মুসলিম স্থাপত্য শিল্পের ঐতিহ্যের ধারক শেরপুরের খেরুয়া মসজিদ

মোঃ তোফাজ্জল হোসেন, স্টাফ রিপোর্টার।।

বগুড়া শেরপুর উপজেলার অদূরে মুসলিম স্থাপত্যে শিল্পের ঐতিহ্যের নিদর্শন, ধারক ও কালের সাক্ষী শাহ বন্দেগি ইউনিয়নের খন্দকার টোলার এ ঐতিহাসিক খেরুয়া মসজিদটি অবস্থিত। সুপ্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী এ অপরূপ সৌন্দর্য মন্ডিত মসজিদটি আজও প্রায় চারশত বছর পেরিয়ে ইতিহাস ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতিকে ধারণ করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। খেরুয়া মসজিদের সুনিপুন নির্মান শৈলী আজও মানুষের হৃদয়কে আকর্ষণ করে। উত্তরবঙ্গের প্রবেশ দ্বার শেরপুর উপজেলা শহরের অতি নিকটে মাত্র এক কিলোমিটার দক্ষিন পশ্চিমে খন্দকার টোলায় এ প্রাচীন মসজিদটি অবস্থান। অপূর্ব নির্মান শৈলী সম্বলিত খেরুয়া মসজিদ আজও ধর্মপ্রাণ মুসলিম সহ সমগ্র বিশ্বের ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সর্বস্তরের অসংখ্য দর্শনার্থীদের হৃদয়কে আলোড়িত করে।

মসজিদের সামনের দেওয়ালে স্থাপিত ফার্সি শিলালিপি থেকে প্রাপ্ত তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে লেখক,সাংবাদিক, ইতিহাসবিদ প্রায়াত অধ্যক্ষ , মরহুম মুহাম্মদ রোস্তম আলীর ‘শেরপুরের ইতিহাস’ নামক গ্রন্থ থেকে জানা যায়, জওহর আলী কাকশালের পুত্র মির্জা নবাব মুরাদ খাঁনের পৃষ্ঠপোষকতায় আব্দুস সামাদ ফকির ৯৮৯ হিজরীর ২৬জিলকদ (১৫৮২খ্রিঃ) সোমবার মসজিদটির ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন। উত্তর দক্ষিনে লম্বা মসজিদের বাহিরের মাপ দৈর্ঘ্য ৫৭ ফুট এবং প্রস্থ সাড়ে ২৪ ফুট। ভিতরের মাপের দৈর্ঘ্য ৪৫ ফুট ও প্রস্থ সাড়ে ১২ফুট। চারিদিকের দেয়ালগুলো প্রায় ৬ ফুট পুরু। মসজিদের চারকোনের ৪টি মিনার ও পূর্ব দেয়ালে ৩টি দরজা রয়েছে। তিন গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদের মাঝের দরজাটি অন্য দুটি থেকে আকারে অনেক বড় সে কারণে মাঝখানের দরজা দিয়ে মুসল্লিদের যাতায়াত করতে হয়।বর্তমানে মসজিদের মুসল্লির সংখ্যা বেশি হওয়ায় একটি মাত্র দরজা দিয়ে যাতায়াত করতে কষ্ট হয় তাই বাকি দরজা গুলি খুলে দেওয়ার দাবি জানান। আয়তকার ফ্রেমের মধ্যে অর্ধ্গোলাকার মেহরাব স্থাপিত। মসজিদের কার্ণিস বাকানো। দেয়ালে কিছু পোড়া মাটির ফলক চিত্রও ছিল। দেয়ালগুলো সাদা-সিধে ধরনের বলা যায়।

জানা যায়, ইট ও চুন সুড়কি ছাড়াও খেরুয়া মসজিদের নির্মানে বৃহদাকার কৃষ্ণ পাথর ব্যবহার করা হয়েছে। মসজিদের গায়ে দুটি মূল্যবান শিলালিপি ছিল, যার একটি ভিতরে রক্ষিত ছিল। আর একটি বর্তমানে পাকিস্তানের করাচি জাদুঘরে রয়েছে।

সম্রাট আকবরের আমলে মসজিদটি নির্মিত হওয়ায় এর গায়ে বিভিন্ন জায়গায় ব্যতিক্রমী অনেক চিহ্ন পাওয়া গেছে। স্থাপত্য বিশারদদের মতে খেরুয়া মসজিদে সুলতানী ও মোঘল আমলের মধ্যবর্তী স্থাপত্য নিদর্শণ প্রকাশ পেয়েছে। এতে বার কোনা ও আট কোনা কলাম ব্যবহার হয়েছে। যাহা বাংলা স্থাপত্য শিল্পে আজো বিরল।

খেরুয়া মসজিদের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সাইট পরিচালক মোঃ আব্দুস ছামাদ প্রামানিক বলেন এ মসজিদে একসাথে ৩ কাতারে ৯০ জন মানুষ নামাজ আদায় করতে পারেন। স্থানীয় লোকজন ছাড়াও দূর দূরান্ত থেকে এমনকি আফগানিস্তান, পাকিস্তান এবং মিশর সৌদি আরব সহ সমগ্র পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে মসজিদ পরিদর্শনে আসা দর্শনার্থীরাও এ মসজিদে নামাজ পড়েন।করোনার কারনে আর তেমন দেখা যায় না। তবে আসর ও মাগরিব ওয়াক্তের নামাজে দর্শনার্থীদের সংখ্যা বেশি থাকে।বর্তমানে মুসল্লিদের সংখ্যা আরো বেশি বৃদ্ধি পাওয়ায় মসজিদের বাহিরেও অতিরিক্ত কাতার করে নামাজ পড়তে হয়। ফলে বর্ষাকালে একদিকে যেমন নামাজ আদায়ের সময় বৃষ্টিতে গা ভিজেছে যায় অন্যদিকে প্রখর রোদে নামাজ পড়তে কষ্ট হয়। তাই মূল মসজিদের পূর্ব পাশে নতুন অবকাঠামো নির্মাণের দাবি জানান তারা। প্রতি বছর এখানে দুই ঈদের নামাজ ও আদায় করা হয়। মসজিদের মাঠে ঈদের নামাজে প্রায় দুই হাজার মানুষ জামাতে নামাজ আদায় করেন। মসজিদটিতে ঈমামতি করছেন হাফেজ মাওলানা মোঃ আব্দুল হামিদ। তিনি প্রায় ৪ বছর ধরে এ মসজিদে মুসল্লীদের নিয়মিত নামাজ পড়ান। এছাড়াও ৩ বছর ধরে মুয়াজ্জিনের দায়িত্ব পালন করছেন জোয়ের আহমদ।

এ মসজিদটি দীর্ঘ সময় অবহেলায় পড়ে ছিল। তবে ৯০’র দশকে প্রত্নতত্ব ও জাদুঘর অধিদপ্তর মসজিদটির সংস্কার করার ফলে মসজিদের নামাজ পড়ার উপযোগী পরিবেশ ফিরে এনেছেন। বর্তমানে নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ও জুমার নামাজ আদায় করা হয়। প্রত্নতত্ব ও জাদুঘর অধিদপ্তর ১৯৮৮ সাল থেকে মসজিদ সহ ৪৮ শতাংশ জায়গা দেখাশোনার জন্য একজন খাদেম নিয়োগ করেছেন। দেশ বিদেশের অসংখ্য দশনার্থী ও স্থাপত্য বিশারদ এই মসজিদ পরিদর্শন করেছেন।

খন্দকার টোলার অধিবাসী মোহাম্মদ হায়দার আলী খন্দকার বলেন, মসজিদের আশপাশে ড্রেনেজ সিস্টেম না থাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। চলমান এই বর্ষাকালে জলাবদ্ধতার দূষিত ও নোংরা পানি একদিকে রাস্তার ক্ষতি করছে অপরদিকে মসজিদের আঙ্গিনা পর্যন্ত পানি এসে দুর্গন্ধ ও বিভিন্ন রোগের সৃষ্টি করে। তাই এই মসজিদটিতে সহজভাবে যাতায়াত করার জন্য খন্দকার টোলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে মসজিদের দক্ষিণ পূর্ব পাশ দিয়ে উত্তর দিকে পাকা রাস্তা পর্যন্ত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা এবং অর্ধ কিলোমিটার রাস্তা মেরামতের দ্রত দাবি জানান এলাকাবাসী।

বাংলাদেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে আপনারা এ মসজিদটি দেখতে হলে বগুড়া শহরে যেতে হবে না। শেরপুর উপজেলা শহরের স্থানীয় বাস স্ট্যান্ড অথবা ধুনট মোড়ে নেমে যে কোনো সি এন জি বা অটো রিক্সাকে বললেই নিয়ে যাবে ভাড়া পড়বে মাত্র ২০/২৫ টাকা। তবে ধনুট রোডের মোড় এমনকি স্থানীয় বাস স্ট্যান্ড থেকে ও টোলার গেট হয়ে খেরুয়া মসজিদে পোঁছতে মাত্র ১ কি.মি রাস্তা পায়ে হেঁটে ও যাওয়া যায়।

শেরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ময়নুল ইসলাম বলেন, ‘আমি যেহেতু খেরুয়া মসজিদ যাই নাই। না দেখে তো কিছু বলতে পারছিনা। যাওয়ার পরে দেখে এ মসজিদ টির প্রয়োজনীয় সংস্কার, মনোরম পরিবেশ, দৃষ্টিনন্দন, মনমুগ্ধকর ও চিত্তাকর্ষক করে গড়ে তোলার জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করব’।

এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

Leave a Reply

প্রতিবেদক

সর্বশেষ সংবাদ

Bengali Bengali English English German German Italian Italian