সপ্নের দেশের ছোয়াই

সোহান সপ্তম শ্রেনীতে পড়ে। ক্লাসের খুব প্রিয় ছাত্র। শিক্ষকরা সবাই খুব ভালোবাসেন। কেননা সে ক্লাসের সবচেয়ে মেধাবী ছাত্র। সে যেমন মেধাবী, তেমন দায়িত্বপরায়ণ। সে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে তার বাবা-মাকে। আর তার গ্রামকে। ওর বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা। বয়সটা তাকে দমানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু দমাবার পাত্র তিনি নন। মুক্তিযুদ্ধের মতো জীবন যুদ্ধেও তিনি সাহসের সাথে যুদ্ধ করে চলেছেন। সামান্য ছোট একটা দোকান আছে তার। যা দিয়ে কোন মতে সংসার চলে। তাতেও আবার অনেক বাধা। সপ্তাহে স্থানীয় ছেলেদের চাঁদা দিতে হয়। বিভিন্ন উৎসব অনুষ্ঠান তো আছেই। তাছাড়া পুলিশের কথা নয় বাদই দিলাম। কারন তার দোকানটা যে বাজারের খাসজমিতে গড়ে ওঠেছে। তবুও তিনি হতাশ নন। তিনি তো নিজের জন্য যুদ্ধ করেন নি। যুদ্ধ করেছেন দেশের জন্য। দেশের মানুষের জন্য। সোহান তার বাবার আদর্শে অনুপ্রানিত। সে তার গ্রামকে খুব ভালোবাসে। ভালোবাসেই বলে গ্রামের অসুস্থতা ওকে কাঁদায়। গ্রামটা নানা রোগে আক্রান্ত।


আরও পড়ুন>>

জলপুর যদিও ছোট গ্রাম। গ্রামে চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, মেয়েদের উত্যক্ত করা ইত্যাদি ছিল প্রতিদিনকার ঘটনা। চারদিকে মৎসন্ন্যায় যুগের অবস্থা। পুকুরে যেমন বড় মাছ, ছোট মাছকে খেয়ে নিজ রাজ্যে রাজত্ব করে। ঠিক তেমনি গ্রামের ক্ষমতাধর রাজনীতিবিদ ধনীরা, গরীবদের শুষে সে নিরস ভূমিতে নিজেদের গুরুত্ব প্রতিষ্ঠা করে চলে। অন্যায়কে অন্যায়ভাবে ন্যায়ের ঘরে প্রতিপালন করে । ফলে গ্রামের বেশিরভাগ মেয়ে বাড়ি থেকে বের হতে পারে না। বেশিরভাগ পরিবারের সুখের কাঠি মাদকাসক্ত। যা সুখ কাঠিটার ভালো-মন্দের বোধটাকে ফ্যাকাশে করে দিয়েছে। তাই আজকাল পরিবারগুলোতে সুখের হাহাকার থাকলেও, সেখানে দুঃখের অমানুষিক শাষন। কেউ কোন প্রতিবাদ করে না। অবশ্য আগে সোহানের বাবা থানায় নালিশ করত। কিন্তু কোন লাভ হতো না। কেননা পুলিশ তো আর ওদের সমাজের বাহিরের কেউ না। তাছাড়া দুধ দেওয়া গাভীকে কেইবা খেপাতে চায়। বরং নালিশ করার জন্যে সোহানের বাবাকে অনেক দিন লাঞ্চিত, অপমানিত হতে হয়েছে। মাঝে মাঝে ভাবেন কি উদ্দেশ্যে দেশটাকে স্বাধীন করেছেন ? কিন্তু তার উদ্দেশ্যটাতো আর সবার উদ্দেশ্য না। তার মতো যাদের একই উদ্দেশ্য ছিল তারাতো মুক্তিযুদ্ধেই শহীদ হয়েছেন। আর সামান্য যে কয়েকজনই বা বেঁচে আছেন, তাদেরও তার মতো একই অবস্থা। সোহানের প্রিয় শখ, বড় হয়ে পুলিশ হবে। গ্রামটাকে সকল রোগ থেকে মুক্ত করবে। গ্রামকে গড়ে তুলবে তার বাবার স্বপ্নের গ্রামের মতো। যার জন্য তারা যুদ্ধ করেছেন।


আরও পড়ুন>>


এভাবেই বাবার সাথে নিজ সখের কথা জানিয়ে, গল্পে কাটান অনেক রাত। বাবাও তাকে উৎসাহিত করে সৎ, সততা ও সত্যের মহামানবদের সঙ্গী হতে আদেশ করে। স্বপ্নের জাল ধীরে ধীরে বিস্তার শুরু করে তার সব ইচ্ছায়। দিন ক্লান্ত হয়ে ঘুমায় রাতের শান্ত বিছানায়। সকালের ডাকে আবার সাড়া দেয়। সেদিন সকালে সোহান খুব আগ্রহ নিয়ে বাবাকে খোঁজে। তাকে খুব খুশি দেখায়। তার বাবা জিজ্ঞেস করে, “কি হয়েছে বিছানায়। সকালের ডাকে আবার সাড়া দেয়। সেদিন সকালে সোহান খুব আগ্রহ নিয়ে বাবাকে খোঁজে। তাকে খুব খুশি দেখায়। তার বাবা জিজ্ঞেস করে, “কি হয়েছে।” সকালের খাবার খেতে খেতে বাবাকে বলে, “ বাবা, আমি খুব ভাল একটা স্বপ্ন দেখেছি।” কি স্বপ্ন, সোহান ?” তার বাবা জিজ্ঞেস করে। সে উত্তর দেয়,“ বাবা, আমি স্বপ্নে আজকে রাতে হয়েছিলাম।” বাবা হেসে বলে, “তাই” । সে বলে, “বাবা, গ্রামটাকে আমি তোমার স্বপ্নের মতো করে বানিয়েছে। যার স্বপ্ন তুমি দেখো। গ্রামটা সকল অপবিত্রতা থেকে মুক্ত। সবাই সুখে শান্তিতে, স্বাধীনভাবে বাস করছে।” বাবা তার ছেলের কথায় খুশি হয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলেন, “আমি না পারলাম। তুই নিশ্চয় আমার স্বপ্নের গ্রামেই থাকবি। এ যে অনেক অশান্ত প্রানের চাওয়া। নিজেদেরকে উৎসর্গ করে তারা সে গ্রামের আশায় এখনো বেড়াতে আসে। কিন্তু না পেয়ে নিরাশায় আবার পাড়ি জমায় তাদের স্থায়ী ঠিকানায়।”
তারপর এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে আকাশের পর্দায় নিজ স্বপ্ন উড়তে দেখে। ১৯৭১ সাল। স্বাধীনতার ঘোষনা হয়ে গেছে। সবাই প্রকৃত স্বাধীনতার খোঁজে নিজ মাতৃভূমির টানে প্রশিক্ষনে ব্যস্ত। সে সারিতে সবার ন্যায় একই উদ্দেশ্যের যাত্রি সোহানের বাবা। সকল সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও অনুপোযুক্ত প্রশিক্ষনে হালকা অস্ত্র নিয়ে মরনের সামনে ঝাপিয়ে পড়ে। অনেক সময় মরণ তাকে আঘাত করলেও অদম্য স্বপ্নের স্রোতে খড়কুটার মতো ভেসে যাই। সুস্থ হয়ে আবার ক্ষত নিয়ে যাত্রা করেন স্বপ্নের খোঁজে। সে যাত্রায় অনেক প্রিয় মুখ হারায়। কিন্তু শোক তার স্বপ্নের স্রােতে বাঁধ দিতে পারে না। বরং চোখের জলে স্বপ্নের স্রােত আরো খরোতর হয়। দ্রুত স্বপ্নের দেশে পৌছানোর জন্য। অবশেষে স্বপ্নের মূর্তি আবিষ্কৃত হয়। কিন্তু সে মূর্তি প্রাণশূন্য, উদ্দেশ্যের অনুস্থিত। স্বপ্নের দেশ পেলেও স্বপ্নগুলো উধাও। তাই এখনও স্বপ্নগুলো খুঁজে চলে। নিরাশ না হয়ে নিজ স্বপ্নকে নিজ সন্তানের স্বপ্নে জুড়ে দেয়।


আরও পড়ুন>>


সোহানার স্বপ্ন বাস্তবে রুপ নেয়। সেদিন স্কুলে যাচ্ছে। হটাৎ দেখে তার সামনেই রুপাকে এসিড ছুড়ে মোটরসাইকেলে করে পালিয়ে যায় দুজন। সে ওদের চেনে। স্কুলের সামনের দোকানে সারাদিন কেরাম খেলে। সে তাদের ঝোপের আড়ালে বসে নেশা করতে দেখেছে অনেকদিন। খবর পেয়ে পুলিশ আসে। কেউ কি দেখেছেন, কে করেছে? বাবার আদর্শের মূর্তিগুলো সোহান নিজের মধ্যে কত স্নেহে বিনম্র ভক্তিতে শ্রদ্ধা করে তার বহিঃপ্রকাশ পায়। বাবার আদর্শে বলিয়ান হয়ে সোহান বলে, “আমি দেখেছি।” “দেখলে চিনতে পারবে তো? পুলিশ জিজ্ঞেস করে। সে বলে, “হ্যাঁ চিনতে পারবো। আমি ওদের স্কুলের সামনের দোকানটাতে প্রতিদিনই দেখি।” পুলিশ সোহানকে সাক্ষী বানায়। সোহানও সাক্ষী দিতে রাজি হয়ে যায়। এ যে ওর বাবারও আদেশ, “সত্যের সঙ্গি হও।” তাছাড়া ওর বাবাও তো অন্যায়ে চুপচাপ ছিল না। মরণের সামনে দাড়িয়ে মরণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে। মৃত্যু তাদের ভয়ে, ভয়ের মহামারিতে ধংস হয়। সোহান বাড়িতে ঘটনা খুলে বললে বাবা স্বাধীনতা অর্জনের আনন্দটাকে ভুলে যায় এ আনন্দের কোলাহলে। যার বর্ষনে ছেলের মনটাও কানায় কানায় পূর্ণ হয়।
পরদিন সন্ধ্যায় সোহানের বাড়িতে কান্নার বাদ্য শোনা যায়। সোহান আর নেয়। ওর লাশ নদীর ধারে পাওয়া গেছে। সোহানের বাবা নিশ্চুপ। ওর বাবা অনেক সঙ্গীকে হারিয়েছেন। যারা তার ছেলের মতো নিজেদের রক্তে নদীটার জীবন ফিরিয়ে প্রাণবন্ত চঞ্চল করেছে। সোহানের দেহের আঘাতের চিহ্নগুলো তার স্বপ্নের পথের ঠিকানাকে অঙ্কিত করেছে। পুলিশ আসে, লাশ নিয়ে যায়। ময়নাতদন্তের পরে ওর নিষ্পান মূর্তিটাকে গ্রামের কবর স্থানে দাফন করা হয়। এখানেই সোহানের বাবা নিজ হাতে দাফন করেছে তার অনেক সঙ্গীকে। মামলার কোন অগ্রগতি নেই। সোহানের বাবা খুব খুশি যে তার সন্তান সত্যিই দেশটায় পেয়েছে। কয়েক বছর পর সোহানের মা, সোহানের খোঁজে অফেরার রাজ্যে ডুব দেয়। আজকাল সোহানের বাবা একা। কিন্তু তিনি এখনও নিরাশ নন। তিনি যুদ্ধে অনেক সময় একাকীত্বের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন। যুদ্ধ করেছেন শত্রুর বিরুদ্ধে। অনাহারে খাদ্য ও অস্ত্রের অপেক্ষায় শত্রুর বন্দুক পানে চেয়ে থেকেছেন। আজ তার শরীরটা বড় ক্লান্ত। নিজ প্রিয় সন্তান ও স্ত্রীর সাক্ষাত পেতে আগ্রহী। কিন্তু তার জীবন বাতিটার ক্ষীণ আলোয় এখনো স্বপ্নের গ্রামের ছবি দেখে। হয়তো স্বপ্নের গ্রামটা দেখার জন্য আজও তার পরিশান্ত দেহ চেয়ে আছে।

লেখকঃ নাজির উদ্দিন।
বি.এ (অনার্স), মাস্টার্স (অধ্যয়নরত),
ইংরেজি বিভাগ, সরকারি আজিজুল হক কলেজ, বগুড়া।

এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

Leave a Reply

লেখক

সর্বশেষ সংবাদ

ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ১৬২ বছরে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (সংক্ষেপে-জবি) বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার কোতোয়ালি থানার সদরঘাট এলাকায় চিত্তরঞ্জন এভিনিউতে অবস্থিত একটি স্বায়ত্তশাসিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে জগন্নাথ রায়...

ধামইরহাটে রাসায়নিক স্প্রে করে ধান পুড়িয়ে দিল দূর্বৃত্তরা

নওগাঁর ধামইরহাটে রাসায়নিক স্প্রে করে কৃষদের ধান পুড়িয়ে দিয়েছে দূর্বৃত্তরা। এতে জমির মালিকের সমস্ত আধাপাকা ধান বিষক্রিয়ায় বিবর্ণরুপ দেখা দিয়েছে। অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, পৌর...

মাত্র ৩ ঘন্টায় সংযোগ দিল হিলি পল্লী বিদুৎ সমিতি

দিনাজপুর জেলার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি ২ এর হিলি সাব জোনাল অফিসে আবেদন করে ৩ ঘন্টার মাথায় বাড়িতে বিদুৎ সংযোগ পেলো হালিমা বিবি। গত কাল বুধবার...

হিলি পল্লী বিদুৎ সমিতি ২ এ আবেদনের ৩ ঘন্টার মাথায় বিদ্যুৎ সংযোগ প্রদান

দিনাজপুর জেলার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি ২ এর হিলি সাব জোনাল অফিসে আবেদন করে ৩ ঘন্টার মাথায় বাড়িতে বিদুৎ সংযোগ পেলো হালিমা বিবি। গত কাল বুধবার...
%d bloggers like this: