ইসলামে নারীরা কখনো পিছিয়ে ছিলোনা, উহুদের বীরাঙ্গনা নুসাইবা বিনতে কা’ব (রা.)

ইসলামের প্রচার প্রসারে নারী সাহাবীদের আত্মত্যাগ অতুলনীয়। জ্ঞানচর্চা, দাওয়াতের কাজে সহযোগিতা, জিহাদের ময়দানে বীরত্বগাঁথা- সকল পরিম-লেই রয়েছে নারী সাহাবীদের সফল ভূমিকা। তেমনি ইতিহাসখ্যাত একজন নারী সাহাবী হলেন নুসাইবা বিনতে কা’ব (রা.)।

নাম ও বংশ পরিচয়

ইতিহাসে তিনি নুসাইবা বিনতে কা’ব নামে অত্যাধিক পরিচিত। উপনাম উম্মে উমারা। পিতার নাম কা’ব বিন আমর। মদিনার বিখ্যাত খাযরাজ গোত্রের নাজ্জার শাখার কন্যা। (সিয়ারু আ’লামিন নুবালা ২/২৭৮) রাসুল (সা.) এর মদীনায় হিজরতের প্রায় চল্লিশ বছর পূর্বে মদিনায় জন্মগ্রহণ করেন। (সাহাবিয়াত-২০৪) তিনি বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বিখ্যাত সাহাবী আবদুল্লাহ বিন কা’ব মাযিনীর বোন। (সিয়ারু আ’লামিন নুবালা ২/২৭৮)

স্বামী ও সন্তান

নুসাইবা বিনতে কা’ব (রা.) এর প্রথম স্বামী যায়েদ বিন আসিম বিন আমর। তিনি তার চাচাতো ভাইও ছিলেন। তার মৃত্যুর পর গাযিয়্যা বিন আমরের সাথে দ্বিতীয় বিয়ে হয়। প্রথম পক্ষে আবদুল্লাহ ও হাবীব এবং দ্বিতীয় পক্ষে তামিম ও খাওলা নামক মোট চার সন্তানের মা হন। (তাবাকাত ৮/৪১২; আল ইসাবা ৪/৪৭৯)

ইসলাম গ্রহণ

নুসাইবা বিনতে কা’ব (রা.) ইসলামের প্রাথমিক যুগের মুসলিম। (সাফওয়াহ ২/৩৪) ইসলামের সূচনালগ্নে রাসুল (সা.) মক্কায় ও তার পার্শ্ববর্তী জনপদে ইসলামের দাওয়াত দিতে গিয়ে দিন দিন কঠোর থেকে কঠোরতর প্রতিরোধ ও প্রতিকূল পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছেন। এর ফাঁকে তিনি মদিনায় তার প্রতিনিধি মুসয়াব বিন উমায়ের (রা.) কে ইসলামের দাওয়াত দেয়ার জন্য পাঠান। রাসুলুল্লাহর (সা.) মদীনায় হিজরতের পূর্বে মুসয়াব (রা.) এর প্রচেষ্টায় মদিনার যে সকল নারী-পুরুষ ইসলাম গ্রহণ করেন নুসাইবা (রা.) তাদের একজন। কেবল তিনি নন, এ সময়কালে তার গোটা বংশ ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে প্রবেশ করে। এভাবেই তিনি প্রথম পর্বের একজন মুসলিম আনসারি মহিলা হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেন। (সাহাবিয়াত-২০৪; আ’লামুন নিসা- ৫/১৭১)

ইসলামের জন্য অবদান

তিনি উহুদ, আক্বাবাহ, হুদাইবিয়্যা, খাইবার, হুনাইন, ইয়ামামার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তন্মধ্যে উহুদের যুদ্ধে তিনি যেভাবে মানববর্মের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে রাসুল (সা.) কে রক্ষা করেন তা ছিল নারীদের জন্য একটি ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত।

উহুদের যুদ্ধের শুরুর দিকে তিনি অন্যান্য নারীদের মতো তৃষ্ণার্ত সৈন্যদের জন্য পানি আনা-নেয়া এবং আহতদের সেবাযত্ন করার কাজে নিয়োজিত ছিলেন। যুদ্ধের ফলাফল যখন মুসলিমদের অনুকূলে আসতে শুরু করে তখন সৈন্যরা রাসুল (সা.) এর নির্দেশ অমান্য করে বসলে প্রাথমিক জয় পরাজয়ে রূপ নিতে লাগে। লোকজন নিজেদের বাঁচানোর তাগিদে দৌড়াদৌড়ি শুরু করে দেয়। এমনকি রাসুল (সা.)ও অরক্ষিত হয়ে পড়েন। এমন সময় নুসাইবা (রা.) এক হাতে উন্মুক্ত তরবারি আর অন্য হাতে একটা ঢাল নিয়ে উল্কার বেগে ছুটতে লাগলেন রাসুলল্লাহকে হেফাজত করতে। একে একে যখন মর্দে মুজাহিদরা বীর বিক্রমে যুদ্ধ করে শহীদ হতে লাগলেন তখন চারদিক থেকে শত্রুপক্ষের সঙ্গে লড়াই করতে লাগলেন উম্মে উমারা। সেদিন রাসুলল্লাহ (সা.) বলেছিলেন, ‘আমি যেদিকে তাকাই দেখি উম্মে উমারা, ডানে উম্মে উমারা, বামে উম্মে উমারা। তিনি অনেক পুরুষ যোদ্ধাদের থেকেও ভালো লড়াই করেছেন।’ শুধু তাই নয়, নবীজি (সা.) আল্লাহর কাছে তার জন্য দোয়া করে বলেন, ‘হে আল্লাহ, তুমি নুসাইবা ও তার পরিবারকে আমার জান্নাতের সঙ্গী বানিয়ে দাও।


আরও পড়ুন>>


উহুদ যুদ্ধের সেই মারাত্মক পর্যায়ের বর্ণনা উম্মে উমারা (রা.) এভাবে দিয়েছেন, ‘আমি দেখলাম, লোকেরা রাসুলুল্লাহকে (সা.) ছেড়ে পালাচ্ছে। মাত্র মুষ্টিমেয় কয়েকজন যাদের সংখ্যা দশও হবে না, রাসুলুল্লাহর (সা.) পাশে আছে। আমি, আমার দুই ছেলে ও স্বামী রাসুলুল্লাহর (সা.) পাশে দাঁড়িয়ে তাকে রক্ষা করেছি। তখন অন্য মুজাহিদরা পরাজিত অবস্থায় রাসুলুল্লাহর (সা.) পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছিল। রাসুলুল্লাহ (সা.) দেখলেন আমার হাতে ঢাল নেই। তিনি এক ব্যক্তিকে দেখলেন, সে পালাচ্ছে এবং তার হাতে একটি ঢাল। তিনি তাকে বললেন, ওহে, তুমি তোমার ঢালটি যে লড়ছে এমন কারো দিকে ছুড়ে মার। সে ঢালটি ছুড়ে মারে এবং আমি তা হাতে তুলে নিই। সেই ঢাল দিয়েই আমি রাসুলুল্লাহকে (সা.) আড়াল করতে থাকি।’ (সিয়ারু আ’লামিন নুবালা ২/২৭৯)

উহুদের দিন উম্মে উমারা (রা.) যুদ্ধাংদেহী রূপ ধারণ করেছিলেন। দামরা ইবন সা’ঈদের দাদা উহুদের একজন যোদ্ধা; তিনি বলেছেন, ‘উম্মে উমারা সেদিন কোমরে কাপড় পেঁচিয়ে শত্রুদের ওপর প্রচ- আক্রমণ চালান। সেদিন তিনি মোট ১৩টি স্থানে আঘাতপ্রাপ্ত হন এবং তার ঘাড়ে মারাত্মক ক্ষতের সৃষ্টি হয় যা ভালো হতে প্রায় ১ বছর সময় লাগে। যুদ্ধ শেষে তাকে আহত ও অজ্ঞান অবস্থায় পাওয়া যায়। জ্ঞান ফেরার পরও তার প্রথম বাক্য ছিল, রাসুলুল্লাহ (সা.) জীবিত আছেন কি না!’ (সিরাতে হালাবিয়া ২/২৩১; তাবাকাত ৮/৪১৩)

