মার্কসবাদের ফেরীওয়ালা : বাসদের রাজনীতি (২য় পর্ব)

প্রথম পর্ব এখানে পাবেন……..
দ্বিতীয় পর্ব

ক. একটি মার্কসবাদী বিপ্লবী দলের গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য অঙ্গ হলো তার কেন্দ্রীয় শক্তিশালী মুখপত্র তথা সংবাদপত্র। এই কেন্দ্রীয় সংবাদপত্র শুধু দলের নানারকম পালিত কর্মসূচীরই প্রচার ঘটে না, বরং একই সাথে দলের মতাদর্শ ব্যাপক জনগনের কাছে কৃষক শ্রমিকের কাছে নিয়ে যায়, তাদের রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই অর্থে দলের মুখপত্র সংগঠক হিসাবে কাজ করে। এই প্রসঙ্গে কমরেড লেনিন বলেছেন, “সংবাদপত্রের ভূমিকা কেবলমাত্র মতাদর্শ প্রচার করা, কেবলমাত্র রাজনৈতিক তামিল শিক্ষা দেওয়া এবং রাজনৈতিক মিত্র সংগ্রহ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সংবাদপত্র কেবলমাত্র যৌথ প্রচারক ও যৌথ আন্দোলনকারীই নয়, যৌথ সংগঠকও বটে।”

….যদি তাই হয়, তাহলে দলের মুখপত্র/সংবাদপত্র বিলি করতে হবে ব্যাপক সংখ্যক শ্রমিকের মাঝে-শিল্প শ্রমিক, সংগঠিত ও অসংগঠিত শ্রমিকসহ সকল শ্রমিকদের মাঝে এবং তাদের মিত্র হিসাবে অত্যবিশ্যকীয় ভাবে কৃষক সমাজের মাঝেও। আর শ্রমিকশ্রেনীর তথা প্রলেতারিয়েতের মাধ্যমে ওই পত্রিকা শহরে পেটি বুর্জোয়া এবং গ্রামীন হস্তশিল্পী ও কারিগর, কৃষকদের মাঝে পৌঁছাবে এবং এইভাবে তা হয়ে দাঁড়াবে জনগনের সত্যিকারের রাজনৈতিক পত্রিকা।”(কোথা থেকে শুরু করতে হবে- লেনিন)।

বাসদের কেন্দ্রীয় মুখপত্র- ভ্যানগার্ডের দিকে তাকালে আমরা কি দেখতে পাই, এই পত্রিকা মূলত একটি বুর্জোয়া গনতান্ত্রিক ধারার পত্রিকা। ভ্যানগার্ডে প্রচলিত ব্যবসায়িক পত্রিকার মতোই প্রচলিত অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা হয়, নিজেদের পালিত কর্মসূচীর সংবাদ প্রচার করা হয়। ফলে প্রলেতারিয়েত শ্রেনীর কাছে পত্রিকাটি পৌঁছাতে পারে না, আর পৌঁছালেও তা সংখ্যায় খুব কম। কয়েক দশকের রাজনৈতিক পত্রিকা ভ্যানগার্ডের মুদ্রন সংখ্যা কমবেশি ২০ হাজারের মত এবং বিলির সংখ্যা আরো কম। শুধু তাই নয়, এই পত্রিকা জন্মলগ্ন থেকে কখনোই শ্রমিকদের মাঝে ব্যাপকভাবে বিলি করা হয়নি। বরং শহুরে চাকুরীজীবী, ব্যবসায়ী, ডাক্তার, শিক্ষক, আইনজীবী, বিভিন্ন অফিসের সরকারী আমলারাই যেন এই পত্রিকার মূল লক্ষ্য, যারা কেবলমাত্র বিপ্লবের কিংবা আন্দোলনের সহায়ক শক্তি হতে পারে নির্ধারক শক্তি নয়। এমনকি ভ্যানগার্ড ছাপানোর সিংহভাগ খরচও আসে চাকুরূজীবী ও পেশাজীবীদের কাছ থেকে, শ্রমিকদের কাছ থেকে নয়। এমনকি ভ্যানগার্ডে অপরাপর বামদলগুলোর কর্মসূচী ও তত্ত্ব নিয়েও কোন সমালোচনা করে না। ভ্যানগার্ড মূলত বিষদাঁতহীন পার্টি মুখপত্র যার প্রচার কেবল মধ্য শ্রেনীর মাঝেই সীমাবদ্ধ। এর ভেতরের বক্তব্যগুলোও নিষ্ফল, অসাড় ও অকার্যকর।

খ. আগের পর্বে, বাসদ যে একটি সংশোধনবাদী দল এ সম্পর্কে কিছুটা ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল। এখন এই সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনায় যাব। প্রলেতারিয়েত কর্তৃক রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের প্রশ্নে বাসদের অবস্থান ও কর্মসূচী বিপ্লবী পরিবর্তনের অনুকূলে নয় বরং প্রতিকূলে। এই দলের অন্যতম কাজ নিপীড়ত শ্রেনীর অর্থনৈকি উন্নয়নের জন্য রাষ্ট্রের কাছে ধর্ণা দেওয়া, দাবী-দাওয়া জানানো, মুজুরি বৃদ্ধির আন্দোলন, শ্রমঘন্টা কমানো আন্দোলন, প্রভূতি আন্দোলনে শুধু যে তাদের সামনের সারিতে দেখতে পাওয়া যায় তাই না, বরং এটিই তাদের রাজনৈতিক লাইন। বাসদ জন্মলগ্ন থেকে বিপ্লবের স্তর সমাজতান্ত্রিক বলে দাবি করলেও প্রলেতারিয়েত কর্তৃক কারখানার মালিকানা অর্জনের আন্দোলন, রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের আন্দোলনের ডাক কখনোই দেয় নি।

তারা মূলত শ্রম ও পুঁজির মধ্যে সংগ্রামকে প্রাধান্য দেয় না, বরং আপোষের মাধ্যমে মীমাংসা করার দিকেই তাদের ঝোঁক বেশী। এমনকি বাসদ নিজেই কখনো কখনো সমাজ সংস্কারের কার্যক্রম শুরু করে যেখানে অর্থায়ন আসে মূলত পেটিবুর্জোয়া, চাকুরীজীবী ও পেশাজীবীদের কাছ থেকে। তাত্ত্বিকভাবে বাসদের যে সংশোধনবাদী অবস্থান তা আমরা প্রকাশ করতে পারি রোজা লুক্সেমবার্গের ভাষায়, “… সংশোধনবাদী তত্ত্ব দুটি মেরুর মাঝামাঝি জায়গায় অবস্থান করে। পুঁজিবাদের অন্তদ্বন্দ্ব পরিপক্ক হয়ে উঠুক সংশোধনবাদ সেটা দেখতে চায় না। বিপ্লবী পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এই দ্বন্দ্বগুলির অবসান হোক তাও তারা প্রস্তাব করে না। তাঁরা পুঁজিবাদী অন্তদ্বন্দ্বকে কিছুটা কমাতে, কিছুটা শান্ত করতে চায়।”

আমরা খেয়াল করলে দেখতে পাব যে, বাসদ, অবশ্য শুধু বাসদ নয় বরং অপরাপর ছদ্মমার্কসবাদী দলগুলোও, প্রায়শই জনগনের রেষকে শৃঙ্খলিত রুপ দান না করে বরং প্রশমিত করে। অনেক সময় সরকারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ডাক দেবার পরিবর্তে তারা রাষ্ট্রের অন্তরীন বিরোধ সংকট মেটানোর জন্য সামন্তীয় ও বুর্জোয়া প্রবনতা সম্পূর্ন দলগুলোকে আন্তরিক আপোষের তাগিদ দেয়। আমরা এখনো বিস্মৃত হই নি, ২০১৪ এর নির্বাচনের পূর্বে বুর্জোয়া প্রবনতা সম্পূর্ন দলগুলিকে সংকট নিরসনের জন্য বাসদ নেতৃবৃন্দ অনুরোধ জানান। এছাড়া বিভিন্ন ধরনের সংস্কারমূলক কাজ করে যা মূলত; বিপ্লবী পথকে নির্দেশ না করে সংস্কারবাদী ও সংশোধনবাদী পথকেই নির্দেশ করে।

চলবে…….

লেখক।।
মতিউর রহমান মিঠু

সমাজকর্মী

এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

Leave a Reply

লেখক

সর্বশেষ সংবাদ

%d bloggers like this: