শরিয়ত বয়াতির নিঃশর্ত মুক্তি দাবিতে ৪৪ নাগরিকের বিবৃতি

অনলাইন রিপোর্ট
লোকশিল্পী শরিয়ত বয়াতির নিঃশর্ত মুক্তি চেয়ে ৪৪ জন নাগরিক বিবৃতি দিয়েছেন। আজ রোববার গণমাধ্যমে পাঠানো সংবাদ বিবৃতিতে বলা হয়, লোকশিল্পী শরীয়ত বয়াতির বক্তব্যকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে ফৌজদারি অভিযোগে অন্যায়ভাবে কারাবন্দি করা নিয়ে আমরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছি।

‘একটি বাউল গানের আসরে ‘‘কোরআনে গান-বাজনা নিষিদ্ধ করা হয়নি’’ মর্মে মতামত দেওয়ায় গত ১১ জানুয়ারি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার বিরুদ্ধে কিছু তথাকথিত ইসলামপন্থীদের অভিযোগ, তিনি ইসলাম ও কোরআন-হাদিসকে ভুলভাবে উপস্থাপন ও ব্যাখ্যার মাধ্যমে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়েছেন। আমরা মনে করি, শরিয়ত বয়াতিকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার ও বন্দি করে রাখার মাধ্যমে সংবিধান স্বীকৃত মত প্রকাশের মৌলিক অধিকারের চরম লঙ্ঘন হয়েছে। এ ছাড়া, মানবাধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক আইনের বাধ্যবাধকতারও লঙ্ঘন হয়েছে।’

বিবৃতিতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিতর্কিত ধারাগুলোর বিলুপ্তি ও সংশোধন এবং পুলিশকে দায়িত্বশীল ও নিরপেক্ষ ভূমিকা পালনের দাবি জানানো হয়।

এতে আরও বলা হয়, ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের সংশ্লিষ্ট ধারার লঙ্ঘনের অজুহাতে মামলা হলেই যে কোনো ব্যক্তিকে এভাবে নির্বিচারে গ্রেপ্তার করার ধারা অব্যাহত রাখা হলে তা নাগরিকের মত প্রকাশের মৌলিক অধিকারকে সংকুচিত করবে এবং এ ধরনের পরিস্থিতি ভবিষ্যতে দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির কারণ হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অন্যতম শর্ত হলো বহুমতের সম্মিলন ঘটানো, যা বিকাশের পরিবর্তে বর্তমান অবস্থায় দিনে দিনে সংকুচিত হচ্ছে। মত প্রকাশের ক্ষেত্রে নাগরিকদের স্বনিয়ন্ত্রণ (সেলফ-সেনসরশিপ) আশ্চর্যজনকভাবে বেড়েছে, যা নাগরিক অধিকার খর্ব করছে এবং সুস্থ সংস্কৃতি বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে।’

‘শরিয়ত বয়াতির বক্তব্যের ভিডিও ক্লিপটি আমরা শুনেছি। সেখানে তিনি ধর্মের প্রতি অবমাননাকর কোনো মন্তব্য করেছেন বলে আমাদের নিকট প্রতীয়মান হয়নি। তা ছাড়া, আপত্তিকর কোনো মন্তব্যও পাওয়া যায়নি। তিনি ধর্মের নামে ভণ্ডামির বিরুদ্ধে বলেছেন, ধর্মব্যবসার বিরুদ্ধে বলেছেন, যা ইসলামের আধ্যাতিক ভাবধারার অন্তর্গত বিষয়। শাস্ত্রের পাশাপাশি ইসলামে আধ্যত্মবাদও স্বীকৃত ধারা। তা ছাড়া, ইসলামি দর্শনের মধ্যেই ভিন্নমতের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের কথা বলা হয়েছে। শরিয়ত বয়াতিরা ইসলামের আধ্যাত্মিক ধারার অনুসারী, তাকে কেবল শাস্ত্রের অপব্যাখ্যা দিয়ে বিচার করা যাবে না।’

‘দুঃখজনকভাবে একটি কথা উল্লেখ করা জরুরি যে, শরিয়ত বয়াতির গ্রেপ্তার এবং অন্যান্য সাংস্কৃতিক চর্চায় নিয়োজিত বাউল শিল্পীদের ওপর যে ধরনের হয়রানি চলছে, তা দেখে পাকিস্তান আমলে কথায় কথায় ইসলামের দোহাই দিয়ে মানুষকে হয়রানি ও বাংলার সংস্কৃতি চর্চাকে ব্যাহত করার নানা ঘটনার কথা মনে করিয়ে দেয়,’ বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।

‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের সময় নাগরিক সমাজ থেকে যেসব আপত্তি তোলা হয়েছিল, সরকার পরবর্তীতে তা আমলে নেয়নি। তবে আইনটি সংসদে পাস হওয়ার আগে ও পরে মাননীয় আইনমন্ত্রী মহোদয় সাংবাদিকদের কাছে অঙ্গীকার করেছিলেন যে, নাগরিকদের পক্ষ থেকে যেসব ধারার বিরুদ্ধে আপত্তি তোলা হয়েছে তা বিবেচনা করবেন। আইন পাস হওয়ার পরেও এই আইন সংশোধনের সুযোগ রয়েছে। তাই নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে আমরা আইনের নিবর্তনমূলক ধারাগুলো বাতিলের জন্য সরকারকে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানাই। নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক চুক্তিসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে এই আইনের পরিবর্তন করতে হবে। আমরা পুলিশসহ আইন প্রয়োগকারী অন্যান্য কর্তৃপক্ষকে আরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।’

বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছেন আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী ব্যারিস্টার সারা হোসেন; সাউথ এশিয়ান ফর হিউম্যান রাইটসের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল; নিজেরা করি’র সমন্বয়ক খুশি কবির; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক তানজীমউদ্দিন খান; বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. আকমল হোসাইন; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক গীতি আরা নাসরীন ও রুবায়েত ফেরদৌস; ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. ডিনা সিদ্দিকী, একই বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সেউতি সবুর; ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের গবেষণা সহযোগী স্বপন আদনান; আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান; লেখক ও অনুবাদক ওমর তারেক চৌধুরী; টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারূজ্জামান; সাংবাদিক গোলাম মোর্তোজা; সাধনা’র আর্টিস্টিক ডিরেক্টর লুবনা মরিয়ম; মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম; জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মির্জা তাসলিমা সুলতানা, একই বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ ফেরদৌস ও সাবেক অধ্যাপক রেহনুমা আহমেদ; গবেষক মাহা মির্জা; জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সদস্য, অধ্যাপক মেঘনা গুহ ঠাকুরতা; বাংলাদেশ জাতীয় প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশনের ক্লিনিক্যাল নিউরোসাইন্স সেন্টারের পরিচালক ড. নাইলা জামান খান; সুশাসনের জন্য নাগরিক, সুজন’র সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার; আলোকচিত্রশিল্পী, সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মী শহীদুল আলম; মানবাধিকার কর্মী, শিক্ষক ও গবেষক রেজাউর রহমান লেনিন; ব্রাক ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড জাস্টিস’র নির্বাহী পরিচালক মনজুর হাসান; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল; আমেরিকার ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. আলী রিয়াজ; কবি ও সংগীতশিল্পী অরূপ রাহী; নারী ও মানবাধিকার আন্দোলনকর্মী শিরীন প হক; আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী ড. শাহদীন মালিক; আমেরিকার গ্র্যান্ড ভ্যালি স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক আজফার হোসাইন; মানবাধিকারকর্মী ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী; এএলআরডি’র নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা; ফ্যাসিবাদ ও সামরাজ্যবাদ বিরোধী জাতীয় কমিটির যুগ্ম সম্পাদক হাসিবুর রহমান; নারী ও মানবাধিকার আন্দোলনকর্মী ড. হামিদা হোসেন; মানবাধিকারকর্মী অধ্যাপক ড. সি আর আবরার; শিক্ষা ও মানবাধিকারকর্মী রাশেদা কে চৌধুরী; গবেষক ও মানবাধিকারকর্মী মুক্তাশ্রী চাকমা; রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক বখতিয়ার আহমেদ; সেন্ট্রাল উইমেন উইমেন ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক পারভীন হাসান; ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ফিরদৌস আজিম; আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া; আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী আব্দুল্লাহ আল নোমান।

এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

Leave a Reply

প্রতিবেদক

সর্বশেষ সংবাদ

Bengali Bengali English English German German Italian Italian