উহুদ যুদ্ধ শেষ হলো। মুজাহিদরা ঘরে ফিরতে লাগলেন। রাসুল (সা.) আবদুল্লাহ ইবন কা’ব মাযিনীকে পাঠিয়ে নুসাইবা (রা.) এর অবস্থা সম্পর্কে ওয়াকিফহাল না হয়ে ঘরে ফিরলেন না।

উহুদ যুদ্ধ শেষ হওয়ার কিছুদিন পর রাসুলুল্লাহর (সা.) মদিনার মুজাহিদদের ‘হামরাউল আসাদ’ নামক এলাকায় যুদ্ধের জন্য বেরিয়ে পড়ার নির্দেশ দেন। নুসাইবা (রা.) সেখানে যাওয়ার জন্য কোমরে কাপড় পেঁচিয়ে প্রস্তুত হয়ে যান। কিন্তু ক্ষত থেকে রক্ত ক্ষরণের কারণে সক্ষম হননি। (তাবাকাত-৮/৪১৩)

ওহুদ যুদ্ধ ছাড়াও তিনি আরো অনেক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। ইবন সা’দের বর্ণনা মতে, তিনি ওহুদ, হুদাইবিয়া, খায়বার, কাজা ওমরা আদায়, হুনাইন ও ইয়ামামার যুদ্ধ ও অভিযানে যোগ দেন। হাকেম ও ইবন মুন্দার মতে, তিনি বদরেও যোগ দিয়েছিলেন। তবে ইমাম জাহাবী বলেন, তার বদরে অংশগ্রহণের কথাটি সঠিক নয়। (সিয়ারু আ’লামিন নুবালা ২/২৭৮,২৮২) তবে একমাত্র ইয়ামামার যুদ্ধ ছাড়া অন্য কোনো যুদ্ধে ও অভিযানে তার অংশগ্রহণের কোনো বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায় না। (ইবন হিশাম-১/৪৬৬)

খলিফা ওমর (রা.) নুসাইবা (রা.) কে অত্যন্ত সম্মান ও মর্যাদার দৃষ্টিতে দেখতেন। তার খেলাফতকালে একবার গনীমতের মালের মধ্যে কিছু চাদর আসে। তার মধ্যে একটি চাদর ছিল খুবই সুন্দর ও দামি। অনেকে বললেন, এটি খলিফা তনয় আবদুল্লাহর (রা.) স্ত্রীকে দেয়া হোক। অনেকে খলীফার স্ত্রী কুলছুম বিনতে আলীকে (রা.) দেয়ার কথা বললেন। খলীফা কারো কথায় কান দিলেন না। তিনি বললেন, আমি এ চাদরের সবচেয়ে বেশি হকদার উম্মে উমারাকে মনে করি। এটি তাকেই দেব। কারণ আমি ওহুদের দিন তার সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) কে বলতে শুনেছি, ‘আমি যে দিকেই দৃষ্টিপাত করছিলাম, শুধু উম্মে উমারাকেই লড়তে দেখছিলাম।’ সুতরাং তিনি চাদরটি তার কাছে পাঠিয়ে দেন। (তাবাকাত-৮/৪১৫; সিয়ারু আ’লামিন নুবালা ২/২৮১; আনসাব আল-আশরাফ-১/৩২৬)

নুসাইবা বিনতে কা’ব (রা.) ছিলেন একজন মহিলা বীর যোদ্ধা। তার বীরত্ব ও সাহসিকতার বিস্ময়কর বাস্তবতা আমরা বিভিন্ন রণাঙ্গনে প্রত্যক্ষ করি। তার যে রণমূর্তি আমরা ওহুদ ও ইয়ামামার যুদ্ধে দেখি, এর দৃষ্টান্ত পৃথিবীর ইতিহাসে খুব কমই দেখা যায়। রাসুলে কারিম (সা.) ছিলেন তার সর্বাধিক প্রিয় ব্যক্তি। তার ভালোবাসার প্রমাণ তিনি দিয়েছেন ওহুদের ময়দানে। নুসাইবা (রা.) এর মৃত্যুসন সঠিকভাবে জানা যায় না। ইসলামের জন্য তার আত্মত্যাগ ইতিহাসে চির স্মরণীয় হয়ে রইবে।

এই বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

Leave a Reply

প্রতিবেদক

সর্বশেষ সংবাদ