মার্কসবাদের ফেরীওয়ালা : বাসদের রাজনীতি (১ম পর্ব)

ভূমিকা: মার্কস ও এঙ্গেলসের হাতে কমিউনিজমের বিজ্ঞানসম্মত ও সুসংবদ্ধ রুপ গড়ে ওঠার সময় থেকে নানাদিক থেকে এর প্রতি আক্রমন এসেছে। ফের্দিন্যান্ড লাসাল, ব্রুনো বাউয়ের, প্রুঁধো, বাকুনিন প্রভূতি ব্যক্তিবর্গ সর্বহারা এক নায়কত্ব ও কমিউনিজমকে অস্বীকার করেছেন। হের ডুরিং কিংবা বার্নস্তাইদের মতো দার্শনিকরা কমিউনিজমের সমস্যা বা সমাজতন্ত্রের সমস্যা খুঁজবার নাম করে যে তত্ত্ব দিয়েছিলেন সেগুলি ছিল খুবই বিভ্রান্তিপূর্ণ ও বৈপ্লবীক রাজনীতিকে গলা টিপে হত্যা করার প্রবণতা সম্পর্ন।

কমিউনিস্ট আন্দোলন গড়ে উঠার সময় থেকে আজ পর্যন্ত কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম শত্রু হলো ছদ্মমার্কসবাদীদের রাজনীতি, তাদের গৃহীত কর্মসূচী ও কৃত কার্যকলাপ। গোটা বিশ্বের মতো বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একথাটি প্রযোজ্য এদেশে সিপিবি, জাসদ, বাসদ, বাসদ (মার্কসবাদী), ওয়ার্কাস পার্টি প্রভুতি বামপন্থী দলগুলোর সংশোধনবাদী অবস্থান ও সুবিধাবাদী প্রবণতা সর্বহারা রাজনীতির বিকাশের পথে অন্যতম অন্তরায়। বাংলাদেশের ছদ্মমার্কসবাদীদের মুখোশ উন্মোচনও বৈপ্লবিক রাজনীতির অংশ বলেই আমরা মনে করি। এই অবস্থান থেকেই মার্কসবাদের আলোকে বাসদের রাজনীতি বিশ্লষণ করার প্রয়াস আমাদের। সময় ও সুযোগে কুলালে অপরাপর ছদ্মমার্কসবাদীদের নিয়েও আমাদের লেখার ইচ্ছে আছে।


আরও পড়ুন


(১)
ক. মার্কসবাদের সমগ্র বক্তব্যকে যদি এক বাক্যে প্রকাশ করা হয় তাহলে বলা যায়, শ্রেনীসংগ্রাম ও সর্বহারার একনায়কত্ব। অবজেকটিভ কন্ডিশনের উপর ভিত্তি করে, সর্বহারা শ্রেনীর লৌহকঠিন দৃঢ়তা ও আপোষহীন শ্রেনীসংগ্রামের মধ্যদিয়ে সমাজতন্ত্র। পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে কায়েম করতে হয় আর অবিকাশিত পুঁজিবাদী সমাজের ক্ষেত্রে পুঁজির বিকাশের ক্ষেত্রে বাধাগুলোকে চিহ্নিত করে একদিকে তার বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয় সাথে সাথে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তোলার অবিরত সংগ্রাম জারি রাখতে হয়। বিশিষ্ট মার্কসবাদী তাত্ত্বিক ও রাজনীতিবিদ রোজা লুক্সেমবার্গের ভাষায় “সমাজতন্ত্রের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আশ্রয় করে আছে পুঁজিবাদী বিকাশের তিনটি প্রধান ফলাফলের উপর। এক, পুঁজিবাদী অর্থনীতির ক্রমবর্ধমান বিশৃঙ্খলা, যা নিশ্চিতভাবেই একে ধ্বংসের দিকে নিয়ে চলে। দুই, উৎপাদন প্রক্রিয়ার ক্রমাগত সামাজিকীকরণ, যা ভবিষ্যৎ সমাজব্যবস্থার ভ্রনের জন্ম দেয়। তিন , সর্বহারা শ্রেনীর বর্ধিত সংগঠন ও সচেতনতা অগ্রগামী বিপ্লবের শক্তির আধার।” একটি মার্কসবাদী সংগঠনের দাবিদার পার্টির মূল কাজ হলো শ্রেনীসংগ্রামকে তীব্র করার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র চরিত্রের আমূল পরিবর্তন ঘটানোর মাধ্যমে সমাজতন্ত্র গড়ে তোলা। একটি বিপ্লবী পার্টির কর্তব্য সম্পর্কে কমরেড লেনিন বলেছেন,” এই মতবাদ (মার্কসবাদ) সমাজের সংস্কার সাধনের পরিকল্পনা প্রনয়ন করে নয়, শ্রমিক শ্রেনীর ভাগ্য (জীবনমান ও অর্থনৈতিক) উন্নয়নের জন্য পুঁজিপতি ও তাদের অনুচরদের প্রতি উপদেশ অনুরোধ জানিয়ে নয়, ষড়যন্ত্র করে নয়, বরং প্রলেতারিয়েতের শ্রেনীসংগ্রামকে সংগঠিত করে এবং শ্রেনী সংগ্রাম পরিচালিত করে, যার চুড়ান্ত লক্ষ্য হলো প্রলেতারিয়েত কর্তৃক রাজনৈতিক ক্ষমতাদখল এবং সমাজতান্ত্রিক সমাজ গড়ে তোলা।”( আমাদের কর্মসুচি)

বাসদের কর্মসূচীর সাথে উপরোক্ত বক্তব্যের তুলনা করলে আমরা স্পষ্টরুপে অনুধাবন করতে পারব যে, বাসদ এখানে শ্রেনী সংগ্রাম তীব্র করার চেয়ে শ্রেনীদ্বন্দ্ব আপোষের মাধ্যমে মীমাংসা করবার দিকেই তুমুলভাবে আগ্রহী এবং সর্বদায় ঝুকে থাকে। তাদের দাবিগুলোর মধ্য অন্যতম বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরে যাওয়া, ডরতালের বিরুদ্ধে হরতালের ডাকদিয়ে শাসকশ্রেনীর এজেন্ডা বাস্তবায়নে তৎপর থাকা, ক্ষমতায় থাকা এবং বাহিরে থাকা লুম্পেন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্য বিরোধ মিটানোর জন্য উক্ত দলগুলোকে আলোচনায় বসার আহবান জানানো, চিকিৎসা না পাওয়া জনগনকে গন আন্দোলনে যুক্ত করে শ্রেনি সংগ্রাম তীব্র করার বদলে কিছু অঞ্চলে চিকিৎসা দিয়ে জনগনকে আপোষকামী ধারায় পরিচালিত করা, খাদ্যহীন মানুষদের নিয়ে যেখানে গন আন্দোলনের মাধ্যমে শ্রেনী সংগ্রাম তীব্র থেকে তীব্রতর করার কথা সেখানে ভুখা মানুষদের কয়েকদিন খাদ্য সহায়তা প্রদান করে বিভিন্ন মহলের বাহবা কুড়ানো ইত্যাদিসহ আরো অনেক বিষয় আছে যেখানে দেখা যায় বাসদ আপোষকামীর সেতুবন্ধন হিসাবে কাজ করে। বাসদের কর্মসূচির দিকে খেয়াল করলে দেখবেন, অধিকাংশই অনুরোধ ও অনুনয়মূলক দাবী দাওয়া। বিদ্যমান রাষ্ট্রের কাছে তাদের চাওয়া হলো, “কৃষিতে ২৫% বরাদ্দ দাও, শিক্ষায় ২৫% বরাদ্দ দাও, জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় চাই, আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি চাই, রেশন চাই, হাটে-বাজারে ক্রয়কেন্দ্র চাই ইত্যাদি ইত্যাদি। ট্রেড ইউনিয়নবাদী অর্থনীতিবাদী কর্মসূচীতে আবদ্ধ থাকা বাসদ এখন পর্যন্ত কোন বৈপ্লবিক কর্মসূচি হাতে নেয় নি। বিভিন্ন ইস্যুভিত্তিক আন্দোলনের বাহিরে পথ হাঁটতে গেলে তাদের পা যেন ভারী হয়ে আসে। তবে তাদের কর্মসূচি বৈপ্লবিক না হলে কি হবে তাদের মুখে যেন খই ফোটে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি: অতীত ও বর্তমান বইয়ে জনাব খালেকুজ্জামান ভুইয়া দাবী করেছিলেন;”২০১১ সালে সমস্ত বুর্জোয়া শক্তি এক কাতারে দাঁড়িয়ে তাদের সামনে যে শক্তিকে দেখবে, সেটা বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল, এটা জেনে রাখুন।” এখন ২০২০ সাল, ঘটনা ও পরিস্থিতি সাক্ষ্য দিচ্ছে, বাসদ একটা অধঃপতিত বাম (ছদ্ম মার্কসবাদী) দল হিসাবে টিকে আছে মাত্র। বাসদের লক্ষ্যই হলো বিদ্যমান রাষ্ট্রের দীর্ঘস্থায়ীত্ব, সংস্কারবাদী চিন্তাভাবনা ছাড়া তাদের চিন্তারাজ্যে যেন আর কোন কিছুরই ঠাঁই নাই।


আরও পড়ুন


খ. কমিউনিস্ট আন্দোলনের মূল ভারকেন্দ্র হলো শ্রমিক শ্রেনীর নেতৃত্বে শ্রেনীসংগ্রাম পরিচালিত হওয়া। বাসদের বেড়ে ওঠা থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত পর্যবেক্ষন করলে দেখা যায়, এই দল আগাগোড়াই পেটি বুর্জোয়া ছাত্রদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা, এর সিংহভাগ নেতৃবৃন্দ ও কর্মী ছাত্রসমাজ থেকে আসা। এমনকি এই দলের সবচেয়ে বড় ও কার্যকর অঙ্গসংগঠন হলো ছাত্রদের সংগঠন-সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট! মজার ব্যাপার হলো শিক্ষা জীবন শেষে এই ছাত্রদের খুব একটা কর্মক্ষেত্রে বা শ্রমিক এলাকায় শ্রমিক আন্দোলন গড়ে তোলা/সংগঠন বিস্তারের কাছে নিয়োজিত থাকতে দেখা যায় না (যদিও তাদের দাবী এই পেটিবুর্জোয়া ছাত্ররাই নাকি শ্রেনীচূত্য হয়ে প্রলেতেরিয়াতে পরিনত হবে)। আর যারাই কিছুটা যুক্ত থাকে তারা মূলত অতিথী বক্তৃতাবাজ নেতৃত্বে পরিণত হয়। নিরেট স্যুট, বুট পরা ভদ্রলোক। তারা শ্রমিকের খাদ্যাভাস, জীবন-যাপন পদ্ধতি, সংস্কৃতি ইত্যাদির ধার না ধেরে শ্রমিকের জীবন পদ্ধতি গ্রহণ না করে, শ্রমিকদের মাঝে অবস্থান না করে অতিথী পাখির মতো এসে আন্দোলন ও সংগঠন গড়ে তোলার ভনিতা করে মাত্র। ফলে সাধারন শ্রমিকদের মাঝে আন্দোলন ও সংগঠন গড়ে তোলার ব্যাপারে (মার্কস ও লেনিনীয়) পদ্ধতির ভুল বার্তা চলে যাচ্ছে এসব নামধারী (ছদ্মমার্কসবাদী) দলের কারণে। এই রাজনৈতিক প্রবন্ধের লেখক ব্যক্তিগতভাবে দীর্ঘদিন ছাত্র ফ্রন্ট ও বাসদের রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন বিধায় এই সম্পর্কে সাম্যক ধারনা ও উপলব্ধি রয়েছে। অথচ একটি লেনিনবাদী পার্টির মূল ভরকেন্দ্র হলো তার শ্রমিক সংগঠন এবং এর মূল কাজ হলো প্রলেতারীয় শ্রেনী সংগ্রাম সংগঠিত করা। অথচ বাসদের শ্রমিক সংগঠন সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্ট হলো অন্যতম দূর্বল সংগঠন এবং সবচেয়ে বেশি পেটি বুর্জোয়া প্রবনতা সম্পূর্ন সংগঠন (এই গনসংগঠনের বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা আছে যারা বুর্জোয়া শ্রমিক সংগঠনেরও নেতা)। এই শ্রমিক সংগঠন মূলতঃ ট্রেড ইউনিয়নবাদী ও অর্থনীতিবাদী সংগঠন। যদিও প্রলেতারীয় শ্রেনী সংগ্রামের মধ্যেই অর্থনীতিবাদী সংগ্রাম অন্তভুক্ত তবে অর্থনীতিবাদী সংগ্রাম হলো প্রলেতারিয়েতদের রাজনৈতিক সংগ্রামকে জোরদার করার উপায়মাত্র। বাসদের নেতৃত্ব অর্থনীতিবাদী সংগ্রামকে এতটায় গুরুত্ব দেন যে, রাজনৈতিক সংগ্রাম পরিচালনার জন্য তাদের নির্ভর করতে হয় পেটি বুর্জোয়া মনোভাবসম্পূর্ন ছাত্র সংগঠনের উপর। এ যেন বিশশতকের প্রথম দশকের রাশিয়ার চিত্র যেখানে মেনশেভিক, মেনশেভিক (আন্তর্জাতিকতাবাদী) প্রভৃতি দল কেবল অর্থনীতিবাদী সংগ্রামকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছে। এই প্রসঙ্গে কমরেড লেনিনের বক্তব্য হলো, “প্রলেতারিয়েতের শ্রেনী সংগ্রামের অন্তর্ভূক্ত রয়েছে অর্থনৈতিক সংগ্রাম। (জনগনের অধিকার ব্যাপকতর করার জন্য, অর্থাৎ গনতন্ত্রের জন্য সরকারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম এবং প্রলেতেরিয়েতের রাজনৈতিক অধিকার ব্যাপকতর করার জন্য সরকারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম)। কতিপয় সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট (এদের মধ্য স্পষ্টতই রাবোচায়ে মিচেল এর পরিচালকরা রয়েছেন) অর্থনৈতিক সংগ্রামকে অপরিমেয়ভাবে অধিকতর গুরুত্ব দেন এবং এতদূর পর্যন্ত যান যে রাজনৈতিক সংগ্রামকে সুদূর ভবিষ্যতের ব্যাপার হিসেবে অবনমিত করেন। এই অবস্থানটা পুরোপুরি ভুল।”

এখন এদের (বাসদ) কার্যক্রম দেখুন, স্মারকলিপি আর মানববন্ধন করা, গুটিকয়েক জায়গায় ছাত্রদের বিনা পয়সায় পড়ানো, কোন অঞ্চলে ফ্রী চিকিৎসা দেওয়া, দু-এক জায়গায় ভুখা মানুষদের খাবার দেওয়া, ত্রান দেওয়া ইত্যাদি! উপজেলা নির্বাহী অফিসার, জেলা প্রশাসক প্রভূতি সরকারী কর্মকর্তাদের কাছে স্মারকলিপি পেশকারী সংগঠন বাসদ ও তার গনসংগঠনগুলো স্পষ্টতই শ্রমিকশ্রেনীর সঠিক মার্কসবাদী চেতনা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অন্যতম অন্তরায় বলে মনে করি, যাদের কাজই হলো সরকারের কাছে দাবী-দাওয়া পেশ করা, কোন রকম রাজনৈতিক সংগ্রামের জন্য শ্রমিক শ্রেনী নির্ভর না হওয়া।
চলবে……………

লেখক।।
মতিউর রহমান মিঠু

সমাজকর্মী

এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

Leave a Reply

লেখক

সর্বশেষ সংবাদ

%d bloggers like this: