হো চি মিন-ভিয়েতনামের প্রাণপুরুষ

বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের কাছে তিনি বিপ্লবের প্রতীক। যার অনুপ্রেরণায় উজ্জীবিত হয়ে জনগণ ফরাসি ও মার্কিন বাহিনীকে এক দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে বিতাড়ন করে মুক্তির নতুন পতাকা উড়িয়ে ছিল, তিনি ভিয়েতনামের প্রাণপুরুষ হো চি মিন। ২ সেপ্টেম্বর তার মৃত্যু দিবস।

হো চি মিন তাঁর আসল নাম নয়, এটি তাঁর ছদ্ম নাম। তাঁর প্রকৃত নাম নগুয়েন থাট থান। কমরেড হো চি মিন রাজনৈতিক কারণে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নামে পরিচিত ছিলেন। ছোট সময় তাঁকে আদর করে ‘আঙ্কেল হো’ বলে ডাকা হতো। হো চি মিন আর ভিয়েতনাম মূলত একই সূত্র গাঁথা। আজন্ম তিনি ভিয়েতনামের স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছেন। মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করেছেন জনগণের মুক্তি, স্বাধীনতা ও অধিকারের জন্য।
.মার্কস-এঙ্গেলসের তত্ত্ব প্রয়োগে নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। আন্তর্জাতিক কমিউনিজম ও জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের একজন অন্যতম প্রবক্তা। এশিয়া ভূখণ্ডে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় তাঁর বলিষ্ঠ চিন্তাধারার বাস্তবায়ন ঘটে।

মার্কস এঙ্গেলস লেনিন স্ট্যালিন ও মাও সে তুঙয়ের পরে হো চি মিনের নামটি উচ্চারিত হয়। বিশ্বের মানুষের কাছে তিনি বিপ্লবের অন্যতম প্রতীক।

হো চি মিনকে প্রথমে গ্রামের পাঠশালায় ভর্তি করে দেন বাবা নগুয়েন মিন হুয়ে। খুব ভালো করায় পরে শহরের এক হাইস্কুলে ভর্তি করে দেওয়া হয়। শহরে এসেই বুঝতে পারলেন নিজেদের মাতৃভূমিতে কোনো অধিকার নেই। তাদের দেশ শাসন করছে ফরাসিরা। স্কুলের প্রধান শিক্ষক ফরাসি। অন্য শিক্ষকরা ভিয়েতনামি হলেও প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে কিছু বলার সাহস নেই। স্কুলের এসব পরাধীনতা তাকে আরও বিপ্লবী চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে। সে সময় বিচ্ছিন্নভাবে কিছু আন্দোলন হলেও সুসংগঠিত কোনো আন্দোলন গড়ে ওঠেনি। ঠিক এ সময়ে হুয়ে শহরে গড়ে ওঠে এক গোপন বিপ্লবী সংগঠন। হো চি মিন এই সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ঘুরে ঘুরে মানুষের কাছে প্রচারপত্র বিলি করতেন এবং বোঝাতেন, অত্যাচারী ফরাসিদের দেশ থেকে বিতাড়ন না করলে দেশের মানুষের মুক্তি নেই। অল্পদিনের মধ্যেই তিনি হয়ে উঠলেন বিপ্লবী আন্দোলনের প্রথম সারির নেতা। আর এ জন্য ফরাসি গুপ্তচর বাহিনীর শ্যেন দৃষ্টি পড়ে তার ওপর। তিনি গুপ্তচর বাহিনীকে ফাঁকি দিয়ে জাহাজে পাড়ি দেন পশ্চিমা কোনো দেশে।

উদ্দেশ্য_ সেসব দেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও শাসন ব্যবস্থা সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান লাভ করা। নানা দেশ ঘুরতে ঘুরতে হো এসে পেঁৗছেন ফ্রান্সে। দেখতে পান ভিয়েতনামে উপনিবেশ গড়ে তোলা ফরাসিদের সঙ্গে সামান্যতম মিল নেই। সুস্থ সংস্কৃতির চেতনায় উদ্বুদ্ধ রুশো, ভলতেয়ারের দেশের মানুষদের দেখে তিনি মুগ্ধ হন। স্থির করেন বিপ্লবের জন্মভূমি ফ্রান্স থেকেই অর্জন করবেন বিপ্লবের মন্ত্র। পরিচয় ঘটে ফরাসি সমাজতান্ত্রিক নেতাদের সঙ্গে।

১৯২০ সালে প্যারিসে ফরাসি সোস্যালিস্ট পার্টির অধিবেশন বসলে বিভিন্ন দেশ থেকে অনেক প্রতিনিধি যোগ দেন। এ সময় হো যোগ দিয়েছিলেন ভিয়েতনামের প্রতিনিধি হিসেবে। এই প্রথম তিনি বিশ্বের প্রতিনিধিদের সামনে তুলে ধরেন ভিয়েতনামের ওপর ফরাসিদের শোষণ আর অত্যাচারের কথা। হো বুঝতে পারলেন, দেশের মানুষের সম্মিলিত ঐক্য আর সংগঠনের মাধ্যমেই গড়ে তুলতে হবে বিপ্লব। যার জন্য প্রয়োজন একটি রাজনৈতিক দলের। তিনি গড়ে তোলেন ভিয়েতনামি বিপ্লবী তরুণ সংঘ। এরপর অনেক সংগ্রামের পর ভিয়েতনামে শেষ হয় ফরাসি শাসন। এ শাসনমুক্ত হলেও নতুনভাবে সরাসরি আগ্রাসন চালায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র । নাপাম বোমা ফেললেও সেই আগ্রাসী শক্তির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে একটুও বিচলিত ছিল না ভিয়েতনামের সাধারণ জনগণ। কারণ তাদের প্রেরণাশক্তি ছিলেন ভিয়েতনামের আলোর দিশারী হো চি মিন।

উল্লেখ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শুধু ভিয়েতনামে প্রত্যক্ষ যুদ্ধেই অংশগ্রহণ করে ক্ষান্ত হয় নি, বরং আনবিক পারমানবিক অস্ত্র ছাড়াও যুক্তরাষ্টের কৌশলগত ভান্ডারে যতসব অস্ত্রভাণ্ডার তৈরি হয়েছিল এর সব কিছুই প্রয়োগ করেছিল ভিয়েতনামে।

তার মানে আমরা বলতে পারি, ভিয়েতনামকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ব্যবহার করেছিল অস্ত্রশস্ত্রের পরীক্ষাগার হিসেবে।অপ্রতিসম যুদ্ধের সুস্পষ্ট দৃষ্টান্ত পরিলক্ষিত হয় ভিয়েতনামে।কিন্তু ভিয়েতনামের বিপ্লবীরাও ছিল আত্মশক্তিতে বলিয়ান।

তারা মুক্তি ও স্বাধীনতাকেই মূলমন্ত্র করে যুক্তরাষ্টের সব সামরিক-কৌশলগত চাপ ব্যর্থ করে দিতে সমর্থ হয়,তারা ব্যর্থ করে দেয় নয়া সাম্রাজ্যবাদ ও ঔপনেবিশবাদী চক্রান্ত এবং বিতাড়িত করে অপ্রতিসম শক্তিকে।ভিয়েতনামের বিপ্লবী মনে করতো, তাদের উপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়া ব্যবস্থাকে একমাত্র জোর প্রয়োগের মাধ্যমেই ধ্বংস এবং উৎখাত করা সম্ভব। আর তাদের এই মুক্তিকামী বিপ্লবী যুদ্ধে অনুপ্রেরণা ছিলেন আপোষহীন নেতা হো চি মিন।

সূত্র: দিবালোক

এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

Leave a Reply

লেখক

সর্বশেষ সংবাদ

%d bloggers like this: