঠককে দিয়ে ১৪৭৪-৭৫ খ্রীষ্টাব্দে ‘পুরাণসর্বস্ব’ নামে একটি পুরাণ ও স্মৃতি সংগ্রহ গ্রন্থ প্রণয়ন করান (সুকুমার ৫৫)।

বলা দরকার, শ্রীখণ্ডের বৈদ্য নরহরি সরকার যিনি চৈতন্যের শিষ্য ছিলেন, তাঁর শিষ্য বৈদ্য চন্দ্রশেখর মোগল আক্রমণে প্রাণ দেন। তাঁর বাড়িতে স্বর্ণনির্মিত রসিকরায় বিগ্রহের লোভে মোগল সেনা আক্রমণ করেছিল। চন্দ্রশেখর প্রাণ দেন, কিন্তু রসিকরায়কে বুকে আগলে রেখেছিলেন শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত। এরা কি পাঠান শাসকের ঘনিষ্ঠ ছিলেন বলেই মোগলের রোষ ছিল? অস্বাভাবিক নয়। অথবা শাসনক্ষমতা বদলের সময়কার অবধারিত সিভিলিয়ান হত্যা, যেমনটা খিলজি হানাদারির সময়েও হয়ে থাকবে? সে সম্ভাবনাও আছে।

মোগল আমলের সৃষ্টি জমিদারি ব্যবস্থা বাংলাভাষী হিন্দুর একাধারে রাজনৈতিক শক্তির চর্চা ও রাজনৈতিক শক্তির প্যারালাইসিস, এ মতটা অবশ্য বঙ্কিমের সময় থেকেই প্রচলিত। বারো ভুঁইয়ার মত শক্তিশালী আর কেউ হতে পারেন নি, মোগল জমিদারি ব্যবস্থা এক অর্থে বাঙালির রাজনৈতিক প্যারালাইসিস এবং স্থায়ী কমপ্রাদরবৃত্তির পথ নিশ্চিত করেছিল। তিন মজুমদারে বাংলা ভাগ বলা হয় প্রতাপের যশোর রাজ্য সম্পর্কে, ঘটনাচক্রে তিনজনেই ব্রাহ্মণ ছিলেনঃ সপ্তগ্রামের রাজবংশ (জয়ানন্দ), নদীয়ার রাজবংশ (ভবানন্দ, কৃষ্ণচন্দ্রের পূর্বপুরুষ) এবং সাবর্ণ রাজবংশ (লক্ষ্মীকান্ত)। তবে মানসিংহ কেবল প্রতাপের রাজ্যের পশ্চিমাংশ এদের মধ্যে বাঁটোয়ারা করেন। পূর্বাংশে প্রতাপ আরও অনেকদিন রাজত্ব করবেন।

লক্ষ্য করার মত বিষয় যে একাধিক ব্রাহ্মণ জমিদার বংশ তৈরি হয়েছিল মোগল আমলে। “নাটোরের সুবিখ্যাত ব্রাহ্মণ জমিদার পরিবার (রামজীবন, রামকান্ত, রাণী ভবানী), ময়মনসিংহের শ্রীকৃষ্ণ হালদার এবং ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ শ্রীকৃষ্ণ আচার্য চৌধুরী – এই সব জমিদার পরিবারের এ সময় উৎপত্তি। এছাড়া এ যুগের বাংলাদেশে অনেক ব্রাহ্মণ পরিবার ভূমধ্যকারী বা ছোট জমিদার ছিল (রাজশাহীর তাহিরপুর, পুথিয়া ইত্যাদি)। কবি ভারতচন্দ্রের পিতা নরেন্দ্রনাথ রায় বর্ধমানের অন্তর্বর্তী ভুরসুট পরগণার পাণ্ডুয়াতে জমিদার ছিলেন। … কায়স্থদের মধ্যে অনেকেই এ সময় উচ্চ রাজকর্মচারী। বাংলার বড়, মাঝারি ও ছোট জমিদারদের অনেকেই কায়স্থ জাতিভুক্ত। আবুল ফজল আইন-ই-আকবরীতে বাংলার জমিদারদের অধিকাংশ কায়স্থ বলে উল্লেখ করেছেন। … নবশাখদের মধ্যে তাম্বুলিরা তাদের জাতিগত বৃত্তি পান সুপারির ব্যবসা ছেরে নানা রকম ব্যবসা বাণিজ্য শুরু করে দেয়। অনেকে ধনী হয়ে জমিদারিও কিনেছিল। রানাঘাটের বিখ্যাত পাল চৌধুরী পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা কৃষ্ণ পান্তি জাতিতে ছিলেন তাম্বুলি। পেশায় পান সুপারির ব্যবসায়ী। … রামপ্রসাদের পদ ‘ঐ যে পান বেচে খায় কৃষ্ণ পান্তি তারে দিলে জমিদারি’- এর সাক্ষ্য দিচ্ছে। রাজশাহীর অন্তর্গত দীঘাপাতিয়া জমিদারির প্রতিষ্ঠাতা দয়ায়াম রায় জাতিতে তিলি। … ” (সুবোধকুমার ১৯-২০) ।

ব্যবসার প্রসঙ্গে বলি, সম্পদসৃষ্টি নিঃসন্দেহে পৃথিবীর অন্যত্র দেখা গেছে রাজশক্তির অংশ হতে সাহায্য করে। কিন্তু বাঙালি ব্যবসায়ী টাইকুন সেযুগে তেমন দেখা যায় নি। বড়মাপের অনেকেই ছিলেন, সন্দেহ নেই। বৃহত্তম, আন্তর্জাতিক মাপের নয়। মধ্যযুগের শেষের দিকে কলকাতার শেঠ বসাকদের ব্যতিক্রম ধরতে হবে।

মোগল শাসনে ভূমি রাজস্ব বাদে বাকি সব করই ছিল সায়ের নামে অভিহিত, এবং এই সায়ের করের দীর্ঘ তালিকা আছে আইন ই আকবরিতে। নবাবী আমলে বাংলায় সায়ের কর রাষ্ট্রের আয়ের একটি প্রধান উৎস হয়ে দাঁড়ায়। বাংলার বণিকদের শুল্ক কিন্তু জাতিভেদে ভিন্ন ভিন্ন ছিল। মুর্শিদকুলির সময় মুসলমান বণিকরা ২.৫ শতাংশ, হিন্দু বণিকরা ৩.৫ শতাংশ, আর্মেনিয়ান বণিকরা ৩.৫ শতাংশ, ওলন্দাজ ও ফরাসি বণিকরা ২.৫ শতাংশ এবং ইংরেজরা বার্ষিক তিন হাজার টাকার বিনিময়ে সারাবছর বিনাশুল্কে বাণিজ্য করত। ওলন্দাজ ও ফরাসীরা আগে হিন্দুদের মতই ৩.৫ শতাংশ বার্ষিক শুল্ক দিত, এরা মোগল দরবারে আবেদন নিবেদন করে সেটাকে কমিয়ে ২.৫ শতাংশে নামায়। ইংরেজরা ১৭১৬ খ্রীষ্টাব্দে ফারুখসিয়ারের কাছে আবেদন করে বার্ষিক তিন হাজার টাকার বিনিময়ে বাংলায় বিনাশুল্কে বাণিজ্যের অধিকার পায় (সুবোধকুমার ৭৬, ৫৭)। দেখা যাচ্ছে, বাংলায় হিন্দু ও আর্মেনিয়ান বণিককে সর্বাধিক শুল্ক দিতে হত। মুর্শিদকুলি বাংলার ভূমি রাজস্ব একধাপে অনেকটা বাড়িয়েছিলেন, ভূমি রাজস্বের হার উৎপন্ন ফসলের প্রায় অর্ধেকে এসে দাঁড়ায় আওরংজেবকে তুষ্ট করতে. ১৭২২ সালে বাংলার ভূমি রাজস্ব বেড়ে হয় এক কোটি একত্রিশ লক্ষ অষ্টআশি হাজার একশো ছিয়াশি টাকা, এর আগে ১৬৫৮ সালে শাহ সুজার আমলে শেষ যে রাজস্ব পরিমাপ হয়েছিল, যার বেশিরভাগটাই আদায় হত না, সেই পরিমাপের তুলনায় নয় শতাংশ রাজস্ব বাড়ে, তবে আগেকার পরিমাপ অনুযায়ী রাজস্ব আদায় প্রায় বন্ধ ছিল, এবং বাংলায় রাজস্ব ঘাটতি মেটাতে অন্য প্রদেশ থেকেও টাকা আনতে হত। অর্থাৎ ভূস্বামীরা কর দিতেন না। মুর্শিদকুলির আগে বাংলায় ৩৪ সরকার (এ সংখ্যাটা বেশ ইন্টারেস্টিং না?), ১৩৫০ মহল ছিল। মুর্শিদকুলি বাংলাকে ১৩ চাকলা এবং ১৬৬০ পরগণায় বিভক্ত করেন। (সুবোধকুমার ৭৬, ৭০-৭১)। যদুনাথ সরকারের মতে মুর্শিদকুলি বাংলার ভূমিরাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে মালজামিনী বা ইজারা ব্যবস্থা চালু করায় বাংলার পুরোনো জমিদার বংশগুলি ধ্বংস হয়ে যায়, মুর্শিদকুলির বসানো ইজারাদাররাই পরবর্তীতে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সময় জমিদার বলে স্বীকৃতি পান। ভূষণার সীতারাম রায় এবং রাজশাহীর দর্পনারায়ণ বিদ্রোহ করেন, এবং রাজ্যহারা হয়েছেন।

এখানে সীতারাম সম্পর্কে কিছু কথা থাকল।

স্বীকার করা যাক, সীতারামকে আধুনিক বাঙালি সর্বাগ্রে জেনেছে বঙ্কিমের উপন্যাসের মাধ্যমে। অবশ্যই বিংশ শতকে সতীশ মিত্র তাঁর যশোর খুলনার ইতিহাসে প্রশংসনীয় কাজ করেছেন সীতারামকে নিয়ে। ১৮৬১-৬৩ এই তিন বছর বঙ্কিম খুলনায় ডেপুটি কালেক্টর এবং মাগুরায় এস ডি ও। মাগুরা থেকে ১৩ মাইল দক্ষিণ-পূর্বে সীতারামের রাজধানী মহম্মদপুর। এই অঞ্চলে রাইচরণ মুখোপাধ্যায় একজন পেশাদার গল্পবলিয়ে ছিলেন, ২-৩ মাস বঙ্কিমের কাছে ইনি সীতারামের কাহিনী বর্ণনা করেন। এছাড়া বঙ্কিম স্টুয়ার্ট, রিয়াজ-উস-সালাতিন, তারিখ-ই-বাঙ্গালা থেকে তথ্য আহরণ করেছিলেন।

সীতারাম উত্তর রাঢ়ীয় কায়স্থ ছিলেন। রাজা মানসিংহের রাজস্ব সেরেস্তায় খাস বিশ্বাস ছিলেন রামদাস, তাঁর পৌত্র উদয়নারায়ণ ভূষণার মুসলমান ফৌজদারের সাজোয়াল অর্থাৎ তহশিলদার ও কার্যাধ্যক্ষ। উদয়নারায়ণের ছেলে ছিলেন সীতারাম। সীতারাম সর্বপ্রথম যে পরগণার জমিদারী পান, সেটা ছিল নলদি (পরে নড়াইল)। বিদ্রোহী পাঠান জমিদার দমনের শর্তে এই পরগণা পেয়েছিলেন তিনি। অর্থাৎ ব্যাকগ্রাউন্ডের হিসেবে তিনি কোল্যাবরেটর শ্রেণীর মানুষ।

এরপরে ক্রমে বিস্তৃত হয়ে সীতারামের সাম্রাজ্য উত্তরে পদ্মা থেকে দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর অবধি, এবং পশ্চিমে মামুদশাহী পরগণা থেকে পূর্বে বরিশাল অবধি ব্যাপ্ত হয়। এই বিস্তৃত অঞ্চলে এক কোটি টাকার রাজস্ব আদায় হত (দীনেশ ৮৪৬)। সীতারামের পরিকরদের সম্পর্কে যদুনাথে নিম্নলিখিত তথ্যসমূহ পাচ্ছি। সীতারামের সেনাপতি ছিলেন রামরূপ, পক্ষান্তরে রঘুরাম ঘোষ, দক্ষিণরাঢ়ীয় কায়স্থ, এবং ইনিই মেনাহাতি নামে ইতিহাসে বিখ্যাত। আরেকজন ছিলেন মুনিরাম রায়, ইনি বঙ্গজ কায়স্থ। মুনিরাম ছিলেন সীতারামের উকিল, অর্থাৎ নবাবদরবারে রাজকীয় দূত। দেওয়ান রঘুনাথ গাঙ্গুলী, উপাধি মজুমদার। সেনাবিভাগে বখতাওর খান, ইনি ভূতপূর্ব ডাকাতসর্দার। আরেকজন সেনাপতি কালাচাঁদ ঢালী। এছাড়া ছিলেন ফকিরা মাছ কাটা (নিকারী সম্প্রদায়ের মানুষ)। দুটি ব্যতিক্রমী রকমের নাম পাচ্ছি, মোচড়া সিংহ এবং গাবুর ডলম, এরাও সীতারামের সেনাপতি ছিলেন। সীতারাম মোগল বাদশাহের অনুগত ছিলেন এবং দিল্লি থেকে রাজা উপাধি ও জমিদারি ফর্মান আনান আনুমানিক ১৬৮৭-৮৮ খ্রীষ্টাব্দে। ১৭১২ সালে ভূষণার ফৌজদার সৈয়দ আবু তোরাবকে অকস্মাৎ হত্যা করে ভূষণা দখল করেন।

সীতারামের পরাজয়ে শত্রুপক্ষের দক্ষিণ হস্ত রামজীবন। ইনি বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ, নাটোর রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা। পরাস্ত সীতারামকে বন্দী করে মুর্শিদাবাদ নিয়ে যান রামজীবনের ভৃত্য দয়ারাম রায়, ইনি দীঘাপাতিয়া রাজবংশের আদিপুরুষ। সীতারামের বিশাল রাজ্য ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে নলডাঙা, নড়াইল, নাটোর, দীঘাপাতিয়া জমিদারীর সৃষ্টি। ১৭১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে সীতারামের পরাজয় এবং মৃত্যু সেই বছরের অক্টোবরে। নৃশংসভাবে মারা হয়েছিল তাঁকে, সেই হত্যাকাণ্ডের বিবরণ তারিখ-ই-বাঙ্গালা দিচ্ছে (যদুনাথ সরকার রচনা সম্ভার ৫৩১-৩৪)।

মুর্শিদকুলির সহযোগী নাজির আহমেদ এবং রেজা খাঁ হিন্দু জমিদারদের ওপরে অত্যাচার করার জন্য বৈকুণ্ঠ বানিয়েছিলেন, আমরা জানি (সুবোধকুমার ৭২-৭৩)। চুনাখালির জমিদার বৃন্দাবনকে বধ করা হয়েছিল কাজি সরফ কর্তৃক, মুর্শিদকুলির সময়েইঃ এই সময়েই ঔরংজেব লিখে পাঠিয়েছিলেনঃ কাজি সরফ, খোদাকা তরফ। মুর্শিদকুলি অবশ্য বৃন্দাবনকে বধ করতে চান নি। সম্ভবত বৃন্দাবনকে বৈকুণ্ঠে রাখলে মুর্শিদকুলির বেশি সুবিধা হত। তবে বকেয়া রাজস্বের জন্য গ্রেপ্তার হওয়া নবাবি যুগে বাংলার হিন্দু রাজা-জমিদারদের ললাটলিখন ছিল। কৃষ্ণচন্দ্র তো আলিবর্দি থেকে মিরকাশিম, সবার রাজত্বেই বেশ কয়েকবার হাজতবাস করেছিলেন। রাজবল্লভকে বন্দী অবস্থায় গঙ্গায় ডুবিয়ে হত্যা করেন মিরকাশিম, তহবিল তছরূপের মিথ্যা অভিযোগ এনে (অভিযোগটি মনগড়া এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল, এ প্রসঙ্গে রমেশচন্দ্র মজুমদারের লিখিত রাজবল্লভ জীবনী দ্রষ্টব্য)। রাজস্ব আদায়ের কাজে বাংলাভাষী হিন্দুকেই লাগানো হত। এ প্রথা মুর্শিদকুলি শুরু করেছিলেন বলা হয়, কিন্তু রাজা প্রতাপাদিত্যের পিতাও পাঠান আমলে রাজস্ব বিভাগের কর্তা ছিলেন। মনে হয় প্রথাটি সর্বভারতীয় ছিল। মোগল আমলে তো বটেই। আকবরের আমলে তোডরমল্ল সারা ভারতেরই রাজস্ব ব্যবস্থা বিন্যস্ত করেন, বাঙালি যাকে রসিকতা করে “আসলে তোমার জমা” নামে ডাকতঃ ওয়াসিল-এ-জমা-তুমার।

এর পেছনে মেধাগত কারণ থাকতে পারে। হিন্দুর হাতে ক্ষমতা এলেও সে কেন্দ্রীয় ক্ষমতার লড়াইতে প্রতিদ্বন্দ্বী হবে না, যেটা মুসলমান রাজকর্মচারীর ক্ষেত্রে হতে পারে, এও একটা কারণ। কালীপ্রসন্ন বলছেন “পাঠনরাজেরা (sic) কোনকালেই মুসলমানের হস্তে রাজস্ব আদায়ের ভার দেন নাই। পাঠান সর্দারগণের সহিত সরস্বতীরও তত সদ্ভাব ছিল না; পরন্তু নিজের ব্যয়েই তাঁহারা রাজস্বের টাকা নিঃশেষ করিয়া ফেলিবেন অথবা বল সঞ্চয় করিয়া বিদ্রোহী [হইবেন] … এই কারণে মধ্যবঙ্গে সেকালে একপ্রকার আদায়কারী হিন্দু জমিদারের সৃষ্টি হইতেছিল। … ‘ভুঁইয়া বলিয়া উলিখিত এই জমিদারবর্গের উপরে পাঠানরাজ বিশেষরূপে নির্ভর করিতেন। … শমসুদ্দীন এই ভুঁইয়া সাহায্যেই প্রবল হইয়াছিলেন এবং রাজ্যলাভের পর উত্তরবঙ্গের ভুঁইয়াদিগের অধীনে রাজকীয় হিন্দু সেনাদল গঠিত করিয়াছিলেন” (কালীপ্রসন্ন ৩২)।

গণেশের উত্থান এই প্রেক্ষাপটে হয়েছিল। রাজশাহী বগুড়ার মধ্যবর্তী চলন বিলের উত্তর তীরে ভাদুড়িয়া গ্রামে ভাদুড়ি বংশ পাঠান সুলতানদের কোল্যাবরেটর ছিল। এই বংশে উদয়নাচার্যের জন্ম। এই বংশের জগদানন্দ ছিলেন শমসুদ্দীনের সেনাপতি ও প্রধানমন্ত্রী। এইসময় ভাতুড়িয়া/ভাদুড়িয়া পরগণা তিনি জায়গীর হিসেবে পান, এবং হিন্দুর পক্ষে নিষ্কর জায়গীর পাওয়া নিষিদ্ধ বলে একটাকা রাজকর দিতেন, এজন্য এই বংশ একটাকিয়া ভাদুড়ী নামে খ্যাত হন। শমসুদ্দীন, সিকন্দর, গিয়াসুদ্দীন, প্রভৃতি ইলিয়াস শাহী সুলতানদের আমলে ভাদুড়ী বংশ শক্তিশালী হয়, এরপর দুর্বল রাজা দ্বিতীয় শমসুদ্দীনকে যুদ্ধে পরাস্ত করে ক্ষমতা দখল করেন রাজা গণেশ (কালীপ্রসন্ন ৩২), মুসলমানদের নথিতে যিনি কান্স, যাকে বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ কুলকারিকা রাজা গণেশ নামে অমর করে রেখেছে। তাঁর নামাঙ্কিত কোনও মুদ্রা নেই, তিনি বায়াজিদ শাহের নামে মুদ্রা চালাতেন অনুমান করা হয়। গণেশের রাজত্বকাল আনুমানিক ১৪০৯- ১৪১৫, এর মধ্যে বায়াজিদ শাহের নামে মুদ্রা পাওয়া গেছে (রাখালদাস বাঙ্গালার ইতিহাস ২য় খণ্ড ৯৪)। রিয়াজ-উস-সালাতিন, তবকাত-ই-আকবরী ও তারিখ-ই-ফেরেশ্তা অনুযায়ী গণেশের রাজত্বকাল সাত বছর (রাখালদাস ৯৭)। গণেশ পোষাকি অর্থে সুলতান ছিলেন না সম্ভবত। তিনি de facto গৌড়েশ্বর ছিলেন, কিন্তু de jure ছিলেন না। আবার নুর কুতবুল আলম এই কাফেরকে সরাতে যেমন ব্যস্ত হয়েছিলেন, তাতে সন্দেহ নেই, যে গণেশ সার্বভৌম রাজার সমস্ত ক্ষমতাই ধরতেন। তবে গণেশের পুত্র জালালুদ্দিন নিজেকে বিন সুলতান বলেন নি, অর্থাৎ সুলতানপুত্র বলেন নি, সেটা আরেকটা প্রমাণ। তবে বৈষ্ণব কবি ঈশান নাগরের অদ্বৈত প্রকাশ নরসিংহ নাড়িয়াল (অদ্বৈত আচার্যের পূর্বপুরুষ) সম্পর্কে বলছেন “যাহার মন্ত্রণাবলে শ্রীগণেশ রাজা। গৌড়ের বাদসাহকে মারি নিজে হৈল রাজা” (দীনেশ ৬২৪)। অতএব বাঙালির কাছে গণেশ অবশ্যই রাজা ছিলেন। জালালুদ্দিন কবি চণ্ডীদাসকে হাতির পিঠে বেঁধে বেত্রাঘাতে হত্যা করেছিলেন এরকম মত আছে। স্টেপলটন এই গৌড় বাদশাকে জালালুদ্দিনের পুত্র আহম্মদ শাহ বলে চিহ্নিত করেছেন, আবার অনেকে এই গৌড় বাদশাকে দ্বিতীয় শমসুদ্দীন হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, যাকে হত্যা করে গণেশ সিংহাসনে বসেন (দীনেশ ৬২৭, ৬৭২)। আরেক কবি কৃত্তিবাস গৌড়েশ্বরের কাছে সমাদর লাভ করেন, তবে সেই গৌড়েশ্বর খুব সম্ভবত তাহেরপুরের রাজা কংসনারায়ণ। গণেশ নন, কারণ গণেশ হলে রাজসভায় কিছু মুসলমান দেখা যেত, কৃত্তিবাসের বর্ণনায় সেটা একদম নেই। কৃত্তিবাসের জন্মকাল তাঁর কাব্য থেকে যেটা পাওয়া যায়, “আদিত্যবার শ্রীপঞ্চমী পুণ্য মাঘ মাস”, সেটা সম্ভবত ১৪৩২ (কালীপ্রসন্ন মধ্যযুগে বাঙ্গলা ৩৭), কাজেই তখন গণেশ বিগত।

এইসময়, জালালুদ্দিনের সময়েই চন্দ্রদ্বীপের কায়স্থ রাজবংশের স্থপয়িতা দনুজমর্দন দেবের উত্থান, তাঁর এবং তাঁর পুত্র মহেন্দ্রদেবের মুদ্রা পাওয়া গেছে। দনুজমর্দনের মুদ্রা ১৪১৭-১৪১৮ খ্রীষ্টাব্দ (১৩৩৯ শকাব্দে) এবং মহেন্দ্রদেবের মুদ্রা ১৪১৮ খ্রীষ্টাব্দে উৎকীর্ণ (রমেশচন্দ্র ৩১)। দনুজমর্দনের মুদ্রা মালদা পাণ্ডুয়ায় পাওয়া গেছিল, অতএব গৌড়ে তাঁর রাজত্ব বিস্তৃত হয়েছিল, এছাড়া খুলনায় আবিষ্কৃত মুদ্রায় চন্দ্রদ্বীপের নাম আছে। এই মুদ্রায় একদিকে বঙ্গাক্ষরে ও সংস্কৃত ভাষায় তাঁর নাম ও অপরদিকে “চণ্ডীচরণ পরায়ণস্য” লেখা। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্যঃ “খ্রীষ্টীয় দ্বাদশ শতাব্দীর পরে পুরুষপুর হইতে কামরূপ পর্যন্ত বিস্তৃত বিশাল আর্য্যাবর্ত্তে মুসলমানগণ কর্তৃক বিজিত কোনও জনপদে বা দেশে, কোনও হিন্দুরাজা নিজ নামে ভারতীয় অক্ষরে বা ভাষায় ইহার পূর্ব্বে মুদ্রাঙ্কন করিতে ভরসা করেন নাই” (রাখালদাস ৯৮-৯৯)।

রমেশ মজুমদার দনুজমর্দনকে গণেশের সঙ্গে অভিন্ন ভেবেছেন, কারণ তিনি কায়স্থ কুলপঞ্জী সম্পর্কে জ্ঞাত ছিলেন না, অথবা তা নির্ভরযোগ্য ভাবেন নি । দীনেশ সেনও কায়স্থ কুলপঞ্জিকায় বিশ্বাস রাখেন নি। তবে গণেশের সঙ্গে দনুজমর্দন দেবকে এক করে দেখাটা সম্ভবত ভুল। কোনও ভারতীয় অথবা ফার্সি গ্রন্থে গণেশ ও দনুজমর্দনের অভিন্নতা ঘোষিত হয়নি। বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ ও ভাদুড়ীদের কুলগ্রন্থ গণেশ সম্পর্কে অনেক তথ্য জানায়, এমনকি একটি কায়স্থ কুলপঞ্জিকা গণেশকে দিনাজপুরের রাজবংশের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে জানিয়ে কায়স্থ বলে দাবিও করেছে। দাবিটি ভ্রান্ত। আসলে গণেশের বৈবাহিক সম্পর্ক ঘটেছিল কায়স্থদের সঙ্গে, এ প্রসঙ্গে এই সন্দর্ভের পরিশিষ্ট অংশ দেখুন। অন্যদিকে বঙ্গজ কায়স্থ কুলকারিকা (ইদিলপুরের ঘটকদের কারিকা) দনুজমর্দন সম্পর্কে অনেক কিছু জানাচ্ছে। কিন্তু ব্রাহ্মণ বা কায়স্থ কোনও কুলপঞ্জীর কোথাও গণেশ ও দনুজমর্দনের অভিন্নতা ঘোষিত হয়নি। গণেশের সঙ্গে দনুজমর্দনের অভিন্নতা রমেশ মজুমদার কল্পনা করেছিলেন, এবং এই কল্পনার কোনও ভিত্তি নেই। রাখালদাসের মত ভিন্ন, তিনি দুজনকে আলাদা ধরেছেন।

দনুজরায়, সুবর্ণগ্রামের সার্বভৌম রাজা, যাঁর সঙ্গে গিয়াসুদ্দিন বলবন মিটিং করেছিলেন, গৌড়ের বিদ্রোহী সুলতান তুঘ্রালকে বন্দী করার ব্যাপারে সাহায্য চেয়ে, তাঁর সঙ্গে দনুজমর্দনকে গুলিয়ে ফেললে চলবে না। সময়কাল পৃথক। কিন্তু শুধু দনুজ কোনও হিন্দুর নাম হতে পারে না। নামটা অন্যরকম ছিল অতএব। কৃত্তিবাস বলেছেন তাঁর পূর্বপুরুষ “বেদানুজ” মহারাজার পাত্র ছিলেন, পূর্ববঙ্গে মুসলমান বিজয়ে “প্রমাদ” উপস্থিত হলে তিনি গঙ্গাতীরে ফুলিয়া গ্রামে বসতি করেন (কালীপ্রসন্ন মধ্যযুগে বাঙ্গলা ৩৭)। দনুজরায় বা নৌজা নামক সুবর্ণগ্রামের যে সার্বভৌম রাজা ১২৮১ সালে বলবনের সঙ্গে চুক্তি করেন, তাঁর আসল নাম কি বেদানুজ? কিন্তু দনুজরায়ের সভাসদ (কৃত্তিবাসের এই পূর্বপুরুষ) নরসিংহ ওঝা হতে পারেন না, তাঁর ফুলিয়া আসার সময় ১৩৪৮। অন্য সূত্রে জানছি, নরসিংহ বা নৃসিংহের পিতামহ উধো দনুজমাধব কর্তৃক সমাদৃত হয়েছিলেন (রজনীকান্ত ২৭৪-৫)। এই দনুজমাধব বা আইন-ই-আকবরির রায় নৌজা সম্ভবত সেনবংশীয় রাজা ছিলেন (রজনীকান্ত ১৩২)। দুর্গাচরণ সান্যাল বলছেন “বল্লালের কায়স্থজাতীয়া এক উপপত্নী-জাত পুত্র কালুরায়কে তিনি চন্দ্রদ্বীপে করদ রাজা নিযুক্ত করিয়াছিলেন। পাঠান কর্তৃক বৈদ্যরাজপাট নির্মূল হইলেও কালুরায়ের সন্তানরা চন্দ্রদ্বীপে রাজত্ব করিতেছিল” (কমল ৩৪)।

অন্যদিকে মধ্যযুগে দশরথদেব নামে যে রাজা অরিরাজদনুজমাধব উপাধি নিয়েছিলেন, সুখময় তাকেই দনুজরায়ের সঙ্গে অভিন্ন ভেবেছেন। এই ভাবনার পেছনে যুক্তি আছে। দশরথদেবের পিতা দামোদরদেব কুমিল্লা নোয়াখালি চট্টগ্রাম মিলিয়ে এক বৃহৎ রাজ্য স্থাপন করেন, এঁর তিনটি তাম্রশাসন পাওয়া গেছে। ১২৩১-২ সালে রাজত্ব শুরু এবং অন্তত ১২৪৩-৪৪ সাল পর্যন্ত ইনি রাজত্ব করেন। পুরুষোত্তমদেব>মধুসূদন>বাসুদেব>দামোদর>দশরথ এইরকম একটা বংশলতিকা পাওয়া যাচ্ছে।

প্রসঙ্গত, সেনবংশের রাজকীয় উপাধি এরকমই হত। অরিরাজবৃষভশঙ্কর, অরিরাজনিঃশঙ্কশঙ্কর, অরিরাজমদনশঙ্কর – যথাক্রমে বিজয়, বল্লাল ও লক্ষ্মণের উপাধি। এদিকে লক্ষ্মণসেনের আরেক নাম ছিল মারাঙ্কমল্লদেব, এবং সেনরা দেব-অন্ত নাম ব্যবহার করতেন।

আমার মতে খুব সম্ভবত পুরুষোত্তমদেব এবং কালুরায় একই ব্যক্তি, এবং পঁচিশ বছরে এক পুরুষ ধরলে বল্লালপুত্র কালুরায় থেকে দনুজরায় অবধি বছরের হিসেব মিলে যাবে। তবে রজনীকান্ত দনুজকে প্রপৌত্র বলেছেন লক্ষ্মণসেনের (১৩২)। দনুজ অর্থাৎ দশরথদেব। এখন দশরথের বাবা দামোদর ছিলেন পুরুষোত্তমের প্রপৌত্র। যদি বল্লাল ও পুরুষোত্তমদেব অভিন্ন হন, সেক্ষেত্রে রজনীকান্তের হিসেব মিলবে, কিন্তু বল্লালের এই নাম কোথাও পাইনি। দেববংশের তাম্রশাসনে তাদের পূর্বসূরী এবং জ্ঞাতি সেনদের কোনও উল্লেখ না থাকার কারণ হতে পারে সেনবংশ তখন অস্তগামী এবং দেববংশ নিজস্ব গৌরবে গৌরবান্বিত।

অরিরাজচানুরমাধব ছিল দামোদরদেবের উপাধি। তিনি নষ্ট শ্রী পুনরুদ্ধার করে গৌড় দেশের মহোৎসব সম্পন্ন করেন, তাঁর তাম্রশাসনের একটি শ্লোকে পাচ্ছিঃ খ্যাতো গৌড়মহীমহোৎসবময়ং চক্রে পুনশ্চ শ্রিয়া (সুখময় ১১৭)।

ফুলিয়া অঞ্চলের বাসিন্দা এবং কান্দি রাজ কলেজে অঙ্কের অধ্যাপক ডঃ অরিন্দম সরকার আমায় জানিয়েছিলেন যে ওই অঞ্চলে প্রচলিত জনশ্রুতি অনুযায়ী যবন হরিদাসকে বাইশ বাজারে বেত্রাঘাত করার পরে মৃতপ্রায় অবস্থায় যখন ফেলে দেওয়া হয়, তখন কৃত্তিবাস সেবাযত্ন করে হরিদাসকে বাঁচিয়ে তুলেছিলেন। কৃত্তিবাস যে ১৪৮৫ সালেও সুস্থদেহে বিদ্যমান ছিলেন, সেটা আমরা জানি। একটি সমসাময়িক শ্লোক আছে, ১৪৮৫ খ্রীষ্টাব্দে ধ্রুবনন্দের মহাবংশাবলী গ্রন্থেঃ “কৃত্তিবাসো কবিধীমান সাম্য শান্ত জলপ্রিয়ঃ”। কবি তখন ৫৩ বর্ষের প্রৌঢ় সন্ন্যাসী ব্যক্তি (কালীপ্রসন্ন ৩৭)। এদিকে যবন হরিদাস চৈতন্য পরিকরদের মধ্যে সবথেকে বয়স্ক ছিলেন (অদ্বৈতকে বাদ দিলে), কাজেই তরুণ হরিদাসকে প্রৌঢ় কৃত্তিবাস শুশ্রূষা করে থাকতে পারেন। কৃত্তিবাসের সঙ্গে যবন হরিদাসের এই সম্পর্কের উল্লেখ কোনও ইতিহাস বইতে আজ পর্যন্ত আমি দেখিনি। কিন্তু স্থানীয় প্রবাদের গুরুত্ব আছে ইতিহাসচর্চায়।

***

মুর্শিদকুলি থেকে সিরাজ পর্যন্ত বাংলার নবাবদের ভূমিকা মূলত extortionist এর। মুর্শিদকুলি বাংলার জমিদারদের ওপরে আবওয়াব নামে একটা বাড়তি কর চালু করেছিলেন, পরিমাণ দু লক্ষ আটান্ন হাজার আটশ সাতান্ন টাকা। এই আবওয়াব বা বাড়তি কর এরপর একটা মহামারীর আকার নেয়। মুর্শিদকুলির জামাই সুজাউদ্দিন এটা উনিশ লক্ষ চোদ্দ হাজার পঁচানব্বই টাকা করেন। এর মধ্যে ছিল নজরানা মোকরারি – দিল্লির বাদশাহকে রাজস্ব পাঠানোর খরচ। জার মাথোট – পুণ্যাহ, নজর, খেলাত, বাঁধের খরচ। রসুম নেজারাত – হেড পিওনের মফস্বল থেকে রাজস্ব আনার খরচ। মাথোট ফিলখানা – নাজিম ও দেওয়ানের হাতির খরচ। ফৌজদারি আবওয়াব – সীমান্ত জেলাগুলির ফৌজদারি কর (সুবোধকুমার ৭৩)।

মুর্শিদকুলি থেকে সুজাউদ্দিন পর্যন্ত মোট চল্লিশ কোটি টাকা পাঠানো হয়েছিল দিল্লির বাদশাহের কাছে কর হিসেবে (সুবোধকুমার ৭৮)।

সুজাউদ্দিনের পুত্র নবাব সরফরাজকে হত্যা করে সিংহাসনে বসেন যে আলিবর্দী, তিনি আবওয়াব বাড়িয়ে করেন বাইশ লক্ষ পঁচিশ হাজার পাঁচশ চুয়ান্ন টাকা। এর মধ্যে বেশিরভাগটাই ছিল চৌথ মারাঠা। মারাঠা বর্গী দস্যুদের যে বিপুল পরিমাণ টাকা আলিবর্দি দিয়েছিলেন, সে টাকা মূলত বাংলার জমিদারদের থেকেই অর্থাৎ বাংলার কৃষকের ঘাড় ভেঙেই জোগাড় হয়েছিল। এ ছাড়া ছিল আহুক – শ্রীহট্ট থেকে আনা চুনের খরচ বহন করার জন্য বাড়তি কর। কিমত খেস্ত গৌড় নামে একটা ছোট্ট আবওয়াব ছিল, গৌড়ের ভগ্নপ্রায় প্রাসাদগুলো ভেঙে ভেঙে ইঁট পাথর আনার খরচ তোলার জন্য এই বাড়তি কর। নজরানা মনসুরগঞ্জ নামে একটা বাড়তি কর ছিল, সিরাজের প্রাসাদ, হিরাঝিল ও সংলগ্ন অঞ্চল সাজিয়ে তোলার জন্য জমিদারদের ওপর এই বাড়তি কর চাপানো হয়েছিল (সুবোধকুমার ৭৩-৭৪)। কৃষক তার উৎপন্ন ফসলের এক তৃতীয়াংশ থেকে শুরু করে অর্ধাংশ পর্যন্ত কর দিতে বাধ্য হত। এই ভয়ানক করবব্যস্থা, এই রক্তশোষণের ফলে বাঙালি হীনবল হয়ে পড়ে। তা সত্ত্বেও যে এই সময় কয়েকজন সমৃদ্ধ রাজন্যের উত্থান ঘটে, যেমন রাজা কৃষ্ণচন্দ্র, রাণী ভবানী, রাজা রাজবল্লভ, সেটা বেশ চমকপ্রদ। বাংলার ভূমিতে সোনা ফলত, এবং বিপুল কৃষিজাত বাণিজ্য হত (সুতি ও রেশম বিশেষ করে), নইলে এই প্রাচুর্য সৃষ্টি সম্ভব হত না।

ইংরেজ আমলে ১৭৮৯ সালে জন শোর তার বিখ্যাত মিনিটসে মন্তব্য করেছিলেন যে এই আবওয়াব বাংলার সর্বনাশ করেছিল (সুবোধকুমার ৭৪)। কারণ জমিদার প্রাণভয়ে এই আবওয়াব আদায় করতে শুরু করে, ফলে বাংলার কৃষক অবর্ণনীয় দুর্দশার মধ্যে পড়ে। বর্গী দস্যুরা লুটপাট করেছিল বটে, কিন্তু আলিবর্দি রক্ষক হয়ে নিজেই ভক্ষকে পরিণত হয়েছিলেন। মুর্শিদকুলির সময়কার দুলক্ষ আটান্ন হাজার আবওয়াব আলিবর্দির সময় বেড়ে বাইশ লক্ষ পঁচিশ হাজার দাঁড়ায়। শতাংশের হিসেবে ৭০০ শতাংশরও বেশি বৃদ্ধি।

আলিবর্দি একটি সাময়িক জবরদস্তি কর বসান বাংলার জমিদার, বিশেষ করে গঙ্গার পূর্ব দিকের জমিদারদের ওপরে, বর্গি হানার সময়, জেমস গ্র্যান্ট বলেন যে এই খাতে বিপুল অর্থ তোলা হয়, সুবোধকুমার সংখ্যাটা বলছেন দেড় কোটি টাকা (৭৮)।

এত কর বাংলার জমিদার কিন্তু সরাসরি নবাবকে দিতেন না, দিতেন জগত শেঠের মাধ্যমে। জগত শেঠ নবাব সরকারের কোষাধ্যক্ষ ছিলেন বলা যায়। সরকারকে দেয় রাজস্ব গ্রহণ করতেন এবং হিসেব রাখতেন জগত শেঠ, এ বাবদ শতকরা দশ ভাগ কমিশন নিতেন, সেটা বার্ষিক আয়ে চল্লিশ লক্ষ টাকা দাঁড়াত। জমিদারদের বাকি খাজনার জামিনদারও হতেন জগত শেঠ, জমিদার কখনও কখনও বাকি খাজনা টাকায় শোধ না করতে পেরে শস্য দিয়ে শোধ করতেন, তাই জগত শেঠের শস্যের ব্যবসাও ছিল। নবাবী টাঁকশালের মালিকও ছিলেন জগত শেঠ। কখনও কখনও নবাব টাকা ধার নিয়ে তার পরিবর্তে কয়েকটি জেলার রাজস্ব জগত শেঠের হাতে ছেড়ে দিতেন ধার শোধের জন্য, এ জেলার জমিদাররা রাজস্ব সরাসরি জগত শেঠকেই দিতেন (সুবোধকুমার ১০২-৩)।

মনে রাখা দরকার, জগত শেঠ কোনও নাম নয়, এটা একটা উপাধি। মানিকচাঁদ নামে এক মাড়োয়াড়ি, অসওয়াল সম্প্রদায়ের, যোধপুর থেকে ঢাকায় এসে কোঠি স্থাপন করেন, ইনি মুর্শিদকুলির ব্যক্তিগত বন্ধু ছিলেন, এবং মুর্শিদাবাদ স্থাপনের সময় ইনিও মুর্শিদাবাদে চলে আসেন। এর পুত্র ফতেচাঁদ ১৭২২ সালে মোগল সম্রাট মুহম্মদ শাহ কর্তৃক জগত শেঠ উপাধি পান, এবং ১৭২৮ খ্রীষ্টাব্দ থেকে দিল্লির বাদশাহের করের টাকা আর নগদ সিক্কায় না পাঠিয়ে জগত শেঠের হুণ্ডিতে পাঠানো হত (সুবোধকুমার ১০০, ৭৯)। বাংলায় যে সমৃদ্ধ রাজশক্তি আর মাথাচাড়া দেয়নি, তার পেছনে তথাকথিত স্বাধীন নবাবদের এই নবাবি অর্থনীতির বড় ভূমিকা আছে, এবং সেই নবাবি অর্থনীতিতে মাড়োয়াড়ি বানিয়ার ভূমিকা আছে।

রাজা-জমিদারদের নিজস্ব উদ্যোগেই সংস্কৃত শিক্ষার জন্য চতুষ্পাঠী ও টোল স্থাপন করতে ব্যয় করতে হয়েছে, যদিও নবাবী আমলে “রাজধানীতে, প্রধান শহরগুলিতে এবং জেলা শহরে মাদ্রাসা ছিল, সরকার এগুলির পঠন পাঠন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য অকাতরে অর্থ ব্যয় করত। এগুলির জন্য অনেক নিষ্কর ভূমি নির্দিষ্ট ছিল। তাছাড়া ছিল রাষ্ট্রের কোষাগার থেকে মাসিক বা বাৎসরিক অর্থ বরাদ্দ। ছাত্ররা এ মাদ্রাগুলিতে বিনা খরচায় আহার ও বাসস্থান পেত এবং বিনা বেতনে পড়াশোনা করত … এখান থেকে পাশ করার পর ছাত্ররা শিক্ষকতা করত বা বিচার বিভাগে চাকরি পেত” (সুবোধকুমার ১০৯)।

কৃষ্ণচন্দ্রের সময়ে নদীয়া রাজসভার উদ্যোগে অনেক পণ্ডিত দার্শনিক কবির পোষকতা করা হয়। নবদ্বীপের পুরোনো খ্যাতি তো মধ্যযুগে ছিলই। কৃষ্ণচন্দ্রের সভাপণ্ডিতদের মধ্যে ন্যায়শাস্ত্রে বিখ্যাত ছিলেন হরিরাম তর্ক সিদ্ধান্ত, রামগোপাল সার্বভৌম, প্রাণনাথ ন্যায়পঞ্চানন, ধর্মশাস্ত্রে গোপাল ন্যায়ালঙ্কার, রামানন্দ বাচস্পতি, বীরেশ্বর ন্যায়পঞ্চানন। এছাড়া তর্কশাস্ত্রে শিবরাম বাচস্পতি, রমাবল্লভ বিদ্যাবাগীশ, রুদ্ররাম তর্কবাগীশ, শরণ তর্কালঙ্কার, মধুসূদন ন্যায়ালঙ্কার, কান্ত বিদ্যালঙ্কার, শঙ্কর তর্কবাগীশ। ত্রিবেণীতে জগন্নাথ তর্কপঞ্চানন, শান্তিপুরে রাধামোহন গোস্বামী ভট্টাচার্য। গুপ্তিপাড়ার কবি বাণেশ্বর বিদ্যালঙ্কার হারিয়ে গেছেন, কিন্তু ভারতচন্দ্র আর রামপ্রসাদ কৃষ্ণচন্দ্রর রাজসভার খ্যাতি অমর করে রেখেছেন।

বাংলার কোনও রাজা, কৃষ্ণচন্দ্র বা রাজবল্লভ, নিজ নিজ রাজকার্যে বাংলা কেউ ব্যবহার করতেন না, ফারসিই ব্যবহৃত হত। কিন্তু প্রায়-স্বাধীন (নামমাত্র মোগলের অধীন) রাজ্য ত্রিপুরা, কুচবিহারে বাংলা ভাষায় কাজ হত।

মধ্যযুগের শেষের দিকে অন্তত তিনটি সমাজ সংস্কারের প্রয়াস ঘটে, এর দুটি রাজবল্লভ করেছিলেন, দুটিই অবশ্য ব্যক্তিগত আঙ্গিকে। প্রথমটি সফল হলেও পরেরটি ব্যর্থ হয়। বৈদ্যদের উপবীত ধারণ করার জন্য রাজনগরে এক সুবিশাল যজ্ঞ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন রাজবল্লভ। অবশ্য সুবোধকুমার লিখেছেন যে দুটিই ব্যর্থ হয়েছিল, কারণ বৈদ্যদের ব্রাহ্মণত্ব কৃষ্ণচন্দ্রের নেতৃত্বে ব্রাহ্মণ সমাজ স্বীকার করেন নি, সেটা সঠিক নয়। আসলে রাজবল্লভের মেয়ের বিধবা বিবাহ স্বীকার করেন নি কৃষ্ণচন্দ্র এবং তাঁর দ্বারা পোষিত ব্রাহ্মণ সমাজ। প্রসঙ্গত কাশীর ব্রাহ্মণরা মেনে নিয়েছিল এই বিধবা বিবাহের প্রস্তাব। নবদ্বীপের ব্রাহ্মণরা মেনে নিলে বাংলায় বিদ্যাসাগরের একশ বছর আগেই বিধবা বিবাহ চালু হয়ে যেত। তবে বৈদ্যদের উপবীত ধারণের বিষয়টি যথেষ্ট জটিল, এটি সুবোধকুমার ঠিকমত বুঝতে পারেন নি, এবং এক্ষেত্রে কৃষ্ণচন্দ্রের (বকলমে তাঁর পোষিত পণ্ডিতদের) বিরোধিতা ছিল না উপবীত ধারণের প্রতি, বা বৈদ্যের দ্বিজত্বের প্রতি। সে বিরোধিতার প্রকৃতি ভিন্ন। সংক্ষেপে ও সরল করে বলতে গেলে কৃষ্ণ-পক্ষীয় দল বৈদ্যের বৈশ্যত্ব প্রতিপন্ন করে দ্বিজত্ব স্বীকার করে উপবীত ধারণে মত দেন।

অন্যদিকে রাণী ভবানী হিন্দু বিধবাদের একাদশী ব্রত সহ বৈধব্যজীবনের কঠোরতা হ্রাস করার একটি প্রয়াস পেয়েছিলেন, সেটি ব্যর্থ হয় (সুবোধকুমার ২১)।

মধ্যযুগের বাংলাভাষী হিন্দু রাজনৈতিক ক্ষমতায় সুপ্রতিষ্ঠিত হলে সমাজসংস্কারের প্রয়াস পেয়েছে অতএব। রাজা রাজবল্লভ ও রাণী ভবানী দুজনেই স্ব স্ব ক্ষেত্রে স্বরাট্‌ বলেই এই উদ্যোগ নিতে পেরেছিলেন।

সুবোধকুমার মুখোপাধ্যায় একটা বেশ চিত্তাকর্ষক ব্যাপার বলছেন। জনৈক সমাজবিজ্ঞানীকে উদ্ধৃত করে উনি বলছেন, মধ্যযুগের বাংলার হিন্দুদের মধ্যে দুটি গুরুত্বপূর্ণ অভাব লক্ষ্য করা যায়ঃ প্রয়োজনাতিরিক্ত উৎপাদনে অনীহা, বর্ণ ও জাতিগুলির মধ্যে সহযোগিতার অভাব (২২)। মধ্যযুগে বাংলায় যে বিজয়নগর, মারাঠা বা শিখ প্যাটার্নে কোনও সার্বভৌম শক্তি বা সাম্রাজ্য গড়ে ওঠেনি, তার পেছনে সম্ভবত বাংলার হিন্দুদের মধ্যে ঐক্যের অভাব ছিল। এই জায়গাতেই গৌড়ীয় বৈষ্ণব আন্দোলনের গুরুত্ব, কারণ এই আন্দোলন ঠিক এই কাজটাই করেছিল, হিন্দুদের মধ্যে একটা ঐক্যের ন্যারেটিভ তৈরি করেছিল।

মিলিটারি কালচারাল কমপ্লেক্স তৈরির ক্ষেত্রে এই ঐক্যের উপস্থিতি বা অভাব কিভাবে কাজ করে একবার দেখে নিই। যশোরসম্রাট প্রতাপাদিত্য মধ্যযুগের বাঙালির সবথেকে আইকনিক সমরনায়ক। দীনেশ সেন বলছেন প্রতাপের প্রধান দুর্গ ছিল ১৪টিঃ যশোর, ধুমঘাট, রায়গড়, কমলপুর, বেদকাশী, শিবসাহ, প্রতাপনগর, শালিখা, মাতলা, হায়দারগড়, আড়াইকাকী, মণি, রামমঙ্গল, চাকশ্রী। কলকাতার কাছে ৭টি দুর্গ ছিল – মাতলা, রায়গড়, টালা, বেহালা, শালখিয়া, চিৎপুর, মূলাজোড়। নৌবহরের জন্য সুন্দরী কাঠের অনেক জাহাজ ও রণতরী নির্মিত হত। এক একটিতে ৬৪ বা তারও বেশি দাঁড় থাকত, এবং অনেকগুলোতেই কামান থাকত। যশোর এই সময় জাহাজ নির্মাণের কেন্দ্র ছিল। শায়েস্তা খাঁর সময়েও দেখা যায় যশোর থেকে মোগলরা জাহাজ তৈরি করাত। পিয়ারা, মহলগিরি, ঘুরাব, পাল, মাচোয়া, পশত, ডিঙ্গি, গছাড়ি, বালাম, পলওয়ার, কোচা – এগুলো ছিল বিভিন্ন রণতরীর শ্রেণীবিভাগ। উৎকৃষ্ট যুদ্ধজাহাজ ছিল ১০০০০ এর ওপরে। অন্যান্য পোতের সংখ্যা ২০০০ এর ওপরে ছিল। আব্দুল লতিফ থেকে উদ্ধৃত করেছেন দীনেশ সেন, এবং তারপরে বলছেনঃ

“প্রতাপাদিত্যের যুদ্ধের উপকরণ শত শত তরীতে বোঝাই থাকিত”। এই রণতরীগুলি প্রথম বাঙ্গালী কর্মচারীর অধীন ছিল, কিন্তু পরে পর্ত্তুগীজ ফ্রেডারিক ডুডলীই এই কার্যের ভার প্রাপ্ত হন। প্রতাপের সৈন্য ঢালী, অশ্বারোহী, তীরন্দাজ, গোলন্দাজ, নৌসৈন্য, গুপ্তসৈন্য, রক্ষিসৈন্য, হস্তিসৈন্য – এই আট ভাগে বিভক্ত ছিল। ঢালী সৈন্যের অধিনায়ক ছিলেন কালিদাস রায় মদন মল্ল। (“যুদ্ধকালে সেনাপতি কালী” – ভারতচন্দ্র)। অশ্বারোহী সৈন্যের প্রধান অধ্যক্ষ প্রতাপসিংহ দত্ত, সহকারী মহিউদ্দিন ও নুরউল্লা। তীরন্দাজের অধ্যক্ষ সুন্দর ও ধুলিয়ান বেগ। নৌবহরের অধ্যক্ষ অগস্টাস পেড্রো। বিপক্ষদের গতিবিধির গুপ্ত সংবাদ লইবার জন্য যে গুপ্তসৈন্য সৃষ্ট হইয়াছিল, তাহার অধ্যক্ষ ছিল ‘সুখা’ নামক এক অসমসাহসী বীর। (“গুপ্তসেনাপতিশ্চাপি সুখাখ্যো ভীমবিক্রমঃ – ঘটককারিকা)। কূকীসেনাদের অধ্যক্ষের নাম রঘু। “ষোড়শ হলকা হাতী, অযুত তরঙ্গ সাতী, বায়ান্ন হাজার যার ঢালী” প্রতাপাদিত্যের সৈন্যসংখ্যার এই নির্দেশ ভারতচন্দ্র করিয়াছেন। পূর্ত্তবিভাগের প্রধান অধ্যক্ষ ছিলেন জগৎসহায় দত্ত। প্রতাপাদিত্যের বহু কামান ও গোলার নিদর্শন এখনও যশোরে দৃষ্ট হয়। … তাঁহার সৈন্যদের মধ্যে অসন্তুষ্ট ও পরাজিত পাঠান সৈন্য , পর্ত্তুগীজ ও পার্ব্বত্য ত্রিপুরার কুকী সৈন্য বিস্তর ছিল। বাঙ্গালী রায়বেঁশে ও ঢালী সৈন্যগণ অতীব দুর্দ্ধর্ষ ছিল, কতলু খাঁর পুত্র জমাল খাঁ তাঁহার অন্যতম সেনাপতি ছিলেন। … তাঁহার একান্ত অন্তরঙ্গ বন্ধু শঙ্কর চক্রবর্ত্তী এবং মহাবলশালী সূর্য্যকান্ত গুহ (সূর্য্যকান্তো মহাশূরো গুহকূলস্য ভূষণম্‌) এই দুইজনে মিলিয়া পাঠানাধিকারের পরে দেশে হিন্দুরাজত্ব ফিরাইয়া আনিতে ষড়যন্ত্র করিতেছিলেন। … কমল (সম্ভবত কামাল) নামক এক বিশ্বস্ত অতি দুর্দ্দান্ত রণদক্ষ খোজা তাঁহার এই আশায় এক প্রধান অবলম্বন ছিলেন।”(৭৯০-১)

অন্যত্র প্রতাপাদিত্যের সামরিক শক্তি সম্পর্কে এই তথ্য পাচ্ছি

“প্রতাপাদিত্যের বায়ান্ন হাজার ঢালী, একান্ন হাজার তীরন্দাজ ও মুদ্গর প্রাসাদিহস্ত বহু সৈন্য ছিল। অন্নদামঙ্গল পাঠে দেখা যায়, তাঁহার দশ হাজার অশ্বারোহী ও ষোড়শ যুথ হস্তী ছিল। পর্ত্তুগীজ সেনাপতিদের অধীনে তাঁহার সেনাগণ কামান-বন্দুকাদি-পরিচালন অভ্যাস করিয়াছিল। সাগরদ্বীপে প্রতাপাদিত্যের নৌ-বাহিনীর প্রধান অবস্থিতিস্থান ছিল। গড় মুকুন্দপুরে প্রতাপের একটি দৃঢ় দুর্গ ও কুশলী নামক স্থানে কামান গোলাগুলি প্রস্তুত করার কারখানা ছিল। সূর্য্যকান্ত গুহ প্রতাপের প্রধান সেনাপতি ছিলেন। ফিরিঙ্গি রুড়া [রডা] গোলন্দাজ সৈন্য পরিচালন করতেন। মদনলাল ঢালিদের পরিচালক ছিলেন। এতদ্ভিন্ন রঘু, সুখা, প্রতাপসিংহ দত্ত ও শঙ্কর চক্রবর্তী প্রভৃতি বীরপুরুষগনের নাম শুনা যায়। প্রতাপাদিত্যের কারখানায় যে বৃহৎ বৃহৎ গোলা প্রস্তুত হইত, তাহার একটি ১৯০৭ সনের কলিকাতা প্রদর্শনীতে প্রদর্শিত হইয়াছে।” (রজনীকান্ত ৩০১-২)

প্রসঙ্গত ১৫ হাতিতে এক হলকা হয়। ষোড়শ হলকা হাতি মানে ২৪০ টি হাতি ছিল।

এরা তোপখানা এবং যুদ্ধের দ্রব্যসম্ভার বইত। (কমল ৩৭), অর্থাৎ, এই হাতি মূলত মাল বহনের কাজে ব্যবহৃত ছিল। কিন্তু জয়পুর বংশাবলীতে দেখা যায় প্রতাপের ১৩০০ হাতি ছিল (কালীপ্রসন্ন ৯১), সেক্ষেত্রে হস্তিসৈন্য প্রতাপের যথেষ্ট ছিল। এবং সেক্ষেত্রে সম্ভবত গঙ্গারিডাইদের মত বিপুল হস্তিসৈন্য বাঙালির মধ্যযুগে এই একবার ফিরে এসেছিল।

প্রতাপের এই বিপুল সেনাবাহিনী কসমোপলিট্যান ছিল, সন্দেহ নেই। শিবাজীর মারাঠা সেনার মত প্রতাপের সেনা একজাতীয় নয় (শিবাজীর সেনা মূলত মারাঠা কাস্টের লোকজন নিয়েই তৈরি হয়)। এর বিপদও ছিল। মুসলমান সেনাপতিদের মধ্যে খোজা কামাল শেষ পর্যন্ত প্রতাপের প্রতি অনুগত থাকলেও ইসলাম খানের সঙ্গে শেষ যুদ্ধে প্রতাপের পরাজয়কালে আরেক সেনাপতি জামাল খাঁ বিশ্বাসঘাতকতা করে মোগল পক্ষে যোগ দেন (অনিরুদ্ধ ১৯২, ১৯৪)।

বর্তমানে যেমন বলা হয় মিলিটারি ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স, মধ্যযুগে একটি মিলিটারি কালচারাল কমপ্লেক্স ছিল। বাংলাভাষী হিন্দু যে নিজস্ব সাম্রাজ্য আর তৈরি করতে পারেনি, কেবল কয়েকটি স্বাধীন এনক্লেভ বা মাঝসমুদ্রে দ্বীপের মত জেগে থাকা কয়েকটি স্বাধীন ছিটমহল থেকে গেছিল, তার একটা কারণ হতে পারে, মুসলমান ঐক্যবদ্ধ ছিল। সুকুমার বর্ণনা দিচ্ছেন রূপরামের ধর্মমঙ্গল থেকে, এটি সপ্তদশ শতকের টেক্সটঃ

“হাসন হুসেন সাজে পায়ে দিয়া মোজা

যাহার সঙ্গতি সাজে বাইশ হাজার খোজা

ঘোড়ার পিঠে পান পানি হেড়া আর রুটি

চলিতে তুরঙ্গ পায়ে বাজে তুলাগুটি।

ভুরুকুণ্ডার পাঠান, রাউটির মোগল, সবাই এল ছুটে। তাদের অস্ত্রশস্ত্র পুরোনো, তবে একতা অসাধারণ।

কাল ধল রাঙ্গা টুপি সভাকার মাথে

রামের ধনুক শর সবাকার হাথে।

সকল বচনে তারা সঙরে খোদায়,

এক রুটি পাইলে হাজার মিঞা খায়।

তার পর এল পশ্চিম দিকের থানাদার খানসামা কাজী সাত হাজার সওয়ার নিয়ে। …

বিশাশয় কামানে সাজে বড় বড় গোলা,

দাম দুম শব্দ শুনি চঞ্চল অচলা। …

সর্দার-সিফাই সাজে বাহাদুর খাঁ

গৌড়ে ইনাম যার বিশাশয় গাঁ।

সাজিল হাথির পিঠে বঙ্গ-মিঞা কাজী,

কর্ণের সমান দাতা রণে মর্দ গাজী”।

(সুকুমার ৬৮)

এর পরে কাব্যটি হিন্দুদের রণসজ্জার বর্ণনাও দিয়েছে, কিন্তু সেখানে এই একতা নেই, সেখানে প্রত্যেকটি ক্ল্যান আলাদা আলাদা ভাবে মার্চ করছে। চার হাজার চৌহান এবং দশ হাজার রানা, মল্ল-রাজার সৈন্য, আট হাজার আগরি (আগুরি) ঢালি, তেঁতুল্যা ও কুসমাট্যা বাগদি ঢালি ও পাইক, গোয়ালা ধানুকি, পঞ্চাশ হাজার ডোম সৈন্যদল যাদের মধ্যে পাইক ধানুকি ঢালি সবই ছিল। মাল পাইক, হাড়ি পাইক, “নেঞ্জা” হস্তে মোদক পাইক, তেলঙ্গা ধানুকি, উড়্যা পাইক, কোল ধানুকি।

পাইক, ধানুকি, ঢালি, এগুলি মধ্যযুগের সৈন্যবিভাগঃ পাইক বর্শা-বল্লম বা অন্যান্য লম্বা ধারালো অস্ত্র, ধানুকি তীরধনুক এবং ঢালি ঢাল-খড়্গ নিয়ে যুদ্ধ করতেন। উল্লেখ্য যে হিন্দু সৈন্যের মধ্যে সওয়ার নেই একেবারে, হস্তিসৈন্যও নেই। হিন্দুসৈন্য পদাতিক। হাতি এবং ঘোড়ায় চাপা সৈন্য মুসলমানদের মধ্যেই দেখা যাচ্ছে, এছাড়া ফিরিঙ্গি সৈন্যও দেখা যাচ্ছে “হাথ্যার” অর্থাৎ হাতিয়ার নিয়ে “পক্ষরাজ” ঘোড়ায় চেপেছে। কামান নিয়ে গোলন্দাজ সৈন্য একমাত্র মুসলমান কাজীর অধীনে দেখা যাচ্ছে, এছাড়া সিলিদারও কামানি সৈন্য রাখেন। (সুকুমার ৬৮-৭০) তবে সিলিদার ঠিক কোন পদ আমি বুঝতে পারলাম না, সুকুমার সেনও কিছু লেখেন নি। সিল অর্থে পাথরের নিরেট টুকরো হয় (আমাদের শিল-নোড়া), সেক্ষেত্রে সিল বললে সম্ভবত গোলা বোঝানো হচ্ছে। কামানের গোলা সিলিদারের হেফাজতে থাকত সেক্ষেত্রে। মধ্যযুগের এই মিলিটারি কালচারাল কমপ্লেক্সে হিন্দুদের অবস্থান অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক। তাদের অনেক সৈন্যদল আছে, প্রবল শক্তিশালী দল সেসব, তাদের অনেকজন দোর্দণ্ডপ্রতাপ সর্দার আছে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু যদিও এই ধর্মমঙ্গলের কল্পকাহিনীতে তাদের একত্রিত করার কাজটা একজন সার্বভৌম দেশজ রাজা করেছেন, বাস্তবে মধ্যযুগের ইতিহাসে এই কাজটা কোনও বাঙালি রাজা করতে পারেন নি, এক প্রতাপ কিছুটা পেরেছেন। কিন্তু তাঁর স্বদেশবাসী, এমনকি তাঁর স্বজাতীয় কায়স্থরাও অনেকেই প্রতাপের সহায়তা করেন নি। উত্তর রাঢ়ীয় কায়স্থ ভবেশ্বর রায় আজম খানের সঙ্গে যুদ্ধে প্রতাপের বিরুদ্ধাচারণ করেছিলেন, ফলে প্রতাপাদিত্যের অধিকৃত মুড়াগাছা, মল্লিকপুর, সৈয়দপুর, আমেদপুর পরগণা আজম খানের কাছ থেকে পান পুরস্কার হিসেবে (রজনীকান্ত ২৯০), এভাবে চাঁচড়ার রাজবংশের সূত্রপাত।

প্রতাপের যোদ্ধাগুণ যত ছিল, কূটনীতি তত নয়। কার্ভালোকে নিমন্ত্রণ করে হত্যা করা খলনীতি, কিন্তু কূটনীতি নয়। হরে শুঁড়ি নামে এক প্রভাবশালী বণিককে হত্যা করেছিলেন প্রতাপ। জামাতা রামচন্দ্রকে হত্যার প্রয়াস পেয়েছিলেন। বসন্ত রায় মোগলের অনুগত ছিলেন, কিন্তু পিতৃব্যহত্যা এবং খুড়তুতো ভাইদের হত্যা করায় বসন্ত রায়ের জামাই রূপরাম বসুর তত্ত্বাবধানে কচু রায় মোগলের দরবারে আশ্রয় নিয়ে প্রতাপের বিরুদ্ধে মোগল অভিযানের কারণ হন। বীর সম্রাট প্রতাপ নিজের এসমস্ত ভুলের জন্য দুবার মরেছেন, একবার মোগল সৈন্যের হাতে, আরেকবার রবীন্দ্রনাথের হাতে। অথচ তাঁর সম্পর্কে তাঁর জীবদ্দশায় এরকম কবিতা লেখা হয়েছেঃ “স্বর্গে ইন্দ্র দেবরাজ বাসুকি পাতালে/ প্রতাপ-আদিত্য দাতা অবনী মণ্ডলে” (কমল ২৬০)।

প্রতাপ এসেছিলেন কোল্যাবরেটর ক্লাস থেকে। তাঁর পূর্বপুরুষ সপ্তগ্রামে কানুনগো সেরেস্তায় কাজ করতেন। সুলেমান কররানীর রাজত্বে প্রতাপের পিতা শ্রীহরি গৌড় সরকারে কাজ করেন, এরপর দাউদ সিংহাসনে বসলে দাউদের পুরোনো ব্যক্তিগত বন্ধু হিসেবে শ্রীহরি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন, এবং বিক্রমাদিত্য উপাধি নিয়ে সুন্দরবন অঞ্চলের জমিদার হন (ওই অঞ্চলের জমিদার চাঁদ খাঁ নিঃসন্তান অবস্থায় মারা গেছিলেন)। দাউদের পতনের পরে শ্রীহরি মোগল সেনাপতি তোডরমল্লকে গিয়ে রাজস্বের হিসেব বুঝিয়ে দিয়ে আসেন (রামরাম বসু দ্রষ্টব্য)।

কৃষ্ণনগরের রাজাদের পূর্বপুরুষ ভবানন্দ মজুমদার মানসিংহকে রসদ যোগান দিয়েছিলেন। নলডাঙ্গার রাজবংশের পূর্বপুরুষ রণবীর খাঁ এবং কুশদহের জমিদার রাঘব সিদ্ধান্তবাগীশ উভয়ে মানসিংহের সহায়তা করেছিলেন। কামদেব ব্রহ্মচারীর পুত্র লক্ষ্মীকান্ত প্রতাপের বিশেষ অনুগৃহীত ছিলেন। তিনি প্রতাপের সমস্ত সামরিক তথ্য মানসিংহকে জানান। তিনি সাবর্ণ রায়চৌধুরীদের পূর্বপুরুষ (সাবর্ণ বংশধরেরা আজও বিশ্বাসঘাতকতা-পাপমোচনার্থে প্রতাপকে খলনায়ক হিসেবে দেখানোর প্রয়াস পান, এটা সোশ্যাল মিডিয়ায় চোখে পড়েছে আমার)। ভবানন্দ, লক্ষ্মীকান্ত, এবং বাঁশবেড়িয়ার রাজাদের পুর্বপুরুষ জয়ানন্দ মজুমদার – এই তিন মজুমদারে বাংলা ভাগ একটি প্রবাদে পরিণত হয়েছে। তবে ইতিহাসবিদদের মধ্যে প্রতাপের বিদ্রোহ নলিনীকান্ত ভট্টশালী বিশ্বাস করতেন না, তিনি বলেছিলেন যে মানসিংহের সঙ্গে প্রতাপের আদৌ কোনও যুদ্ধ হয়নি (কমল ১৩৪-৫)। এ বিষয়ে সন্দেহ নেই, মানসিংহের পরেও প্রতাপ রাজত্ব করেছেন। প্রতাপের পরাজয় ঘটে ইসলাম খানের সঙ্গে যুদ্ধে, মানসিংহের অনেক পরে।

মধ্যযুগের শেষে বাংলার হিন্দুদের সম্পর্কে সমসাময়িক ইংরেজদের কয়েকটি মন্তব্য।

জেমস রেনেল তাঁর ডায়েরিতে লিখেছেনঃ “ইউরোপীয়দের তুলনায় বাঙালীরা অনেক মহৎ দার্শনিকতা নিয়ে কষ্ট ও দুর্ভাগ্য বরণ করে”। ল, ইনি ফরাসীদেশীয়, বলছেন ‘মুসলমান অভিজাতরা ইউরোপীয়দের সঙ্গে কোনও যোগাযোগ রাখে না। তাদের মানসিক গণ্ডি খুব সঙ্কীর্ণ। বাংলার হিন্দু বণিক ও ব্যাঙ্কাররা ইউরোপীয়দের সম্পর্কে অনেক খোঁজখবর রাখত। বাংলার বাইরে কোথায় কি ঘটছে এরা তার খবর আনত”। ল্যুক স্ক্র্যাফটন লিখেছেন ‘আনুগত্য ও দেশপ্রেম বাঙালীর অজানা। অথচ এ দুটি গুণই মানুষের মধ্যে যা কিছু মহৎ এবং শ্রেষ্ঠ সৃষ্টির পেছনে অনুপ্রেরণা হিসাবে কাজ করে। বাঙালীরা অনুগত থাকে ততক্ষণ যতক্ষণ তাদের মনে ভয় থাকে; ভয়ের সঙ্গে আনুগত্যও উবে যায়। টাকা এখানে শক্তির উৎস, কারণ সৈন্যরা টাকা ছাড়া আর কোনও বন্ধন স্বীকার করে না। সুতরাং যার যত টাকা সে তত শক্তিশালী’ (রিফ্লেকশন্স)। … এযুগে রাষ্ট্রবিপ্লব সাধারণ মানুষকে একেবারেই স্পর্শ করত না। তারা এব্যাপারে সম্পূর্ণ উদাসীন। কে ক্ষমতা পেলেন, কে ক্ষমতাচ্যুত হলেন এসব নিয়ে বাংলার কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী, কারিগর, তাঁতি, জোলা মাথা ঘামাত না। গোলাম হোসেন লিখেছেন ‘এরা নেহাতই ভীতু, নিরীহ, কাপুরুষ ও গোবেচারা। ভয়ে আনতভাবে জীবন কাটায়। যে টাকা দেয় তারই কাছে আত্মসমর্পণ করে’ (সিয়ার উল মুতাখরীণ)। বাঙালির প্রধান আনুগত্য তার গৃহ ও চাষ জমির প্রতি। এগুলি তারা প্রাণ দিয়ে আঁকড়ে ধরে থাকে। বহু কষ্ট স্বীকার করেও এগুলি রক্ষা করার চেষ্টা করে। নিতান্ত বাধ্য হয়ে কেবল এগুলি ত্যাগ করে। বাঙালীর মধ্যে জাতীয়তার বন্ধন নেই। এমন কোনো সাধারণ আদর্শ নেই যার ভিত্তিতে তারা ঐক্যবদ্ধ হতে পারে। ওয়ারেন হেস্টিংস তাঁর স্মৃতি কথায় লিখেছেন ‘সারা উত্তর ও দক্ষিণ ভারতে একমাত্র মারাঠাদের মধ্যে ঐক্যের বন্ধন আছে। অন্য কোনও জাতির নেই’ (সুবোধকুমার ১২৬-২৭)।

এই ঐক্যের অভাবের কনটেক্সটে বৈষ্ণব আন্দোলনের রাজনৈতিক দিকটি পাঠ করা আরও বেশি প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। তার একটি অতি সংক্ষিপ্ত প্রয়াস করি।

মধ্যযুগে রামায়ণ এবং মহাভারত, দুটিই বৈষ্ণব টেক্সট হিসেবে বাঙালির কাছে এসেছে (বিষ্ণুর অবতার রাম এবং কৃষ্ণ যেহেতু নায়ক)। মুসলমান শাসকের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা এখানে আছে, সন্দেহ নেই। কিন্তু এমন ভাবা অনুচিত যে বৈষ্ণব সাহিত্য ও ভাবধারা প্রচারে সুলতানের রাজসভার কিছু ভেস্টেড ইন্টারেস্ট ছিল। ষোড়শ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে স্বাধীন রাজ্য কোচবিহারের রাজা নরনারায়ণ এবং তাঁর উত্তরসূরী রাজারা মহাভারত, রামায়ণ ও কৃষ্ণলীলার কাহিনী পাঁচালী ফরম্যাটে রচনা করান সভাকবিদের দিয়ে। আসামের বৈষ্ণবধর্ম প্রচারক শঙ্করদেব ছিলেন নরনারায়ণের আশ্রিত। এদিকে সপ্তদশ শতকে অপর স্বাধীন রাজ্য বিষ্ণুপুরের মল্লরাজারাও বৈষ্ণবধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা করেন (সুকুমার ৫৬-৭)। বৈষ্ণবধর্মের রাজনৈতিক দিকটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় আজ যাচ্ছি না, সে আলোচনা অন্যসময় করা যাবে, তবে বৈষ্ণব ধর্মের ফলে হিন্দু রাজশক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে, এরকম একটি মত আছে, সুকুমার সেনও এরকম একটা বক্তব্য রেখেছেন। প্রভাত মুখার্জি বিস্তারিত তথ্যপ্রমাণ সহ দেখিয়েছিলেন যে উড়িষ্যায় হিন্দু রাজশক্তির পরাজয়ের কারণ চৈতন্য আন্দোলন নয়।

মধ্যযুগের রাজশক্তির সংস্কৃতিচর্চার প্রসঙ্গে আসা যাক। বারো ভুঁইয়াদের অন্যতম ভুলুয়ার রাজা লক্ষ্মণমাণিক্যদেব, জাতিতে ব্রাহ্মণ, ‘সৎ কাব্যরত্নাকর’ নামে একটি কাব্যসঙ্কলনগ্রন্থ এঁর কীর্তি। সভায় ন্যায়শাস্ত্রের চর্চাকেও উৎসাহ দিতেন (সুকুমার ৫৭)। বারো ভুঁইয়ার অন্যতম ইশা খানের পুত্র মুসা খান মস্‌নদ্‌ আলি প্রশংসিত হয়েছেন তাঁর সভাকবি মথুরেশের ‘শব্দরত্নাবলী’ কাব্যগ্রন্থে। মস্‌নদ্‌ আলির ভ্রাতা মহম্মদ খান এবং আবদুল্লা খানেরও ভূয়সী প্রশংসা করতে দেখা যায়, মহম্মদকে ইন্দ্রর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে, মস্‌নদ্‌ আলির বদান্যতা কর্ণের সঙ্গে তুলনায়িত হয়েছে, এরকম আরও মহাকাব্যিক সব তুলনা টানা হয়েছে (সুকুমার ৫৮)। স্পষ্টতঃ, সভাকবি হিন্দু হলে এই সুবিধাগুলো ছিল মুসলমান শাসকের, জনতার মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর কাজে এই জনমানসে দৃঢ়প্রোথিত ন্যারেটিভগুলো ভাড়া পাওয়া যাচ্ছিল।

তবে হিন্দু কর্মচারীর অনেক বিপদও ছিল। সুবুদ্ধি রায়, গৌড়-অধিকারী বা গৌড় নগরের কোতোয়াল ছিলেন। অধীনস্থ কর্মচারী সৈয়দ হোসেন খাঁর গাফিলতিতে বিরক্ত হয়ে চাবুক মেরেছিলেন। এই ব্যক্তিই পরে গৌড়ের সিংহাসনে হোসেন শাহ নাম নিয়ে বসবেন, এবং সুবুদ্ধির জাতি বিনাশ করবেন “করোয়ার পানি” সুবুদ্ধির মুখে দিয়ে। সুবুদ্ধি শেষ বয়সে বৃন্দাবনবাসী হন, চৈতন্যের পরামর্শমতে। সেখানে তিনি বনে বনে শুকনো কাঠ কুড়িয়ে এনে মথুরায় বেচতেন পাঁচ ছয় পয়সায়, এবং তার মধ্যে এক পয়সায় তিনি “চানা চাবানা” খেতেন, বাকি পয়সা বেনের দোকানে গচ্ছিত রাখতেন, সেই পয়সায় দুঃখী বৈষ্ণবকে ভোজন করাতেন এবং “গৌড়িয়া” এলে দধিভাত খাওয়াতেন ও পথশ্রান্তি অপনোদন করার জন্য তৈলমর্দনের ব্যবস্থা করাতেন (সুকুমার ৬৪)। এখানে রাজশক্তির একটি সাংখ্য অনুরাগী আদর্শে স্পিরিচুয়াল শক্তিতে রূপান্তর ঘটেছে সর্বস্ব ত্যাগের মাধ্যমে।

সুজাউদ্দিন, অর্থাৎ মুর্শিদকুলি খানের জামাই যখন বাংলার নবাব, তখন ঢাকায় ডেপুটি নবাবের কাজ করছেন সরফরাজ, সুজাউদ্দিনের পুত্র। সরফরাজ শাসক হিসেবে মোটের ওপরে অযোগ্যই ছিলেন বলা যায়। কিন্তু তাঁর শাসনে ঢাকার দেওয়ান ছিলেন যশোবন্ত রায়, এবং এই যশোবন্ত রায়ের সুশাসনে মানুষ শান্তি ও সমৃদ্ধির মুখ দেখেছিল, সরকারেরও রাজস্ব বৃদ্ধি পায়। এই সময় ঢাকায় টাকায় আট মণ চাল পাওয়া যাচ্ছিল বলে শায়েস্তা খাঁর বানানো তোরণ মহা ধুমধামের সঙ্গে পুনরায় খোলা হয়, যেটি মধ্যযুগের শেষদিকে অন্যতম বিখ্যাত ঘটনা। যশোবন্ত রায় নিঃসন্দেহে আগামীতে রাজবল্লভের উত্থানের পথ সুগম করেছিলেন, অনেকটা যেমন ইয়েভগেনি প্রিমাকভ নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে এসেছিলেন বলে ভ্লাদিমির পুটিনের উত্থান সম্ভব হয়েছিল। বৃদ্ধ প্রিমাকভ ও তরুণ পুটিন পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন, সুসম্পর্ক ছিল না প্রথমে, বৃদ্ধ যশোবন্ত ও তরুণ রাজবল্লভের মধ্যেও তিক্ত সম্পর্ক দেখা যায়। ইতিহাসবিদ প্যারালাল খুঁজে পাবেন।

***

বিষ্ণুপুরের মল্ল রাজারা ইসলামের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন, মহরমে শ্রেষ্ঠ তাজিয়াকে পুরস্কৃত করা হত (সুবোধকুমার ১২৪)। সীতারাম তার রাজধানীর নাম রাখেন মহম্মদপুর, আমরা জানি। মঙ্গলকাব্যে দেখি, মুকুন্দরাম বিস্তারিত বর্ণনা করছেন, কীভাবে কালকেতুর গুজরাট নগরে পশ্চিম অংশে মুসলমান বসতি গড়ে তোলা হচ্ছে (সুকুমার ৪৯-৫০)। নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সভায় বিসরাম খাঁ ছিলেন হিন্দুস্থানী ক্ল্যাসিক্যালের শিক্ষক, আর উত্তর ভারতীয় নৃত্যর শিক্ষক ছিলেন শের মাহমুদ (সুবোধকুমার ১৩৬)। এর পেছনে কিছুটা বাদশা-সুলতানের ধর্মের তোষণ ছাড়াও একটি ভারতীয় সর্বধর্মসমন্বয়ের আদর্শ কাজ করে থাকতে পারে, এখানে দেশজ রাজশক্তি প্রাচীন কাল থেকেই বিভিন্ন ধর্মীয় সেক্টকে উদারভাবে পালন করেছেন।

শেক শুভোদয়ার কাহিনীতে দেখি, লক্ষ্মণ সেনের রাজসভাতেও মুসলমান সুফি শেখ জালালুদ্দিন তাব্রেজি সমাদৃত হয়েছেন, যদিও ইতিহাসে যে জালালুদ্দিন তাব্রেজির সময়কাল পাই, তার পক্ষে লক্ষ্মণসেনের রাজসভায় হাজির হওয়া সম্ভব ছিল না, তিনি ভারতে এসেছেনই লক্ষ্মণসেনের শাসনকাল শেষ হওয়ার পরে, তবে তিনি লক্ষ্মণসেনের কোনও পুত্রের সভায় গিয়ে থাকতে পারেন, অথবা লক্ষ্মণের সভায় অন্য কোনও মুসলমান সাধু এসেছিলেন, যাঁর পরিচয় বিস্মৃত এবং পরে এই বিখ্যাত জালালুদ্দিনের কাহিনীতে সেই মুসলমান সাধুর কাহিনী মিশে গেছে।

সেনসাম্রাজ্য কিন্তু লক্ষ্মণসেনের সঙ্গে শেষ হয়ে যায়নি। বাঙালির মধ্যযুগে দীর্ঘদিন পূর্ববঙ্গে সেনরা রাজত্ব করেছেন। পূর্ববঙ্গে যদিও আক্রমণ শুরু হয়ে গিয়েছিল। রণতরী সাজিয়ে পূর্ববঙ্গ প্রথম আক্রমণ করেন গিয়াসুদ্দিন ইওয়াজ খিলজি। সময়টা শীতকাল, জানুয়ারি মাস, ১২২৭ খ্রীষ্টাব্দে (যদুনাথ হিস্ট্রি অভ বেঙ্গল ৪১)। কিন্তু তাকে পেছন থেকে এইসময় আক্রমণ করেন দিল্লির সুলতান ইলতুতমিশের ছেলে মালিক নাসিরুদ্দিন, ফলে বঙ্গ বিজয় অসমাপ্ত রেখেই ফিরে আসেন ইওয়াজ খিলজি, এবং নিহত হন। কেশব সেন ও বিশ্বরূপসেন গর্গযবনান্বয়প্রলয়কালরুদ্র উপাধি নিয়েছিলেন, ঠিক কোন্‌ যবনকে হারিয়ে, সেটা জানা যায় না। তবে গিয়াসুদ্দিনই খুব সম্ভবত হতে পারেন এই গর্গযবন, অথবা গারঝা নামে ঘারজিস্তানের একটি ক্ল্যানও এই গর্গযবন হতে পারে (যোগেন্দ্রনাথ ২৫৪-৫৫)। পরমভট্টারক মহারাজাধিরাজ পরমসৌগত গৌড়েশ্বর মধুসেন রাজত্ব করেছেন পূর্ববঙ্গে, সময়কাল কালীপ্রসন্ন বলছেন ১২১১ শক, সেক্ষেত্রে ১২৮৯ খ্রীষ্টাব্দ (২২)। তিনিই শেষ সেন পদবীধারী রাজা যিনি গৌড়েশ্বর উপাধি নিয়েছেন বলে জানা যায়, গৌড় বা লক্ষ্মণাবতী যদিও অনেক আগেই পরিত্যক্ত হয়েছিল।

১২৮২ খ্রীষ্টাব্দেই দেখা যাচ্ছে লক্ষ্মণাবতী বলঘকপুর বা বিদ্রোহ-নগরীর শিরোপা পেয়েছে (কালীপ্রসন্ন ২৪)। এই সময়ে সুবর্ণগ্রামে স্বাধীন রাজত্ব চলছে দনুজ রায়ের, যার সঙ্গে এর কিছু আগে দিল্লির সুলতানের চুক্তি হয়েছিল বিদ্রোহী তোগ্রাল খানকে ধরিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে। তোগ্রালের মৃত্যুর পরেও লক্ষ্মণাবতী নিয়ন্ত্রণে আসেনি যদিও। তবে সুবর্ণগ্রামে স্বাধীন বাঙালি রাজ্যও বেশিদিন চলেনি, কারণ এরপরেই দেখি সুবর্ণগ্রামে মুসলমান শাসন শুরু হয়ে গেছে। এরপর পুরো মধ্যযুগে বাংলার বিভিন্ন নগর এবং অঞ্চল এবং আস্ত বাংলাই বলঘকপুর শিরোপা পেয়েছে। মোগল আমলে হুগলি জেলা সম্পর্কেও বলঘকপুর বলা হত।

সেনবংশের অনেকগুলি অফশুট মধ্যযুগে দীর্ঘদিন রাজত্ব করেছে, তাদের অধীনে অনেকগুলি এনক্লেভ টিঁকে গেছিল। দিলীপ মৈতে যে কিংবদন্তীর চন্দ্রকেতুর কিছুটা ইতিহাস সংকলন করেছেন, তাতে তিনি চন্দ্রকেতুকে সেনবংশীয় বলেছেন। খুবই সম্ভব যে সেনবংশোদ্ভব ছিলেন এই রাজা চন্দ্রকেতু, এবং পীর গোরাচাঁদের সঙ্গে তাঁর যুদ্ধের কাহিনীর সঙ্গে পূর্ববঙ্গের দ্বিতীয় বল্লালসেন বনাম বায়াদুম্বের যুদ্ধের কাহিনীর আশ্চর্য মিল। উভয় রাজাই যুদ্ধে যেতেন, কিন্তু ভুল সংবাদ পৌঁছয়, ফলে অন্তঃপুরে সবাই আত্মহত্যা করেন, ফলে রাজাও তাঁর মৃত পরিবার পরিজনদের অনুগমন করেন। পশ্চিমে ঘাতক ছিল জল, আর পূর্বে আগুন। বিক্রমপুরের ইতিহাস গ্রন্থে পাচ্ছি, বিংশ শতকের শুরুতেও বল্লালবাড়ি নামে খ্যাত এই দ্বিতীয় বল্লালসেনের রাজপ্রাসাদ সংলগ্ন অগ্নিকুণ্ড (একটি সুগভীর গর্ত) থেকে খনন করে প্রচুর কয়লা বেরিয়েছে, এককালে একটা বড় অগ্নিকাণ্ড যে সেখানে ঘটেছিল, তাতে লেখক যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত নিঃসন্দেহ (২৭৭)। প্রসঙ্গত বৈদ্য কুলপঞ্জিকা অনুযায়ী দ্বিতীয় বল্লালসেন ছিলেন ধন্বন্তরী, এবং যে বল্লালসেন ইতিহাসে পরিচিত, তিনি বৈশ্বানর, ফলে এরা দুজন এক বংশের লোক নন। দ্বিতীয় বল্লালসেন যে ঐতিহাসিক মানুষ, তার পাথুরে প্রমাণ হল বায়াদুম্বের মসজিদ। বাবা আদম ঐতিহাসিক লোক ছিলেন, তাতে সন্দেহ নেই। রামপালে ১৪৮৩ খ্রীষ্টাব্দে সুলতান ফতেহশাহের সময় জনৈক মালিক-উল-মোয়াজ্জেম (শিলালিপির লিখন অনুযায়ী) বাবা আদম শহিদের মসজিদ নির্মাণ করেন। “কথিত আছে সুফীসাধক বাবা আদম ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে এই অঞ্চলে আসেন এবং বল্লাল সেনের নিকট পরাজিত ও নিহত হয়ে শাহাদাত বরণ করেন। মসজিদটি ছয় গম্বুজ বিশিষ্ট আয়তাকার ভূমির উপর প্রতিষ্ঠিত। এটি উত্তর-দক্ষিণে ৪৩ ফুট এবং পূর্ব পশ্চিমে ৩৬ ফুট। … এর সঙ্গে দিল্লির কুওয়াতুল ইসলাম মসজিদের আলাই দরওয়াজার মিল আছে” (৬৭৮-৬৭৯)। মসজিদের কাছেই বাবা আদমের সমাধি। পূর্ববঙ্গে ইসলাম প্রচলনের একদম প্রথম দিকের ঘটনা, এবং এক্ষেত্রে বাবা আদম ও দ্বিতীয় বল্লালসেনের যুদ্ধ গোপালভট্টর বল্লালচরিত মানলে ১৩০০ শক, বা ১৩৭৮ খ্রীষ্টাব্দে অনুষ্ঠিত হয় (২৭৭)। সেক্ষেত্রে মসজিদটি বানাতে আরও একশো বছর লেগেছে। এই সময়কাল লেগেছিল সম্ভবত বঙ্গে ইসলামিক শাসনের থিতু হতে।

মহাস্থানগড় অঞ্চলে পীর সুলতান মহী সোওয়ার সম্পর্কে একটি কাহিনী প্রচলিত, ইনি বলখ্‌ থেকে এসে মহাস্থানের রাজা পরশুরামের কাছে গো-চর্ম পরিমিত ভূমি প্রার্থনা করেন, উপাসনার জন্য। রাজা অনুমোদন করেন। কিন্তু একবার সেই চর্মে বসে উপাসনা শুরু করলে সে চর্ম ক্রমশঃ বাড়তে বাড়তে পুরো রাজ্য ঢেকে ফেলার উপক্রম হয়। রাজা সসৈন্যে এই ফকিরকে আক্রমণ করেন। যুদ্ধে মৃত স্বপক্ষীয় সৈন্যদের রাজা একটি কূপের জল সিঞ্চন করে বাঁচাতেন। কূপের নাম জীবৎকুণ্ড। হরপাল নামক মেথর এই সংবাদ দেন পীর সুলতানকে, সেখানে গোমাংস ফেলে কুণ্ডের জীবনদায়িনী শক্তি বিলুপ্ত করা হয়। রাজা পরাজিত হন, নিহত হন। ফকির এরপর রাজকন্যা শিলাদেবীর ওপর বলাৎকার করতে উদ্যত হলে রাজকন্যা ফকিরকে ধারালো অস্ত্রে বিদ্ধ করে নিহত করেন এবং করতোয়ার জলে ঝাঁপ দেন। করতোয়া নদীতে শিলাদেবীর ঘাট আছে, শাহসুলতানের দরগা আছে, সেটি একটি মন্দিরের ভগ্নাবশেষ, কাছেই পরশুরামের গড় আছে, সেটি একটি প্রকাণ্ড ইঁটের জাঙ্গাল, জীবৎকুণ্ড আছে (রজনীকান্ত ৩৩৫-৬)। এবং এই শিলা নামটা আমি আমার ঐতিহাসিক উপন্যাস “ছায়া দীর্ঘ হয়”-এ ব্যবহার করেছিলাম এক নারী চরিত্র চিত্রনে।

এই কাহিনীর সঙ্গে কিছুটা মিল আছে শ্রীহট্টে গৌড়গোবিন্দের পতন (শাহ জালালের হস্তে), বা সপ্তগ্রামে শেষ হিন্দু রাজবংশের পতন (জাফর খান গাজির হস্তে)। সেই কাহিনীতেও সুফিদের ভূমিকা দেখা যায়, দুটিতেই গোবধ করা হচ্ছে, হিন্দু রাজা শাস্তি দিচ্ছেন, এবং তখন সুফি নায়ক সৈন্যসামন্ত নিয়ে আক্রমণ করছেন। মধ্যযুগের সুফিরা যে তরবারিধারী সৈনিক ছিলেন, সেটা রিচার্ড ইটনও বলে গেছেন। এই জাফর খান সংস্কৃতে অতি চমৎকার গঙ্গাস্তব রচনা করেছিলেন। পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর তন্ত্রপরিচয় গ্রন্থে অবশ্য অবশ্য অন্য একটা নাম দিচ্ছেন, দরাব খাঁ, যিনি গঙ্গাস্তোত্র রচনা করেছিলেন, এবং তন্ত্রধর্মে দীক্ষা নিয়েছিলেন (১০)। জাহাঙ্গীরের আমলে বাংলায় যখন শাজাহান ক্ষমতায় এবং পিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহী, তখন একজন দরাব খাঁ শাজাহানের সহযোগী ছিলেন, পরে ইনি বিশ্বাসঘাতকতা করেন শাজাহানের সঙ্গে। জাহাঙ্গীর ও শাজাহানের মিটমাট হয়ে গেলে জাহাঙ্গীরের নির্দেশে এই দরাব খাঁর মৃত্যুদণ্ড হয় এবং ছিন্নমুণ্ডু দিল্লিতে নিয়ে যাওয়া হয়।১ তবে দরাব খাঁ নামের কোনও গঙ্গাস্তবরচয়িতার উল্লেখ আমি অনেক খুঁজেও কোনও ইতিহাসগ্রন্থে পেলাম না, এক যদি না পাঁচকড়ি জাফর খাঁ লিখতে গিয়ে দরাব খাঁ লিখে থাকেন, অবশ্য কেনই বা তেমন করবেন। তবে যিনি গঙ্গাস্তব রচেছিলেন বলে ইতিহাস জানে, সেই জাফর খানই যদি তন্ত্রসাধনা করে থাকেন, সেক্ষেত্রে তার মধ্যে আমরা যবন হরিদাসের অনেক আগে একজন কনভার্ট খুঁজে পাচ্ছি। যেমন বাংলার প্রথম এম ডি ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকারই আবার বাংলার প্রথম হোমিওপ্যাথ, তেমনি যে জাফর খানের তৈরি মসজিদটি বলা হয় বাংলার প্রথম মসজিদ (১২৯৮ খ্রীষ্টাব্দে তৈরি), সেক্ষেত্রে প্রথম মসজিদের স্রষ্টাই প্রথম কনভার্টেড হিন্দু। সত্যি যদি হয়, তবে সেই অনামা তন্ত্রগুরুর সন্ধান করা উচিত যিনি এই পরিবর্তন ঘটালেন, কারণ এই পরিবর্তনে বাংলার হিন্দুধর্মের বিশেষ কোনও লাভ হয়নি। জাফর খান গাজী মারা গেছিলেন ভূদেব নামে হুগলির এক হিন্দু রাজার সঙ্গে যুদ্ধে, কাজেই কোনও পরিবর্তন হয়ে থাকলেও সেটা ব্যক্তিগত ধর্মাচরণে, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তিনি দেশজ হিন্দু শাসকদের বিনষ্ট করতে সক্রিয় ছিলেন। ওই মসজিদে জাফর খানের শিলালিপিও কাফেরদের হত্যার কথা সগর্বে উল্লেখ করে।২

সেখানে যা লেখা নেই, লেখা থাকার কথাও নয়, তা হল এই সব কাফেরদের সগর্ব ইতিহাস, যারা আগ্রাসী জাফর খান গাজীর দর্পচূর্ণ করে তাকে হত্যা করেছিল। মধ্যযুগের এই কাফেররাই আমাদের পূর্বমানুষ। তাদের নেতৃত্ব দিয়েছিল যে বাঙালি রাজশক্তি, তার ইতিহাস রচনা করা আমাদের অবশ্যকর্তব্য। তাই এই সন্দর্ভের শেষে বঙ্কিমকেই আবার স্মরণ করি। বাঙালির ইতিহাস চাই, নইলে বাঙালি মানুষ হবে না, বঙ্কিম বলেছিলেন। সেই সূত্র ধরে আমরা বলতে চাই, মধ্যযুগে বাঙালি রাজশক্তির ইতিহাস চাই, নইলে বাঙালি মানুষ হবে না।

***

পরিশিষ্ট

সংক্ষেপে কয়েকটি নির্ণায়ক রাজ্য, যারা পাঠান মধ্যযুগে, অর্থাৎ মধ্যযুগের প্রথমভাগে বাঙালির নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

ভূষণা। ভূষণার মুকুন্দ রায়কে অনেক ইতিহাসবিদশ বারোভুঁইয়ার একজন মনে করেন। প্রসঙ্গত দ্বাদশ ভৌমিকের প্রথা এদেশে প্রাচীন, মনু এবং শুক্রনীতিতে দেখা যায় (রজনীকান্ত ২৯৫)। আবার বড় ভৌমিক থেকে বারো ভৌমিক এসে থাকতে পারে। মুকুন্দ রায় ফতেয়াবাদ বঙ্গজকায়স্থ সমাজের সমাজপতি ছিলেন। ইনি মোগল সেনাপতি মোরাদ খাঁর পুত্রদের নিমন্ত্রণপূর্বক হত্যা করেছিলেন। বাদশাহী সেনার সঙ্গে যুদ্ধ হয়েছিল, একবার পরাজিত করেছিলেন, একবার পরাজিত হন। মুকুন্দ রায়ের পর শত্রুজিৎ রায় বিদ্রোহ করেছিলেন, তাঁর প্রাণদণ্ড হয়েছিল ঢাকায় ১৬৩৬ খ্রীষ্টাব্দে (রজনীকান্ত ৩০৩)।

ভাদুড়িয়া। পাঠান রাজত্বে ভাদুড়িয়া অঞ্চলের একটাকিয়া ভাদুড়ী বংশ এবং সাঁতোড় অঞ্চলের সান্যাল বংশ – এ দুটি বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ রাজ্য পাঠান কোল্যাবরেটর। মূলত শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহের সময় এরা পাঠানদের সঙ্গে যোগ দেন। ভাজনা গ্রাম থেকে সুবুদ্ধিরাম, কেশবরাম ও জগদানন্দকে সেনা সংগ্রহ করতে বলেন শামসুদ্দিন। জগদানন্দ রায় উপাধি পান। সুবুদ্ধি ও কেশব পেয়েছিলেন খাঁ উপাধি। এরপর সুবুদ্ধিরাম এক লক্ষ টাকার ভাদুড়িয়া চাকলা পান জায়গীর হিসেবে মাত্র এক টাকার নজরানার বিনিময়ে, সেই থেকে একটাকিয়া ভাদুড়ী রাজবংশের শুরু। রাজশাহীর চলনবিলের উত্তরদিকে ছিল এই ভাদুড়িয়া। অনেক পরে হোসেন শাহ এই বংশের এগারোজন যুবককে মুসলমান করে নিজের এগারোটি কন্যা দান করেছিলেন। এই বংশের রাজা জগতনারায়ণ নয় লক্ষ টাকা ব্যয় করে বাসন্তী পুজোর আয়োজন করেন, তার আগে বলা হয় বাংলায় বাসন্তী পুজো ছিল না। এই একটাকিয়ার ভাদুড়ীদের মধ্য থেকে গণেশ এবং কালাপাহাড়, দুজনেই এসেছেন। পাঠান রাজত্বের অবসানে এদেরও আধিপত্যের অবসান ঘটে।


আরও পড়ুন


সাঁতোড়। রাজশাহীর দামনাশ থেকে শিখাই বা শিখিবাহনকেও শামসুদ্দিন ইলিয়াস সেনা সংগ্রহ করতে দায়িত্ব দেন। ইনি সাঁতোড় রাজ্য পান জায়গীর হিসেবে, রাজশাহীর চলনবিলের দক্ষিণ দিকে। সাঁতোড় থেকেই সান্যাল পদবী এসেছে। তিন ভাদুড়ী এবং এক সান্যাল মোট পঞ্চাশ হাজার সৈন্য জোগাড় করে দিয়েছিলেন, সেই সেনাতেই ইলিয়াস শাহী রাজত্বে সূচনা, ইলিয়াস তখন স্বজাতীয় মুসলমানের সাহায্য তেমন পান নি।

রাজা অবনী সান্যালের কন্যা নবকিশোরীর সঙ্গে রাজা গণেশ ভাদুড়ীর পুত্র যদুর বিবাহ হয়েছিল।

প্রসঙ্গত, সাঁতোড়ের সান্যালদের আত্মীয় ছিলেন বেণী রায়। তাঁর স্ত্রীকে পাঠানরা অপহরণ করায় (সম্ভবত দাউদের রাজত্বকাল) তিনি চলনবিলের মধ্যে একটি দুর্গম দ্বীপে ঘাঁটি গাড়েন, সেখানে যবনমর্দ্দিনী নামে একটি কালীমূর্তি স্থাপনা করেন, এবং তিনি সেখানে মুসলমানদের ধরে এনে বলি দিতেন। মানসিংহ বাংলায় এসে ভ্রাতা ভানুসিংহকে পাঠান বেণী রায়ের সঙ্গে সন্ধি করতে। বেণীর অবর্তমানে যুগল সান্যাল (কাল জোগলা বলে অভিহিত) বেণী রায়ের রাজ্য পান। ভানুসিংহ এসে বেণী সান্যালের কাছে এই কল্পকাহিনীটি ন্যারেট করেন। আকবর আগের জন্মে একজন হিন্দু সাধু ছিলেন, নাম মুকুন্দরাম ব্রহ্মচারী। তীর্থরাজ প্রয়াগে তপস্যা করতেন। মনে বিষয়বাসনা জন্মানোর ফলে আত্মগ্লানিতে গঙ্গা যমুনা সঙ্গমে প্রাণবিসর্জন দেন, এবং এই জন্মে তিনি আকবর হয়ে এসেছেন। এর শাসনে হিন্দুদের ওপরে অত্যাচার সম্পূর্ণ বন্ধ, পাঠানরা অপসৃত। কাজেই বেণী রায়ের উচিত অস্ত্র সম্বরণ করা – এই ছিল ভানুসিংহের বার্তা। বেণী রায় ১২০০ বিঘা জমি পান তাঁর কালীবিগ্রহের দেবত্র হিসেবে, এবং বাদশাহী সনদ পান জমিদার হিসেবে। বেণীর সহকারী চণ্ডীপ্রসাদ রায় (কাল চণ্ডিয়া) মোগল সুবেদার দরবারে পেশকার হন (কমল ২২)। বেণী সম্পর্কে তথ্য পাচ্ছি দুর্গাচরণ সান্যালের “বাংলাঃ মোগলদের আগে” শীর্ষক লেখায়। প্রবন্ধটি কমল চৌধুরী সম্পাদিত বাংলার বারোভুঁইয়া এবং মহারাজ প্রতাপাদিত্য গ্রন্থে সংকলিত।

তাহেরপুর। মনুসংহিতার টীকাকার কুল্লুক ভট্ট এই রাজবংশের পূর্বপুরুষ। রাজা উদয়নারায়ণ গণেশের শ্যালক ছিলেন। রাজা কংসনারায়ণ সর্বপ্রথম সাড়ে আট লক্ষ টাকা ব্যয় করে দুর্গাপুজো শুরু করেছিলেন, ইনি কৃত্তিবাসের কাব্যে উল্লিখিত গৌড়েশ্বর। এঁরা বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ।

সিন্দুরী। বল্লালসেনের পুরোহিত গৌড়ের কালিয়াগ্রামনিবাসী ভীম ওঝা পদ্মিনীর সঙ্গে বল্লালের বিবাহ মেনে না নিতে পেরে পাবনার ছাতক গ্রামে বসতি করেন। ভীমের পৌত্র অনন্তরাম ওঝা রাজা লক্ষ্মনসেনের গুরু, সিন্দুরী ও শাখিনী গুরুদক্ষিণা পেয়েছিলেন। অর্থাৎ এই রাজবংশের প্রতিষ্ঠা সেন আমলেই। এই বংশের রাজা দেবীদাস (ঠাকুর কুশলী নামেও পরিচিত) কালাপাহাড়ের সমসাময়িক ছিলেন। অর্থাৎ সুলেমান কররানির সময়। তাঁর রাজ্য আক্রান্ত হয়। দেবীদাসের জ্যেষ্ঠ পুত্র তিনদিন যুদ্ধের পর নিহত হন, পরিবারের মেয়েরা বিষপানে আত্মহত্যা করেন, দেবীদাসের আরেক দুই পুত্র মুসলমান হয়ে প্রাণ রক্ষা করে। ভোলা নামক নাপিত নিজের তিন ছেলেকে রাজপুত্র পরিচয় দিয়ে মুসলমান সৈন্যের হাতে দেয়, মুসলমানরা সেই তিনজনকে মেরে ফেলেন, কিন্তু রাজার অবশিষ্ট তিন পুত্র রক্ষা পান।

এই বর্ণনা রজনীকান্তের গ্রন্থে পাই (৩০৪-৫)। অন্যদিকে নগেন্দ্রনাথ বসু বলেন, রাজগুরু ভীম কালিহাই গ্রাম প্রাপ্ত হন। নারায়ণের অষ্টম অধস্তন পুরুষ অনন্ত খ্যাত হন বাঙ্গাল ওঝা নামে। তিনি কালিহাই ত্যাগ করে পূর্ববঙ্গের বোয়ালিয়া গ্রামে বাস করেন। অনন্তের পুত্র অচ্যুতানন্দ নিজের চেষ্টায় বোয়ালিয়ায় অনেক সম্পত্তি অর্জন করেন। অচ্যুতানন্দের পৌত্র ঠাকুর কুশলী, দেশবিখ্যাত রাজা দেবীদাস (২৬৯)।

বাহিরবন্দ। জগৎরায় নামে এক বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ এই রাজ্য স্থাপনা করেন পাঠান আমলে। আসাম ও কোচবিহারের আক্রমণ ঠেকিয়েছিলেন বহুদিন। বাহিরবন্দ, ভিতরবন্দ, পাতিলাদাহ ও স্বরূপপুর – এই চারটি পরগণা নিয়ে ছিল বাহিরবন্দ রাজ্য (রজনীকান্ত ৩০৫)।

দিনাজপুর। গণেশের এক কায়স্থ স্ত্রীর গর্ভে জাত কন্যাকে বিবাহ করেন হরিরাম ঘোষ, এবং গণেশ এঁর নাম দেন দিনরাজ। যদু এঁকে পার্বত্যজাতির উপদ্রব রুখতে উত্তর বাংলায় যে বিষয় প্রদান করেন, সেটাই তাঁর নামে দিনরাজপুর বলে আখ্যা পায়, আজকের দিনাজপুর (রজনীকান্ত ৩০৫)।

পাদটীকা

১। bn.wikisource.org/wiki/পাতা:জীবনীকোষ-ভারতীয়_ঐতিহাসিক-তৃতীয়_খণ্ড.pdf/৪০১

bn.wikisource.org/wiki/পাতা:জীবনীকোষ-ভারতীয়_ঐতিহাসিক-তৃতীয়_খণ্ড.pdf/৪০২

২। http://double-dolphin.blogspot.com/2016/06

গ্রন্থপঞ্জী

অনিরুদ্ধ রায় মধ্যযুগের বাংলাঃ আনুমানিক ১২০০-১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দ। কলকাতাঃ প্রগ্রেসিভ পাব্লিশার্স, ২০১৩।

কমল চৌধুরী। বাংলার বারোভুঁইয়া এবং মহারাজ প্রতাপাদিত্য। কলকাতাঃ দে’জ পাবলিশিং, ২০১৬।

কালীপ্রসন্ন বন্দ্যোপাধ্যায়। মধ্যযুগে বাঙ্গলা। কলকাতাঃ দে’জ পাবলিশিং, ২০০২।

দীনেশচন্দ্র সেন। বৃহৎ বঙ্গ ২য় খণ্ড। কলকাতাঃ দে’জ পাবলিশিং, ২০০৬।

নগেন্দ্রনাথ বসু। বঙ্গের জাতীয় ইতিহাস বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ বিবরণ। কলকাতাঃ দে’জ পাবলিশিং, ১৪২০।

পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়। তন্ত্র পরিচয়। কলকাতাঃ সাহিত্য বিহার, ২০০৮।

প্রভাত মুখার্জি। হিস্ট্রি অভ মেডায়েভাল বৈষ্ণবিজম ইন ওড়িসা। কলকাতাঃ প্রবাসী প্রেস, ১৯৪০।

যদুনাথ সরকার। দ্য হিস্ট্রি অভ বেঙ্গল, ভলিউম টু, মুসলিম পিরিয়ড ১২০০-১৭৫৭। দিল্লিঃ বি আর পাব্লিশিং কর্পোরেশন, ২০০৩।

—. যদুনাথ সরকার রচনা সম্ভার। কলকাতাঃ এম সি সরকার, ২০১৫।

যোগেন্দ্রনাথ গুপ্ত। “বিক্রমপুরের ইতিহাস”। কমল চৌধুরী সম্পাদিত বিক্রমপুর রামপালের ইতিহাস। কলকাতাঃ দে’জ, ২০০৪।

রজনীকান্ত চক্রবর্তী। গৌড়ের ইতিহাস ১ম ও ২য় খণ্ড একত্রে। কলকাতাঃ দে’জ পাবলিশিং, ২০০৯।

রমেশচন্দ্র মজুমদার। হিস্ট্রি অভ মেডায়েভাল বেঙ্গল। কলকাতাঃ তুলসী, ১৯৭৩।

রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। বাঙ্গালার ইতিহাস ২য় খণ্ড। কলকাতাঃ দে’জ পাবলিশিং, ১৪০৫।

সুকুমার সেন। প্রবন্ধ সংকলন চতুর্থ খণ্ড। কলকাতাঃ আনন্দ, ২০১৮।

সুখময় মুখোপাধ্যায়। বাংলায় মুসলিম অধিকারের আদিপর্ব। কলকাতাঃ সাহিত্যলোক, ২০১৫।

সুবোধ কুমার মুখোপাধ্যায়। প্রাক্‌-পলাশী বাংলাঃ সামাজিক ও আর্থিক জীবন ১৭০০-১৭৫৭। কলকাতাঃ কে পি বাগচী, ১৯৮২।

লেখক।।

ড. তমাল দাশগুপ্ত

চেয়ারম্যান, সপ্তডিঙা ফাউন্ডেশন। অধ্যাপক, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়।

- Advertisement -

এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

Leave a Reply

প্রতিবেদক

সর্বশেষ সংবাদ

Bengali Bengali English English German German Italian Italian
%d bloggers like this: