স্বাস্থ্যসেবা, স্বাস্থ্য-রাজনীতিঃ একটি পর্যালোচনা-১

আতিফ অনিক।।

নোটঃ

সারাবিশ্বের প্রায় ২০০ টি দেশ বা অঞ্চলে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পরেছে। এ পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা প্রায় চল্লিশ হাজার ছাড়িয়েছে। ‘উন্নত’ দেশগুলোতে যেন মৃত্যুর মিছিল শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যেই চীনকে ছাড়িয়ে গেছে আমেরিকায় মৃতের সংখ্যা। অন্যান্য দেশের তুলনায় আমেরিকা সবচেয়ে বেশি তার স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগ করে। তারপরেও ভাইরাস প্রতিরোধ করা তার পক্ষে সম্ভব হয় নি। আবার একইসাথে চীনও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ২য় স্থানে থেকেও করোনা প্রতিরোধ করতে পারে নি। অর্থাৎ করোনা মোকাবেলা করতে হয়েছে সব দেশকেই। সারা বিশ্বের উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা হিসেবে পরিচিত দেশগুলো থেকে শুরু করে অনুন্নত দেশ, কোথাও চিকিৎসা ব্যবস্থা যে প্রতিরোধমূলক নয় তা উন্মোচন করে দিচ্ছে।

স্বাস্থ্যখাতকে যে সমস্ত দেশ তুলনামূলক জনবান্ধব করতে পেরেছে তারা কিছুটা এক্ষেত্রে অগ্রগতি ঘটাতে পেরেছে। এরমধ্যে রয়েছে কিউবা এবং দক্ষিণ কোরিয়া সহ আরো কিছু দেশ। এদিকে সেখানে ফেল (!) মেরেছে প্রায় সাড়ে তিন লাখ কোটি ডলারের উপরে ব্যয় করা স্বাস্থ্য ব্যবস্থা আমেরিকা!

আমাদের দেশ বাংলাদেশও এই পরিস্থিতির বাইরে নয়। রাষ্ট্র-সরকারে বসে থাকা গুরুত্বপূর্ণ কর্তা ব্যক্তিরা উন্নয়নের জোয়ার বইয়ে দিলেও কতটুকু উন্নত হয়েছে এদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা তা পর্যালোচনা জরুরী। পর্যালোচনা জরুরী এখানকার স্বাস্থ্য সেবা কত পার্সেন্ট নিম্ন আয়ের মানুষকে সেবা দিতে পারে। অর্থাৎ স্বাস্থ্যসেবা খাতের পরিস্থিতির মূল্যায়ন অবধারিত হয়ে পরেছে আমাদের সামনে। আর এই স্বাস্থ্যখাত কিভাবে সাধারণ মানুষের দৌড় গোরায় পৌছাতে পারে এবং সেক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা কি সেসবও ভাবনা চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে স্বাস্থ্যখাতের সাথে জড়িয়ে আছে স্বাস্থ্য নীতি প্রণয়নের রাষ্ট্রীয় নীতির গভীর সম্পর্ক। রাষ্ট্রের রাজনৈতিক অবস্থান ঠিক করে দেয় স্বাস্থ্যখাত কেমন হবে। সেই হিসাবে স্বাস্থ্যখাতের সাথে রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং রাজনৈতিক আদর্শ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সেজন্য স্বাস্থ্যসেবা বোঝা পড়ার জন্য এর পেছনের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও আমাদের টাঁনাহেচড়া শুরু করতে হবে। করোনা আমাদের সেই তাগিদই দিচ্ছে। করোনার প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়তো আমাদের ভবিষ্যত ক্ষতি বন্ধের জন্য পদক্ষেপ নেবার দিশা হতে পারে। যা মর্মান্তিক কিন্তু বাস্তব!

স্বাস্থ্যখাত নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে, সাম্প্রতিক সময়ে কিউবার স্বাস্থ্যনীতি আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে। কিউবার স্বাস্থ্য নীতি প্রসংসার দাবি রাখে। তথাপী তার থেকেও উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা হতে পারে কিনা সেটাও আমাদের ভাবতে হবে। সেই ক্ষেত্রে আমরা অতীতে ফিরে যেতে পারি। আমরা তুলনামূলক পরিস্থিতি এবং স্থান কাল পাত্র বিবেচনায় পৃথিবীর দুই অগ্রসর সমাজতন্ত্র অনুশীলনকারী দেশ চীন (১৯৪৯-১৯৭৬) এবং রাশিয়া (১৯১৭-১৯৫৬) কিভাবে তার দেশের স্বাস্থ্যনীতি ঠিক করেছিল এবং তার সাফল্য কেমন ছিল আমাদের সেসবও খুঁজে দেখতে পারি।আমরা যদি আমাদের দেশের এবং বিশ্বের জনগনের জন্য টেকসই এবং মানসম্পন্ন চিকিৎসা সবার জন্য বিশেষত কৃষক-শ্রমিকদের জন্য নিশ্চিত করতে চাই তাহলে আমাদের অতীতের অগ্রসর অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতেই হবে।

শেষে এই শিক্ষার প্রেক্ষিতে আমাদের করণীয় কি সেটিও স্পষ্ট হতে হবে।

বর্তমান লেখাটিতে ধারাবাহিক ভাবে উপরে বর্ণিত বিষয় গুলোতে যথাসম্ভব আলোচনা করবার চেষ্টা করা হবে।

বাংলাদেশ

স্বাস্থ্যখাতে বাজেটঃ

২০১৯-২০২০ অর্থ বছরে বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্যখাতে মোট বাজেট হলো ২৫ হাজার ৭৩২ কোটি টাকা। এই বাজেটের মধ্যে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের পরিচালন ব্যয় ধরা হয়েছিলো ১০ হাজার ৭ কোটি টাকা, উন্নয়ন ব্যয় ছিলো ৯ হাজার ৯৩৬ কোটি টাকা। স্বাস্থ্য,শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগেএ ব্যয় ৩ হাজার ৪৫৭ কোটি টাকা এবং উন্নয়ন ব্যয় ২ হাজার ৩৩২ কোটি টাকা। যা মোট জাতীয় বাজেটের মাত্র ৪.৯২ শতাংশ এবং জিডিপির ০.৮৯ শতাংশ। এতে জনপ্রতি স্বাস্থ্যসেবা খাতে বরাদ্দের পরিমান দাঁড়ায় ১৪২৭.৭৭ টাকা। এই টাকা দিয়ে ডাক্তার, নার্স এবং টেকনিশিয়ানদের বেতন দিয়ে চিকিৎসার অগ্রগতিতে বেশি খরচ সম্ভব হয়ে ওঠবে না নিসঃন্দেহ। এতে করে চিকিৎসা খাতে আরো বেশি সংকট তৈরী হবে। মানুষের স্বাস্থ্যসেবা পাবার অধিকার তার মৌলিক অধিকার হলেও বাজেটে বরাদ্দ প্রমান করে যে বাংলাদেশে অন্যতম মৌলিক অধিকার স্বাস্থ্যসেবা পাবার অধিকার কতটা সংকুচিত।

স্বাস্থ্যখাতে সরকারী পরিকল্পনাঃ

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশে মাত্র ৫৪% সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক সেবাই নিশ্চিত করা সম্ভব হয় নি যেসব পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল।

আওয়ামীলীগ সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পরে ২০১২ সালে স্বাস্থ্য অর্থায়ন কৌশলপত্র প্রণয়ন করেছিলো। এই কৌশলপত্রে ২০৩২ সালকে লক্ষ্য মাত্রা হিসেব করে ২০১২-২০৩২ পর্যন্ত পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়।

এই পরিকল্পনায় ব্যক্তিগত চিকিৎসা ব্যয় ৩২ শতাংশে কমিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারন করা হয়। অপরদিকে এই পরিকল্পনা প্রণয়নের বছর থেকেই চিকিৎসা ব্যয় ব্যক্তিগত ক্ষেত্রে আরো বাড়তে শুরু করে। ২০১২ সালে ব্যক্তিগত চিকিৎসা ব্যয় ছিল ৬৪ শতাংশ।যা ২০১৫ সালে এসে হয় ৬৭ শতাংশ। আর বর্তমানে তা প্রায় ৭২ শতাংশ ছাড়িয়েছে।
এই পরিকল্পনা প্রণয়নের সময়ে সরকার চিকিৎসা ব্যয় নির্বাহ করতো ২৬ শতাংশ আর তা বর্তমানে কমে হয়েছে ২৩ শতাংশ। আর ২০৩২ সাল নাগাদ সরকার কর্তৃক ব্যয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিলো ৩০ শতাংশ।

উপরের পরিসংখ্যান দেখিয়ে দিচ্ছে যে বর্তমান সরকারের আমলেই স্বাস্থ্যখাতে খরচ কমানো হয়েছে। জনগনের করের টাকায় বাজেটের লট বহর বড় হলেও চিকিৎসা খাতে জনগনের ব্যয় বেড়ে চলেছে আর রাষ্ট্রীয় খরচ কমছে।

বাংলাদেশে চিকিৎসা ব্যয়ঃ

বাংলাদেশের জনগনকে শুধুমাত্র চিকিৎসা ব্যয় মেটাবার জন্য প্রতি বছর ৭ শতাংশ বা ১ কোটি ১৪ লাখ মানুষকে দারিদ্র সীমার নিচে নেমে যেতে হয়।

চিকিৎসার ক্ষেত্রে ৭২ শতাংশ খরচই করতে হয় ব্যক্তিগতভাবে নিজ খরচে। বাকি ২৮ শতাংশের মধ্যেও পুরোটা সরকার বহন করে না। এর মধ্যে রয়েছে এনজিও এবং বিভিন্ন দাতা সংস্থার উপস্থিতি। বর্তমানে মাত্র ২৩ শতাংশের মতো ব্যয় বহন করে রাষ্ট্র। আর বাকি ৫ শতাংশ এনজিও এবং দাতা সংস্থাগুলো করে থাকে।

বাংলাদেশে ২৫ শতাংশ মানুষকে আকস্মিক স্বাস্থ্য ব্যয়ের চাপ মোকাবেলা করতে হয়। এতে করে অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে যায়। পরিবারের একজন দুজনের আকস্মিক অসুখের ফলে অনেক সময় পুরো পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়।এদেশে পরিবারপ্রতি শুধুমাত্র স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় করতে হয় মোট ব্যয়ের ১০ শতাংশ।

ঔষধে অধিক ব্যয়ঃ

ব্যক্তিগত খরচের মধ্যে ৬০ শতাংশই যায় ঔষধ কেনার পেছনে। অতিরিক্ত ঔষধের দাম এবং ডাক্তাররা কখনো কখনো অতিরিক্ত দামের ঔষধ প্রেসক্রাইব করার ফলে এক্ষেত্রে ঔষধ এর পেছনে অনেক ব্যয় হয় এদেশের মানুষের। ঔষধ কোম্পানীগুলো নির্দয়ভাবে সাধারণ মানুষের পকেট থেকে উদ্বৃত্ত টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। ঔষধ শিল্পে দেশের অগ্রগতি ঘটলেও নিম্ন আয়ের মানুষ অনেক বেশি দামেই ঔষধ কিনতে হয়। এক্ষেত্রে কম দামে ঔষধ নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে। সরকারী হাসপাতাল গুলোতে পর্যাপ্ত পরিমান ঔষধ থাকে না। বরং বিভিন্ন সময়ে পত্রপত্রিকায় দেখা যায়, অবৈধভাবে সরকারী ঔষধ বিক্রি করা হয় এবং নিম্ন আয়ের মানুষ ঔষধ থেকে বঞ্চিত হন।

হাসপাতাল এবং ডাক্তার-নার্স-টেকনিশিয়ান পরিস্থিতিঃ

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে প্রতি দশ হাজার মানুষের জন্য ২৩ জনের একটি ডাক্তার-নার্স-টেকনিশিয়ানের দল থাকা আবশ্যক। সেই হিসাবে বাংলাদেশে রয়েছে ৩.৩ জনের একটি প্রতিনিধি দল। দেশে ২ হাজার ৫শ’ মানুষের জন্য একজন ডাক্তার রয়েছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। দেশের মোট জনসংখ্যার অনুপাতে এই মুহূর্তে কমপক্ষে দেড় লাখ ডাক্তার থাকা দরকার ছিল।

এতেও অনুমান করা যায় যে, জনসংখ্যা অনুযায়ী এদেশের চিকিৎসা সেবার মান কেমন হতে পারে। স্বাভাবিকভাবেই ডাক্তার-নার্সদের পক্ষে সঠিকভাবে সেবা দেয়া সম্ভব হবে না। মহামারীর মতো সমস্যা দেখা দিলে তো বলায় বাহুল্য!

বাংলাদেশে মোট হাসপাতালের সংখ্যা সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ৩,৫৭৫টি৷ এরমধ্যে সরকারি হাসলপাতাল মাত্র ৫৯২ টি৷ সরকারি হাসপাতালের মধ্যে উপজেলা এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে হাসপাতাল আছে ৪৬৭টি আর ১২৫টি হাসপাতাল বিশেষায়িত এবং জেলা পর্যায়ে৷

আরও পড়ুন>>>করোনা দেশে শ্রেনী বৈষম্য মূর্ত করে তুলছে

বর্তমানে সরকারী হাসপাতালে ৪৯ হাজার ৪১৪ টি শয্যা রয়েছে।অন্যদিকে বেসরকারী হাসপাতালে শয্যা রয়েছে ৮৭ হাজার ৬১০ টি। সরকারী-বেসরকারী যৌথ ভাবেও এখানে গড়ে প্রায় ১৩১৩ জনের জন্য একটি মাত্র শয্যা রয়েছে।যা জনসংখ্যা বিবেচনায় খুবই অপ্রতুল।

বেসরকারী হাসপাতালে কিছুটা চিকিৎসা মান ভালো হলেও সেখানে চিকিৎসা ব্যয় প্রচুর হওয়ায় নিম্ন আয়ের মানুষ সঠিক চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হন। সরকারী হাসপাতালেও দীর্ঘ লাইন ধরে চিকিৎসা নেয়া অনেকের পক্ষেই সম্ভব হয় না।

সরকারী হাসপাতাল গুলোতে চিকিৎসকের অপর্যাপ্ততা সত্ত্বেও সঠিকভাবে চিকিৎসককরা হাসপাতালে হাজির হন।সরকারি হাসপাতালের অনেক ডাক্তারই বেসরকারী হাসপাতাল গুলোতে অধিক সময় ব্যয় করেন। এতে করে তারা সরকারী হাসপাতালে সঠিকভাবে রোগী দেখেন না।

অতিরিক্ত পরীক্ষার বোঝাঃ

হাসপাতালগুলোতে গেলে রোগ নির্ণয়ে অতিরিক্ত পরীক্ষার বোঝা বইতে হয় সাধারণ রোগীদের। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় সাধারণ একটি অসুখেও অনেক গুলো টেস্ট দেয়া হয়। এতে করে রোগীরা পড়েন বিপদে। বাধ্য হয়ে তাদের অতিরিক্ত টাকা খরচ করে চিকিৎসা করাতে হয়। এক্ষেত্রে ডাক্তারদের সাথে অসাধু ল্যাব ব্যবসায়ীদের একটা যোগসাজশ থাকে। এতে করে মুষ্টিমেয় ডাক্তার এবং ব্যবসায়ীরা লাভবান হয়।

স্বাস্থ্যখাতে দূর্নীতি-লুটপাটঃ

সরকারি হাসপাতালগুলোতে রয়েছে ব্যাপক পরিমাণ দুর্নীতি। স্বাস্থ্য খাতে কেনাকাটা, নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি, পদায়ন, চিকিৎসাসেবা, চিকিৎসাসেবায় ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ব্যবহার, ওষুধ সরবরাহসহ ১১টি খাতে দুর্নীতি বেশি হয়। এই হিসাব করেছে খোদ রাষ্ট্রীয় সংস্থা দুদক! তারা কয়েক দফা সুপারিশও কররেছে এই পরিস্থিতি পাল্টাবার জন্যে।কিন্তু এটা এভাবে পাল্টানো সম্ভব নয়।কারণ স্বাস্থ্যখাতে এই দূর্নীতির সাথে রাষ্ট্রের নির্ধারক ব্যক্তিরা জড়িত। ডাক্তার নিয়োগ থেকে শুরু করে চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনা,ঔষধ জালিয়াতি সব ধরনের দূর্নীতি ও লুটপাট এই সেক্টরে করা হয়।

স্বাস্থ্য খাতে গবেষনা-বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি ও পর্যাপ্ত শিক্ষার অভাবঃ

বাংলাদেশে প্রান্তিক পর্যায়ে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সচেতনা একেবারেই নেই বললে চলে। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য সচেতনতা নির্ভর করে মফস্বল এর ফার্মেসীগুলোর পরামর্শের উপর।সরকার থেকে কমিউনিটি ক্লিনিক করা হলেও তা গ্রামে কার্যকর প্রভাব ফেলতে পারে নি। এখনো পর্যন্ত সামগ্রিকভাবে এক ব্যাপক অংশের মানুষ স্বাস্থ্য সম্পর্কে একেবারেই অসচেতন। এখানকার জনগোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে সনাতনী ধর্মীয় কুসংস্কার এবং অবৈজ্ঞানিক ধ্যান ধারনা। সাম্প্রতিক সময়ে করোনা মোকাবেলায় দেখা যাচ্ছে এ বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে এবং এই ক্ষেত্রে কি পরিনাম অজ্ঞতা রয়েছে তা ভালভাবে টের পাওয়া যাচ্ছে। যখন কিনা সারাদেশে সাধারণ মানুষকে করোনা সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক ধারনা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। অর্থাৎ জনগনকে স্বাস্থ্য সচেতন করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে। এখানেও জনগনকে দোষারোপ করবার কোন কারণ নেই। দীর্ঘ দিন ধরে যখন স্বাস্থ্য এবং বিজ্ঞান সম্পর্কে জনগনকে সচেতন করবার উদ্যোগ নেয়া হয় না তখন নতুন পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ এমন করবেন এটাই স্বাভাবিক।

সাধারণ ভাবে ডাক্তারদের মানোন্নয়ন এবং মেডিকেল কলেজগুলোর মানোন্নয়ন ও মেডিকেল গবেষনা খাতে আমাদের দেশের ব্যয় খুবই কম। রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রেও আমরা পিছিয়ে রয়েছি। যার ফলে অসংক্রামক রোগের বিস্তার বাড়ছে। অন্যদিকে পাল্লা দিয়ে বাংলাদেশ থেকে ভারতে চিকিৎসা করতে যেতে বাধ্য হচ্ছে মধ্যবিত্ত জনগনের একাংশ। দুরারোগ্য রোগের চিকিৎসারর জন্য অসংখ্য লোক ভারতে পারি জমাচ্ছে প্রতি বছর। এতে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে ভারত।

উপরে বর্ণিত পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা মূলত এখনো পর্যন্ত রোগ প্রতিরোধে সক্ষম নয়। বরং স্বাস্থ্যসেবা ও নীতিসমূহ প্রণীত হয়েছে রোগ হবার পরে কিভাবে ব্যবস্থা নেয়া হবে সেই অনুযায়ী।অন্যদিকে পুরো স্বাস্থ্যখাতকেই বেসরকারীকরণ করে মূলত মাফিয়াদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। বৃহৎ শিল্প পুঁজিপতিদের মুনাফা তৈরীর সেক্টরে পরিণত করা হয়েছে চিকিৎসা বা স্বাস্থ্যের মত মৌলিক সেবামূলক খাত কে।ঔষধ শিল্পের উপরও সরকারী কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। যে ঔষধ খাতে ব্যক্তিগত ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ব্যয় করতে হয় জনগনকে। এই পরিসরে আরো গভীর বিশ্লেষণ সম্ভব নয়। এখানে শুধু বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত দেখিয়ে বাস্তব পরিস্থিতি অনুধাবন করবার চেষ্টা করা হয়েছে। ধারাবাহিক লেখায় এই ধরনের স্বাস্থ্যসেবা খাতে কি করা উচিত এবং কিভাবে করা হবে তা আলোচনা করা হবে।

চলবে……….

লেখক

আতিফ অনিক

সভাপতি, বিপ্লবী ছাত্র-যুব আন্দোলন, কেন্দ্রীয় কমিটি।

এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

Leave a Reply

লেখক

সর্বশেষ সংবাদ

%d bloggers like this: