শক্তির ওপিঠে

বারিগঞ্জ গ্রাম। গ্রামজুড়ে রণক্ষেত্রে পরিনত হয়েছে। গ্রামের সেরা পরিবারগুলো হচ্ছে আর্ফিন পরিবার, মৈনিক পরিবার, নাশিয়া পরিবার। গ্রামের প্রতিটি সেরা পরিবারের সেই যুদ্ধে জয়ের জন্য কতো প্রচেষ্টা, কতো আয়োজন। মানুষ যে সৃষ্টির সেরা জীব তা প্রমানে বড় তোড়জোড়। কীভাবে সৃষ্টির সেরা হওয়া যায় তা নিয়ে যতো গবেষনা। কীভাবে এক বোতামের টিপে একটা পরিবারকে ইতিহাসের পাতায় কালির সমাধিতে সমাহিত করা যায়, তা নিয়ে চরম প্রতিযোগিতা। কোন পরিবার পিঁছিয়ে পড়ার মতো নয়।

আর যারা অসহায়, দূর্বল, প্রতিযোগিতায় অক্ষম। তারাও শক্তির সাথে দ্রবন তৈরি করে। কেননা সবাই দ্রবনে তুষ্ট হয়। দ্রব্য বা দ্রাবকে কি আসে যায়। মূলত বড় বড় পরিবার কর্তাদের সকল শক্তির উৎস ১.৫ ওজনের তেজস্ক্রিয় জড় পদার্থে। যার তেজস্ক্রিয়তা ও বিধ্বংসীতা সেরাদের সেরাত্ব প্রতিষ্ঠা করে। এই সামান্য বস্তু নিয়ে সবার যত অহংকার। সবসময় সবাই দলে দলে এ বস্তুর তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে মাতামাতি করে। নতুন বিধ্বংসীতা আবিষ্কার করে। কিভাবে মেঘ থেকে বৃষ্টি? শূন্য থেকে মহামানব তৈরি করা যায়? এখন সেসব মূল্য হারিয়েছে। এখন গুরুত্বের পাতায় ছাপা, কিভাবে জীবিতকে মৃত ও মৃতকে জীবিত করা যায় সেই চিন্তা।


আরও পড়ুন>>


প্রতিনিয়ত ছোট পরিবারগুলো এসব আর্ফিন পরিবার, মৈনিক পরিবার, নাশিয়া পরিবারের গর্ভে বিলীন হয়। সেরা পরিবারগুলো একে একে অসেরা পরিবারদের পেটে পুড়ে নেয়। তাই আর্ফিন পরিবার অনেক অসেরা পরিবারকে তার পাখনার ছায়ায় রাখে। ইচ্ছে হলে মাঝে মধ্যে পাখনাটা ঝাপটিয়ে পুরো পরিবারটাকে বাতাসে ভাসিয়ে অজানাতে হারিয়ে দেয়। আর্ফিন পরিবার কর্তারা যুগের পর যুগ ধরে অনেক দূর্বল পরিবারগুলোতে অতিথিশালা তৈরি করে রেখেছে। আর সে অতিথিশালায় তাদের আবিষ্কৃত কতিপয় যমদূত আপ্যায়িত হয়। সময় অসময় সর্বদা দূর্বলদের মৃত্যু তালিকা হালনাগাদ করার জন্য। যাতে করে ক্ষমতার শব্দের কোলাহলে এসব দূর্বল পরিবারগুলো তাদের পথগামী না হয়।

এমন অনেক পীড়িতদের মধ্যে অন্যতম ফকির পরিবার। কেননা আর্ফিন পরিবার কর্তাদের মূল লক্ষ্য তারাই। গ্রামের যেখানেই ফকির পরিবারের বসতি সেখানেই তৈরি হয়েছে মৃতের ক্ষেত। যে ক্ষেতে ফলনও দারুন হয়। আর্ফিন পরিবারের যমদূতের রোলারের পৃষ্ঠে পিষে নিহত মায়ের বুকের উপর বসে অভুক্ত শিশু ক্ষুধার আর্তনাদে নিরস শুষ্ক স্তুন চুষে ব্যর্থতার জলে তা ধুয়ে দেয়। ক্ষেতের কোন পাশে স্নেহের কচি ফসলের ক্ষত-বিক্ষত গোশত দেখে মায়ের বোবা যন্ত্রনার বিস্ফোরনের শব্দে নিস্তবদ্ধ দুপুরের ঘুমকে আচমকা জাগিয়ে তোলে। কিন্তু তারপরেও সেরা পরিবার কর্তাদের বিভৎসতা দেখার পিপাসার প্রশান্তি হয় না।


আরও পড়ুন>>


ফকির পরিবারের এক সাদামাটা প্রস্তরযুগের মানসিকতার সদস্য ছামছুন। তার ক্ষেতে একটাই রোগাপুষ্ট ফল ফলেছে। সে ফলাটা এতটাই অচল যে বাজারে চলে না। তাই বাধ্য হয়ে অন্যের হাড়ি ঝাড়া ময়লা আঁচলে কুড়িয়ে সে ফলটার পুষ্টি যোগায়। কিন্তু একদিন যমদূতদের ক্রোধের ফুলকি সে মহল্লাকে অতিতে পরিনত করে। কিন্তু ছামছুনের অপুষ্ট নিরোগ ফলটা এখনো বর্তমানের ধ্বংস স্তুপে তার পুষ্টিদাতা ক্ষেতের স্মৃতি বিলায়। কিন্তু সে স্মৃতির বিচরন দীর্ঘ হয় না। কেননা অপুষ্ট ফলটা চলতে পারে না। ক্ষুধার মধ্যাহ্নের আগমনের পদশব্দের ভয়ে ঘষে ঘষে চলা শুরু করে খাবার সন্ধানের জন্য। সে ধংস স্তুপে তার চলার শক্তিটাকে ব্যর্থ প্রমানিত করে। নিরুপায় হয়ে তার সেই পুষ্টি সরবরাহকারী ক্ষেতের নিকটেই শেষ ভরসা। বাধ্য হয়ে সে ক্ষেতের অর্ধগলিত গোশত ছিড়ে খাওয়া শুরু করে। সে বেইমানি করলেও ভিতরস্থ রেচনতন্ত্র কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তা প্রবেশ পথেই বের করে দেয়। এদিকে পানি নিঃসঙ্গতায় সে ফল চুপসে শুকে যায়। এমনি অবস্থা বেশিরভাগ গ্রামবাসির। তাই গ্রামবাসির সিংহভাগ পরিবার সেরাত্বের যুদ্ধে প্রয়োজনীয় রসদ- সারঞ্জামের অভাবে যুদ্ধ হতে বিরত থেকে শান্তির অভয়বাণী শোনান। নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে গেলে গলা ঝেড়ে মুক্ত হন। আবার পুনরায় নির্যাতনের সাগরে হাবুডুবু খায়। কেউ সেরাদের পা ধরে কুল পায়। কেউ আত্মসম্মানে ডুবে ইতিহাসে বিচরন করে। কিন্তু সেরাদের কর্ণপাতে সাড়া জাগাতে অক্ষম।


আরও পড়ুন>>


আজকাল আর্ফিন পরিবার, মৈনিক পরিবার, নাশিয়া পরিবারের বিভৎসতা, নির্যাতনের ধারনাতেও পরিবর্তন এসেছে। কিভাবে রণক্ষেত্রে শত্রুর দেহে নিজেদের ক্রোধের মূর্তি অঙ্কন করা ছাড়া যুদ্ধ না করেও জয়ী হওয়া যায়, নিজের সেরাত্ব বজায় রাখা যায়, তা নিয়ে সদা ব্যস্ত । এখন আর্ফিন পরিবার বিভিন্ন যাদু শিখে। কিভাবে নিজ শক্তি ক্ষয় না করে যাদু ক্রিয়া দিয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা যায় তা নিয়ে চলে গুপ্ত গবেষণা। তাছাড়া কখনো সে যাদুর ক্রিয়া যদি নিজ শিবিরে আঘাত হানে তার জন্যে যাদুর প্রতিক্রিয়া কাটানোর পূর্ব যাদুটাও আবিষ্কার করে রাখে। এ যাদুর শক্তি এতটাই প্রকোপ যে যমদূতের তুলনায় দ্রুত মারনশীল, অত্যাধিক নিষ্ঠুর ও যমদূতের থেকে আরো বিভৎস। শত্রুর আর্তনাদে যাদুর হাসির আনন্দটা প্রাণ পায়। তাই বলে অন্য সেরা পরিবারগুলো যুদ্ধের কৌশলে বোকা নয়। তারাও একে অন্যের উপর গোপন নজরদারি করে। একে অন্যের যাদুর ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়া কাটানোর তথ্য নিয়ে গবেষনা করে। আর্ফিন পরিবারের আধুনিক শক্তির ভান্ডারে মজুদ অনেক মহাশক্তিধর যাদুর সম্ভার। তারপরেও আর্ফিন পরিবার নিজ শক্তি সম্ভার বাড়াতে অলস থাকে না।


আরও পড়ুন>>


কিন্তু একদিন হটাৎ তাদের সেরাত্বের যুদ্ধে তাদের অসহায়ত্বকে আঙ্গুল উঁচিয়ে দেখাতে বায়ুতে তৈরি হয় নতুন যাদু। নতুন যাদুটা সকল সেরা পরিবারের কাছে অজানা। এ যাদুর প্রকোপ এতটাই ভয়াবহ যে তাদের মরনকে মারতে আবিষ্কৃত চিকিৎসা ব্যবস্থাকে নিয়ে ছোট বাচ্চার মতো খেলা করে। গ্রামের সব সেরা পরিবার ভয়ে উন্মাদ প্রায় অবস্থা। সেরা পরিবারগুলো যাদু মোকাবিলায় দূর্বল প্রমানিত হয় মূর্কের ন্যায় একে অন্যের দিকে যাদু তৈরির অভিযোগের কাঁদা ছোড়াছুড়ি করা শুরু করে। যাদুও নির্দয়ভাবে সেরা-অসেরাকে ব্যঙ্গ করে মানব ধংসের খেলায় আর্তনাদ বৃদ্ধি করে চলে। যাদুর ক্রিয়া আক্রান্তের দেহে বায়ু ও পানি পিপাসার ক্ষরা তৈরি করে। পৃথিবীর সকল পানি দিয়েও সে শুষ্ক জমিনকে সিক্ত করা যায় না। বায়ু পিপাসা তো রইলোই। যখন তা প্রকোপ হয় সে সীমাহিন যন্ত্রণা হতে মুক্তির জন্য আক্রান্ত নিজেই নিজ হাতে নিজের প্রাণপাখিটাকে যমদূতের হাতে তুলে দিতে উদ্যত হয়। কিন্তু সেখানেও ব্যর্থ হয়। এসব যন্ত্রনার থেকেও যাদুর ভয়ংকর প্রতিক্রিয়া হচ্ছে এটা আক্রান্তকে নিংসঙ্গ করে দেয়। কেননা আক্রান্তের সংস্পশে আসলেই অন্যরাও আক্রান্ত হয়। সেরারা ভয়ে নিজেদের সেরাত্বকে মুখ ফিরিয়ে ঘরে আবদ্ধ করে। দিশেহারা তৃষ্ণার্ত পথিকের ন্যায় যাদু নির্মূলের পানি খুঁজে খুঁজে ছটপট করে।


আরও পড়ুন>>


সৃষ্টিকর্তার ব্যঙ্গে আর্ফিন পরিবার কর্তা সে যাদুর ক্রিয়াই আক্রান্ত হয়। শক্তির যে রথে চড়ে দূর্বলদের পিষে চলতো, সে রথ তাকে ছুড়ে ফেলে একাকীত্বের চারদেয়ালের ভিতরে নিঃসঙ্গে। দূর্বলদের পিষে তাদের আর্তনাদে যাদের অন্তরে হাসির সুর তৈরি করতো, সে আপনজনরাই আজ নিজ রক্ষার সুরে মাতাল হয়ে তাকে একা ছেড়ে যায় কংক্রিটের জড় সঙ্গীর নিকটে। দিন দিন আর্ফিন পরিবার কর্তা যাদু ক্রিয়াই শরীরের তুলনায় মানসিকভাবে বেশি কঙ্কালসার হয়ে পড়ে। যার খাবারের থালায় উন্নত খাদ্যের ঝলকানি দিত। আজ সে থালায় এখন অনাহারের আর্তনাদের প্রতিধ্বনিত হয়। সে আর্তনাদ কংক্রিটের পদার্থগুলোর মন জয় করতে পারে না। তাই সে প্রতিধ্বনি অন্যের কাছে পৌঁছায় না। এদিকে যাদুর প্রকোপ বাড়ায় সে বদ্ধ ঘরের পথে মাকড়সা জাল বুনে, ধুলিকণা আপন মনে আলপনা আঁকে। দিনকয়েক পরে যাদুর ক্রিয়ায় পীড়িত হওয়ার সাথে সাথে ক্ষুধা ও নিঃসঙ্গতার পীড়ন বৃদ্ধি পায়। অনাহারের সামনে গায়ের জামার আহারের থালা সাজিয়ে দিলেও ক্ষুধার শিশুটাকে ভোলাতে পারে না। তার কান্নার চিৎকার থামাতে নিজ হাতের মাংস নিজে ছিড়ে চলে। হাতের হাড় বের হলে পায়ের মাংসে হিংস সিংহের ন্যায় চোয়ালের খাবোল বসায়। এদিকে পানির শূণ্যতার হাহাকারে গলায় চৈত্রের ফাটল সৃষ্টি হলেও জড় কংক্রিটের দেহে ফাটল ধরাতে পারে না। বাধ্য হয়ে সর্পীনি দেবীর মতো নিজ রক্ত ও মূত্রের কাসায় চুমুক বসায়। তবুও একদিন কংক্রিটের ভিতরের শব্দ নিঃশব্দে পরিণত হয়। বদ্ধ দরজার বিপরীতে শক্তির ওপিঠটা রহস্যময় থাকে।

লেখক: নাজির উদ্দিন

বি এ অনার্স, এম এ ইংরেজি( অধ্যয়নরত)

আজিজুল হক কলেজ, বগুড়া।

এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

Leave a Reply

লেখক

সর্বশেষ সংবাদ

%d bloggers like this: