নবীনের বেশির ভাগ সময় কাটে মাটির কোলে। মায়ের কোলের অভাবটা পূরন করে, মাটির উষ্ণ, শীতল পরশে। সে পরশে কখনো কখনো নাকের জলে, বুকের শনশনানি শব্দে ধন্যবাদ জানায়। তার হয়তো সেদিনের কথা মনে নেয়। কিন্তু তার দাদির সাথে প্রায়ই সে অতীতে ভ্রমন করে। তার বাবার বিয়ের স্মৃতি। তার আগমনের রুপকথা।

আজকালকের দিনে বিয়ে শব্দটির সাথে যৌতুক শব্দটির ব্যাপক প্রচলন। বিয়েতে যেমন বর-কনের একান্ত প্রয়োজন। তেমনি বিয়েতে যৌতুকের একান্ত প্রয়োজন। এটা সমাজের সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। শিক্ষিত-অশিক্ষিত, ধনী-দরিদ্র সকলেই এটাকে তাদের মৌলিক অধিকার মনে করে। যদিও ধনীদের সমাজে এর ভিন্ন নাম রয়েছে। এটি ছাড়া বিয়ে ? মানে তো মৌলিক অধিকার ক্ষুন্ন। আর আমাদের দেশের সকলেই মৌলিক অধিকার রক্ষায় দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। যদিও অন্যসব মৌলিক অধিকার নিয়ে তাদের কোনো মাথা ব্যাথা নেই। কে বলে, তারা অঙ্কে কাঁচা। বছর, বছর এত ছেলে অঙ্কে ফেল করে। কোথায়? তারা তো কোমড় বাধিয়া দর কষাতে বেশ পটু। কেউ ঠকবার পাত্র নয়। যতদূর সম্ভব এ বিষয়ে লাভবান হওয়া চাই।


আরও পড়ুন>>


সেদিন ঘটনা ঘটার অপেক্ষায় মকবুল হোসেনের বাড়িতে। মকবুল হোসেনের একমাত্র ছেলে হাসিবুল। অবস্থাটাও অনেক ভালো তাদের। অনেক জমি-জমা। বড় গৃহস্থ। তার বিবাহের জন্য পাত্রীর সন্ধান চলছে। কিন্তু সে সন্ধান দরাদরিতে মিলছে না। তাদেরই পাশ্ববর্তী গ্রামের বাসিন্দা বদর উদ্দিন। তারও একটি মাত্র কন্যা, সীমা। দেখতে ভারী সুন্দর। বদরের সাংসারিক অবস্থা মোটামুটি সচ্ছল। তবে সেটাকে উচ্চভীলাষি বলা চলে না। কিন্তু সৃষ্টিকর্তা যাকে কন্যা সন্তানের বাবা করেছেন, তার মাথায় দুশ্চিন্তা নামক একটা বোঝাও চাপিয়ে দিয়েছেন। ক্রমশ তা ভারি হয়। এখন মেয়ের বিয়ের অনেক সম্বন্ধ আসছে। ঘটক রথে মকবুলও সস্বন্ধের ডালা পাঠায়। হাসিবের সীমাকে খুব পছন্দ। অবশ্য যৌবনে ছেলে মাত্রই মেয়ের ছায়া দেখলেই ভালো লাগে। কেননা সেকালে মেয়ে তৃষ্ণা প্রবল হয়। হাসিবের পছন্দ হওয়াই সবাই রাজি হয়। শুধু দর কষাকষিটা অসম্পন রইল।

মকবুলের চাহিদা খুবই সামান্য। মাত্র দুই লক্ষ টাকা। সাথে মেয়ের জন্য হালকা গহনা। যদিও মকবুলের কাছে সামান্য চাওয়া, কিন্তু বদরের কাছে তা দুিশ্চন্তার নাম। উপায় কি আর? মেয়ের বাবা যখন হয়েছে, তখন তো সৎ পাত্রে কন্যাদান করতেই হবে। তাই বদর এত সুন্দর সম্বন্ধটা ছাড়তে রাজি হল না। কষ্ট হোক তবুও সে রাজি হয়ে গেল। কিন্তু সমস্যার শেষ নেই। মকবুলের দাবি, তার একমাত্র ছেলের বিয়েটা বেশ ধুমধাম আয়োজনে করেই হওয়া চায়। এতক্ষনে বোঁঝাটা এত ভারি হল যে তা আর বেশিক্ষণ ধরে রাখা কঠিন। কি আর করার বোঝাটাতো নামানো দরকার। তিনি রাজি হলেন। চুক্তি হলো এক লক্ষ টাকা বিয়ের দিন নগদ। আর বাকি এক লক্ষ টাকা ও গহনা বিয়ের এক বছর পরে।


আরও পড়ুন>>


বিয়ের সম্বন্ধ পাকা হলো। রীতিমতো বদর জমি বিক্রি করে টাকা জোগাড় করলো। অবশিষ্ট রইল শুধু ভিটেটা। বিয়েটাও হলো বেশ ধুমধামে। আকাঙ্কার ঘাটতি রইলো না আয়োজনে। বিশাল অঙ্কের অর্থ আনায়, মেয়েটাও বেশ লক্ষীর আসনে পূজা হতো লাগলো শশুড় বাড়িতে। সময় গড়াল আপন হাওয়াই। দিনের পর দিন পার হলো। দেখতে দেখতে বছরটাও গেল। এদিকে সময়ের পাখায় ভর করে মকবুলের ঘরে নাতিও এলো। সবাই খুশি। শুধু হাসিব সে খুশির গন্ধটা পেল না। সে খুব চিন্তামগ্ন। সে চিন্তা ছেলে হওয়ার জন্য নয়। বরং চিন্তার কারন, তার বিদেশ যাওয়া একান্ত জরুরি। কেননা আজকাল দেশে আয় করে বড় সংসার চালানো দুঃসাধ্য। কারো কথা মাথায় না নিয়ে জমি-জমা বিক্রি করলো। বাকি টাকা পূর্ণ করলো ধার করে। পাসপোর্ট বানালো। রীতিমতো টাকাও জমা দিল। অতি স্বল্প সময়ে মালেশিয়াতেও গেল। কিন্তু মাস দু-তিন না গড়াতেই দেশে ফিরল সর্বস্ব হারিয়ে। তাকে ভ্রমন ভিসায় জাল ভাবে পাঠানো হয়েছিল। বাধভাঙ্গা স্রােতে দিশেহারা হয়ে মাতাল হয়ে পরলো হাসিব।


আরও পড়ুন>>


দেনাদারদের সকাল-বিকাল হাজিরা তার কাছে যন্ত্রনারকর মনে হতে লাগলো। তাই এবার শশুড় বাড়ির টাকাটার জন্য তাড়া দিতে আরম্ভ করলো। বউকে বাপের বাড়ি পাঠালো টাকা আনার জন্য। কিন্তু বদরের আরো কিছু সময় চাই। এদিকে বাড়ির সবাই বলা শুরু করলো হাসিবকে ঠকানো হচ্ছে। টাকা না দেওয়ার পায়তারা চলছে। কাঁটা গায়ে একেবারে লবনের ছেটার মতোই কাজ করলো। সেদিন সকালে সীমার সাথে হাসিবের প্রচন্ড ঝগড়া হলো। বউকে বেধরক মার দিল। বীররা শক্তি প্রমান করে রণক্ষেত্রে, আর পুরুষরা শক্তি প্রমান করে বউদের কাছে।
রাতের বেলাও ঝগড়ার মিমাংসা হলো না। হাসিব আবারও সীমাকে মারে।

এবার সীমা প্রতিবাদ করলে হাসিব আরও রেগে যায়। তর্কের এক পর্যায় রেগে হাসিব লাঠি দিয়ে সীমার মাথায় আঘাত করে। সীমা মাটিতে ধরাশায় হয়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সীমার প্রাণপাখিটা সবাইকে ফাকি দিয়ে উড়ে যায় অচিন রাজ্যে। অত্যাচার এ জগতে সবাই করতে জানলেও, খুব অল্প কয়েকজনই পারে তা সহ্য করতে। সীমা তার বাবার মাথার বোঝাটাকে অনেকটা বছর ধরে ভার করে ছিল। তাই আর বোঝাটাকে ভার করে, তার বাবাকে কষ্ট দিতে চাইলো না। নিজেই এবার কষ্টের বোঝাটা নিয়ে চলে গেলো ওপারে।


আরও পড়ুন>>


সকালে পুলিশ আসে। চারিদিকে কান্নার সুর ছুড়িয়ে পড়ে। সীমার ছোট্ট ছেলেটাও কিছু না বুঝেই সে মিছিলে যোগ দেয়। পুলিশ লাশ নিয়ে যায় ময়নাতদন্তের জন্য। সঙ্গে হাসিবকেও কোমড়ে রশি বেধে নিয়ে যায়। কালের ছন্দে সীমার স্থান অচিনপুরে হলেও, হাসিবের জায়গা হয় লাল ঘরের চার দেয়ালের কালো ছায়াই। তার যাবৎ জীবন সাজা হয়েছে। আর ছেলেটার স্থান হয় বৃদ্ধা দাদির আচলে। সে আচলে আদরের পরিমান বৃদ্ধ শরীরের ন্যায় নরবড়ে। তাই নবীন নিজ রাজ্যে আপন সিংহাসন খোঁজে। কখনো রুপকথার রাজকুমার হয়ে মাকে পাতালপুরে উদ্ধারের জন্য অলৌকিক শক্তি খুঁজে, রুপকথার জাল বুনে। কিন্তু চাদের বুড়ির সে সুতা হালকা বাতাসে উড়ে যায়। যার শেষ পূর্ণতা হয় না।

এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

Leave a Reply

লেখক

সর্বশেষ সংবাদ

সখীপুরে বহেড়াতৈল ইউনিয়ন মহিলা আওয়ামীলীগ ও যুব মহিলা লীগের সম্মেলন

সখীপুর প্রতিনিধি।। টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলার বহেড়াতৈল ইউনিয়ন মহিলা আওয়ামীলীগ ও যুব মহিলা আওয়ামীলীগের সম্মেলন আজ সোমবার অনুষ্ঠিত হয়েছে। মহিলা আওয়ামীলীগের উদ্ধোধন ঘোষণা করেন সখীপুর উপজেলা...

মোংলায় কবি হিমেল বরকত স্মরণে নাগরিক শোকসভা আগামী শুক্রবার

কবি, গবেষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক, রুদ্র অনুজ ড. হিমেল বরকতের অকাল প্রয়াণে আগামী ৪ ডিসেম্বর শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৩টায় মোংলার সেন্ট পলস...

৯৯৯-এ ফোন পেয়ে নির্যাতিতা গৃহকর্মী শিশুকে উদ্ধার করলো পুলিশ

মাফি মহিউদ্দিন, কিশোরগঞ্জ (নীলফামারী) প্রতিনিধি।। ৯৯৯-এ ফোন পেয়ে নিযার্তনের শিকার গুরুতর জখম এগারো বছরের এক শিশু গৃহকর্মীকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। সোমবার বিকালে নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার...

বীরগঞ্জে নিরাপদ প্রসূতি কেন্দ্রের উদ্বোধন

৩০ই নভেম্বর ২০২০ ইং তারিখে সকাল ১১:৪৫ টায় জনাব এম.মাঈনউদ্দিন মাইনুল কান্ট্রি ডিরেক্টর, গুড নেইবারস বাংলাদেশ কর্তৃক কোইকা-জিএনবিসি এইচ ডব্লিউ প্রকল্প, গুড নেইবারস বাংলাদেশ...
%d bloggers like this: