রাজবাড়ী জেলা আ’লীগ কমিটিতে নবীনদের পদধ্বনি

অর্ধযুগের বেশি সময় ধরে স্থানীয় নেতাদের সাথে নানা প্রকার দ্বন্দে লিপ্ত রাজবাড়ী জেলা আওয়ামী লীগ। এর জন্য সমালোচনার মুখেও পড়তে হয়েছে একাধিকবার। জেলায় বর্তমানে দলটির দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা বিষয়টি নিয়ে নেননি কোনো প্রকার কার্যকর উদ্যোগ। যে কারণে নানাবিধ সমস্যা থাকলেও হয়নি সমস্যার সমাধান। বিষয়টি গড়িয়েছে আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায় পর্যন্ত।

বিভিন্ন বাধা আর কমিটির সম্মেলন নিয়ে একের পর এক তারিখ দেওয়া হলেও তা নানা কারণে কার্যকর হয়ে ওঠেনি এতো দিনে। অবশেষে আগামী ১৬ অক্টোবর হচ্ছে জেলা আওয়ামী লীগের নতুন কমিটির সম্মেলন এমন তথ্যই নিশ্চিত করেছেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম। এখন এই কমিটির জটিলতা নিরসনে একাধিক বিকল্প চিন্তাভাবনা নিয়ে এগোচ্ছে ক্ষমতাসীন দলটি। কাটছাঁট করে পূর্ণাঙ্গ কমিটির বিষয়ে স্থানীয় নেতাদের একমত করার চেষ্টা করছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা। তা না হলে শীর্ষ পদে পরিবর্তন আনা বা বর্তমান কমিটির পরিবর্তে নতুন করে আহ্বায়ক কমিটি গঠনের চিন্তাভাবনাও করা হচ্ছে। আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা অনুযায়ী এ বিষয়ে কাজ করছে কেন্দ্রীয় কমিটি।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম বলেন, রাজবাড়ী জেলা আওয়ামী লীগের কমিটি দীর্ঘদিন ধরে নানা প্রকার দ্বন্দে লিপ্ত। যে দ্বন্দের প্রভাব গিয়ে পড়েছে উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড কমিটি পর্যন্ত। এটার একটা সমাধান আমরা দ্রুত করে ফেলব। আগামী ১৬ অক্টোবর রাজবাড়ী জেলা আওয়ামী লীগের কাউন্সিল হবে। তিনি আরও বলেন, শুধু রাজবাড়ী নয় যেসব জেলাতে নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব বা ভুল বোঝাবুঝি ছিল তা দূর করতে আমরা ইতোমধ্যে বিভিন্ন জেলার নেতাদের নিয়ে বসেছি। আমরা আশা করছি অক্টোবরের মধ্যে এই সমস্যাগুলোর সমাধান করে ফেলতে পারব। নবীন, প্রবীণ এবং ত্যাগী নেতাদের নেতৃত্ব দিয়ে সকল দ্বন্দের অবসান ঘুচিয়ে সাজানো হবে আওয়ামী লীগের কমিটি গুলো। এরপরও যদি কেউ নিজেদের মধ্যে কিংবা দলের মধ্যে দ্বন্দ ও সমস্যা সৃষ্টির চেষ্টা করে তবে তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেবে কেন্দ্রীয় কমিটি।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার ২১ সেপ্টেম্বর রাজবাড়ী শিল্পকলা ভবনে আওয়ামী লীগের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা, উপজেলা ও জেলা কমিটির নেতাদের উপস্থিতিতে জেলা কমিটির বর্ধিত সভা অনুষ্ঠিত হবে। কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে রয়েছে আওয়ামী লীগের যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক ও শিক্ষা মন্ত্রী ডা. দীপু মনি এমপি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম এমপি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি মণ্ডলীর সদস্য লে. কর্ণেল (অবঃ) ফারুক খান এমপি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি মণ্ডলীর সদস্য ও কৃষি মন্ত্রী ড. মোঃ আব্দুর রাজ্জাক এমপি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সানজিদা খানম।

আওয়ামী লীগের একটি সূত্র থেকে জানা যায়, রাজবাড়ী জেলা আওয়ামী লীগের নতুন কমিটিতে কাটছাঁট করে ত্যাগী নেতাদের নিয়ে নতুন কমিটি তৈরির কাজ করছে দলের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা। কিন্তু এরই মধ্যে রাজবাড়ীতে আওয়ামী লীগের প্রধান দু-গ্রুপের স্থানীয় বিরোধ আরও জটিল হয়ে উঠছে।

২০১৫ সালে রাজবাড়ী জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে রাজবাড়ী ২ আসনের সংসদ সদস্য জিল্লুল হাকিমকে সভাপতি ও রাজবাড়ী ১ আসনের সংসদ সদস্য কাজী কেরামত আলীকে সাধারণ সম্পাদক ঘোষণা করে করা হয় জেলা আওয়ামী লীগের কমিটি। পরবর্তীতে নানা নাটকীয় ঘটনার মধ্য দিয়ে সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে অব্যাহতি নেন কাজী কেরামত আলী। পরে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক করা হয় তার ছোট ভাই কাজী ইরাদত আলীকে। এরপর থেকেই জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে দীর্ঘদিন দলের সাথে সংযুক্ত, পরিশ্রমী আর ত্যাগী নেতাদের বাদ দিয়ে শুরু হয় পদ বাণিজ্য। যেখান থেকে ক্রমান্বয়ে সৃষ্টি হতে থাকে নানাবিধ সমস্যা আর দ্বন্দের। আওয়ামী লীগের মূল দল থেকে জেলায় তৈরি হয় তিনটি গ্রুপ। এব্যাপারে স্থানীয় নেতারা দায়ী করছে জেলা আওয়ামী লীগের পদে থাকা প্রধান দুই নেতাকে।

গত ইউনিয়ন, উপজেলা ও পৌরসভা নির্বাচনে জেলার পাংশা, কালুখালি ও বালিয়াকান্দি উপজেলায় আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়নের বিপরীতে বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার অভিযোগ রয়েছে ছাত্রলীগ, যুবলীগ সহ জেলা আওয়ামী লীগের বর্তমান সভাপতি ও রাজবাড়ী ২ আসনের সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে। ঠিক তেমনি গত পৌরসভা নির্বাচনে রাজবাড়ী সদরে দলীয় মনোনয়ন প্রাপ্ত প্রার্থীর বিপরীতে গিয়ে বিদ্রোহী প্রার্থীর হয়ে কাজ করার অভিযোগ রয়েছে জেলা আওয়ামী লীগের পদে থাকা বেশ কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে।

জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জিল্লুল হাকিম ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক কাজী ইরাদত আলী দলের নেতাকর্মীদের সাথে সমন্বয় না করে দ্বন্দ সৃষ্টি করছে। দিচ্ছে না উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে কাউন্সিল। ত্যাগী নেতাকর্মীদের বাদ দিয়ে হাইব্রিড নেতাদের দিয়ে পকেট কমিটি করে একতরফা কার্যক্রম চালাচ্ছে। এই মর্মে গত ১২ ডিসেম্বর ২০২০ তারিখে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের পদের অব্যবহিত প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি বরাবর একটি লিখিত দরখাস্ত দেন রাজবাড়ী ১ আসনের সংসদ সদস্য কাজী কেরামত আলী এবং জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আকবর আলী মর্জি।

এছাড়াও এই কমিটি নিয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রে বিস্তর অভিযোগ জমা পড়ে। পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে জেলা আওয়ামী লীগের দ্বন্দ্ব ধীরে ধীরে প্রকাশ্যে আসে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজবাড়ী জেলা আওয়ামী লীগ বর্তমানে মূলত তিন ভাগে বিভক্ত। আলাদা আলাদাভাবে হয় দুই গ্রুপের বিভিন্ন আয়োজন। আরেক গ্রুপ থাকে নিশ্চুপ। তিন গ্রুপের নেতারাই নিয়মিত আওয়ামী লীগের শীর্ষ কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন।

স্থানীয় পর্যায়ের নেতা, দলের কর্মী এবং সাধারণ মানুষের মতো সমর্থন কারীদের কাছে আগামী সম্মেলনে প্রার্থী সমর্থনের বিষয়ে জানতে চাইলে তারা বলেন, আমরা জেলা আওয়ামী লীগের কমিটির প্রধান দুই পদে নবীন নেতৃত্বে আশাবাদী। যারা দ্বন্দ কিংবা নিজেদের স্বার্থ না জনগণের স্বার্থে দলের স্বার্থে কাজ করবে। এখন যেমন আওয়ামী লীগের গ্রুপে গ্রুপে সংঘর্ষ হানাহানি হয়, আওয়ামী লীগের নেতাদের মদদে আওয়ামী লীগ নেতা খুন হয় এটা যেন আর না হয়।

এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

Leave a Reply

প্রতিবেদক

সর্বশেষ সংবাদ